আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

প্রজন্মের স্বাধীনতার চেতনা

প্রকাশিত : ১০ মার্চ ২০১৫

শামসুর রাহমানের কবিতার একটি অংশ শাকিলের টিশার্টে উৎকীর্ণ দেখে মলয় জড়িয়ে ধরল ওকে। দোস্ত, চমৎকার! কোথা থেকে কিনেছিস? চল আমিও একটা কিনব। শাকিল বলল, শুধু একটি কবিতা নয়, মুক্তিযুদ্ধের আরও কবিতা আর স্মারক দিয়ে বানানো টিশার্ট, পাঞ্জাবি, ক্যাপ, ওড়না, সেলোয়ার-কামিজ পাওয়া যাচ্ছে। চল তোর জন্য টিশার্ট কিনবি, আর তোর ‘ওর’ জন্য একটা ওড়না। দু’জনেই হেসে ওঠে। মলয় শাকিলের পিঠে একটি কিল বসিয়ে দেয় ভালবেসে।

দু’জনেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় দ্রুত কার্যকরের দাবিতে গড়ে ওঠা লাখো কোটি তরুণের স্বপ্ন-ভালবাসা ‘গণজাগরণ মঞ্চ’-এর কর্মী। চলছে স্বাধীনতার মাস মার্চ। ক্লাস শেষে বিকেলে জড়ো হচ্ছে শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে। রাজাকারের বিরুদ্ধে তীব্র শ্লেষাত্মক কবিতা সঞ্চারিত এ টিশার্টটি শুধু পোশাক নয়, চেতনা জাগরণী; রাজাকারের বিরুদ্ধে ঘৃণা জাগাবে, এমন চিন্তা থেকেই কিনেছে শাকিল।

ঘটনা-২

নওরিন, কমল, কুতুব, মাকসুদ এরা পরস্পর ফেসবুকে বন্ধু। আলাপ-পরিচয় যা ওই ফেসবুকের মাধ্যমে। যোগাযোগও হয় ওই আকাশ ডাকে। ৭ মার্চের পর নওরিন হঠাৎ করেই দেখতে পেল কমল, কুতুব আর মাকসুদের প্রোফাইল বদলে গেছে। বিশেষত ছবির জায়গায় যা আছে, তা দেখে বন্ধুদের প্রতি শ্রদ্ধা ভালবাসা আরেকটু বেড়ে গেল। তিনজনই ওর ইনবক্সে মেসেজ পাঠিয়েছেÑ স্বাধীনতার মাস চলছে। মুক্তিযুদ্ধ ও যোদ্ধাদের প্রতি সামান্য শ্রদ্ধা ও সম্মানের প্রচেষ্টা স্বরূপ ছবি বদলালাম। এবার দেখা যাক কে কী করেছে।

কমল নিজের ছবির জায়গায় দিয়েছে জাতীয় স্মৃতিসৌধের ছবি, কুতুব দিয়েছে মেহেরপুরের মুজিবনগরের স্মৃতিসৌধ আর মাকসুদ মুক্তিযুদ্ধকালীন পতাকা; যাতে খচিত বাংলাদেশের মানচিত্র।

ঘটনা-৩

মৃদুলের ফোন বাজতেই বেজে উঠল ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি।’ আর অপর প্রান্তে ওয়েল কাম টিউন শুনতে পেল ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’। মৃদুল পাড়ার ক্লাবের ক্রীড়া সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছে। এবার স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ক্লাবের পক্ষ থেকে আয়োজন করেছে একদিনের প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ। ফোনে ক্লাবের পক্ষের অধিনায়কের কাছে জানতে চাইছে, মাঠে অনুশীলনে তার দল সঠিক সময়ে যাচ্ছে কিনা।

বছর ঘুরে আবার এসেছে স্বাধীনতার মাস মার্চ। ২৬ মার্চ পালিত হতে যাচ্ছে মহান স্বাধীনতা দিবস। মূলত ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এই অগ্নিঝরা কাব্যময় ঘোষণার মাধ্যমেই শুরু হয় পাকিস্তানী সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সংগ্রাম। ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণায় শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ। এই ঘোষণায় দেশের আবালবৃদ্ধবণিতা ঝাঁপিয়ে পড়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে, যার সিংহভাগই ছিল তরুণ। তারুণ্যের অদম্য সাহসিকতায়, রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। ‘সময়ের প্রয়োজনে’ই সেদিন দরকার ছিল অধিকতর তারুণ্য।

স্বাধীনতা লাভের পর দীর্ঘদিন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় ছিল না। যদিও নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে কোন কোন শক্তি মুক্তিযুদ্ধ ও এর চেতনাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। একটি গোষ্ঠী তো জনযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধকে নিজেদের ‘সম্পত্তি’ বলে মনে করেছে। নিজেদের ইচ্ছামতো ইতিহাস বিকৃতিসহ তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার প্রয়াস পায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনাশে যা করার তার সব কিছু করে হয়েছে জাতির কাছে ধিকৃত। কথা এই যে, এত ষড়যন্ত্র, নোঙরামির মধ্যেও প্রজন্মের সৎ ও সাহসী এবং প্রকৃত ইতিহাস অনুসন্ধানী তারুণ্য জেগে ওঠে। তারাও তাদের অনুজসম প্রজন্মের হাত ধরে খুলে দেয় চোখ।

এ লেখার শুরুর দিকে যে তিনটি ঘটনার উল্লেখ আছে, তাতে আরও আশান্বিত হওয়া যায় নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সঞ্চারিত তো হচ্ছেই, পাশাপাশি দৃশ্যমান হচ্ছে তাদের প্রচার-প্রচারণার কৌশল। ব্যবহার্য ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী, পোশাক-আশাক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণই বলে দেয়Ñ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, চেতনা বাংলাদেশ বিপথে হারাবে না। এই তরুণদের হাত ধরেই দেশের অহঙ্কার, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধারা যুগ যুগ ধরে হবেন সম্মানিত, বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে।

তরুণদের এসব সাধুবাদযোগ্য কর্মকা- ও অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে একটি সংযোজনের ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে। একটা সময় বিশেষত গত শতাব্দীর আট, নয় ও শেষ দশকে রাজধানীর পাড়া-মহল্লা, জেলা-উপজেলা-থানা শহর থেকে বিভিন্ন স্মরণিকা প্রকাশিত হতো। বিশেষ করে মহান ভাষা শহীদ দিবস, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, মে দিবস, বাংলা নববর্ষে নানা রকম প্রকাশনা দেখা যেত। এখন এ ব্যাপারে খরাই চলছে বলা যায়। এতে প্রধানত দুটি লাভ হতো- প্রথমত, সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশ ঘটত; দ্বিতীয়ত, ফুটে উঠত সময়ের চিত্র । পরবর্তীকালে এর ঐতিহাসিক চাহিদা ও মূল্য হতো সৃষ্টি। এমন উদ্যোগ তরুণ সমাজ আবার ও নিতে পারে কিনা, একটু ভেবে দেখা দরকার।

মহান স্বাধীনতার মাসে তারুণ্য যে নিদর্শন দেখাচ্ছে, তা শুধু একটি মাসের মধ্যে যেন সীমাবদ্ধ না থাকে। সারা বছরই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতার অহঙ্কার যেন বজায় থাকে তারুণ্যের ‘ভেতরে-বাহিরে’। আর অবশ্যই তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

সিরাজুল এহসান

প্রকাশিত : ১০ মার্চ ২০১৫

১০/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: