মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

টেস্টে ফেল করলেও পরীক্ষা দেয়া যাবে-এ সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী

প্রকাশিত : ১০ মার্চ ২০১৫
  • এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের ঘোষণায় শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, অভিভাবকদের তীব্র প্রতিক্রিয়া

বিভাষ বাড়ৈ ॥ নির্বাচনী (টেস্ট) পরীক্ষায় ফেল করলেও সমস্যা নেই, ক্লাসে ৭০ শতাংশ উপস্থিতি থাকলেই দেয়া যাবে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা-শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমন ঘোষণায় অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার মানের সঙ্কটের মধ্যেই এমন ঘোষণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও অভিভাবকরা। একে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত অভিহিত করে অবিলম্বে এটি বাতিলের দাবি জানিয়ে তারা বলেছেন, মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্ত পড়ালেখা থেকে শিক্ষার্থীদের দূরে ঠেলে দেবে। পড়ালেখা বাদ দিয়ে কোনমতে ক্লাস উপস্থিতিতেই মনোযোগী হবে র্শিক্ষার্থীরা। নির্বাচনী পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাবে। এর ফলে পাবলিক পরীক্ষার সামগ্রিক ফল খারাপ হতে বাধ্য। এ ছাড়া এই সিদ্ধান্তের ফলে পাবলিক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী পরীক্ষা পুরোপুরি গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে। সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন অভিভাবকরা।

মন্ত্রণালয়ের আকস্মিক এ ঘোষণার বিরুদ্ধে সোমবার রাজধানীতে জরুরী সভা করেছেন অভিভাবকরা। যেখান থেকে আন্দোলনের দাবি উঠেছে। দুদিন আগেও বৈঠক করেছেন তারা। মন্ত্রণালয়ের ঘোষণায় এখন থেকে যে কোনভাবে ক্লাসউপস্থিতি দেখাতে সারাদেশের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় অবৈধ শিক্ষা বাণিজ্য শুরু হওয়ার আশঙ্কা করেছেন অভিভাবকরা। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার ঝর বইছে ফেসবুক, টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এর আগে গত তিন মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করে। যেখানে বলা হয়, নির্বাচনী পরীক্ষায় ফেল কললেও শ্রেণীকক্ষে ৭০ শতাংশ উপস্থিত থাকলে শিক্ষার্থীরা পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে। বিষয়টি নিশ্চিত করতে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের নির্দেশনা দিয়ে পরিপত্রটি জারি করা হয়। শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান স্বাক্ষরিত পরিপত্রে আরও বলা হয়, কোন কোন বিদ্যালয় শতভাগ পাস কিংবা ভাল ফল দেখানোর জন্য নির্বাচনী (টেস্ট) পরীক্ষায় এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার অজুহাতে পরীক্ষার্থী ছাঁটাই করে। অপরদিকে অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ঘটনা ও বিভিন্ন অযাচিত ঘটনার জন্য কিছু শিক্ষার্থী পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে না। এ ধরনের শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা সরকারের কাম্য নয়।

এদিকে মন্ত্রণালয়ের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই এ নিয়ে অসস্তোষ বাড়তে থাকে অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের মাঝে। বিষয়টি নিয়ে এক সপ্তাহে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন সারাদেশের স্কুল-কলেজের অভিভাকদের ঐক্যবদ্ধ সংগঠন অভিভাবক সমন্বয় ফোরাম। ফোরামের সাধারণ সম্পাদক নিপা সুলতানা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তকে শিক্ষার মানের জন্য চরম আত্মঘাতী অভিহিত করে বলেছেন, এটা যে কেন করতে গেল মন্ত্রণালয়, আমরা বুঝি না। আমাদের সন্তানরা এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয় মূলত টেস্ট পরীক্ষাকে ঘিরেই। এই পরীক্ষার একটা গুরুত্ব সারাজীবন ধরে চলে আসছে। এই পরীক্ষায় ভাল করার জন্য শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা করে বলেই মূল পরীক্ষাটা ভাল হয়। এখন তো কেউ পরীক্ষার আগে পড়ালেখা করতে বসবে না। এটা করে তো মান আরও খারাপ হবে শিক্ষার। অভিভাবক নেত্রী আরও বলেন, আমরা ইতোমধ্যেই অভিভাবকরা বসেছি আলোচনায়। সেখানে প্রত্যেক অভিভাবক এটা বাতিল করার দাবি জানিয়েছেন। তারা এজন্য আন্দোলনের কথা বলেছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তে পড়ালেখা বাদ দিয়ে কোনমতে ক্লাস উপস্থিতিতেই মনোযোগী হবে শিক্ষার্থীরা। নির্বাচনী পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাবে।

আর সারাদেশে বিশেষত গ্রামে-গঞ্জে শিক্ষক ও গবর্নিং বডিকে ম্যানেজ করে কোনমতে ক্লাসউপস্থিতি বাড়ানো হবে খাতা-কলমে। পড়ালেখা কেউ করবে না। আমরা অবিলম্বে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানাচ্ছি। নির্বাচনী পরীক্ষাকে এভাবে গুরুত্বহীন করে দেয়ার ঘোষণায় উদ্বিঘœ জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্যসচিব শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. শেখ ইকরামুল কবীর।

তিনি বলছিলেন, না, এটা করা কোনভাবেই ঠিক হয়নি। এমনিতেই র্শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন আছে, তার মাঝে হঠাৎ করে বছরের পর বছর ধরে যে পরীক্ষাকে ঘিরে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় মনোযোগী হয় তাকে দুর্বল করে দিলে সঙ্কট বাড়বে। মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তের ফলে ভাল না করেও কেবল ক্লাসউপস্থিতি দেখিয়ে পাবলিক পরীক্ষায় আসবে শিক্ষার্থীরা। এ কারণে পাবলিক পরীক্ষার সামগ্রিক ফল খারাপ হবে। এ ছাড়া এই সিদ্ধান্তের ফলে নির্বাচনী পরীক্ষাও গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে। আসলে আমাদের দেশের বাস্তবতা এখনও সেই পর্যায়ে আসেনি যে শিক্ষার্থীদের ওপর একটা পড়ালেখার চাপ না রেখে উদার করে দেয়া যায়। সেই বাস্তবতা অনেকদূর। এ শিক্ষাবিদ আরও বলছিলেন, এখন এতে সমস্যা হবে। সরকারের উদ্যোগের অপপ্রয়োগ হবে। একদিকে পাবলিক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী পরীক্ষা পুরোপুরি গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে। অন্যদিকে এখন থেকে যে কোনভাবে ক্লাসউপস্থিতি দেখাতে সারাদেশের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় শিক্ষা বাণিজ্য শুরু হবে। এটা নিয়ে নতুন করে ভাবার পরামর্শ দিয়েছেন এ শিক্ষাবিদ। জাতীয় পাঠক্রম প্রণয়নের সঙ্গে সব সময় যুক্ত আছেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন পাটওয়ারী। তিনি শিক্ষার স্বার্থে দ্রুত এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার পরামর্শ দিয়েছেন; বলেছেন, এটা নিয়ে অবশ্যই নতুন করে ভাবতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন এমন হবে যে কেউ পরীক্ষার আগে তো পড়ালেখা করবেই না তার ওপর গবর্নিং বডি বা অন্য প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ৭০ শতাংশ উপস্থিতি দেখানোতে ব্যস্ত থাকবে। এটা কর তো খুব সহজ। তিনি সরকারকে পরামর্শ দেন, ঢালাওভাবে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তার পরিবর্তে কেবল নির্বাচনী পরীক্ষার আগে অসুস্থ বা দুর্ঘটনা জনিত কারণে কেউ পরীক্ষা দিতে না পারলে তাদের পরীক্ষা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা দরকার। সেক্ষেত্র বিকল্প কোন পথ বের করতে হবে, তবে তা এভাবে নয়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী অবশ্য বলছিলেন, টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করলে অনেক স্থানে টাকা নিয়ে পরীক্ষার সুযোগ দেয়ার অভিযোগ আছে। টাকা না দিলে পরীক্ষায় আসতে দেয়া হয় না। তবে এটা বন্ধের জন্য এভাবে সিদ্ধান্ত নিলে হবে না। ৭০ শতাংশ উপস্থিতি আর পাস; একটাকে আরেকটার বিকল্প ভাবা যাবে না। দেশে তো কত নীতিমালাই আছে। ভাল ভাল নীতিমালা আছে কিন্তু তা সেভাবে মানা হয় কিনা তার মনিটরিং কই? এখনও মনিটরিং ছাড়া নতুন সমস্যা হবে। শিক্ষাঙ্গনে উপস্থিতি দেখানোর জন্য শিক্ষাবাণিজ্য শুরু হবে।

রাজধানীতে অবস্থিত দেশের নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষরাও সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। এক অধ্যক্ষ বলছিলেন, এটা থেকে মন্ত্রণালয় না ফিরে আসলে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা থেকে দূরে চলে যাবে। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল এ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা বেগম বলছিলেন, এই সিদ্ধান্তের ভাল-খারাপ দুটো দিকই আছে। শিক্ষার্থীরা এর ফলে ক্লাস করায় মনোযোগী হবে। তবে খারাপ দিক হলো, পড়ালেখা হবে না, টেস্ট পরীক্ষাকে ঘিরে সারাজীবন যা হয়ে আসছে। এছাড়া সারাদেশে বিশেষত গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন ব্যক্তিকে ধরে কোনমতে ক্লাসে ৭০ শতাংশ উপস্থিত দেখানোই কাজ হবে শিক্ষার্থীদের। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার ঝর বইছে ফেসবুক, টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও।

রাজ্জাক তার ফেসবুক ওয়ালে বলেছেন, টেস্ট পরীক্ষায় পাস করা যদি গুরুত্বপূর্ণ না হয়, তাহলে ক্লাসের উপস্থিতিকে বিবেচনা করারও প্রয়োজন আছে বলে মনি করি না। এটা আরেকটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বলে মনে হচ্ছে। এখন দেশে এ+ এর ছড়াছড়ি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় তারা ফেল করে। চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় ফেল করে। এখন আরও এ+ বাড়বে। কিন্তু প্রকৃত এ+ পাওয়া যাবে না।

আকরাম খান লিখেছেন, ক’দিন পরে বলবে পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করলেই এ+ দেয়া হবে। শুধুই পাস থাকবে, ফেল বলে কোন শব্দ থাকবে না। পরীক্ষার হলে ‘উপস্থিত’ থাকলেই পাস। সমীরণ দেওয়ান লিখেছেন, তাহলে নির্বাচনী পরীক্ষা নেয়ার দরকার কি? তারচেয়ে বছর শেষে ৭০% হাজিরা হলেই পাস, বলে দিলেই হয়! মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে শিক্ষা ব্যবস্থা আরও ধ্বংসের দিকে যাবে। শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের কফিনের শেষ পেরেক এটা। দয়া করে ফিরে আসুন এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে।

প্রকাশিত : ১০ মার্চ ২০১৫

১০/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: