হালকা কুয়াশা, তাপমাত্রা ১৮.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অটোসাজেশন- যা বদলে দেয় সবকিছু

প্রকাশিত : ৯ মার্চ ২০১৫

মনে মনে ইতিবাচক শব্দের বার বার উচ্চারণ বা অনুরণনই হচ্ছে অটোসাজেশন। অটোসাজেশনে ছোট ছোট কথা শব্দ বার বার উচ্চারিত হয়ে সৃষ্টি হয় বিশ্বাস ও শক্তির এক অনন্ত-অনুরণন, যা বদলে দেয় সবকিছু, তৈরি করে নতুন বাস্তবতা। মন্ত্রশক্তি এই একই প্রক্রিয়ায় কাজ করে। মন্ত্রশক্তির আধুনিক নাম হচ্ছে অটোসাজেশন।

অটোসাজেশন কিভাবে কাজ করে?

আসলে বার বার উচ্চারিত ইতিবাচক শব্দ বা কথার প্রভাব সম্পর্কে সাধকরা সচেতন ছিলেন আদিকাল থেকেই। প্রতিটি ধর্মেই ইতিবাচক কথা বা বাণীকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। নবীজী (সা.) বলেছেন, কারও সঙ্গে দেখা হলে সালাম বিনিময়ের পর কুশল জিজ্ঞেস করলে বলবে, ‘শোকর আলহামদুলিল্লাহ, বেশ ভাল আছি’। কেন বলেছিলেন, বললে কী হবে, না বললে কী ক্ষতি, এসব আমরা হাজার বছর ধরেও বুঝিনি।

বিশ শতকের শুরুতে মনোবিজ্ঞানীরা এই ‘ভাল আছি’ বলার গুরুত্ব বুঝতে শুরু করলেন। ফরাসী মনোবিজ্ঞানী ডাঃ এমিল কোয়ে বাস্তব গবেষণায় দেখলেনÑ ভাল কথা বার বার বললে ভাল জিনিসগুলোই তার দিকে আকৃষ্ট হয়। সে ভাল হতে থাকে। তিনি তার ক্লিনিকে রোগমুক্তির জন্য প্রয়োগ করলেন অটোসাজেশন। ১৯১০ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত মাইগ্রেন, মাথাব্যথা, বাতব্যথা, অ্যাজমা, প্যারালাইসিস, তোতলামি, টিউমার, গ্যাস্ট্রিক, আলসার, অনিদ্রা থেকে হাজার হাজার মানুষকে তিনি ভাল করেছেন এই অটোসাজেশন প্রয়োগ করে। তাঁর এই নিরাময় প্রক্রিয়ায় রোগীকে কিছুদিন সকালে ও বিকেলে একাগ্র মনোযোগ দিয়ে ২০ বার বলতে হতো, ‘ডে বাই ডে ইন এভরি ওয়ে আই অ্যাম গেটিং বেটার অ্যান্ড বেটার’। ব্যস, রোগ উধাও।

বাংলাদেশে ফলিত মনোবিজ্ঞানের পথিকৃত প্রফেসর এমইউ আহমেদ নিজের ওপর এই অটোসাজেশন প্রথম প্রয়োগ করেন ১৯৩৪ সালে। প্যারাটাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে ৪ মাস ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে থাকার পর ডাক্তাররা তার বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়ে তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে বলেন। তাকে বজরা নৌকা করে বরিশালে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। বুড়িগঙ্গায় নৌকায় উঠেই তিনি ভেতর থেকে পেলেন বাঁচার মন্ত্র। অন্তর থেকেই বার বার বলতে লাগলেনÑ ‘আমি বাঁচতে চাই! আমি বাঁচবো!’ সুস্থ হয়ে উঠলেন তিনি। একই প্রক্রিয়ায় ১৯৭৩ সালেও ৬৪ বছর বয়সে ‘ক্লিনিক্যালি ডেড’ অবস্থা থেকে বেঁচে ওঠেন তিনি।

প্রফেসর এমইউ আহমেদ শুধু নিজের ওপরই অটোসাজেশন প্রয়োগ করেননি; তাঁর প্রবর্তিত মেডিস্টিক সাইকোথেরাপি প্রক্রিয়ায় অটোসাজেশন দিয়ে হাজার হাজার রোগী বিভিন্ন জটিল ব্যাধি থেকে মুক্তি পেয়েছেন বিস্ময়করভাবে। মনোদৈহিক রোগ নিরাময়ে প্রফেসর এমইউ আহমেদ অত্যন্ত সফলভাবে অটোসাজেশন প্রয়োগ করেন তিন দশক ধরে।

অটোসাজেশনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কী?

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টরা হাজার হাজার গবেষণা করে দেখেছেন, মানুষের নার্ভাস সিস্টেম বাস্তবতা ও কল্পনার মধ্যে কোন তফাৎ করতে পারে না। বাস্তব ঘটনা দেখলে যে ব্রেনওয়েভ সৃষ্টি হয়, সেই একই ঘটনা কল্পনা করলেও একই ব্রেনওয়েভ সৃষ্টি হয়। যে কারণে সিনেমায় আমরা অভিনয় দেখে হাসি আবার কান্নায় বিষাদে মন ভরে ওঠে। আপনি জানেন পুরোটাই অভিনয়। কিন্তু তারপরও উত্তেজনা বা বিষাদের রেশ কাটাতে সময় লাগে। এই সূত্রকেই মনোবিজ্ঞানীরা কাজে লাগাচ্ছেন কখনো অটোসাজেশনে, কখনো মনছবিতে।

নবীজীর (সা.) ‘শোকর আলহামদুলিল্লাহ, বেশ ভাল আছি!’ বলতে বলার রহস্য এখানেই। আপনি দিনে ২০/৩০/৪০ জনের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর যদি একই কথা বলেন, তাহলে ৪০ বার আপনার মস্তিষ্কে এই ভাল থাকার বাণী যাচ্ছে। বার বার একই বাণী যাওয়ার ফলে মস্তিষ্কে ভাল থাকার তরঙ্গ তৈরি হচ্ছে। ভাল থাকার আকুতি বাড়ছে। নিউরো সাইন্টিস্টরা দীর্ঘ পরীক্ষায় দেখেছেন, যখনই মস্তিষ্কে নতুন তথ্য যায়, মস্তিষ্কে নতুন ডেনড্রাইট অর্থাৎ একটি নিউরোন থেকে আরেকটি নিউরোনে নতুন সংযোগ পথ তৈরি হয়। ক্রমাগত একই তথ্য যেতে থাকলে মস্তিষ্কের কর্মকাঠামো (ডড়ৎশরহম ঝঃৎঁপঃঁৎব) বদলে যায়।

অটোসাজেশন কীভাবে দিতে হবে?

অটোসাজেশনের কথামালা ঠিক করার জন্য নিম্নোক্ত সহজ নিয়ম অনুসরণ করতে পারেন।

১. এই অটোসাজেশন সম্পূর্ণ আপনার ব্যক্তিগত। তাই ‘আমি বা আমার’ শব্দ ব্যবহার করুন।

২. পুরোপুরি ইতিবাচক হন। যা কামনা করেন তা লিখুন। না-সূচক শব্দগুলো এড়িয়ে চলুন। যেমন, ‘আমি আর ভুলবো না’Ñ এভাবে না বলে বলুন, ‘আমার স্মৃতিশক্তি বাড়বে’ বা ‘প্রয়োজনীয় সবকিছু আমার মনে থাকবে’।

৩. নেতিবাচক শব্দ পরিহার করুন। করব না, পারব না, চাই না এ ধরনের শব্দ।

৪. বর্তমান কাল জ্ঞাপক শব্দ ব্যবহার করুন।

৫. তুলনা করবেন না। অতীতের সঙ্গে বা অন্যের সঙ্গে তুলনা করবেন না।

৬. অটোসাজেশনে আপনি আপনার পছন্দমতো কাল ব্যবহার করতে পারেন। যেমন, আমি সফল হব (ভবিষ্যত কাল) আমি সফল হচ্ছি (বর্তমান কাল)।

৭. কোন সময়সীমা নির্ধারণ করবেন না। সময়সীমা ক্ষতিকর হতে পারে, এতে টেনশন সৃষ্টি হয়।

অটোসাজেশন স্বাভাবিক জাগ্রত অবস্থায় কিংবা মেডিটেশনে বসেও দিতে পারেন। প্রথমেই ১০০০টা অটোসাজেশন থেকে আপনার যেগুলো প্রয়োজন চিহ্নিত করুন। তারপর একটি কাগজে লিখে ফেলুন। বসে যান মেডিটেশনে। দিতে থাকুন অটোসাজেশন। মেডিটেশন না জানলে শিখে নিন। মেডিটেশন শেখার জন্য কোয়ান্টাম মেথড বই আছে, ক্যাসেট/সিডি আছে। শিখতে খুব একটা সময় লাগবে না।

দৈনন্দিন কাজের যে কোন ফাঁকে মনে মনে ২-৪ বার দিতে পারেন এই অটোসাজেশন। অটোসাজেশনের বার বার অনুশীলন আপনার মনোদৈহিক প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি করবে নতুন অনুরণন, নীরবে-নিঃশব্দে ভেতর থেকেই বদলাতে শুরু করবেন আপনি। বদলে যাবে আপনার জীবন।

নজরুল হোসেন

প্রকাশিত : ৯ মার্চ ২০১৫

০৯/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: