কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অভিজিত হত্যা ॥ ডিবির তালিকায় ১০ সন্দেহভাজনের নাম

প্রকাশিত : ৯ মার্চ ২০১৫
  • ফারাবীর সিলেটের বাসায় তল্লাশি

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ হিযবুত তাহরীর নেতা শফিউর রহমান ফারাবীসহ অন্তত ১০ জন বিভিন্ন সময়ে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও ব্লগার অভিজিত রায়কে। অভিজিত রায় হত্যার সন্দেহভাজনদের তালিকা তৈরি করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুুলিশ (ডিবি)। হত্যাকা-ের তালিকায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের দুর্ধর্ষ জঙ্গী রানাকে ধরার জন্য দুই-এক দিনের মধ্যে পুরস্কার ঘোষণা করবে ডিবি।

এ হত্যা মামলায় গ্রেফতার হওয়া প্রধান আসামি শফিউর রহমান ফারাবীকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকারীদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের তালিকা অনুযায়ী গ্রেফতার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গ্রেফতার হওয়া শফিউর রহমান ফারাবীর সিলেট শহরের বাসভবনে অভিযান চালিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। রবিবার দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে নগরীর মুন্সীপাড়ায় ১৬/ডি নম্বর হোল্ডিংয়ের মুজিবুর রহমানের বাড়ির তৃতীয় তলায় ফারাবীর ভাড়া ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে একটি ল্যাপটপ, একটি ডেস্কটপের সিপিইউ এবং বেশকিছু কাগজপত্র জব্দ করা হয়েছে। মুন্সীপাড়ার ওই বাড়িতে ফারাবী তার মা ও বোনকে নিয়ে বসবাস করলেও অভিযানের সময়ে ওই ফ্ল্যাটে কেউ ছিল না। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

রবিবার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) এ ঘটনায় তদন্তে আসার পর প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আমাদের একাধিকবার আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে। সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিটের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন তাঁরা। তাঁরা আমাদের কারিগরি সহযোগিতাসহ সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। ফারাবীসহ ১০ জন বিভিন্ন সময় অভিজিতকে হত্যার হুমকি দিয়েছিল। তাদের প্রত্যেককে পেশাদারি প্রক্রিয়া বজায় রেখেই গ্রেফতারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে জানান ডিএমপির মুখপাত্র।

এফবিআই সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্মকমিশনার মনিরুল ইসলাম রবিবার তাঁর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ওরা (এফবিআই) তো কথা কম বলে। তারপরও জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমরা কী মনে কর? কারা এ হত্যায় জড়িত? তারা (এফবিআই) বলল, এটা যদিও প্রথমে বলা কঠিন, তারপরও প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে এটা কোন এক্সট্রিমিস্ট গ্রুপের কাজ।

যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক-ব্লগার অভিজিত হত্যাকা- তদন্তে যোগ দিয়ে এফবিআই কর্মকর্তারা গত শুক্রবার হত্যাকা-স্থল পরিদর্শন করেন। শনিবার তাঁরা অভিজিতের বাবা অজয় রায়ের কথাও শুনেছেন। এফবিআই কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের এই নাগরিক হত্যাকা-ের তদন্তে মামলার তদন্ত সংস্থা গোয়েন্দা পুলিশকে সহায়তা করছে।

ডিএমপির মুখপাত্র মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছেন, এফবিআইয়ের সরাসরি অপারেশনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। তারা এ হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে। এখনও তারা (এফবিআই) কাকে গ্রেফতার বা আটক করতে হবেÑ এমন কোন তথ্য দেয়নি। যদি কাউকে গ্রেফতারের বিষয়ে তারা রিকম্যান্ড করে, আমরা সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। তিনি বলেন, রিমান্ডে থাকা ফারাবী হত্যাকা-ে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করলেও অভিজিতকে হুমকিদাতা কিছু লোকের নাম জানিয়েছে। অভিজিত হত্যার দায় স্বীকার করে ‘আনসার বাংলা-৭’ নামের একটি গ্রুপ টুইট করেছিল। সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দা পুলিশ। অভিজিত রায় যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, ভবিষ্যতে এফবিআই চাইলে তাদের নিজ দেশেও এ ঘটনায় মামলা করতে পারে। তারা তখন যদি আমাদের সহায়তা চায়, আমরা করব। তাছাড়া এখন হত্যার কোন আলামত তারা যদি বিদেশে নিয়ে পরীক্ষা করতে চায়, সে সুযোগও রয়েছে। এফবিআই কর্মকর্তারা এ হত্যা রহস্য উদ্ঘাটনের তদন্তে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে দাবি করেছেন ডিএমপির মুখপাত্র।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা ঘুরে লেখক ও ব্লগার অভিজিত রায় ও তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মোড়ে এলে দুর্বৃত্তরা তাঁদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন অভিজিত রায় আর গুরুতর আহত হন রাফিদা আহমেদ বন্যা। উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছেন। তাঁরা দুজনেই বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) হিযবুত তাহরীর নেতা ফারাবীকে ১০ দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বলেছেন, অভিজিত হত্যাকা-ে অনুতপ্ত নন তিনি এবং এই হত্যাকা-কে সমর্থন করেন। আনসার বাংলা-৭ নামে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে টুইট করেছিল হিযবুত তাহরীর। হিযবুত তাহরীর নেতা গ্রেফতারকৃত ফারাবীকে দিয়েই হত্যাকারী শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সিলেটের বাসভবনে অভিযান

অভিজিত হত্যাকা-ের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া শফিউর রহমান ফারাবীর সিলেট শহরের বাসভবনে অভিযান চালিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ঢাকা থেকে যাওয়া ডিবির তিন সদস্যের একটি দল রবিবার দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে নগরীর মুন্সীপাড়ায় ১৬/ডি নম্বর হোল্ডিংয়ের মুজিবুর রহমানের বাড়ির তৃতীয় তলায় ফারাবীর ভাড়া ফ্ল্যাটে অভিযান চালায়। তাদের সহায়তা করেছে সিলেট কোতোয়ালি থানা পুলিশ। মুন্সীপাড়ার ওই বাড়িতে মা ও বোনকে নিয়ে বসবাস করতেন ফারাবী। তবে অভিযানের সময় ওই ফ্ল্যাটে কেউ ছিল না। ফ্ল্যাট থেকে পুলিশ একটি ল্যাপটপ, একটি ডেস্কটপের সিপিইউ এবং বেশ কিছু কাগজপত্র জব্দ করেছে। আনসার বাংলা-৭ নামের এক টুইটার এ্যাকাউন্ট থেকে হত্যাকা-ের দায় স্বীকার করে বলা হয়, ইসলামবিরোধী কর্মকা-ের জন্য হত্যা করা হয়েছে অভিজিতকে। গত ২ মার্চ ফারাবীকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে আটক করে র‌্যাব। মামলাটির তদন্ত সংস্থা ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় ফারাবীকে। অভিজিত বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নাগরিক হওয়ায় তদন্তে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই।

রানাকে ধরতে পুরস্কার ঘোষণা ॥ অভিজিত রায় হত্যায় জড়িত প্রধান সন্দেহভাজন রানাকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করবে ডিবি। ডিবির একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জনকণ্ঠকে নিশ্চিত করেছে, দুই-এক দিনের মধ্যে সংবাদমাধ্যমে রানার ছবি দিয়ে ধরিয়ে দেয়ার আহ্বান জানানো হবে। তদন্তের পর্যায়ে ডিবির কর্মকর্তারা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সঙ্গে জড়িত রানাকে অভিজিত হত্যায় প্রধান সন্দেহভাজন আসামি মনে করছেন। তবে রানার অবস্থান সম্পর্কে তাঁরা নিশ্চিত হতে পারছেন না। তাই তাকে ধরিয়ে দিতে লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হবে। একজন কর্মকর্তা বলেন, ডিবি এরই মধ্যে রানার ছবি এবং ঠিকানা হাতে পেয়েছে। এর আগে রাজধানীতে অন্তত চারজন ব্লগার, লেখক ও মুক্তমনা শিক্ষকের ওপর হামলার ঘটনায় রানার সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া একাধিক আসামির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে রানার নাম এসেছে।

জানা যায়, রানা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের ছাত্র। তার গ্রামের বাড়ি ফেনী। এ প্রসঙ্গে যুগ্মকমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, রানার সঙ্গে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এর প্রধান জসিমুদ্দিনের সঙ্গেও তার যোগাযোগের তথ্য আছে। জসিমুদ্দিন এখন কারাগারে আছেন। আটক ফারাবী এখনও অভিজিত হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেনি। তবে সে ফেসবুকে অভিজিতকে হত্যার হুমকি দেয়ার কথা স্বীকার করেছে।

প্রকাশিত : ৯ মার্চ ২০১৫

০৯/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: