রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

গুচ্ছ কবিতা

প্রকাশিত : ৭ মার্চ ২০১৫
  • জাংফর ওয়াজেদ-এর
  • জাফর ওয়াজেদ-এর

রাস্তায় নামো

ঘরে বসে থেকো না, যুবক

বাইরে যাও,

নাশকতা, নৃশংসতা, সহিংসতা

চারদিকে সটান দাঁড়িয়ে

তাকে ভেদ করে বেরিয়ে এসো।

স্বপ্নময় ভালোবাসা, তারই মাঝে

আছে কিছু ভুবন জুড়ে

বিশুদ্ধ নিসর্গের ডালপালাও

ভাগ্যবান হলে

পেয়ে যাবে যে কোনদিন-

দিনান্তের সময় এখন সর্বত্র

বাতাস এলোমেলো

ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে

চারদিকে অগ্নিবোম, হিংস্রতা

রিপুমুক্ত নয় কেউ আজ আর-

যুবক, রাস্তায় নামো দ্রুত...

অন্ত্যজ জীবন

বলুন, বলুন, সারমেয় সন্তানই বলুন, গ-ারের চামড়া পরিধানে

যতো খুশি বলে যান শকুন বাঁদর, হোক পুরোপুরি ইতরজ্ঞানে

নামিয়ে দিন, উল্লুক বল্লুকেরও নিচে গুবরে পোকার চারপাশে

প্রয়োজনে শূকরছানাকে লেপ্টে দিন অন্ত্যজকেই ভালোবেসে।

ভালো না বাসলে কি অত্তো নামে ডেকে কত্তোভাবে দেখা যায়

এই যে দেখছেন কখনো পশু, কখনো প্রাণীদের সন্তানের মায়ায়

এ রকম প্রাণভরা অমৃত সিঞ্চন দুর্লভ অতি সহজে কী তা মেলে

এ্যাত্তো এ্যাত্তো নাম-সর্বনামের নিক্তিতে বসে বসে কিবা পেলে?

যদি কেউ জানায় দেখার আগ্রহ, বলে দিন গরু কিংবা গাধা

হালের বলদ জুড়ে দিতে পারেনÑ লাঙল যেন জোয়াল বাঁধা

বলুন, বলুন, দিলখোলা হাসিতেই বলুন অনায়াসে হারামজাদা

অমুকের পুত তমুকের নাতি-চাষা ভূষো গায়ে পায়েতে কাদা

থেমে গেলে কষ্ট বাড়ে, গ্রাম্যতাও ভর করে এই উত্তরাধুনিকে

নিম্নবর্গে চড়ি ফিরি, অন্ত্যজ জীবনে সবই তো দেখি হায় ফিকে!

বাজখাই সংলাপ

তার আগে শোনে হে দর্শক বাকশিল্পের অবাধ স্বাধীনতায়

বক বক করে যারা, ঘরে ঘরে থাকে তারাই পরাধীনতায়।

যেমন মাঝরাতে টক শো’য়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে একে অপরজনে

তীব্র বাক্যবাণে বিষোদগার করে পরস্পরে অম্লমধুর বদনে

যেরকম রবীন্দ্র সরোবরে অপরাহ্নে সার্ধশতবার্ষিকী পালনে

কারা যেন হেঁড়ে গলায় নৃত্যবাদনে টুঁটি চেপে ধরে লালনে

তেমনি সমাজ কমিউন তোলপাড় করে হরেক পারিজাত

মহাসড়কের যানজট ছাড়িয়ে দিতে ছোড়ে পা আর হাত।

এই ফাঁকে এসো আমরা দু’জনে রিমোঁট হাতে প্রেমের

ভা-ার খুলে ফেলি, যে যার চ্যানেলে নিকষিত হেমের

গল্প বলি, কণ্ঠ ছেড়ে তুমুল ঝগড়ার বাজখাই সংলাপ

এসো এনে দেই রাতভর টকশো’য়ের খিন্নতর প্রলাপ...

হামি নাটোরের বনলতা সেন

বগলে ঘামের গন্ধ মুখে সস্তার পাউডার হাতে সেলফোন

আমাকে অজস্র ঝামেলায় ফেলে দিয়েছিল বনলতা সেন

বিনা টিকিটে রেলের সেলুন কারে পায়ের উপর পা তুলে

খিলিপান চিবুতে চিবুতে বাঁকা ঠোঁটে আমাকেই বুঝি ভুলে

জিজ্ঞেস করে, ‘হামাক রেখে এতোটা দিন কোথায় ছিলেন

হিরোর রোল ছেড়ে বাহে কোথায় হে পাঠ গাইতে গিছলেন

মাঝখানে কি যে হাঙ্গামা গেছে প্রায় মারতেই আসে ভিলেন

কান্দিয়া কান্দিয়া মরি যে গো হামি হিরোইন বনলতা সেন।’

বিস্ময়ে ভ্রমি আমি! কবে কোন অন্ধকার রাতে পলাশ শিমুল

গোলাপ ছাড়িয়ে কাঁঠালিচাপার ঘ্রাণে কুড়াতেছিলাম তাজা ফুল

তারপর কে কার বক্ষ মাঝে মৃগনাভি গন্ধ খুঁজে খুঁজে মরছিল

জোছনার প্রান্তরে মাঝরাতে তবু মহীনের ঘোড়াগুলো ঘুরছিল

তারই আবেশে স্পন্দিত হতে হতেই পরস্পরের শরীর সমর্পণ

স্বর্গ খেলনা গড়েছিলাম ঘাসের সবুজে নদীর জলে ডুবসন্তরণ

সে সব কবে কার ধূসর পা-ুলিপি হয়ে আজকের যুগে সাতটি

তারার তিমিরে ঢেকে গেছে মুছে গেছে রূপসী বাংলার সত্যটি

যে যার পথ ধরে চলে গেছে গেরুয়া পথ ছেড়ে অন্তহীন বাঁকে

কালের ধুলায় ঢেকে গেছে সেই সব অতীতের সোনালী র‌্যাকে...

পানের পিক মেঝেতে দেওয়ালে ফেলে আঁচল দিল মেলে

দেখাতে চায় বায়স্কোপের মতোনই দেহ নিয়ে যায় চিলে

চিলের ঠোঁটে রেখে ঠোঁট বুঝি গায়, ‘বাচপান কা মোহব্বত

ভুলি নাই ভুলি নাই ভালোবেসে শিখিয়েছিল কত সোহবত’

এতো নয় সেই নারী, যার দু’টি চোখ জুড়ে পাখিরা বাঁধে বাসা

দু’দ- শান্তি দেবে বলে মুক্ত করে খাঁচায় শৃঙ্খলিত যত দুরাশা

বরং আঁচল কোমরে গুঁজে হঠাৎ স্থূল খেমটা নৃত্যের ভঙ্গিমায়

মাতোয়ালী গান তুলে হাততালি আর শরীরী কসরত রঙ্গিমায়

জড়িয়ে ধরে আমাকেই বলে, ‘যা আছে তাড়াতাড়ি দিয়ে দেন

হামি নাটোরের বনলতা সেন, নেমে যাব এর পরের ইস্টিশেন।’

অপেরা সুন্দরী

তোমার টকশো’ থেকে বস্তাপচা গন্ধ বেরোচ্ছে, দুর্মুখ

ভাবছো সব সুখে আছো চামড়াসুখ কামড়াকামড়ি সুখ

মিষ্টিভাষ শুনে শুনে মধুমেহে ব্যস্ত আছে বিজ্ঞাপনদাতা

জড়ানো প্যাঁচানো কথার ফাঁকে তোমার দু’হাত পাতা

লুটে নিতে চাও যেন কথকের কথা ভাবালু সব ভাবনা

কেউ যেন বলতে না পারে কার যে কি গোপন বাসনা

বিক্ষোভে দাও ভালোই জিলাপি-বিদ্রোহে দাও সিফন শাড়ি

স্টুডিওতে আছে প্রেজেন্টার আছে আরো অপেরা সুন্দরী

‘ক্যামেরা অন’ হলেই মনে হয় নিজেই বিশ্বের সেরা সম্ভার

মনে হয়, জগতের জ্ঞানের জগতে নিজেরই সাধনা অপার।

তিলকে তাল, তালকে বানিয়ে তিল মৃতদের উদাহরণে

বেমক্কা টেনে নেয় রেলগাড়ি পাথরহীন জীর্ণ রেললাইনে

জ্ঞান দিচ্ছেন থাকুন দিতে, জ্ঞানের ভা-ার হচ্ছে অফুরন্ত

নিজের জন্য ষোলকলা আমজনতার কলা অতি বাড়ন্ত।

ভালো কথা, মিষ্টি কথা, কথার কথা, লব্জ কথা, ভুল কথা

কথার পিঠে কথা রেখে কথার নামে চলছে অতি কথকতা।

চোত মাসের কৈ

চান্স পেলে তোদের কান্কো মারা বের করবো একদিন -

শালা, তোদের মুখের নেই কোনো ট্যাক্সো, ডাস্টবিন যেন

এক একটা আন্কুত তোরা, হুব্বা, গাঁইগুঁই; গেঁড়েমাল সব

আমাকেই খুব লগড়াচ্ছিস ওহে চোত মাসের কৈ কোথাকার

এইসা কিল ঘুষি মারবো যে বাচলামি গুলতানি ভুলে যাবি,

ভুলে যাবি বাপদাদা চৌদ্দপুরুষের নামধাম সাকিন মৌজা-

কী স্টুপিড! আমাকেই ভেবেছিস ষাঁড়ের মগজ পাঁঠার শিশ্ন

চিরকালই তোরা ফকিরণি হাঁটকে-চাঁটকে বেড়ালি এন্তারসে

বেলেল্লাপানার টিভি চ্যানেল খুলে দেখাচ্ছিস লটরপটর আর

আমাকেই কিনা উস্কে দিতে চাস গোল আলু মার্কা বাকসর্বস্ব

টকশোয়েতে, রেখে নিজেদের পকেটে গুচ্ছের ন্যাকড়া ঢিল

দারুপায়ী চেহারা সুরুত নিয়ে উঠিস আবার গম্বুজের চূড়ায়Ñ

বেড়েছে তোদের পেল্লায় বাড়, ঢাউস ঢাউস কতো কি খায়েশ

এক চাপড়েই লৌড়ে যাবিÑভুলে যাবি জিন্দেগির আরাম আয়েশ।

প্রজন্ম চত্বরে ডাহুক

প্রজন্ম চত্বরে ডাকে ডাহুক, নিঃসঙ্গ ভেজা ভেজা নয় তার কণ্ঠস্বর

ডাহুকের ডাক শুনেছিলেন কবি ফররুখ আহমদ একাত্তরের আগে

আর পুরো একাত্তরের নয় মাস শকুনের সাথে গিয়েছেন পিঠা ভাগে

ডাহুকের স্বর বুঝি স্তব্ধ হয়েছিল তখনই, আজ চুয়াল্লিশ বছর পর

জেগে ওঠেছে ডাহুক, মাঠ বিল দ্বীপ জলাশয় পেরিয়ে আকাশ

অতি দূর প্রজন্ম চত্বরে ডানা তার মেলেছে আলোকের আভাস

শাহবাগের রাস্তাায় বসে শুনতে থাকি ডাহুকের মধুরতর ডাক

এ ডাকের শেষ যে না পাই, তাই ভরাট করি মেমোরির ফাঁক

মনে আসে একাত্তরে পাকি হানাদারের ধাওয়া খেয়ে আমরা

তখন পালিয়ে বেড়াই জলজঙ্গলে, রাতের বেলা ঘাটের মড়া

পড়ে থাকি নৌকো কিংবা বাঁশের মাচায় মশার সাথে মশকরা

রাজাকারের আনাগোনায়Ñউঠতো ডেকে ডাহুক;স্বর অতিকড়া

ভরা নদী ভরা বিলÑডাহুক ছিল তাদেরই স্টাফ আর্টিস্ট

রাত দুপুরে গান শোনাতো ভর দুপুরে পেতো মৎস্যফিস্ট।

পেরিয়ে গেছে চুয়াল্লিশ বর্ষ, ডাহুক গিয়েছিল বন জঙ্গলে

সার্ধশতজয়ন্তী শেষে রবির মতোই এসেছে মানব মঙ্গলে।

প্রকাশিত : ৭ মার্চ ২০১৫

০৭/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: