রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পাওলা হকিন্সের ‘দ্য গার্ল অন দ্য ট্রেন’

প্রকাশিত : ৭ মার্চ ২০১৫
  • এ সপ্তাহের নিউইয়র্ক টাইমসের সেরা বই পাওলা হকিন্সের
  • ‘দ্য গার্ল অন দ্য ট্রেইন’ নিয়ে লিখেছেন আরিফুর সবুজ

নিউইয়র্ক টাইমসের এ সপ্তাহের বেস্ট সেলার তালিকার শীর্ষে ‘দ্য গার্ল অন দ্য ট্রেন’ বইটি। লেখক জিম্বাবুইয়ে হারারেতে জন্মগ্রহণকারী পাওলা হকিন্স। প্রথম প্রকাশিত উপন্যাসেই পুরো বাজিমাত করে দিয়েছেন তিনি। বইটির কাহিনী গড়ে উঠেছে মানুষের মনোজাগতিকতাকে কেন্দ্র করে। মানুষের চিন্তার জগতে প্রতিনিয়ত অনেক কিছুই নাড়া দিয়ে যায়। খেলা করে অনেক কিছুই। অনেক ভাবনাই আসে মনে। ভেবে ভেবে পার করে দেয় সময়। কত কিছু নিয়েই না মানুষ ভাবে। কিছু বাস্তব, কিছু অলীক। তবু ভাবে। ভাবার সঙ্গে বুনে চলে স্বপ্ন। আলো-আঁধারির খেলায় স্বপ্ন দেখতে দেখতে অনেক কাজ করে চলে। যার কিছু অর্থক, কিছু নিরর্থক। করে মজা পায় কিংবা পায় না, তবু করে। এমনই বিচিত্র মানুষের মনোজগত। সেই মনোজগতকেই লেখক হকিন্স খুবই সূক্ষভাবে র‌্যাচেল, মেগান এবং এ্যান্না এই তিন নারী চরিত্রের মধ্যে দিয়ে তুলে ধরেছেন। জিলিয়ান ফ্লিনের বেস্ট সেলার বই ‘দ্য গন গার্ল’ এর মতো এই বইটির প্রধান চরিত্র নারী।

র‌্যাচেল ওয়াটসনই এই বইটির মূল চরিত্র। র‌্যাচেলের চিন্তা-ভাবনার মধ্যে দিয়েই মূলত একজন হতাশাবাদী নারীর মনোজগতের দৃশ্যায়ন করেছেন হকিন্স। প্রতিদিন সকাল ৮.০৪ মিনিটের ট্রেনে এ্যাসবারি থেকে লন্ডনে এবং ১৭.৫৬ মিনিটি ইউস্টোন থেকে ফিরতি ট্রেনে যাতায়াত করা নিয়মে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল র‌্যাচেলের। বাড়ির বাড়িওয়ালা থেকে সবাই জানে র‌্যাচেল চাকরি করতে নিয়ম করে অফিসে যাচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি তা নয়। মাসখানেক আগেই র‌্যাচেলের চাকরি চলে গেছে। তার কাজ প্রতিদিন ট্রেনে ওঠে আশপাশের দৃশ্য অবলোকন করা আর এদিক-সেদিক ঘোরাফেরা করে যথাসময়ে ঘরে ফিরে আসা। ট্রেনের জানালায় মুখ দিয়ে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের স্বাভাবিক কর্মকা- দেখতে খুবই ভাল লাগে র‌্যাচেলের। দেখার সঙ্গে মানুষের অন্তর্নিহিত ভাবনার খোঁজ করে সে। প্রতিদিনই সে দেখে এ্যান্না, টম আর তাদের ছোট ফুটফুটে বাচ্চাটিকে। দেখে আর হৃদয়ের সূক্ষকোণে অনুভব করে তীব্র যন্ত্রণা। কারণ টম তার প্রাক্তন স্বামী। টমকে ঘিরেই সে বেঁচে ছিল। কিন্তু আজ আর টম তার কেউ নয়। বন্ধ্যা র‌্যাচেলকে নিয়ে টম সুখী ছিল না। আর তাই এ্যান্নার দিকে ঝুঁকে পড়েছিল টম। এ্যান্না, টম আর তাদের বাচ্চার একটি ছবি ফেসবুকে আপলোড করে টম নিজেকে সবচেয়ে সুখী দাবি করেছিল আর সেটা র‌্যাচেলের বুকে পিনের মতোই বিঁধেছিল। এখনও বিঁধছে।

মদ খেয়ে র‌্যাচেল ভুলে থাকতে চায় অতীতের সব স্মৃতি। সারাক্ষণই বুদ হয়ে থাকে মদে। কিন্তু আদৌ পারে কি? না, পারে না। সেই চেষ্টাও সে করে না। এ এক অদ্ভুত মনোজাগতিক খেলা। প্রতিদিনই ট্রেনে যাচ্ছে, নিজের বাড়ি আর নিজের প্রাক্তন স্বামীকে দেখছে এ্যান্নার সঙ্গে খুনসুটি করতে দেখছে। যন্ত্রণা পাচ্ছে র‌্যাচেল, তবুও এড়িয়ে যাচ্ছে না বা যেতে চাইছে না। এক অদ্ভুত কল্পজগত র‌্যাচেল তার নিজের মানসপটে তৈরি করে রেখেছে, সেখানে প্রতিনিয়তই চলছে ভাঙ্গাগড়ার খেলা। এই খেলা কে থামাবে? কেউ না। র‌্যাচেল এ্যান্নাকে দায়ী করে। টমকে দায়ী করে। আবার নিজেকেও দায়ী করে। আসলে কে দায়ী, তা র‌্যাচেল জানে না। তবে সে হদিস পেয়েছে অবিশ্বাসী মনের। প্রতিটি মানুষের অন্তরালেই যে অবিশ্বাসী এক ঘাতক লুকিয়ে থাকে, তা র‌্যাচেল দেখেছে। আর তা দেখেছে মেগান আর স্কটের সম্পর্কের মধ্যে দিয়েই।

শত দুঃখের মাঝেও র‌্যাচেলকে আনন্দ দিত এই জুটির প্রেম ভালবাসা। প্রতিদিন ট্রেনে যেতে যেতে এই জুটির খুনসুটি হতাশায় নিমজ্জিত র‌্যােেচলকে জীবন সম্পর্কে কিছুটা হলেও আশা জাগাত। সে এই জুটির নাম দিয়েছিল ‘জশন এ্যান্ড জেস’। কিন্তু একদিনের ঘটনায় র‌্যাচেল মানুষের মনের অন্তরালের গহীনে লুকিয়ে থাকা অবিশ্বাসী সত্তাকে খুঁজে পায়। সেদিন মেগানকে দেখতে পেয়েছিল স্কটবিহীন। তবে একা ছিল না। ছিল অন্য এক পুরুষ। ছিল ঘনিষ্ঠভাবে। সেই পুরুষটিকে মেগান আবেশে চুমো দিচ্ছিল। স্কটবিহনী মেগান, অন্য এক পুরুষ, চুমো এই বিষয়গুলো মদ্যপ র‌্যাচেলের মনে উথাল-পাতাল ঝড় বয়ে এনেছিল। হকিন্স র‌্যাচেলের চাক্ষুস এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে মানব মনের অবিশ্বাসী সত্তার সন্ধান দিয়েছেন। ভালবাসা-আর খুনসুটির আড়ালেও যে, কোন সত্য থাকতে পারে তা হকিন্স বেশ ভালভাবেই তুলে ধরেছেন।

মেগান সেই রাতে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার রহস্যে উদ্ধার করতে পুলিশ যখন পারছিল না, তখন র‌্যাচেল নিজের দেখা সেই ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়েছিল। কিন্তু পুলিশ মদ্যপ এই মহিলার কথা বিশ্বাস করে নি। কেউ তার কথার গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু হকিন্স এই ঘটনার মধ্যে দিয়েই র‌্যাচেলের মনের স্বচ্ছতা আর সত্য প্রকাশের ব্যগ্রতার বিষয়টি পাঠকের সামনে তুলে ধরেন। র‌্যাচেল এই বইটির প্রধান চরিত্র হলেও অন্যান্য চরিত্রগুলোর মধ্যে দিয়ে লেখক হকিন্স মানব চরিত্রের কদর্য বিশ্বাসঘাতকতার, অবিশ্বাসী দিকটিকে তুলে ধরেছেন। মনোজাগতিক বিষয়টিকে হিচককের সিনেমার মতোই সফলতার সঙ্গে লেখক তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। আর তাইতো বইটি পাঠকের কাছে পেয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা। অবস্থান করছে নিউইয়র্ক টাইমসের বেস্ট সেলারের তালিকার শীর্ষে।

প্রকাশিত : ৭ মার্চ ২০১৫

০৭/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: