কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মানটো’র নামগোত্রহীন মেয়েরা

প্রকাশিত : ৭ মার্চ ২০১৫
  • সাযযাদ কাদির

পরিচয়ের পর-পরই প্রকাশক জিজ্ঞেস করলেন, আপনি তো অনুবাদ করেন? উর্দু জানেন? বলি, না... লিখতে-পড়তে জানি না। তবে শুনে বুঝতে পারি কিছু, হিন্দি-উর্দু ছবির পোকা হিসেবে। কেন?

প্রকাশক বলেন, মানটো’র গল্পের অনুবাদ খুঁজছি।

বছর কয়েক আগে কলকাতার কবি-বন্ধু, ‘চান্দ্রমাস’-সম্পাদক, গৌরশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়-ও চেয়েছিলেন মানটো’র একটি গল্পের অনুবাদ তাঁর পত্রিকার জানুয়ারি সংখ্যার জন্য। ১৮ জানুয়ারি মানটো’র মৃত্যুবার্ষিকী। ওই সময় আমার সংগ্রহে থাকা শর্মিলা বাগচী’র অনুবাদ নেড়েচেড়ে পড়ে ফেলি আবার। গুগলিং করে ইংরেজী অনুবাদে-ও পড়ে ফেলি কয়েকটি গল্প।

উর্দু ছোটগল্পের কিংবদন্তি পুরুষ সা’দাত হাসান মানটো (১৯১২-১৯৫৫)-র সঙ্গে আমার পরিচয় কৈশোরে। আমাদের এখানে তখন চলছে ‘চলচ্চিত্র-সাহিত্য-সংস্কৃতি’ পত্রিকার যুগ। চিত্রালী, রমনা, সন্ধানী, রূপকথা, ছায়াপথ, জোনাকি, ঝিনুক, নর-নারী প্রভৃতি পত্রিকার জোর কাটতি। এগুলোতে প্রায়ই অনুবাদ ছাপা হতো বলিউডের নায়ক-নায়িকাদের নিয়ে লেখা মানটো’র স্মৃতিকথা ‘গাঞ্জে ফারিশতে’ (শূন্যকেশ দেবদূতেরা)-র। ওইসব লেখা পড়ে অশোক কুমার, শ্যাম, নারগিস, নুরজাহান, নাসিম বানু, দিলীপ কুমার সম্পর্কে যে ধারণা জন্মে আমার তা রয়ে গেছে এই এখনও।

বোম্বেতে মানটো ছিলেন ১৯৩৬-১৯৪৭ সালে, তখন জড়িত ছিলেন সাংবাদিকতা ও চিত্রনাট্য রচনায়। মাঝখানে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে কাজের সূত্রে দিল্লী ছিলেন বছর খানেক (১৯৪১-৪২)। তাঁর চিত্রনাট্য ও সংলাপে নির্মিত ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘কিষাণ কন্যা’ (১৯৩৭), ‘আপনি নগরিয়া’ (১৯৪০), ‘চল চল রে নওজোয়ান’ (১৯৪৪), ‘আট দিন’ (১৯৪৬), ‘মিরজা গালিব’ (১৯৫৪) প্রভৃতি।

বলিউডি কেচ্ছাকাহিনী পড়ার বেশ পরে, ষাটের দশকে, পড়ি মানটো’র গল্পের অনুবাদ। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু, উর্দু সাহিত্যের খ্যাতিমান অনুবাদক, আখতার-উন-নবী’র কাছে অনেক কিছু জানতে পারি মানটো সম্পর্কে। তাঁর গল্প ‘বু’, ‘খোল দো’, ‘ঠাণ্ডা গোশত’, ‘টোবা টেক সিং’ প্রভৃতি বিচ্ছিরি রকম বাংলা অনুবাদে পড়েও অভিভূত হই। তবে অনুবাদে যা পাইনি তা পাই বন্ধুবরের গল্পপাঠ শুনে। ধারণা হয়, মানটো লেখেন বক্রোক্তিতে। নিম্নবর্গের মানুষই তাঁর বেশিরভাগ গল্পের উপজীব্য। এখানে মানটো’র সঙ্গে অদ্ভুত সাদৃশ্য লক্ষ্য করি চীনা কথাশিল্পী লু সুন (১৮৮১-১৯৩৬)-এর। তবে আমার ধারণা অনেকখানি স্পষ্ট হয় আশির দশকে প্রীতীশ নন্দী সম্পাদিত ‘ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অভ ইনডিয়া’য় মানটো সম্পর্কে আলোচনা এবং তাঁর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গল্পের অনুবাদ পড়ে। বস্তুত বাংলার চেয়ে ইংরেজী অনুবাদেই যেন বেশি পাই মূলের স্বাদ। আর এখন আমাদের চোখের সামনে স্বয়ং মানটো-কেই এনে দিয়েছে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়। তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে তাঁকে করে তুলেছে রক্তমাংসের উত্তাপে জীবন্ত এবং সজীব। কাজটি সহজ নয়। কারণ, এ নাট্যরূপ গল্প থেকে, আর মানটো’র নিজের কথায় ‘তাঁর গল্পের চরিত্র এবং পরিবেশ ভদ্রজনোচিত নয়। অতি অসহ্যরকম নোংরামিতে ভরা। অন্য সাহিত্যিকের মতো মানবজীবনের নান্দনিক ব্যাখ্যা সেখানে অনুপস্থিত। আপত্তিকর শব্দরাজিতে ভরা।...’

মানটো লিখেছেন বহু বিষয়ে, তবে তাঁর বিখ্যাত গল্পগুলোতে রয়েছে ‘দাঙ্গাবিধ্বস্ত মানুষের শাশ্বত শোকগাথা,... ধর্মের জালে মানুষের সার্বিক শোষণ এবং বারবণিতা সমাজের’ কষ্টকথা। শেষোক্ত সমাজের গল্পগুলো সম্পর্কে শর্মিলা বাগচী লিখেছেন, ‘... দেহোপজীবনী চরিত্রগুলোকে তিনি কখনই দেবীর আসনে বসাননি। পতিতা জীবনে বাৎসল্যের তাগিদে হাহাকার, প্রিয় পুরুষের জন্য জীবনব্যাপী একানুগত্যবোধ বা প্রতীক্ষা- এই সব পাঠক ভুলানো কোন আবেগ এসব গল্পে নেই। আছে বাস্তবের তীব্র নগ্ন রূপ- যাকে অসাধারণ মানব জীবনবেদ বলা যায়। সমাজ যাকে রূঢ় ভাষায় ‘বেশ্যা’ বলে, শরীর নিয়ে বেসাতি যাদের ধর্ম- তাদের নিখুঁত এবং অবিকৃত রেখেই অনায়াসে প্রবেশ করেছেন সেই সব অবহেলিতা মেয়ের অন্তর্মহলে। শুধু নিজেই নন, সহযাত্রী হয়েছি বা হতে বাধ্য করা হয়েছে আমাদের। অবশ্য মার্গটি সকলেরই চেনা, মানটো’র হাতে গড়া সেই পথ।...’

এ পথে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের দুঃসাহসিক সহযাত্রা তাদের ৪৪তম প্রযোজনা ‘নাম-গোত্রহীন মানটো’র মেয়েরা’র মাধ্যমে। মানটো’র তিনটি গল্প ‘কালি সেলোয়ার’, ‘লাইসেন্স’ ও ‘হাতাক’-এর নাট্যরূপ এই প্রযোজনা। প্রথম গল্পের যৌনকর্মী সুলতানা এমনিতেই শোষিত, তারপরও তাকে হতে হয় প্রতারণার শিকার। দ্বিতীয় গল্পের সদ্যবিধবা নীতি স্বামীর টাঙ্গা চালাবার লাইসেন্স পায় না, কিন্তু পায় বেশ্যাপল্লীর খাতায় নাম লেখাবার সুযোগ। তৃতীয় গল্পের সুগন্ধী দগ্ধ হয় অপমানের জ্বালায়।

নাট্যরূপ দিতে বিশেষভাবে এই তিনটি গল্প বেছে নেয়ার কারণ সম্ভবত আলোর নিচে যে সমাজ আর সে সমাজে নারীর অবস্থান স্পষ্ট করে তুলে ধরা। ‘কালি সেলোয়ার’-এ পুরুষতন্ত্রের, ‘লাইসেন্স’-এ রাষ্ট্রব্যবস্থার এবং ‘হাতাক’-এ প্রশাসনের অনৈতিক রূপটি আমরা দেখি ওই অবস্থানের সূত্রে। বিপন্ন হলেও সুলতানা ক্ষুব্ধ, নীতি প্রতিবাদী এবং সুগন্ধী রীতিমতো দ্রোহী। নাট্যরূপের জন্য বেছে নেয়া তিনটি গল্পের এই ভাবগত পরম্পরায় যে ক্রমোত্তরণ তা-ই প্রযোজনাকে তুঙ্গে নিয়ে গেছে নাটকীয় বিস্ফোরণে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দর্শক এ যাত্রায় শামিল হয় রুদ্ধশ্বাসে।

নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের প্রযোজনা দেখেছি সত্তর দশকে, মুগ্ধ হয়েছি প্রতি মুহূর্তে; এখন এই প্রযোজনায় তাঁরা ভিন্ন মাত্রায় উন্নীত হয়েও সেই মুগ্ধতা আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে ফিরিয়ে দিয়েছেন আমাদের কাছে। তখনকার উপভোগ্যতার সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে এক মহৎ শিল্পানুভব।

আমার বরাবরই মনে হয়েছে, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের প্রযোজনায় নাট্যরূপ, সংলাপ ও অভিনয় গুরুত্বের শীর্ষে অবস্থান নেয় প্রায় ক্ষেত্রে। ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’র আলী যাকেরকে খুব মনে আছে আমার। তাঁর দাপুটে অভিনয়ে তখন এতই মুগ্ধ হয়েছিলাম যে ‘আলী যাকেরের কিসসা’ নামে লিখে ফেলেছিলাম একটি আলোচনা। সেটি দৈনিক বাংলার ‘ছায়ামঞ্চ’ বিভাগে শীর্ষ রচনা হিসেবে ছাপা হয়েছিল আট কলামজুড়ে। দেখে কবি-নাট্যকার জিয়া হায়দার বলেছিলেন, ‘ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিলে গ্রুপ থিয়েটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’ এ কারণে ‘সৎ মানুষের খোঁজে’ দেখার পর আর কিছু লিখিনি আমি, ওই প্রযোজনার প্রাণ ছিলেন সারা যাকের। আমার মনে হয়েছিল তিনি নিশ্চয়ই ভেনট্রিলোকোয়িস্ট (মায়াস্বর ব্যবহারে পারদর্শী), নাহলে কণ্ঠস্বরে এত পরিবর্তন আনেন কি করে! তবে সেই থেকে আলী যাকের ও সারা যাকের দু’জনের অভিনয়েরই মুগ্ধ দর্শক আমি। মনে আছে, বিটিভি’র কি এক সিরিয়ালে ছিলেন সারা যাকের। তখন সব কাজ ফেলে আমি বাসায় ফিরতাম ওই অনুষ্ঠানটি প্রচারের আগেই। এক পত্রিকার পক্ষ থেকে তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম, তখন বলেছিলেন, আমি তো পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দেই না। তবে আপনাকে দিতে রাজি হয়েছি... কারণ শুনেছি ওর (আলী যাকেরের) সঙ্গে আপনার বন্ধুত্বের সম্পর্ক।

‘নাম-গোত্রহীন...’-এ নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে পেয়েছি কলকাতার হিন্দি থিয়েটার ‘রঙ্গকর্মী’র উষা গাঙ্গুলিকে। তাঁর সম্পর্কে জানি সেই আশির দশক থেকেই, তবে মঞ্চে তাঁকে পাওয়া এই প্রথম। অবশ্য ইউটিউব-এ তাঁর ‘রুদালি’ ও ‘হাম মুখতারা’ দেখেছি বাজে ভিডিও সত্ত্বেও। তাঁর সঙ্গে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের মিলিত প্রয়াস আমাদের দিয়েছে এক অবিস্মরণীয় নাট্য অভিজ্ঞতা। ‘নাম-গোত্রহীন...’-এর নাট্যরূপ ও নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি, মঞ্চায়নের আগে দিন-রাত মহড়া করেছেন এক মাস। এখন সে নির্দেশনার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছেন সারা যাকের।

নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে উষা গাঙ্গুলি বাংলাদেশে এসেছিলেন তাঁর দল ‘রঙ্গকর্মী’র নাটক ‘কোর্ট মারশাল’, ‘রুদালি’ ও ‘লোককথা’ নিয়ে। তখন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের। তারপর কথা ওঠে একসঙ্গে কাজ করার। উষা গাঙ্গুলি লিখেছেন, এ কথা ‘আরও জোরদার করে আমার বন্ধু সারা যাকেরের সঙ্গে এক বছরের যোগাযোগ। এভাবেই ‘নাম-গোত্রহীন...’ নাটকের কাজ শুরু হয়।’

কিন্তু মানটো কেন? তিনি লিখেছেন, ‘... মানটো’র সমস্ত লেখা বার বার পড়ে তাঁর লেখার অসীম জীবনবোধ, মানবীয় চেতনা আর একটা দর্শন যেটা পূর্ণাঙ্গ মানুষকে দেখায় তা খুঁজে পেয়েছি। দাঙ্গা, সাধারণ মানুষের কিংবা উদ্বাস্তুদের অসহায়ত্ব অথবা নারীর যন্ত্রণা, তার অন্তর্গত মনের রহস্য এত সূক্ষ্মতার সঙ্গে গল্পে তুলে এনেছেন যা আমাদের একটা সমগ্র জীবন দেখায়। আসলে দেশ কাল পাত্রের ঊর্ধ্বে মানটো দেখান নতুন এক মানবিক চেতনা। বিশেষ করে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানের সংস্কৃতি, অর্থনীতি, জীবনযাপন, সামাজিক কাঠামো যখন একই রকম তখন মানটো সেটাকে এক তারে বেঁধে দেন।...’

ঊষা গাঙ্গুলির সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাটা কেমন? সারা যাকের লিখেছেন, ‘... এত বছর ধরে অভিনেতা হিসেবে যা-যা করেছি সব ভুলে যেতে হয়েছে।... যখন ঊষা কাজটা ধরেন প্রথমেই তিনি শব্দ নিয়ে কাজ করেন। সারা নাটকে কি সংলাপ বলছি, তার চেয়েও বেশিভাবে তিনি দেখেন শব্দের অরকেসট্রা। পাশাপাশি তিনি কাজ করেন শারীরিক অভিনয় নিয়ে। একদম শেষে তিনি অভিনেতাকে ছেড়ে দেন চরিত্রকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে। অতঃপর মঞ্চায়নের মুহূর্তে অভিনেতা নিজেই বুঝতে পারে কতখানি সে ধারণ করতে পেরেছে চরিত্রকে। এটাই ঊষার কর্মপদ্ধতি। এত আপোসহীন নির্দেশকের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার এই প্রথম।...’

প্রায় ৩০ বছর পর দর্শক হিসেবে নাটকের অংশ হতে গিয়ে আমারও প্রথম অভিজ্ঞতা হয় ধাক্কা খাওয়ার। ঝাঁকুনি নয়, প্রথম দেখায় রীতিমতো ধাক্কা দেন ঊষা গাঙ্গুলি। তাঁকে দেখে শুনে বুঝতে গেলে দ্বিতীয়-তৃতীয় বার দর্শক হয়ে নিজেকে সামলে নিতে হবে, আত্মস্থ হতে হবে। তারপর হয়তো মোটামুটি একটা আলোচনা সম্ভব। তাই এখানে যা লিখছি তা শুধু অভিঘাতের বিবরণ।

নাটকের শুরুতে মানটো ও ‘নাম-গোত্রহীন...’ সম্পর্কে নাট্যপ্রাসঙ্গিক তথ্য ও বক্তব্য উপস্থাপন করেন সূত্রধার ও কোরাস। পরেও ঘটনার বিন্যাস ও কাহিনীর বয়ানে তাঁদের দেখি যথাভূমিকায়। ‘নাম-গোত্রহীন...’ আসলে তিন পর্বে গ্রথিত এক দীর্ঘ ঘাত-তরঙ্গ। ওই নাট্যতরঙ্গে আমাদের আবেগ-অনুভব যেভাবে ওঠানামা করে তার তুলনা হতে পারে শুধু অব্যাহত স্নায়বিক কম্পন। ঊষা গাঙ্গুলির নাট্যরূপ মূলানুগ, উপস্থাপনা সাবলীল। শুরু থেকেই গতিময় এ রূপায়ণ। প্রায়ই পৌঁছৈ যায় নাট্যমুহূর্তে। সংলাপ সোজাসাপটা হলেও সাঙ্কেতিক ব্যঞ্জনায় তীব্র তীক্ষè হয়ে ওঠে কখনও। আবহ সঙ্গীত যথেষ্ট সমর্থন দিয়েছে নাটকীয় মুড সৃষ্টিতে। সময়-কাল বোঝাতে বলিউডের ‘রতন’ (১৯৪৪) ও ‘বাহার’ (১৯৫১) ছবির গান ব্যবহার করা হয়েছে নেপথ্যে। শুনতে-শুনতে আমার মনে হয়েছে মানটো’র নিজের ছবি ‘চল চল রে নওজোয়ান’ (১৯৪৪)-এর গান থাকলে ভাল হতো আরও। পোশাকের উজ্জ্বল বর্ণাঢ্যতা কিছুটা চমকে দিয়েছে আমাকে। অসচ্ছল, পীড়িত, ক্ষুধার্ত চরিত্রগুলোর এমন বেশভূষার কি কারণ থাকতে পারে তা খুঁজেছি মনে-মনে, এখনও খুঁজছি। তবে সবকিছু ছাপিয়ে উঠেছে শারীরিক অভিনয়। অভিনেতাদের অভিব্যক্তি, দেহভঙ্গি, বাচিক ব্যঞ্জনা অর্থাৎ চলন বলন সুচারু সুষ্ঠুতায় নৃত্যায়িত (কোরিওগ্রাফড্)। মনে হয় উষা গাঙ্গুলি তাঁর নৃত্যশিক্ষাকে এখানে ব্যবহার করেছেন চরম একাগ্রতায়। ফলে চরিত্রগুলো ‘গভীর স্তর থেকে পরতে-পরতে বেরিয়ে’ এসে ক্রমে-ক্রমে পেয়েছে বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনা।

‘নাম-গোত্রহীন...’-এ মানটো’র তিন মেয়ে সুলতানা, নীতি ও সুগন্ধিকে মঞ্চে হাস্যে-লাস্যে রঙ্গ-ব্যঙ্গে ব্যথা-বিদীর্ণতায় ক্ষোভে দ্রোহে জ্যান্ত করে তুলেছেন অপি করিম, শ্রিয়া সর্বজয়া ও সারা যাকের। তাঁদের সঙ্গে সমান সংতিতে অভিনয় করেছেন পান্থ শাহরিয়ার, ফখরুজ্জামান চৌধুরী, মোস্তাফিজ শাহীন, রাজীব দে, নওমী কামরুন বিধু। অপি করিমের প্রতিভা সম্পর্কে জানি শুনে ও পড়ে। তার মামা আমার বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের তুই-তুই সম্পর্কের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তার পিতাও আমার অত্যন্ত নিকটজন। কিন্তু এই প্রথম সরাসরি অভিনয় দেখে বুঝতে পারি তার প্রতিভা অসামান্য। মঞ্চে চরিত্রের সঙ্গে বিরল স্বচ্ছন্দতা একপর্যায়ে তাকে আরও সাবলীল করে তোলে স্বতঃস্ফূর্ততায়। এমন একাকার হওয়া সত্যি বিরল। আমার তো মনে হয় হঠাৎ কোথাও দেখা হয়ে গেলে তাকে হয়ত আমি ডেকে বসব ‘সুলতানা’ বলে। ‘নীতি’ চরিত্রের শ্রিয়া সর্বজয়া’র এই প্রথম আত্মপ্রকাশ অভিনেতা হিসেবে- এটা জেনেছি পরে। অভিনয় দেখতে-দেখতে তা কিন্তু মনে হয়নি তখন। জানার পর এখন বলছি, প্রতিশ্রুতি ছাড়িয়ে আরও অনেক অঙ্গীকারের ছাপ রয়েছে তার শরীরী অভিব্যক্তিতে। নীতি চরিত্রের মাধুর্য ও কারুণ্য উভয়ই তিনি সমান দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন মঞ্চে। ‘সুগন্ধী’ চরিত্রের সারাহ যাকের একেবারেই ভিন্নতর উচ্চতায় নিয়ে গেছেন নিজের সৃষ্টিশীলতাকে। এক ‘হাতাক’ (অপমানিত) নারীর বিদ্রƒপে ঝলসে ওঠা, ক্ষোভে-দুঃখে ফুঁসে ওঠা, শেষে দ্রোহে বিস্ফেরিত হওয়া- সবই তিনি মূর্ত করে তোলেন বাচিক ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ শরীরী অভিনয়ে। একদম গভীর গভীরতর স্তর থেকে তুলে এনে সুগন্ধির আত্মাকে প্রাণ দেন, তার আর্তিকে করে তোলেন মুখরব্যঙময়। নাটক হয়ে ওঠে জীবন আর তার শিল্পরূপ তিনি।

প্রকাশিত : ৭ মার্চ ২০১৫

০৭/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: