রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

স্বাধীনতার সেই ঐতিহাসিক ঘোষণা

প্রকাশিত : ৭ মার্চ ২০১৫

রবিউল হুসাইন ॥ বন্ধুরা, তোমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের স্বাধীনতার সেই ঐতিহাসিক ঘোষণার কথা বিভিন্নভাবে শুনেছ। কিন্তু সেই ঘোষণা কিসের জন্য বা কোন প্রেক্ষাপটে দেয়া হয়েছিল,তা কি জানো? বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং অবশেষে স্বাধীনতার ঘটনা আমাদের মননে-বিশ্বাসে চিরকাল প্রজ্বলিত থাকবে। ইতিহাসের সুদূরতম পর্যায়ে এদেশের জনগোষ্ঠী স্বাধীন সার্বভৌমত্বের খানিক স্পর্শমাত্রও লাভ করেনি। বরং সবসময় বিদেশী শাসকদের দ্বারা বিভিন্নকালে শাসিত-শোষিত হয়েছে। কেউ এখানে ভাগ্যান্বেষণে এসে চিরকালের জন্য আবাসিত হয়েছে। কেউ লুণ্ঠন শেষে ফেরত গেছে আপন বাসে। এদেশ বিদেশীদের জন্য শোষণের একটি আদর্শ উৎসস্থল হিসেবে আমাদের দুর্বলতার সুযোগে সেই সময় ব্যবহৃত ও বিবেচিত হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে হাজার বছর পর এদেশের স্বাধীনতা অর্জন সামন্তযুগে নয়, বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় ফর্মের এই গণতান্ত্রিক যুগেও একটি বিশাল ঘটনা। এই গৌরবময় অধ্যায়ের সঙ্গে যে যে ঘটনা বা যারা যারা জড়িত, ব্যক্তি বা দেশ, প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবেÑ সবকিছুই আমাদের বোধে ও চেতনায় অতি যতেœর সঙ্গে গচ্ছিত রাখতে হবে। এসব আমাদের চিরকালের গর্ব এবং অহঙ্কার। এই বোধ থেকে বিচ্যুত হওয়ার অর্থ নিজেদের নিজেদের দ্বারা অপমানিত করা, দেশের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও মন-মানুষদের অস্বীকার করে অকৃতজ্ঞ হওয়া। আজ স্বাধীনতা লাভের পূর্ব প্রস্তুতি মার্চ মাসের এই সময়েও অনেক দুঃখ ও অনুতাপের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করিÑ ইতিহাসের গণনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর যোগ্যতম স্থানে কিছু কীটদুষ্ট মানবসন্তান স্থাপিত করতে চায় না। যে রণধ্বনি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ ঘটেছিল, সেই জয় বাংলা ধ্বনি উচ্চারণ করতে মানুষের জিহ্বা ও কণ্ঠ ব্যবহৃত হয় না।

ইতিহাসের অনিবার্যতা অস্বীকার করার পরিক্রমায় যারা বিশ্বাসঘাতকতা করে যাচ্ছে অবলীলায়, তারা আবার এই দেশে রাজনীতি করে, সংসদ সদস্য হওয়ার এক হীন অসুস্থ চক্রে অংশ নিয়ে থাকে। এ দেশের আলো-বাতাসে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস, খাওয়া-দাওয়া সবই করে যাচ্ছে, অথচ এদেশের স্বাভাবিক ও অবধারিত পরম্পরাকে স্বীকার করে না।

একটি কথা মনে রাখা দরকার যে, বঙ্গবন্ধু কোন বিদ্রোহ করতে চাননি। তিনি বিদ্রোহী বা বিপ্লবী ছিলেন না। বিপ্লবের মাধ্যমে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে চাননি কোনদিন। তিনি ছিলেন নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্রচর্চার এক নিবেদিতপ্রাণ অনুসারী। সেই ১৯৪৭ সালের আগে থেকে ধাপে ধাপে ১৯৪৮, ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৫৬, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭০ এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও সর্বশেষে স্বাধীনতাপ্রাপ্তিÑ সর্বক্ষেত্রে শীর্ষবিন্দুর শীর্ষ ব্যক্তিত্ব হিসেবে অমোঘ সময়প্রবাহই তাঁকে নির্বাচিত করেছিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে, যা ছিল ইতিহাসের এক অবধারিত নিরপেক্ষ শক্তি।

দেশের আপামর জনসাধারণ এবং রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় বিভিন্ন জননেতার অবদান বঙ্গবন্ধুর সেই বেগবান রাজনৈতিক স্রোতকে আরও পরিপুষ্ট করেÑ চূড়ান্ত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে মাত্র। যেখানে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অদম্য সাহসী, অপরিহার্য এবং বিশ্বস্ত। সেই আসনের কেউ কোন দিন বিকল্প হতে পারে নাÑ এই কথাটি সবারই মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করা ইতিহাসের খাতিরেই আজ বড্ড প্রয়োজন।

এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রামÑ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের সেই ১৯ মিনিটের অমোঘ ভাষণটি এমনই একটি প্রকৃতিনির্ভর স্বাধীনতার ঘোষণা প্রায় দেববাণী সুলভ ভাষণ ছিল। যেটির মধ্যে তদানীন্তন পাকিস্তানী শাসকবর্গও তাঁর বিরুদ্ধে তেমন অনিষ্টকর কিছু খুঁজে পায়নি। বঙ্গবন্ধু অসাধারণ রাজনৈতিক হিসাব ও কৌশল চাতুর্যে বিচ্ছিন্নতাবাদের ডাক দেননি। গণতান্ত্রিক উপায়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও তিনি বাধ্য হয়ে অবশ্যম্ভাবী শুধুমাত্র সংগ্রামের, আন্দোলনের এবং স্বাধীনতার কথা উচ্চারণ করেছিলেন, অন্য কিছু নয়। এটাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শ্রেষ্ঠ কৌশল ও প্রজ্ঞাÑ যার দ্বারা স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল। এটি না করে তিনি যদি সেই দিন সরাসরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার ডাক দিতেন, তাহলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি হতো তো বটেই, একই সঙ্গে পাকিস্তানীদের কাছ থেকে স্বাধীনতা প্রাপ্তি একটি সুদূরতম প্রয়াস হিসেবে পরিগণিত হতো। নানা চাপের মুখে স্থির ও অবিচল এই দূরদর্শী অবিস্মরণীয় ভাষণের অন্তর্নিহিত বাণী যেমন জনগণের মরমে ও মননে পৌঁছে গিয়েছিল, তেমনি পাকিস্তানীরাও তাদের শেষ চেষ্টা বলবৎ করার জন্যও মরিয়া হয়ে উঠেছিল। এইভাবেই আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী ও অনন্যধারার উজ্জ্বলতম অধ্যায়ের গৌরবময় সূচনা হয়েছিল।

অলঙ্করণ : আইয়ুব আল আমিন

প্রকাশিত : ৭ মার্চ ২০১৫

০৭/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: