মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

টিভি ধারাবাহিকে টানছে না দর্শক

প্রকাশিত : ৭ মার্চ ২০১৫
টিভি ধারাবাহিকে টানছে না দর্শক

সাজু আহমেদ ॥ ভাল গল্পের অভাব, নির্মাতাদের দক্ষতার অভাব, নির্মাণে নতুনত্ব না থাকা এবং দক্ষ শিল্পী সঙ্কটের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের স্যাটেলাইট চ্যানেলে প্রচার হওয়া ধারাবাহিক নাটকগুলো দর্শককে টানছে না। বর্তমানে দেশে ৩০টিরও অধিক চ্যানেলে গড়ে প্রতিদিন ৪০টিরও অধিক ধারাবাহিক নাটক প্রচার হচ্ছে। কিন্তু বাইরের দেশের চ্যানেলগুলোর সঙ্গে টেক্কা দিয়ে এসব ধারাবাহিক নাটক দেশীয় দর্শকদের আকৃষ্ট করতে পারছে না। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন সমসাময়িক সামাজিক সমস্যা ও সমাধান এবং মেসেজধর্মী গল্পের ধারাবাহিক নাটক উপস্থাপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। নাটকে গল্প উপস্থাপনে নতুনত্ব নেই, প্রকাশভঙ্গিতে চমৎকারিত্ব নেই। নাট্যনির্মাণে অভিনবত্ব এবং নতুনত্বের যথেষ্ট অভাবও পরিলক্ষিত হচ্ছে। উপরন্তু একই গল্পকে ঘুরে ফিরে অহেতুক টেনে লম্বা করার প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা আরও মনে করেন নাটক হলো সমাজের দর্পণ। নাটকে সমসাময়িক সমাজের সমস্যা, অসঙ্গতি, অসামঞ্জস্যতা ফুটে উঠবে। সেগুলোর সমাধানের ইঙ্গিত থাকবে। সুস্থ বিনোদনের পাশাপাশি দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য নাটকে থাকবে। কিন্তু সম্প্রতি প্রচার হওয়া ধারাবাহিক নাটকগুলোর অধিকাংশেই এসবের কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। নাটকের পরিচালক ও রচিয়তাসহ সংশ্লিষ্টরা শুধু মান্ধাত্বা আমলের মত প্রেমপ্রীতি আর ভালবাসা উপজীব্য করে নাটক নির্মাণ করছেন। উদাসীনতার কারণে এর বাইরে তারা আর কিছু ভাবতে পারছে না। এছাড়া সাম্প্রতিকালের ব্যবসায়িক মন্দার কারণে বিজ্ঞাপন না পাওয়ায় ভাল বাজেটের অভাবে প্রয়োজনীয় ও দর্শকচাহিদা সম্পন্ন নাটক নির্মাণ সম্ভব হচ্ছে না বলে অনেকেই মনে করেন। এসব কারণেই বর্তমানে বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচার হওয়া বেশিরভাগ ধারাবাহিক নাটকগুলো দর্শকদের আকৃষ্ট করছে না বিধায় তারা বিদেশী চ্যানেলের প্রতি ঝুঁকছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচার হওয়া ধারাবাহিক নাটকগুলোর গল্প নিয়ে। এসব নাটকে গল্পের ধারাবাহিকতা যেমন নেই, তেমনি নাটক দেখে একজন দর্শক বিনোদনের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা বা সামাজিক মেসেজ কতটা পাচ্ছে সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এ অবস্থায় সাধারণ দর্শকদের প্রশ্ন দেশের চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত ধারাবাহিক নাটকের নামে আসলে হচ্ছে টা কী?

জানা যায়, বর্তমানে প্রচারিত ধারাবাহিক নাটকগুলোর মধ্যে আছে আরটিভির মায়ার খেলা, অলসপুর, নোয়াশাল, বাংলাভিশনের ঘোমটা, এনটিভির দলছুট প্রজাপতি, চলো হারিয়ে যাই, এটিএনবাংলার সাতটি তারার তিমির, একশ হাত দূরে থাকুন, একুশেটিভির পুতুল নাচের ইতিকথা, বৈশাখী টিভির সংঘাত, দেশটিভির অফস্ক্রিন, চ্যানেল নাইনের রাব্বু ভাইয়ের বউ, ধন্যি মেয়ে, মাছারাঙার ক্ষণিকালয়, মামলাবাজ, চ্যানেল আইয়ের পাতালপুরীর রাজকন্যা, শূন্য জীবন, এসএটিভির রেইন ফরেস্ট, জিটিভির রংতুলি প্রভৃতি। এসব নাটক কিছুটা দর্শক টানতে পারলে এর বাইরে অন্য নাটকগুলো দর্শকদের চাহিদা মেটাতে পারছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব নাটকের একাধিক অভিনেতা-অভিনেত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন তারাও এ সব কাজে সন্তুষ্ট নন। কিন্ত কাজের স্বার্থে তাদের অভিনয় করতে হচ্ছে। কারণ না করে উপায় নেই। তারা না করলে অন্য কেউ করবেই। চ্যানেল বাড়ায় শিল্পী সংকটের কারণে ভাল নাটক নির্মাণ হচ্ছে না বলে মনে করছেন তারা।

বর্তমানে ধারাবাহিক নাটক প্রসঙ্গে গবেষণাধর্মী নাট্যপরিচালক হাবিবুল ইসলাম হাবিব বলেন, চ্যানেলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে সেক্ষেত্রে আগের চেয়ে নাটকের মান উন্নত হয়েছে। আমাদের দর্শকরা দেশের বাইরের চ্যানেলগুলোর প্রতি অনেকটাই দুর্বল তারা দেশের নাটক দেখছে না। এর অন্যতম কারণ আমাদের দেশের চ্যানেলগুলোর নির্মিত নাটকগুলোর কন্টেন্ট অনেকটাই দুর্বল। চ্যানেল বাড়ার কারণে নাটকের প্রয়োজন বেড়েছে। এ কারণে নির্মাতাও বেড়েছে তবে দক্ষ নির্মাতার অভাব তো রয়েছেই। এ কারণ অনেকেই না জেনে না বুঝেই নির্মাণ করছে। দু-একটা নাটকে সহকারী হিসেবে কাজ করে পরিচালক বনে যাচ্ছে। চ্যানেলগুলো যেনতেন ডিরেক্টর দিয়ে নাটক বানিয়ে নিচ্ছে। দর্শকদের চাহিদা অনুযায়ী আমরা কিছু করতে পারছি না। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। এক্ষেত্রে আমার অবজারভেশন হচ্ছে ধারাবাহিক নাটকগুলো বেশি দীর্ঘ হওয়া ঠিক না। আমার মনে হয় ১৩ পর্ব অথবা ২৬ পর্বেও মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। যেহেতু গল্পে নতুনত্ব না থাকায় দর্শক টানতে পারছি না। সেহেতু গল্পকে অহেতু টেনে লম্বা না করাই ভাল। পাশাপাশি ভাল কিছু তৈরির জন্য শিল্পী নির্মাতা এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা বাড়াতে হবে। ভাল কিছুর জন্য এটাও জরুরী। তবে সবচেয়ে জরুরী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। কারণ ভাল কিছু করার জন্য আগে নিরাপত্তাটা থাকা দরকার। অসংখ্য জনপ্রিয় নাটকের পরিচালক কায়সার আহমেদ বলেন, আমাদের দেশে ভাল কাজ যে হচ্ছে না তা না, ভাল কাজ হচ্ছে। তবে সেটার সংখ্যা খুব কম। এর অন্যতম প্রধান কারণ নাটক নির্মাণের ক্ষেত্রে ভাল বাজেট না থাকা। কারণ সংশ্লিষ্টরা অতি অল্প খরচে ভাল জিনিস চান। কিন্তু বাস্তবে সেটা সম্ভব না। চ্যানেল বেড়ে যাওয়ায় নাটকের চাহিদা বেড়েছে কিন্তু শিল্পীদের সংখ্যা সেভাবে বাড়েনি। সেক্ষেত্রে একই শিল্পীর ওপর কাজের চাপ বাড়ছে। সে একটি স্ক্রিপ্ট নিয়ে ভালভাবে চিন্তা ভাবনা করতে পারছে না। ডিরেক্টররা ভাবনার সময় পাচ্ছে না ভাল কিছু করার। ফলে কাজের মান খারাপ হচ্ছে। পাশাপাশি ভারতীয় চ্যানেলগুলো আমাদের দেশে একটা ভাল প্রভাব বিস্তার করছে। সব মিলে আমরা একটা খারাপ সময় পার করছি। তারপরও অনেকেই ভাল কাজ করছেন। ভাল নাটক হচ্ছে। তবে সেটা সংখ্যা শতকে ১০টা।

গুণী নাট্যনির্মাতা মনির হোসেন জীবন বলেন, ভাল নাটক খুব কম হচ্ছে। বেশিরভাগ নাটকের মান অনেক কমে গেছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ চ্যানেল বেড়ে যাওয়ায় বাজেট স্বল্পতায় বিজ্ঞাপনের রেট কমে গেছে। অদক্ষ অযোগ্য মেধাহীন ডিরেক্টর বেড়ে গেছে। দর্শকদের চাহিদা অনুযায়ী ভাল নাটক বা অনুষ্ঠান নির্মাণে যোগ্য, দক্ষ সিনিয়র নির্মাতাদের উপেক্ষা করা হচ্ছে। অনেকেই একটা দুইটা নাটকে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করে পূর্ণাঙ্গ পরিচালক হিসেবে কাজ করছে। চ্যানেলগুলোর কতিপয় অসাধু কর্মর্কতা নিজের অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য নবীন, মেধাহীন অপরিপক্ব ডিরেক্টরদের সঙ্গে আঁতাত করে তাদের দিয়ে নাটক বানিয়ে নিচ্ছে। ফলে নাটকের গুণগত মান নিঃসন্দেহে আগের তুলনায় অনেকটাই কমে গেছে। কারণ আঁতাতকারীদের পছন্দের ডিরেক্টররা যা বানাচ্ছে তা দর্শকরা দেখছে না বা দর্শকদের দেখানোর ইচ্ছে আছে বলেও মনে হয় না। সুতরাং দর্শক দেখছে না, যা দেখছে তা তারা ভাল মনে করছেন না। রিমোর্টের মাধ্যমে চলে যাচ্ছেন দেশের বাইরের চ্যানেলগুলোতে। এ অবস্থায় দর্শকদের ফিরে আনতে হলে দর্শকদের ভাল কিছু দিতে হবে। এজন্য ভাল ডিরেক্টর প্রয়োজন, সময়ের প্রয়োজন। চিন্তাভাবনার প্রয়োজন। এত সবের মধ্যে নতুন নতুন কিছু ছেলে মেয়ে ভাল কাজ করছে। আমি বলব তারা অসম্ভব এবং দুর্দান্ত ভাল করছে। তবে ভালর সংখ্যাটা একেবারেই কম। এর প্রধান এবং অন্যতম কারণ সিনিয়রদের অবজ্ঞা করা। ভাল কিছু পেতে হলে ভালদের সংশ্লিষ্ট যোগ্য ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করতে হবে তবেই দর্শকরা ভাল কিছু দেখতে পারবেন বলে আমি মনে করি।

তরুণ মেধাবী পরিচালক দীপু হাজরা বলেন, দেখুন নাটক বলেন, টেলিফিল্ম বলেন কিংবা ধারাবাহিক নাটক বলেন সব চলে গেছে বিজ্ঞাপনী সংস্থা বা বিজ্ঞাপন হাউস বা চ্যানেলগুলোর কাছে। কারণ চ্যানেল বা বিজ্ঞাপনী হাউসগুলোই নিজেরা নাটক তৈরি করে দেয় তাদের মতো করে, তাদের নির্বাচিত শিল্পীদের মাধ্যমে, অথবা তাদের পণ্যের প্রচারের স্বার্থে। সুতরাং সাধারণ দর্শকরা কি চায় সেই হাউসগুলোর সেটা খেয়াল থাকে না। তারাই আর্টিস্ট, গল্প, কিংবা লোকেশন ঠিক করে দেয়। সুতরাং ডিরেক্টররা চাইলেও ভাল কিছু করার সুযোগ এবং সময় কোনটাই থাকে না। পাশাপাশি যারা কাজ করছে তারা নানা প্রতিবন্ধকতার স্বীকার হচ্ছে। চ্যানেল বেড়েছে কিন্তু আর্টিস্ট কিংবা ভাল মেকার তৈরি হয়নি। ভাল গল্পকারেরও অভাব যথেষ্ট রয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান সময়ে আমরা ডিরেক্টররা যে কোন কাজের ক্ষেত্রে যতœশীল নই। অনেক অনেক ডিরেক্টর আসছে কিন্তু পরিপক্ব হয়ে আসছে না। সব মিলে দর্শকদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নাটক তৈরি হচ্ছে না বলেই দর্শকরা সেটা পছন্দ করছে না বলে আমি মনে করি।

তরুণ নাট্যকার ও পরিচালক জিএম সৈকত বলেন, আমি বলব এর জন্য দায়ী ভাল গল্প না হওয়া গল্পের গাঁথুনির অভাব। কারণ আমি মনে করি দর্শক টানার জন্য প্রথমত ভাল গল্প থাকতে হবে। তারপর অন্য কিছু। আমার মনে হয় মেকিং যত ভালই হোক কিংবা অভিনেতা অভিনেত্রীদের অভিনয় যতই প্রাণবন্ত হোক গল্প যদি ভাল না হয় তাহলে দর্শক কাহিনীটিকে সেভাবে নেবে না। রিমোর্ট ঘুরিয়ে অন্য চ্যানেলে চলে যাবে। সেজন্য আমি মনে করি যে কোন ধারাবাহিক হোক বা এক ঘণ্টার নাটক অথবা টেলিফিল্মই হোক ভাল গল্পের বিকল্প নেই। এছাড়া আরও তো বেশকিছু সমস্যা রয়েছে সেগুলোর দিকেও নজর দিতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

সর্বোপরি ধারাবাহিক নাটকের মান উন্নয়নে ভাল গল্প, নির্মাতা, অভিনয়শিল্পীদের সচেতনতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের শিল্প সৃষ্টিতে উদার মানসিকতার পরিচয় দেয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকাশিত : ৭ মার্চ ২০১৫

০৭/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: