আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নারীর উন্নয়নে প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য

প্রকাশিত : ৬ মার্চ ২০১৫
  • রুখসানা কাজল

ইশকুলের হেড স্যার মাঝেমধ্যে বেশ নরম হয়ে কথা বলতেন আমাদের সঙ্গে। তোরা তো মেয়ে। বাবার টাকা খরচ করে এই যে লেখাপড়া শিখছিস আবার তোদের বিয়েও দিতে হবে লাখ টাকা খরচ করে। বলত কী লাভ তোদের পেছনে এত খরচ করে? তোরা কি বাবা-মা, ভাই-বোনকে দেখবি? আমরা ক্লাসশুদ্ধ আন্দোলনে নেমে পড়তাম। না না স্যার আমরা চাকরি করব। আমরাও বাবা-মাকে দেখব। বিয়ে তো করবই না স্যার। মুঠো করা হাতের ওপর মুখটা রেখে স্যার হাসতেন। হাতের বেতটা জুঁই ফুলের মালার মতো পড়ে থাকত টেবিলে। তখন তো ছিলাম বালিকা। বাবা-মার রাজকন্যা। তখন কে জানত মেয়েরা নারী হয়ে ওঠে আর জীবন ঘষে আগুন জ্বালাতে জ্বালাতে নারীত্বের চরম সংগ্রাম করতে করতে এক সময় মরা জোনাকির মতো ঝরে পড়ে।

বাচ্চু চাচার বাড়ি এগারো ফুট দেয়ালের আড়ালে। সেখানে তার ছয় মেয়ে আর চাচি থাকে। ছেলে চাই কিন্তু ছেলে আর হয় না চাচার। অতিষ্ঠ হয়ে চাচি বড় মেয়ের হাত ধরে গোপনে লাইগেশন করে আসে। মারের চোটে রক্তাক্ত চাচিকে তিন তালাকের মোহর দিয়ে বাসা থেকে বের করে দিতে দিতে দাঁত চেপে চাচা বলে, সূচ কারখানার আন্দোলন শিখছ? আমার খেয়ে আমার পরে নারী স্বাধীনতা ফলাচ্ছ। বেরো আমার বাড়ি থেকে। চাচি জীবনে প্রথম খান্দানি বোরকার পর্দা তুলে তিন মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। মেয়েরা এখন সরকারী কর্মকর্তা। সংসার দেখছে বাবা-মার।

১৮৫৭ সালের ৮ মার্চে সংঘটিত সুচ কারখানার আন্দোলন সম্পর্কে সেই প্রথম জানতে পারি। সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে একটি সুচ কারখানার নারী শ্রমিকরা দৈনিক শ্রম ১২ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে আট ঘণ্টায় আনা, ন্যায্য মজুরি এবং কর্মক্ষেত্রে সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। পরিণামে জুটেছিল গ্রেফতার এবং অমানুষিক নির্যাতন। নারীরা বুঝেছিল সংগঠিত হতে হবে তাদের। সেই উদ্দেশ্যে ১৮৬০ সালের ৮ মার্চ গঠন করা হয় ‘নারী শ্রমিক ইউনিয়ন’। এবার আরও দুর্বার এবং বেগবান হয় আন্দোলন। ১৯০৮ সালে পোশাক ও বস্ত্রশিল্প কারখানার প্রায় দেড় হাজার নারী শ্রমিক একই দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। কর্তৃপক্ষের নির্যাতনের মাত্রা হত্যা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অবশেষে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করার দাবি অধিকারে পূর্ণ হয়।

১৯১০ সালের এই দিনে ডেনমাকের্র কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে জার্মানের নারী নেত্রী ক্লারা জেটকিন ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। সারাবিশ্বের নারীরা দিবসটি আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে গ্রহণ করে মর্যাদার সঙ্গে পালন করে আসছে। অবশেষে জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালে আন্তর্জাতিক নারীবর্ষে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন এবং ১৯৭৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ৮ মার্চকে স্বীকৃতি দেয়। সারাবিশ্বে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালিত হয়। এই দিন নারী আন্দোলন ও উন্নয়নে নিবেদিত সংগঠনগুলো মিলিত হয় এবং নানা কর্মসূচী গ্রহণ করে। এই দিন বিশেষ ক্রোড়পত্র বের করা হয়। নারী উন্নয়নে কতটুকু কাজ হয়েছে, আরও কী কী করা উচিত তাই নিয়ে আলোচনা ও কর্মসূচী গ্রহণ এবং ঘোষণা করা হয়।

বাংলাদেশে এবারের নারী দিবসের মূল কথা হলোÑ ‘এই হোক অঙ্গীকার, নারী নির্যাতন নয় আর’। এমন একটি সময় এবারের নারী দিবস পালিত হতে যাচ্ছে যে সময় দেশ ও দেশের মানুষ ধর্মান্ধদের হাতে আগুনবোমা এবং চাপাতির আঘাতে জর্জরিত। বিরোধী দলের লাগাতার অবরোধ-হরতালে আর্থিক, সামাজিক এবং শিক্ষাক্ষেত্র ভয়াবহ ক্ষতির শিকার। অথচ নারীর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন, ধর্ষণ, বৈষম্য রোধে বর্তমান সরকার যে স্বার্থক উন্নয়ন করেছে সেই কর্মসূচীকে আরও অগ্রগামী করে তুলতে সরকারের সহায়ক শক্তি হিসেবে বিরোধী দলের সহমত থাকা একান্তই প্রয়োজন ছিল। যে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১০টি ধর্ষণ এবং ১৫টি নারী পাচারের ঘটনা ঘটে, নিত্য পারিবারিক নির্যাতন, কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্য, যৌন নির্যাতন হচ্ছে, যে দেশের মানবাধিকার সংগঠন, পুলিশ প্রশাসন এবং সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে নারী নির্যাতনের উচ্চমাত্রার উদ্বেগজনক খবর, সে দেশের সকল রাজনৈতিক কর্মকা-ে সহিংসতা এবং ধর্মান্ধতাকে বর্জন করে নারী ও শিশু উন্নয়নে সকলের কর্তব্য সরকারের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করা। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান নারী উন্নয়ন এবং প্রগতি দেশ-বিদেশে প্রচুর সমাদৃত হয়েছে।

প্রখ্যাত নোবেলজয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন তাঁর বক্তৃতায় প্রায়ই বাংলাদেশের অগ্রগামী নারীসমাজের কথা উল্লেখ করেন। জাতিসংঘ ভূয়সী প্রশংসা করেছে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান নারী প্রগতির ধারাবাহিকতাকে। তাই আজকের আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে সামনে রেখে বলতে চাই, দেশ সকলের। এ দেশের উন্নয়ন আমাদের সকলের গর্বের। কোন কারণে উন্নয়ন পিছিয়ে পড়লে ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদসহ সকলের ক্ষতি হবে। দেশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠলে দেশের অর্থনীতি মুখথুবড়ে পড়বে। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অভাব-অনটনে প্রান্তিক পরিবারগুলো ভেসে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর সুষ্ঠুভাবে বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং এই সকল পরিবারের মেয়েরা বাধ্য হবে নিজেকে বিকিয়ে দিতে। ফলে পিছিয়ে পড়বে বর্তমানে অর্জিত নারী উন্নয়ন।

জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে মানুষ জন্মগতভাবে সমান মর্যাদার অধিকারীÑ এই বাক্যটি কেবল আমরা মুখে বলি। আমাদের সমাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। অবশ্যই নারী উন্নয়নে পুরুষকে বন্ধু-সহায়ক হিসেবে নারীরা পেয়েছে। কিন্তু এখনও এই সমাজে এমন নারী ও পুরুষ রয়েছে যারা নারীর অর্জিত অগ্রগামিতাকে মেনে নিতে পারছে না। নারীর প্রতি সহিংসতা অন্যায় এবং বৈষম্য দূর করার জন্য আমাদের এই মুহূর্তে জাতীয় ঐক্য থাকা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার ফসল সিডও সনদ স্বাক্ষর করা সত্ত্বেও বাংলাদেশে পরিপূর্ণভাবে সকল ধারা পূরণ করা যায়নি। সুতরাং সকলকে সহনশীল মানসিকতা নিয়েই রাষ্ট্রের উন্নয়নে এককাতারে এসে দাঁড়াতে হবে, এই হোক এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বাংলাদেশের নারীদের আহ্বান।

প্রকাশিত : ৬ মার্চ ২০১৫

০৬/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: