মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

যা বর্ণিত হয়েছে সে সব কবিতায়

প্রকাশিত : ৬ মার্চ ২০১৫
  • ঝুমকি বসু

বাংলাদেশের সকল প্রধান কবিই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন কালজয়ী কবিতা। মুক্তিযুদ্ধ ঘিরে রচিত হয়েছে অজস্র আবেগী কবিতা, সংখ্যায় তারা অগণিত। এসব কবিতার মধ্যে জসিমউদ্দীনের ‘দগ্ধগ্রাম’, সুফিয়া কামালের ‘আজকের বাংলাদেশ’, আহসান হাবীবের ‘মুক্তিযোদ্ধারা দেখতে কেমন’, সিকান্দার আবু জাফরের ‘বাংলা ছাড়ো’, শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও ‘আসাদের শার্ট’, হাসান হাফিজুর রহমানের ‘যখন উদ্যত সঙ্গীন’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘গেরিলা’, শহীদ কাদরীর ‘নিষিদ্ধ জার্নাল’, রফিক আজাদের ‘একজন মুক্তিযোদ্ধার আত্মসমর্পণ’, নির্মলেন্দু গুণের ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’, ‘হুলিয়া’, আবুল হাসানের ‘উচ্চারণগুলি শোকের’, মুহম্মদ নূরুল হুদার ‘আমরা তামাটে জাতি’, সানাউল হক খানের ‘সাতই মার্চ একাত্তর’, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের ‘শহীদ স্মরণে’, অসীম সাহার ‘পৃথিবীর সবচেয়ে মর্মঘাতী রক্তপাত’, হুমায়ুন কবিরের ‘বাংলার কারবালা’, আসাদ চৌধুরীর ‘রিপোর্ট ১৯৭১’, হেলাল হাফিজের ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’, খোন্দকার আশরাফ হোসেনের ‘বাউসী ব্রিজ ’৭১’, মহাদেব সাহার ‘ফারুকের মুখ’, আবিদ আজাদের ‘এখন যে কবিতাটি লিখব আমি’, ফারুক মাহমুদের ‘রাহেলা ফুফু’, দাউদ হায়দারের ‘বাংলাদেশ’, আবিদ আনোয়ারের ‘আমার মায়ের নামে তোপধ্বনি চাই’, মিনার মনসুরের ‘কী জবাব দেব’ প্রভৃতি উল্লেযোগ্য। এসব কবিতায় পাওয়া যায় বাঙালী জাতীয়তাবাদের চেতনা, মানবিক আবেগ, স্বদেশপ্রেম, সাম্যচেতনা, ক্ষোভ ও মুক্তির তীব্র আকাক্সক্ষা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ যে আন্দোলনমুখর ঘটনাবলীর চূড়ান্ত পরিণতি সেসব আন্দোলনের বিশ্বস্ত বর্ণনা উঠে এসেছে উল্লিখিত কবিদের কবিতায়। শামসুর রাহমানের ‘আসাদের শার্ট’ কবিতায় ‘লাশ আমরা রাখবো কোথায়’ ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের মহান কাব্যিক দলিল। অন্যদিকে স্বাধীনতার প্রত্যাশায় উন্মুখ এক জাতির চেতনাকে তিনি ধারণ করেছেন ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতায়। কবির আর্তি, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা/তোমাকে পাওয়ার জন্য/আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়? আর কতবার দেখতে হবে খা-বদাহন?’ স্বাধীনতাকামী বাঙালী জাতির রক্তঝরা ইতিহাস আর তা পাওয়ার দুর্দমনীয় আকাক্সক্ষারই প্রতিধ্বনিই যেন এ কবিতাটি। এছাড়া সিকান্দার আবু জাফরের ‘বাংলা ছাড়ো’ কবিতাটি লাল-সবুজের বাংলাদেশকে দখল করা হিংস্র পাকবাহিনীর প্রতি হুঙ্কার : ‘তুমি আমার আকাশ থেকে/সরাও তোমার ছায়া/তুমি বাংলা ছাড়ো।’

প্রকৃত অর্থে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে বাঙালী জাতীয়তাবাদের যে ঢেউ উঠেছিল তা উত্তুঙ্গ হয়ে ওঠে ক্রমশ। একুশের প্রথম প্রহরে লেখা মাহবুবুল আলম চৌধুরীর কবিতা গোটা বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর হিসেবে গর্জে উঠল ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি।’ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর কবিতা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ রূপ নিল কালজয়ী গানে। আলাউদ্দিন আল আজাদের কবিতা ‘স্মৃতির মিনার’ সেই অভয়ের বাণীই আমাদের শুনিয়েছিল, যা মুক্তিযুদ্ধে অমিত সাহসে রূপান্তরিত হয়েছিল। অন্যদিকে আহসান হাবীবের ‘মুক্তিযোদ্ধারা দেখতে কেমন’ কবিতাটি একটু ভিন্ন আঙ্গিকের। এ কবিতায় একজন মুক্তিযোদ্ধাকে ঘিরে সাধারণ মানুষের ঔৎসুক্যের আড়ালে প্রকাশ পেয়েছে সহমর্মিতা ও মাহাত্মকে তুলে ধরার প্রয়াস।

বর্বর পাকবাহিনী নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ও নৃশংস ত-বের চিত্র ফুটে উঠেছে জসিমউদ্দীনের ‘দগ্ধগ্রাম’ কবিতায়। কবির কাব্যভাষার স্বভাবজাত সারল্যে ফুঠে উঠেছে এক অমানুষিক নিষ্ঠুরতার ছবিÑ

‘কীসে কী হইল, পশ্চিম হইতে নরঘাতকরা আসি

সারা গাঁও ভরি আগুনে জ্বালায়ে হাসিল অট্টহাসি

মার কোল থেকে শিশুরে কাড়িয়া কাটিল সে খান খান

পিতার সামনে মেয়েকে কাটিয়া করিল রক্তস্নান’

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস গোটা বাংলাদেশ ছিল অবরুদ্ধ, জনপদের পর জনপদ আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়েছে, অস্ত্র আর বেয়নেটের মুখে ছিল সাত কোটি মানুষ, নিরস্ত্র মানুষ আক্রান্ত হয়েছে, মা-বোনেরা হয়েছে ধর্ষিত। শহীদ কাদরীর ‘নিষিদ্ধ জার্নাল’ কবিতায় ফুটে উঠেছে শত্রুর বুলেটে নিহত কিশোরের বর্ণনায় সেই অবরুদ্ধ বাংলার ছবি।

‘ধ্বংসস্তূপের পাশে, ভোরের আলোয়

একটা বিকলাঙ্গ ভায়োলিনের মতো দেখলাম তে-রাস্তার মোড়ে

সমস্ত বাংলাদেশ পড়ে আছে আর সেই কিশোর, যে তাকে

ইচ্ছের ছড় দিয়ে নিজের মতো করে বাজাবে বলে বেড়ে উঠেছিল

সেও শুয়ে আছে পাশে, রক্তাপ্লুত শার্ট পরে।’

অন্যদিকে সৈয়দ শামসুল হকের অনবদ্য পঙ্্ক্তি, ‘আমি যেখানে যাই এ শহরের অবেলায় ক্রমাগত বেলা পড়ে যায়’ তুলে ধরে অবরুদ্ধ ঢাকার চিত্র। তাঁর ‘গেরিলা’ কবিতাটি ফুটিয়ে তুলেছে একজন লড়াকু গেরিলাকে। একই শিরোনামে হাসান হাফিজুর রহমান লিখেন, ‘সবুজ মানুষেরা আচম্বিতে আজ প্রত্যেকেই গেরিলা’। এ কথাই বলে যে নিরস্ত্র বাঙালীকে পঁচিশে মার্চের কালরাতের অন্ধকারে আক্রমণ করে বর্বর পাকবাহিনী ঠেলে দিয়েছে সেই প্রান্তে যেখানে প্রত্যেকেই একেকজন মুক্তিকামী গেরিলা। কবির অন্য কবিতা ‘তোমার আপন পতাকা’য় স্বাধীন পতাকার দুঃখনিবারণী শক্তির কথা বলা হয়েছে : ‘হাজার বছরের বেদনা থেকে জন্ম নিল/রক্তিম সূর্যের অধিকারী যে শ্যামকান্ত ফুল/নিঃশঙ্ক হাওয়ায় আজ ওড়ে, দুঃখ ভোলানিয়া গান গায়।/মোছাব তোমার মুখ সেই পতাকায়।’

মুক্তিযুদ্ধের ওপর রচিত অন্যতম সেরা কবিতার একটি হলো আবুল হাসানের ‘উচ্চারণগুলি শোকের’।

‘হাঁটি হাঁটি শিশুটিকে আমি আর আজ/কোথাও দেখি না/নরম নোলক পরা বৌটিকে আমি আর আজ/কোথাও দেখি না/কেবল পতাকা দেখি,/স্বাধীনতা দেখি!/ তবে কি আমার ভাই আজ ওই স্বাধীন পতাকা?/তবে কি আমার বোন তিমিরের বেদীতে উৎসব?’

মুহম্মদ নূরুল হুদার ‘বাঙালির জন্মতিথি’ কবিতাটি বিজয়ের প্রত্যুষে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি উচ্চারণ করেন গভীর শোকজড়িত অভিবাদন। কবিতাটি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য উৎসর্গিত পঙ্্ক্তিমালার এক অপূর্ব সন্নিবেশ।

‘তোমাদের হাড়গুলো জ্যোৎস্নারাতে উড়ে যাওয়া সাদা কবুতর

সুদূর ঝর্ণার জলে স্বপ্ন-ছাওয়া ঘাসের সবুজ;

তোমাদের হাড়গুলো অন্তহীন স্রোতস্বিনী, সুরের নির্ঝর

একতারা হাতে এক বাউলের মনোজ গম্বুজ;

তোমাদের হাড়গুলো বাংলার সীমানা ডিঙ্গানো

ক্রমশঃ বর্ধিষ্ণু এক হরিৎ বাগান

কারবাইন তাক করা-বেপরোয়া সৈনিকের গান;

তোমাদের হাড়গুলো বাংলার হৃৎপিণ্ডে অবিনাশী ঝড়,

বাঙালির জন্মতিথি, রক্ত লেখা ষোল ডিসেম্বর।’

অন্যদিকে খোন্দকার আশরাফ হোসেনের ‘বাউসী ব্রিজ ’৭১’ মুক্তিযুদ্ধের ওপর রচিত এক অনন্য কবিতা।

‘কাঠবিড়ালির মতো ত্রস্ত নৈপুণ্যে আমরা নৌকা থেকে লাফিয়ে পড়েছিলাম,

তখন কৃষ্ণা একাদশীর ডাইনী রাত ছিলো গর্ভবতী, আর তার কিছুক্ষণ পর

ষাঁড়ের বাঁকানো শিঙ নিয়ে চাঁদ তার হাইডআউট থেকে বেরিয়ে এসেছিলো,

আকাশ-এরিনার অন্য কোণায় তখন মেঘ নামক এক যোদ্ধা অপেক্ষমাণ’

এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক কবির আরেকটি অনবদ্য কবিতা হলো ‘নোটনের জন্য শোক’। যুদ্ধে নিহত এক মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে লেখা হয়েছে এ কবিতাটি।

নির্মলেন্দেু গুণের ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ এক অনন্য কাব্যদলিল।

রেসকোর্সের ময়দানে সমবেত লাখো মানুষের কালো মাথার আন্দোলনে যে অনবদ্য মাঠ সেই মাঠকে কাব্যের পৃষ্ঠা বানিয়ে স্বাধীনতার কবি লিখছেন তাঁর কালজয়ী কবিতা। সমবেত জনতার অপেক্ষা, ‘কখন আসবেন কবি?’ মার্চের ঐ ঘোষণাই স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধ যাকে রূপদান করেছে বাস্তবতায়- কবিতায় তাই ফুটে উঠেছে। নির্মলেন্দু গুণের ভাষায়, শেখ মুজিব হলেন সেই অমর কবি যাঁর কবিতার প্রথম দুটি পঙ্্ক্তি, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’।

প্রকাশিত : ৬ মার্চ ২০১৫

০৬/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: