মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

আবৃত্তিশিল্পীদের কণ্ঠে মুক্তিযুদ্ধের কবিতা

প্রকাশিত : ৬ মার্চ ২০১৫
  • অঞ্জন আচার্য

বাঙালী জাতির সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ঘটনা হলো মুক্তিযুদ্ধ। এর মধ্য দিয়েই জাতি হিসেবে হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা বাঙালীরা অধিকারী হলো একটি স্বাধীন ভূখে র। ইতিহাসের বিভিন্ন কালপর্বে বাঙালীরা মুক্তির আস্বাদ পেলেও স্থায়ী হয়নি সেসব। বেশিরভাগ সময় তাদের কেটেছে পরাধীনতার শৃঙ্খলে। আর এ মহান মুক্তিযুদ্ধ আন্দোলিত করেছে বাংলার আপামর জনসাধারণকে। শত্রুকে মোকাবেলা করার জন্য বাধ্য হয়ে তারা হাতে তুলে নেয় অস্ত্র, চালায় অসীম সাহসী অসম লড়াই। গেরিলার যেমন অস্ত্র, কবির তেমনি কলম। কবিতায়, চিত্রে, গানে, নাটকে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করার মহান দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন সৃজনশীল মানুষেরা, যারা জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল। তাঁদের অনেকেই সরাসরি অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে, অস্ত্র, কলম ও কণ্ঠে ঝরান রক্ত। মুক্তিযুদ্ধপূর্ব, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাই লেখা হয় অসংখ্য গান ও কবিতা, যা কালে কালে প্রাণিত করেছে বাঙালীর চেতনাবোধকে। কবিতার শক্তি অসীম। বাঙালীকে উজ্জ্বীবিত করতে, উদ্দীপনা দিতে, বিবেকবোধকে জাগ্রত করতে এর ভূমিকা আজও সমানভাবে গ্রহণযোগ্য ও প্রাসঙ্গিক। এই কবির লেখা কবিতাকে যাঁরা জনমানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার যে কা-ারি ভূমিকা পালন করছেন তারা হলেন আবৃত্তিশিল্পী। বাচিক এ শিল্প মাধ্যমের ফলে বাংলাদেশ তথা সমগ্র বাঙালী জাতি উদ্দীপ্ত হয়েছে, হচ্ছে এবং আগামীদিনেও হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা যায়। মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা কবিতা মানুষকে কতখানি জাগ্রত করে তুলে তাই নিয়ে কথা হয় কয়েকজন আবৃত্তিকারের সঙ্গে। এদিকে বাংলাদেশের প্রায় সকল কবিই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে লিখেছেন একাধিক কবিতা, যা আবৃত্তি হচ্ছে কালক্রমে। আবৃত্তিকারদের মুখ থেকে তা পৌঁছে গেছে জনমানুষের কাছে। সেই আবৃত্তিশিল্পীদের মুখ থেকে শোনা যাক মুক্তিযুদ্ধের কবিতা পাঠের প্রাসঙ্গিকতা ও পাঠ-প্রতিক্রিয়া

লায়লা আফরোজ

আবৃত্তিশিল্পী

১৯৮৩ সালের কথা। সেবারই প্রথম আমরা বাংলাদেশে প্রথম বৃন্দ কবিতা আবৃত্তি করি। তখন উত্তাল সময়। স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলন চলছে। সেই সাথে চলছে জরুরি অবস্থা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। ওই সময় আমরা ‘প্রসূনের জন্য প্রার্থনা’ শিরোনামে দলীয় আবৃত্তির আয়োজন করি। সেই আয়োজনে প্রাধান্য পায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনালব্ধ কবিতা। শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, সিকদার আমিনুল হক, সৈয়দ শামসুল হকের সেইসব কবিতা এখনও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। আমি মনে করি, মুক্তিযুদ্ধ সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিল সত্তর দশকের কবিদের। কেননা সে সময়ে তারা সকলেই ছিলেন টগবগে যুবক। সত্তরের কবিতায় যে উচ্চকিত দ্রোহ দেখা যায় তার প্রধান প্রভাবক মুক্তিযুদ্ধ। আশির দশকের কোনো কোনো কবির কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ অঙ্কিত হলেও বেশির ভাগ কবির কবিতায় নেই মুক্তিযুদ্ধের জোরালো উপস্থিতি। নব্বই দশকে তা ক্ষীয়মাণ হয়ে আসে আরও। এদিকে নতুন প্রজন্মের কবিদের কথা বলতে গেলে, তারা তো স্বচক্ষে মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। তাই তাদের কবিতার মুক্তিযুদ্ধ তেমনটা প্রতিফলিত হয়নি বললেই চলে। ফলে মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে রচিত পঙ্্ক্তির খোঁজে আমাদের অগ্রজ কবিদের কাছেই বারবার যেতে হয়। তাদের কবিতাই মুক্তিযুদ্ধের কবিতার বিভিন্ন সংকলনে ঠাঁই পেয়েছে, যা মূলত মুক্তিযুদ্ধ ঘিরেই আবর্তিত। আমার মতে, সকলেরই কবিতার লেখার অধিকার আছে। তবে সব লেখাই কবিতা হয়ে উঠে কি না তা ভাববার বিষয়। তাছাড়া সব কবিতাই আবৃত্তিযোগ্য কবিতা নয়। আবারো বলি, আশির দশকে অনেক কবিই মুক্তিযুদ্ধের ওপর কবিতা লিখেছেন। তবে সেগুলো কতখানি মুক্তিযুদ্ধের কবিতা হয়ে উঠেছে, তাতে প্রশ্ন থেকে যায়। কোয়ান্টিটি যে হারে বেড়েছে তার তুলনায় কোয়ালিটি সম্পন্ন কবিতা খুব কমই পেয়েছি পরবর্তীকালে। যুদ্ধ, গেরিলা, গ্রেনেড ইত্যাদি শব্দ অভিধান থেকে চয়ন করলেই তা মুক্তিযুদ্ধের কবিতা হয়ে উঠবে তা আমি মনে করি না। তাছাড়া নব্বইয়ে কিংবা হাল আমলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা ফিউশনের নামে যেসব ‘বিমূর্ত’ কবিতা রচিত হয়েছে বা হচ্ছে তার অধিকাংশই সুখপাঠ্য নয়; আবৃত্তিযোগ্য কবিতা তো নয়ই। একজন আবৃত্তিকারের দায়িত্ব হলো কবিতাকে জনপদের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আশির কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’র সেই সম্ভবনা ছিল। তারপরে তো সেইভাবে কোনো নাম পাই না। একটা কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই, কোনো বিষয়ে নিরীক্ষা করতে হলে তাকে সে বিষয়ে মাস্টার হতে হয়। নয়ত নিরীক্ষা আত্মহনের সমতুল্য। কবিতাও এর বাইরে নয়।

শিমুল মোস্তফা

আবৃত্তিকার

বাংলাদেশের অসংখ্য কবিতায় উঠে এসেছে স্বদেশপ্রেম, বাহান্ন, মুক্তিযুদ্ধ। এ ধরনের কবিতার এক বিশাল ভা-ার আছে এদেশে। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের কবিতা আমাদের প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করেছে, প্রাণিত করেছে, উজ্জ্বীবিত করেছে, এখনও করে আসছে। মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা কবিতা অনেক শক্তিশালী, মর্মস্পর্শী। কেননা এর একটি ঐতিহাসিক পটভূমি আছে। স্বাধীন দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক সঙ্কটে এ কবিতাগুলোই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লেখা কবিতায় আছে স্বাধীনতার স্বপক্ষের চিন্তাধারা বা মতাদর্শ। স্বাধীনতা পরবর্তী প্রেক্ষাপটে এবং সামাজিক অবক্ষয়ে মুক্তিযুদ্ধের কবিতাই আবার মানুষকে বাঁচতে শিখিয়েছে। শামসুর রাহমানের ‘আসাদের শার্ট’, নির্মলেন্দু গুণের ‘স্বাধীনতা, এ শব্দটি কীভাবে আমাদের হল’, ‘হুলিয়া’ এখনও অনেক বেশি রকম প্রাসঙ্গিক। পরবর্তী দশক, মানে আশি, নব্বই দশকের কবিতায় উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট। তাদের অনেকে অগ্রজ কবিদের চেতনা ধারণ করে কবিতা লিখেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় পরম্পরায় কবিতা হয়ে উঠেছে মানুষের নিত্যদিনের অনুষঙ্গ। এখনো মুক্তিযুদ্ধের কবিতা শুনতে চায় মানুষ। আজকের প্রজন্মের ছেলেমেয়েরাও আবৃত্তি শোনে। তারা কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শোনে, কবিতা শোনে। তারা সেই পরম্পরা ধারণ করছে, বিস্তার ঘটছে কবিতার। কবিতা হলো সুস্থতা ও শুদ্ধতার এক অনন্য শক্তিশালী মাধ্যম। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর তা ইতিবাচকভাবেই ধারণ করে আসছে মানুষ। এটি আমার গর্বের জায়গা।

মাহিদুল ইসলাম

আবৃত্তিশিল্পী

আবৃত্তি মূলত একটি প্রয়োগ শিল্প। এটি স্বকীয়তা লাভের সাথে সাথে শ্রোতাদের কাছে পেয়েছে জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা। আবৃত্তির মানদ- কবিতা কিংবা কবিতার বিষয়বস্তু না। আবৃত্তি শিল্পের নির্মাণ কৌশল ও নিখুঁত প্রয়োগ শৈলীই হলো এর প্রথম বিবেচ্য বিষয়। আমরা চেতনায় ধারণ করি মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের ওপর রচিত কবিতা মর্মস্পর্শী এবং একই সাথে আকর্ষণীয় ও হৃদয়গ্রাহী। এইসব কবিতা কেবল মার্চ কিংবা ডিসেম্বরেই উচ্চারিত হয় না। এটি আমাদের কাছে প্রতিদিনকার ভালো লাগার একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। একাত্তরের হত্যাকা-, নিপীড়ন, নির্যাতন, শোষণ ইত্যাদি বিষয়গুলোর মধ্য দিয়ে সেই সময়ের চিত্র ফুটে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের কবিতায়। এখনও এটি কেবল প্রাসঙ্গিকই না, বরং দর্শক-শ্রোতার কাছে তা অনেক বেশি জনপ্রিয়। মুক্তিযুদ্ধচলাকালে আকাশবাণী রেডিওতে সেসময় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের উদ্দীপনাময় কবিতা পাঠ করা হতো। তাঁদের কবিতা উজ্জ্বীবিত করেছে মুক্তিকামী বাঙালীকে। স্বাধীনতা পরবর্তীসময়ে আবু হেনা মোস্তাফা কামাল, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, সৈয়দ শামসুল হক, ফজল শাহাবুদ্দিন, অসীম সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা প্রমুখ কবিদের কবিতা পাই। সেই সব কবিতায় মুক্তিযুুদ্ধের আঙ্গিক ও দর্শন খানিকটা বদলে যায়। সেখানে ঠাঁই পায় মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগ, মূল্যবোধ। প্রজন্মের থেকে প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস দেখা যায় এই কবিতাগুলো। একই সাথে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের অবক্ষয় থেকে প্রজন্মকে রক্ষা করাতেও ভূমিকা রাখে ভিন্নরূপে। সেইসব কবিতা সময় উপযোগী ও কালোত্তীর্ণ। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, হুমায়ুন আজাদ, তারিক সুজাত, আনিসুল হক, মুহাম্মদ সামাদ, সঞ্জীব চৌধুরীসহ আরো অনেকের মুক্তিচেতনায় উদ্বুদ্ধ কবিতা পড়া হয় আমাদের। আমার মনে হয়, কোনো আবৃত্তিকার যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনালব্ধ কবিতা নিখুঁতভাবে আবৃত্তি করতে পারেন তবে বাংলাদেশে জন্ম যেকোনো নাগরিককেই তা নাড়া দেওয়া সম্ভব। আমি নিজে একবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কবিতা আবৃত্তি করতে গিয়ে সেখানকার নবীন শিক্ষার্থীদের কাছে বিপুল সাড়া পেয়েছিলাম। আমি মনে করি, আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক সংকটে নতুন প্রজন্মের মূল্যবোধ আন্দোলিত করতে মুক্তিযুদ্ধের কবিতা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। তবে এও সত্য, আবৃত্তি শিল্পীর ব্যক্তিত্ববোধ, শিল্প-বিষয়ক জ্ঞান ও সঠিক প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে কবিতার পৌঁছানোর দায়।

মজুমদার বিপ্লব

আবৃত্তিকার

মোটা দাগে মুক্তিযুদ্ধের কবিতাকে তিনটি ভাগে বিভাজিত করা যায়। প্রথমটি মুক্তিযুদ্ধপূর্ব কবিতা। ওই সময়ের কবিতায় উঠে এসেছে পাকিস্তানের শোষণ-বঞ্চনার কথা। যেমন সিকান্দার আবু জাফরের কবিতা ‘বাংলা ছাড়ো’ এক্ষেত্রে স্মরণযোগ্য। দ্বিতীয় পর্বে আসে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গণহত্যা, নৃশংসতা, স্বজন হারানোর বেদনা, বিদ্রোহের কথা। মুক্তিযুদ্ধের সেইসব কবিতায় পাকবাহিনীর ধ্বংসলীলা, বাংলার মানুষের দুর্ভোগ, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার প্রত্যাশা ইত্যাদি ঘুরে ফিরে এসেছে। অসংখ্য কবি তাদের রচনায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আবেগ ও চিত্রকে ধারণ করেছেন। একই সাথে বাংলাদেশে বাস করেও যারা দেশের বিরোধিতা করেছে তাদের প্রতি ঘৃণা, ক্রোধের বহির্প্রকাশও আমরা লক্ষ করি কবিতার মধ্য দিয়ে। পাশাপাশি দেখা মেলে, পিতামাতার সন্তান হারানোর দুঃখ-বেদনা কিংবা শহীদ সন্তানের প্রতি তাদের গর্বের বিষয়টিও। তৃতীয় পর্বে আসে যুদ্ধপরবর্তী বাস্তবতা, যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের পটভূমি। এরপরের কবিতায় ঠাঁই পেয়েছে পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, একাত্তরের পরাজিত শক্তির আস্ফালন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলণ্ঠিত করার প্রয়াস ইত্যাদি ইত্যাদি। বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ চিন্তা করা যায় না। তাই এ মানুষটিকে নিয়ে লিখিত পঙ্ক্তিমালাও আমাদের মুক্তিচেতনার কবিতারই এক ভিন্নরূপ। জসিমউদ্দিনের ‘দগ্ধগ্রাম’ বা ‘ধামরাই রথ’ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নির্মমতার ছবি ফুটে উঠেছে। শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আসাদ চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, হুমায়ুন আজাদ, রবিউল হুসাইন, অসীম সাহা, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, মিনার মনসুরসহ আরো অনেকে মুক্তিযুদ্ধে প্রেক্ষাপটে কবিতা লিখেছেন। সেই সাথে পশ্চিমবঙ্গের সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, সুকান্ত ভট্টাচার্য, নবারুন ভট্টাচার্য সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের কবিতা না লিখলেও, তাঁদের কবিতা আমাদের উজ্জ্বীবিত করেছে। তবে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী মুক্তিযুদ্ধের ওপর লিখেছেন কবিতা। এমনকি প্রখ্যাত মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’, একাত্তরে বাঙালী শরণার্থীর অবর্ণনীয় দুর্ভোগকে চিত্রিত করেছে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের ওপর রচিত কিছু গদ্য আছে, যা পাঠ করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ নীলিমা ইব্রাহীমের ‘আমি বীরাঙ্গণা বলছি’, জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’, আশরাফুল আলমের ‘রণাঙ্গণের চিঠি’ এবং ‘একাত্তরের চিঠি’ ইত্যাদি। সাম্প্রতিক সময়ের কবিতায় আসছে হতাশা এবং সার্বিক বাস্তবতার রূপটি। মূলত পঞ্চাশোত্তর দশক, ষাটোত্তর দশক এবং স্বাধীনতাত্তোর প্রথম দশকে বেশ কিছু ভালো কবিতা আমরা পেয়েছি। এ কবিতাগুলো এখনো প্রাসঙ্গিকই কেবল নয়, বরং আমি মনে করি যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন বাঙালী থাকবে ততদিন এর গ্রহণযোগ্যতা শেষ হবে না। বাঙালী জাতিসত্তার এমন হাজার হাজার বছরের ইতিহাস শেষ হবার নয়। বর্তমান সময়ের এই ক্রান্তিকালে এসে মনে হচ্ছে এটি আরো বেশি প্রাসঙ্গিক। কেননা স্বাধীনতা বিরোধীরা অন্ধকারে নিয়ে যাওয়ার যে প্রয়াস করছে, দেশটাকে অন্যদিকে নিয়ে যাওয়া চেষ্টায় রত আছে, তার প্রতিরোধ হিসেবে আসতে পারে মুক্তিযুদ্ধের কবিতা। আজকের এ সময়টায় এ ধরনের কবিতা অনেক বেশি গুরুত্ববহ। তবে একটা সত্য মানতে হবে, গান শোনা, নাটক দেখা, সিনেমা দেখা ইত্যাদি যেমন জনপ্রিয়; আবৃত্তি ততখানি জায়গা এখনও দখল করতে পারেনি। কারণ কাব্যবোধ সম্পন্ন শিক্ষিত শ্রোতারাই আবৃত্তির প্রতি আকৃষ্ট হন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের কবিতা শোনতে কাব্যজ্ঞান লাগে না, এমনকি শিক্ষিত হতে হয় না। মঞ্চে কিংবা মুক্তাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের কবিতা আবৃত্তি করা হলে তা শ্রেণি-পেশা-বয়স নির্বিশেষে সমানভাবে সকল শ্রোতাকেই স্পর্শ করে। এ ধরনের কবিতা শোনার ফলে মনে হয় যেন নিজের কথা, নিজেদের কথা, ইতিহাসের কথা, অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই শ্রোতারা মুক্তিযুদ্ধের কবিতায় একাত্ম হতে পারেন সহজেই।

প্রকাশিত : ৬ মার্চ ২০১৫

০৬/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: