কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শত বছরের স্মারক, মুদ্রণ শিল্পের ইতিহাস বর্ণনা

প্রকাশিত : ৫ মার্চ ২০১৫
শত বছরের স্মারক, মুদ্রণ শিল্পের ইতিহাস বর্ণনা
  • জাদুঘরে ট্রেডল মেশিন

মোরসালিন মিজান

আজকের চোখ দিয়ে দেখলে অবাক হতে হয় বৈকি! বিদ্যুত সংযোগের বিষয় নেই। জল তেল লাগে না। লোহার একটি অবকাঠামো। এর নিচের অংশে পা রেখে চাপলেই মুদ্রণের কাজ শুরু হয়ে যায়। যন্ত্রটির নাম ট্রেডল মেশিন। হ্যাঁ, বহু বহু কাল আগের যন্ত্র। সঙ্গত কারণেই দুর্লভ। একদমই দেখা যায় না, বলা চলে। তবে ঠিক এই মুহূর্তের কথা আলাদা। চাইলে যে কেউ দেখতে পারবেন। চমৎকার সুযোগটি করে দিয়েছে জাতীয় জাদুঘর। অতি সম্প্রতি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই স্মারক সংগ্রহ করেছে সরকারী প্রতিষ্ঠান। এখন চলছে ‘লাইফ ইন এ্যাকশন’ শীর্ষক প্রদর্শনী। কৌতূহল নিয়ে দর্শনার্থীরা দেখছেন, কিভাবে কাজ করত ট্রেডল মেশিন।

বলা বাহুল্য, ট্রেডল মেশিন আর মুদ্রণশিল্পের ইতিহাস একসূত্রে গাঁথা। শতাধিক বছর আগে গুরুত্বপূর্ণ সব ছাপার কাজে ট্রেডল মেশিনই ছিল একমাত্র ভরসা। প্রায় সব ধরনের মুদ্রণ কাজ হতো এ মেশিনে। পত্রিকা, সাহিত্যের কাগজ, পুস্তিকা, গেজেট ইত্যাদি ছাপা হতো। ট্রেডল মেশিনের অবদান সম্পর্কে একটি ধারণা দেয় ‘ঢাকা প্রকাশ’। সেই ১৯০০ সালে ঢাকা থেকে ট্রেডল মেশিনে ছাপা হতো বিখ্যাত এই সাপ্তাহিক। এখনও এর কপি সংরক্ষিত আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সংগ্রহশালায়। সেসব কপি হাতে নিয়ে দেখলে চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়! অতি সাধারণ একটি মেশিন দিয়ে কী আশ্চর্য সুন্দর কাজ হয়েছে তখন! জানা যায়, সেই ইতিহাস সংরক্ষণের তাগিদ থেকে ট্রেডল মেশিনের সন্ধান শুরু করে জাতীয় জাদুঘর। বহু খোঁজা খুঁজির পর গত তিন মাস আগে ময়মনসিংহ শহরে একটি মেশিনের সন্ধান পাওয়া যায়। ছোটবাজারের ডিএন চক্রবর্তী সড়কের একটি ছাপাখানায় এটি দিয়ে চলছিল মুদ্রণের কাজ। ৩২ বছর আগে কিশোরগঞ্জ থেকে ট্রেডল মেশিনটি কিনে এনে এখানে স্থাপন করেন মোহাম্মদ কিবরিয়া। একেবারে শেষদিন পর্যন্ত সচল ছিল মেশিনটি। মাত্র ৩০ হাজার টাকায় অমূল্য স্মারক কিনে নেয় জাতীয় জাদুঘর। এর পর থেকে জাদুঘর ভবনের সামনে একটি খোলা জায়গায় ‘লাইফ ইন এ্যাকশন’ শিরোনামে চলছে প্রদর্শনী।

সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ট্রেডল মেশিনটির প্রধানত দুটি অংশ। এক অংশে দুটি চাকা। বামপাশেরটি আকারে বড়। ডানপাশে অপেক্ষাকৃত ছোট চাকা। চাকা দুটির মাঝখানে সাদা কাগজ রাখার জায়গা। অপর অংশে রং ও কাঠের ব্লক। নিচের দিকে একটি পা রাখার মতো জায়গা। সেখানে এক পা রেখে চাপ দিলে মেশিন চলতে শুরু করে। মেশিনের উভয় অংশ তখন দরজার কপাটের মতো কাছাকাছি চলে আসে। অমনি ছাপার কাজটি হয়ে যায়। মূল দুই অংশের বাইরেও মেশিনের অনেক কলকবজা রয়েছে। সব একসঙ্গে কাজ করে। সেলাই মেশিন যেভাবে কাজ করে, অনেকটা সে রকম।

জাদুঘরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলামও শিখে নিয়েছেন ট্রেডল মেশিন পরিচালনা। তিনি প্রতিবেদকের সামনে মেশিনের নিচের অংশে পা রেখে চাপ দেন। দিতে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে বড় চাকাটি ঘুরতে শুরু করে। এই চাকার সঙ্গে যুক্ত অপেক্ষাকৃত ছোট চাকাটি ঘুরে একইসঙ্গে। এভাবে একত্রে কাজ শুরু করে সব কলকবজা। ট্রেডল মেশিনটির সামনের অংশে রং জমা রাখা। মেশিন চালু হলে সেখান থেকে তরল গড়িয়ে নিচের গোলাকার পাতে পড়তে থাকে। এখান থেকে রুটি তৈরির বেলুনের মতো দুটি কাঠি রং গায়ে মেখে নিচে নেমে যায়। আর তখন সেই রং গায়ে মেখে নেয় কাঠের ব্লক। রং মাখা ব্লক আগে থেকে পেতে রাখা কাগছের গায়ে ছাপ দেয়। অমনি হয়ে যায় ছাপার কাজ। বোঝা যায়, মেশিনটি প্রচ- যতেœ রেখেছিলেন যে মালিক কিবরিয়া। শেষদিন পর্যন্ত এ মেশিনেই কাজ করেছেন তিনি। আধুনিক সময়ে ট্রেডল মেশিনে কী কাজ হতো? জানতে ফোনে যোগাযোগ করা হয় কিবরিয়ার সঙ্গে। জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, এক সময় তো মুদ্রণের প্রায় সব কাজ এই মেশিনে হয়েছে। তার পর প্রযুক্তির যত উন্নতি হয়েছে ততই কাজ কমেছে ট্রেডল মেশিনের। তবে প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি। শেষ দিকে মেশিনটি দিয়ে ক্যাশমেমো, বিভিন্ন দাওয়াতপত্র, কুপন ইত্যাদি ছাপানোর কাজ করেছি। নির্বাচনী পোস্টারসহ বিভিন্ন প্রচারপত্র ছাপতেও ব্যবহৃত হয়েছে ট্রেডল মেশিন। জাতীয় জাদুঘর সংরক্ষণ করায় তিনি খুব খুশি বলেও জানান। স্মারকটি সংগ্রহ ও জাদুঘরে সংরক্ষণ প্রসঙ্গে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী বলেন, আমাদের শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে ট্রেডল মেশিনের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। আজকের প্রজন্ম ইতিহাসটি জানে না। এ কারণেই জাদুঘরে এটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতিহাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমন আরও কিছু মুদ্রণযন্ত্র জাদুঘরে আনার প্রয়াস চলছে বলেও জানান তিনি।

প্রকাশিত : ৫ মার্চ ২০১৫

০৫/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: