মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

আন্দোলনের চেয়ে খালেদা ব্যস্ত এখন নিজের ও ছেলের মামলা নিয়ে

প্রকাশিত : ৫ মার্চ ২০১৫
  • কূটনৈতিক তৎপরতার নেপথ্যে-

শরীফুল ইসলাম ॥ সরকারের বিরুদ্ধে লাগাতার অবরোধ-হরতাল কর্মসূচী শুরুর আগে থেকেই কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে বিএনপি। কিন্তু সরকারের পাল্টা তৎপরতার কাছে কুলিয়ে উঠতে পারছিল না বিএনপি। তবে ২৫ জানুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হলে দলের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক তৎপরতা আবারও জোরদার করা হয়। এ কারণে যখন চাউর হয়ে পড়ে ৪ মার্চ খালেদা জিয়াকে হয় আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে নতুবা তাঁকে গ্রেফতার করা হবে, তার একদিন আগেই ৩ জানুয়ারি রাতে গুলশান কার্যালয়ে গিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা।

জানা যায়, খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিকরা বৈঠকের পর তাঁর বিষয়ে সরকারের মনোভাব কিছুটা নমনীয় হয়। আর খালেদা জিয়াও পূর্বাভাস পেয়ে যান ৪ মার্চ আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের বিশেষ আদালতে হাজির না হলে কিংবা আদালতে আত্মসমর্পণ না করলেও তাঁকে গ্রেফতার করা হবে না। এ কারণেই বুধবার আদালতে যাননি খালেদা জিয়া। আর আপাতত বিভিন্ন কৌশলে গ্রেফতার এড়ানোর পাশাপাশি আন্দোলনও চালিয়ে যেতে চান খালেদা জিয়া। তবে কূটনৈতিক তৎপরতাসহ বিভিন্ন কৌশলে পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে আনতে পারলে তিনি তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করবেন বলে জানা গেছে।

এদিকে বুধবার খালেদা জিয়ার পক্ষে তাঁর আইনজীবীরা গ্রেফতারি পরোয়ানার আদেশ বাতিলের দাবিতে যে আবেদন করেছেন আদালত তার ওপর শুনানি করলেও এ ব্যাপারে কোন আদেশ না দিয়ে আবেদন নথিভুক্ত করেন। ফলে সিএমএম কোর্ট থেকে পূর্বে দেয়া খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা বহাল রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। তবে এর আগেই যে কোন সময় খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা যাবে। তবে আপাতত গ্রেফতার এড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতাসহ ভেতরে ভেতরে নানামুখী চেষ্টা চালিয়ে যাবেন খালেদা জিয়া।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অবশ্য সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনায় বলেছেন, বিদেশী কূটনীতিকরা কোন দূতিয়ালী করছে না। তবে সরকার দ্রুতই আবারও অবস্থা তুলে ধরার জন্য কূটনীতিকদের ডাকবেন। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া এখন আন্দোলনের ভবিষ্যত নিয়ে যতটা না ব্যতিব্যস্ত তার চেয়ে বেশি ব্যতিব্যস্ত তাঁর নিজের ও ছেলে তারেক রহমানের মামলা নিয়ে। কারণ আন্দোলন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আন্দোলনের সফলতা আগে-পরে আসতে পারে আবার নাও আসতে পারে। কারণ আন্দোলনের সফলতা-ব্যর্থতা নির্ভর করে পরিবেশ পরিস্থিতি এবং দেশের জনগণ ও বিভিন্ন মহলের সহযোগিতার ওপর। কিন্তু মামলা একটি আইনী প্রক্রিয়া। তাই আইনী প্রক্রিয়ায় মামলার নেতিবাচক রায় একবার হয়ে গেলে তা থেকে পরিত্রাণ পেতে বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়। এমনকি মামলায় একবার নেতিবাচক রায় হয়ে গেলে রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়ে। এ ছাড়া মামলায় কারও বিরুদ্ধে শাস্তি হয়ে গেলে তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারেও অযোগ্য হয়ে পড়েন। আর এ কারণেই মামলার ব্যাপারে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া সতর্ক রয়েছেন এবং গ্রেফতার এড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতাসহ নানামুখী প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া, লন্ডন প্রবাসী তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমান, দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান মোর্শেদ খান, শমসের মবিন চৌধুরী, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান, সাবিহউদ্দিন আহমেদ, ড. ওসমান ফারুকসহ বিএনপি সমর্থিত কিছু বুদ্ধিজীবী দলের পক্ষে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রথমে কূটনৈতিক তৎপরতায় কিছুটা সফল হয়। এরই অংশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘসহ আরও কয়েকটি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা নির্বাচনের আগে বিএনপিকে রাজনৈতিক সুবিধা দেয়ার পক্ষে কাজ করে। কিন্তু বিষয়টি টের পেয়ে আওয়ামী লীগও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করে। তাই সে যাত্রায় বিএনপি কূটনৈতিক তৎপরতায় সুবিধা আদায় করতে পারেনি।

কূটনৈতিক তৎপরতায় সফল হতে না পেরে বিএনপি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে। তবে এ নির্বাচন বানচাল করতে সারাদেশে কেন্দ্রভিত্তিক সংগ্রাম কমিটি করেও নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি, তা গতবছর ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সমমনা দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। এরপর প্রথম এক বছরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বেশকিছু সফলতাও অর্জন করে বর্তমান সরকার।

বর্তমান সরকারের এক বছর পার হওয়ার পর বিএনপি যখন আন্দোলন করার প্রস্তুতি নেয় ঠিক তখনই সরকার খালেদা জিয়াসহ বিএনপি নেতাদের মামলাগুলো নিষ্পত্তি করার ব্যাপারে তৎপর হয়ে পড়ে। ফলে বিএনপি রাজনেতিকভাবে বেকায়দায় পড়ে। তবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় আন্দোলন জোরদারের কৌশল নেয় বিএনপি। তাই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর পূর্তির দিন ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে সারাদেশ থেকে লোক জড়ো করে রাজধানীতে বড় ধরনের সমাবেশ করে সরকারকে চাপে ফেলার প্রস্তুতি নেয় বিএনপি। ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর মার্চ ফর ডেমোক্রেসি কর্মসূচী ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এবার ভিন্ন কৌশল নেন খালেদা জিয়া। আন্দোলনের প্রস্তুতি জোরদার করতে ৩ জানুয়ারি রাতেই বাসা ছেড়ে গুলশানের দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান নেন তিনি। কিন্তু ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ৫ জানুয়ারি রাজধানীতে সমাবেশ করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পুলিশী বাধা অতিক্রম করেই ৫ জানুয়ারি বিকেলে নয়াপল্টন দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন তিনি। খালেদা জিয়ার এ ইচ্ছের কথা জেনে ওই দিন দুপুরেই গুলশান কার্যালয়ের ফটকে তালা মেরে দেয় পুলিশ। কিন্তু বিকেলে নয়াপল্টনে সমাবেশ করতে যাওয়ার জন্য গাড়িতে চড়ে বসলে গুলশান কার্যালয় থেকে পুলিশ বের হতে দেয়নি খালেদা জিয়াকে। একপর্যায়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে থাকা মহিলা দলের নেতাকর্মীরা সরকারবিরোধী সেøাগানে মুখরিত হয়ে লাথি মেরে তালাবদ্ধ গেট ভাঙ্গার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ওপর পিপার স্প্রে মারে। এর কিছুক্ষণ পর খালেদা জিয়া গাড়ি থেকে নেমে ওখানে দাঁড়িয়েই ৬ জানুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ কর্মসূচীর ডাক দেন। আর ২ ফেব্রুয়ারি থেকে অবরোধের মধ্যেই সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার বাদে টানা হরতাল কর্মসূচীও পালন করে আসছে বিএনপি জোট।

আন্দোলনের স্বার্থে ৩ জানুয়ারি গুলশান কার্যালয়ে অবস্থানের পর এক মিনিটের জন্যও সেখান থেকে বের হননি খালেদা জিয়া। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর মনে করা হচ্ছিল ৪ জানুয়ারি আদালতে আত্মসমর্পণ করতে যাবেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আদালতে যাননি। তবে তার আগে বিদেশী কূটনৈতিকসহ বিভিন্ন মহলের মাধ্যমে তৎপরতা চালিয়ে এ যাত্রায় তিনি গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হয়েছেন।

জানা যায়, আগে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দলের বেশ কয়েকজন নেতা কূটনৈতিক তৎপরতার পক্ষে সক্রিয় থাকলেও এখন হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া তেমন কেউ খালেদা জিয়ার সঙ্গে এ প্রক্রিয়ায় নেই। ইতোমধ্যেই পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে চলে গেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী। চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হওয়ার পর এখন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আর চেয়ারপার্সনের আরেক উপদেষ্টা সাবিহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি খালেদা জিয়ার সঙ্গে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত সাক্ষাতের দিন গুলশান কার্যালয়ে গিয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেখানে ২ দিন অবস্থানের পর অস্বস্তি বোধ করলে সেখান থেকে বেরিয়ে যান এবং এরপর থেকে গুলশান কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ ও দলীয় কর্মকা-ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোর্শেদ খান চিকিৎসার জন্য বিদেশে চলে যান। একইভাবে দলীয় কিছু বুদ্ধিজীবীও এখন খালেদা জিয়ার পক্ষে কূটনৈতিক তৎপরতা থেকে বিরত থাকেন। তবে বাস্তবতার নিরিখেই বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া নিজে এবং তাঁর ছেলে তারেক রহমান নিজেদের পক্ষে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেন। এ ছাড়া দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খান নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেন। এ ছাড়া বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক খালেদা জিয়ার পক্ষে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন । এ ছাড়া বর্তমানে বিভিন্ন দেশে অবস্থান করা কিছু প্রবাসী বিএনপি নেতাকর্মী দলের পক্ষে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

প্রকাশিত : ৫ মার্চ ২০১৫

০৫/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: