মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

আন্তঃপ্রশান্তীয় অংশীদারিত্ব

প্রকাশিত : ৪ মার্চ ২০১৫
  • ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর

আন্তঃপ্রশান্তীয় অংশীদারিত্ব বা Trans-Pacific Partnership (টিপিপি) প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে সংবলিত করে একটি মুক্ত বাণিজ্য এলাকা (Free Trade Area) গঠন করার উদ্দেশ্যে প্রণীত চুক্তি-প্রস্তাব। এই প্রস্তাব এখন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনাই, কানাডা, চিলি, জাপান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, নিউজিল্যান্ড, পেরু, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামের মধ্যে চূড়ান্তকরণের উদ্দেশ্যে এসব দেশের মধ্যে আলোচিত হচ্ছে। প্রস্তাবিত এই চুক্তির মোটাদাগের রূপরেখা ২০১১ নবেম্বরে ফিলিপাইনের হনলুলুতে এশিয়া ও প্রশান্তীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা (এপেক) জোটের দেশসমূহের বাণিজ্যমন্ত্রীদের সভায় ঘোষণা করা হয়েছিল। এই ঘোষণা অনুযায়ী যদি টিপিপি চুক্তি প্রশান্ত মহাসাগরের দুই তীরের অধিকাংশ দেশসমূহের মধ্যে সম্পাদিত হয় তাহলে এসব দেশের মধ্যে বিদ্যমান শুল্ক ও শুল্কবহির্ভূত বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে যাবে। যে ১২টি দেশের মধ্যে আন্তঃপ্রশান্তীয় অংশীদারিত্বমূলক আলোচনা চলছে তারমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্রুনাই, জাপান, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ভিয়েতনামের সঙ্গে এখনও কোন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা সমঝোতা নেই। এই ৫টি দেশের বাইরে প্রস্তাবিত টিপিপি চুক্তির আওতায় অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, চিলি, মেক্সিকো, পেরু ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এবং এই সকল দেশের সঙ্গে ব্রুনাই, জাপান, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ভিয়েতনামের প্রায় সকল পণ্য, কৃত্যক বা সেবা ও আঁতেল সম্পদ অন্তর্ভুক্ত করে একটি সম্প্রসারিত মুক্ত বাণিজ্য এলাকার মোড়কে পারস্পরিক বাজার প্রসারণের আলোচনা চলছে। শোনা যাচ্ছে যে, এশিয়া এলাকায় ভিয়েতনামের বাইরে লাওস, কম্বোডিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড এমনকি মিয়ানমারও এই টিপিপির আওতাভুক্ত হতে পারে এবং যদি এ হয় তাহলে প্রথাগত জিএসপির (অগ্রাধিকারের সাধারণ ব্যবস্থা) আওতায় বাংলাদেশের তরফ থেকে একক বা দ্বিপাক্ষিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার পাওয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের টিপিপি চুক্তিতে ঢোকা বা অংশগ্রহণ করার কথা এ পর্যায়ে গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে।

টিপিপির সূত্রপাত ঘটে ২০০৩ সালে যখন সিঙ্গাপুর, নিউজিল্যান্ড এবং চিলি এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় বাণিজ্য উদারীকরণের পথ নির্দিষ্ট করার অভিলাষ প্রকাশ করে। এ সম্পর্কিত তিনটি দেশের আন্তঃদেশ আলোচনায় ২০০৫ সালে ব্রুনাই যোগ দেয় এবং ফলত আন্তঃপ্রশান্ত মহাসাগরীয় মৌল কৌশলীয় অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি ২০০৬ সালে এই চারটি দেশ সম্পাদন করে। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য উদারীকরণের এই প্রচেষ্টায় শামিল হয় এবং বিনিয়োগ ও আর্থিক কৃত্যকাদি-বিষয়ক বিভিন্ন বিধান এই চুক্তির আওতায় আনে। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র এই আলোচনার পরিধিতে আবার অস্ট্রেলিয়া, পেরু ও ভিয়েতনামকে অন্তর্ভুক্ত করে। ২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট ওবামা এসব দেশের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনাক্রমে একটি বিস্তৃত সদস্যপদ সম্পন্ন উঁচুমানের বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্য ঘোষণা করেন। ২০১১-তে হনলুলুতে এপেক বাণিজ্যমন্ত্রীদের তরফ হতে মোটাদাগে চুক্তির কাঠামো ঘোষণা করার পর কানাডা, জাপান ও মেক্সিকো এপেক দেশসমূহের সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তি আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে থাকে। পরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী এ্যাবে ২০১৩-এর জুলাই মাসে এ সকল দেশের সঙ্গে বাণিজ্য উদারীকরণের আলোচনায় জাপানকে অংশগ্রহণ প্রবৃত্ত করেন। ২০১৪ সাল থেকে দক্ষিণ কোরিয়া এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে থাকে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে প্রশান্ত মহাসাগরের অন্য পারে অবস্থিত কলম্বিয়া ও কোস্টারিকা টিপিপিতে যোগ দেয়ার অভিলাষ ব্যক্ত করে।

বর্তমানে মুক্ত বাণিজ্য প্রসারণের অন্তরায় হিসেবে সদস্য দেশ কর্তৃক আরোপিত (১) পণ্যের ও কৃত্যকের আমদানির ওপর শুল্ক, (২) কোটা ও আঁতেল সম্পদের আমদানি-রফতানির ওপর আরোপিত শুল্কবহির্ভূত বাধা এবং (৩) পরিবেশ, রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যোগ এবং বিনিয়োগকেন্দ্রিক অন্তরায়সমূহ দূরীকরণ বা একই সূত্রাধীনে আনা আলোচনার প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার জাপান কর্তৃক অনুসৃত কৃষিপণ্যাদি ও মোটরযান উৎপাদনের অনুকূলে প্রতিরক্ষণ এবং যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সে দেশে কৃষি উৎপাদনে ভর্তুকি দেয়ার বিষয়ে মতানৈক্য এখনও শেষ হয়নি।

হিসাব করে দেখা গেছে, টিপিপি আলোচনায় অংশগ্রহণকারী দেশসমূহ পৃথিবীর মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) শতকরা ৪০ ভাগ এবং বিশ্ব বাণিজ্যের শতকরা ৩০ ভাগ উৎসারিত করে। মুক্ত বাণিজ্যের পথে এসব দেশ অগ্রসর হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যতত্ত্ব অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ও উৎপাদন বাড়বে। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র উত্তর আমেরিকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (ঘড়ৎঃয অসবৎরপধহ ঋৎবব ঞৎধফব অৎবধ-নাফটা) আওতায় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকোর মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য প্রতিষ্ঠিত করে। এই সূত্র অনুসরণ করে ২০১১ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ১১টি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ১৬টি দেশের সঙ্গে সম্পাদন করে। সর্বশেষ তিনটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় কলম্বিয়া, পানামা ও দক্ষিণ কোরিয়া অন্তর্ভুক্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি মহল থেকে এই সকল মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষক, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের স্বার্থ সর্বাংশে রক্ষিত হয়নি বলে বলা হয়েছে। তার কারণ এসব মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে কৃষিজাত পণ্য, সকল কৃত্যকাদি বা সেবা, বিনিয়োগ, আঁতেল সম্পত্তির ক্ষেত্রে শুল্ক প্রত্যাহার বা হ্রাসকরণ এবং শ্রমিকের অধিকার ও পরিবেশ সম্পর্কিত গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল বিধান স্থান পায়নি। এসব সম্পর্কিত বিধানাদি টিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব এখন আলোচিত হচ্ছে। এর বাইরে সকল সদস্য দেশের জন্য রাষ্ট্রীয় মালিকানার উদ্যম, সরকারী সংগ্রহ, সেবা ও পেশার ক্ষেত্রে একক বিধি বা শৃঙ্খলা প্রসারণ সম্পর্কিত বিষয়ে বিদ্যমান মুক্ত ও বাণিজ্য চুক্তিসমূহে কোন বিধান রাখা হয়নি। আন্তঃদেশ বাণিজ্য বিস্তারণে প্রাসঙ্গিক এসব বিষয় ও উপকরণাদি টিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব পাওয়া গেছে। বর্তমানে নাফটার আওতায় যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার পরিমাণ পণ্য এবং ৯০ বিলিয়ন ডলার পরিমাণ কৃত্যক কানাডা ও মেক্সিকোতে রফতানি করে থাকে। প্রস্তাবিত টিপিপির আওতায় সদস্য দেশসমূহের পণ্য রফতানির পরিমাণ ৭০০ বিলিয়ন ডলার এবং কৃত্যক রফতানির পরিমাণ ১৭০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হবে বলে প্রক্ষেপিত হয়েছে। বাণিজ্যের দৃষ্টিকোণের বাইরে রাজনৈতিকভাবে চীনকে টিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত করার কথাও উঠে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে টিপিপির মাধ্যমে এশীয় প্রশান্তীয় এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে নতুন করে শক্তি বলয় শনাক্তকরণ ও অনুসরণ করার যুক্তির বিপরীতে চীনকে অন্তর্ভুক্ত করার সুবিধা-অসুবিধাসমূহ আলোচনায় এসেছে। ২০১৩-এর নবেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুসান রাইস বিস্তৃত ও অধিকতর ফলপ্রসূ টিপিপি চুক্তিতে চীনসহ অন্য সংশ্লিষ্ট সকল রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তি চেয়েছেন। তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন, এই ধরনের অন্তর্ভুক্তি বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সম্পাদিত চুক্তি বা সমঝোতা স্মারককে উঁচুমানের চুক্তি বা সমঝোতায় উন্নীত করবে। চীন এখন পর্যন্ত এই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেনি। যদিও সাম্প্র্রতিককালে বাণিজ্য প্রসার ও উদারীকরণে ভারত বিস্তৃত কর্মসূচী বাস্তবায়ন করে আসছে, তথাপি এই বিষয়ে ভারতের অবস্থান সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে এখন পর্যন্ত কিছু জানা যায়নি। ভারত অবশ্য আসিয়ান এবং এর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় সংযুক্ত অস্ট্রেলিয়া, চীন, জাপান, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়া সমন্বয়ে আঞ্চলিক ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব (জবমরড়হধষ ঈড়সঢ়ৎবযবহংরাব ঊপড়হড়সরপ চধৎঃহবৎংযরঢ়-জঈঊচ) যোগদান করার অভিলাষ আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যক্ত করেছে। এই পর্যায়ে পরিষ্কারভাবে বলা যায় না কিভাবে আরসিইপি ও টিপিপি একে অন্যের ওপর কী অভিঘাত সৃষ্টি করবে। অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনাই, জাপান, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনাম অবশ্য এখন টিপিপি ও আরসিইপি আলোচনাকে একে অপরের সম্পূরক বলে বিবেচনা করে। প্রস্তাবিত টিপিপি ও একই বা সংশ্লিষ্ট এলাকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনক্রমে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার আলোকে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে ঐকমত্যে পৌঁছানো জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রথমত, বর্তমানে বিদ্যমান বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডড়ৎষফ ঞৎধফব ঙৎমধহরুধঃরড়হ-ডঞঙ) আওতায় এবং দোহা দফায় আলোচিত বিশ্ব বাণিজ্য পদ্ধতির সম্মার্জন প্রক্রিয়ার আলোকে বলা চলে, বিস্তৃত অবয়বে টিপিপি সই ও বলবৎ হলে কতিপয় ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হবে। এক. টিপিপি রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যম, সদস্য দেশসমূহের উৎপাদন ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণমূলক বিধানে সমতা এবং আঁতেল সম্পদ আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে অনুসরণীয় বিধান সুবিন্যস্ত করে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে অধিকতর বিস্তৃতভাবে মুক্ত বাণিজ্যের সূত্রাদি পৃথিবীব্যাপী প্রয়োগ করার ভিত্তি ও যৌক্তিকতা দেবে। দুই. বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ করার লক্ষ্যে অন্যান্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতাধীন এলাকার (উদাহরণত : ইউরোপীয় ইউনিয়ন) পরিপ্রেক্ষিতে টিপিপিতে গৃহীত এবং অনুসরণীয় অধিকতর মুক্ত বাণিজ্যের সূত্র ও পদ্ধতি গ্রহণ করতে চাইবে এবং টিপিপি মুক্ত বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উদারীকরণের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল সদস্য দেশসমূহকে তাদের উদারীকরণের লক্ষ্যে গৃহীত অর্থনৈতিক সংস্কারসমূহকে স্থায়িত্ব দেবে। অবশ্য এই তিন দিকে ইতিবাচকতা অর্জন ও সংরক্ষণ করতে হলে টিপিপি দেশসমূহের জোট যাতে অন্যান্য এলাকা বা জোট থেকে বাণিজ্যের কেবলমাত্র দিক পরিবর্তন না করে বাণিজ্যের সার্বিক পরিমাণ বাড়ায় তার দিকে নীতিনির্ধারকদের তীক্ষè নজর রাখতে হবে।

দ্বিতীয়ত, প্রায় ১১ হাজার শ্রেণীর পণ্যের ওপর বর্তমানে আরোপিত শুল্ক উঠিয়ে নেয়ার নির্ধারিত পর্যায়, বিশেষত স্পর্শকাতর পণ্যাদির ওপর আরোপিত শুল্ক প্রত্যাহারের সময়সূচীর সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ আইনাদি, আমদানি-রফতানি লাইসেন্স দেয়ার পদ্ধতি, শুল্ক প্রশাসন সম্পর্কিত বিভিন্ন ইস্যু এবং শিল্প ও বাণিজ্যে সহায়তাকরণ কর্মসূচীর সমন্বয় বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বা সদস্য দেশসমূহের নেতৃত্বের ঐকমত্যে পৌঁছতে হবে। এর সঙ্গে এই সময়ে দৃষ্ট উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশে উৎপাদনীয় ও আমদানীয়, বুনন, বস্ত্র ও পাদুকাশিল্পের ওপর আরোপনীয় বা প্রত্যাহার করণীয় শুল্কের হার, ব্যাপ্তি ও পর্যায় সম্পর্কে মতানৈক্য দূর করতে হবে। একই সূত্র অনুযায়ী বিভিন্ন কৃত্যককেন্দ্রিক বাণিজ্য যথা : আর্থিক কৃত্যকাদি, ইন্স্যুরেন্স, ব্যাংকিং, পেশাগত সেবা, শিক্ষা ও আইনী কৃত্যক, টেলিযোগাযোগ, জরুরী ও দ্রুত হস্তান্তরণীয় ইলেক্ট্রনিক বাণিজ্য ও উপাত্তের অন্তঃ বা বহিঃপ্রবাহ এবং এ সকল ক্ষেত্রে গ্রহণীয় পদক্ষেপের সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দোহা দফায় আলোচিত ও স্থিরকৃত পদক্ষেপ বা কার্যক্রমসমূহ ক্রমবিবর্তনমান পরিপ্রেক্ষিতে সুবিন্যস্ত করতে হবে। এর বাইরে সরকারী সংগ্রহ, কৃষি বাজারে প্রবেশাধিকার, স্বাস্থ্যপ্রদীয় বা স্যানিটারি ও কীটপতঙ্গাদির স্বাস্থ্যপ্রদীয় বা ফাইটো স্যানিটারি পণ্যাদি, আঁতেল সম্পদ, কপিরাইট ও পেটেন্ট, ওষুধাদি, জীববিজ্ঞান উৎসারিত পণ্যাদি বা উদ্ভাবন, বাণিজ্য ও বাণিজ্য তথ্যের গোপনীয়তা, (উৎপাদনের উপকরণ) উৎস সম্পর্কিত বিধান, বিদেশী বিনিয়োগ, শ্রম আইন ও পরিবেশবিষয়ক বিধানাদি বিষয়ে বিস্তারিত বিধি প্রণয়ন ও অনুসরণ করার জন্য একযোগে কাজ করতে হবে।

মুক্ত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ক্রমবিবর্তনমান পরিপ্রেক্ষিতের দুটি উপকরণ সম্পর্কে সাম্প্রতিককালে মতানৈক্য সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এক. প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বা প্রাকৃতিক আবিষ্কারের ফলশ্রুতিতে পণ্যবিশেষের বিশাল মূল্যহ্রাস, যেমন : ২০১৪-এর শেষভাগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কুচিপাথর থেকে তেল আহরণ পদ্ধতি উদ্ভাবনের পর বিশ্বব্যাপী তেলের মূল্যহ্রাসজনিত বিভিন্ন পণ্যের মূল্য সামঞ্জস্যকরণ সম্পর্কিত সমষ্টিগত পদক্ষেপ সম্পর্কে ঐকমত্যে পৌঁছানো এখনও সম্ভব হয়নি। দুই. আমদানি-রফতানি কমানো বাড়ানোর লক্ষ্যে দেশ বিশেষ বিনিময় হারের পরিবর্তন করে থাকে। এই ধরনের পরিবর্তনের ফলে আমদানি অধিকতর মূল্যবান এবং রফতানি সুলভ করা হয় যা বাণিজ্যরত অন্যান্য দেশে ঘাত-অভিঘাত সৃষ্টি করে। বিনিময় হারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নীতি সম্পর্কে কোন সূত্র এখনও গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। টিপিপি বা এই ধরনের বাণিজ্য জোট সৃষ্টির প্রতিক্রিয়ায় অন্য বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে এই দুটি ক্ষেত্রে চলিষ্ণু পরিপেক্ষিতে সমাধানের পরিধি ও পদ্ধতি থাকা কর্মানুগ হবে।

উপরোক্ত সকল বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছে সদস্য দেশসমূহের অনুসরণীয় বিধির বিভিন্ন অর্থ বা তাৎপর্যাদি এবং সমায়ন্তরে সেসব সম্পর্কে মতবিরোধের নিষ্পত্তিকরণের কাঠামো উদ্ভাবন কঠিন ও সময়সাপেক্ষ কাজ। এতদ্সত্ত্বেও বলা চলে, নাফটা এবং এক্ষেত্রে মুক্ত বাণিজ্য সংবলিত অন্যান্য অঞ্চল সৃজন ও পরিচালনে ইতোমধ্যে যে অগ্রগতি হয়েছে তা টিপিপি চূড়ান্তকরণে সহায়ক হবে। মুক্ত বাণিজ্য থেকে উৎসারিত উৎপাদন বর্ধনমূলক সমন্বিত পদক্ষেপের সঙ্গে এখনই সংশ্লিষ্ট না হলে এক্ষেত্রে সদস্য দেশসমূহের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করা সহজ হবে না। দেশের বাণিজ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয় দ্রুত এদিকে দৃষ্টি দেবে বলে আশা করি।

প্রকাশিত : ৪ মার্চ ২০১৫

০৪/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: