রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শেখ হাসিনা এখন তিন ফ্রন্টে যুদ্ধরত

প্রকাশিত : ৪ মার্চ ২০১৫
  • আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে রাশিয়ার হাতে হিটলারের জার্মানির পরাজয়ের একটা বড় কারণ হিসেবে বলা হয়, জার্মানির রণনীতি ছিল অফেনসিভ বা আক্রমণাত্মক। অন্যদিকে রাশিয়া বা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের রণনীতি ছিল ডিফেনসিভ বা আত্মরক্ষামূলক। পনেরো শ’ মাইলের ব্যাসার্ধ নিয়ে হিটলার আকস্মিকভাবে রাশিয়া আক্রমণ করেছিল এবং তার ঝটিকা বাহিনী একটার পর একটা রুশ এলাকা দখল করে রাজধানী মস্কোর উপকণ্ঠ পর্যন্ত উপস্থিত হয়েছিল।

তারপরেই যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। লালফৌজের ধৈর্য এবং প্রচন্ড ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেও টিকে থাকার কৌশল তাদের আত্মরক্ষায় সাহায্য যোগায়। অন্যদিকে হিটলারের স্টর্ম ট্রুপার বা ঝটিকা বাহিনী সর্বশক্তি নিয়ে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে দ্রুত উদ্যম ও মনোবল হারায়। সাবেক স্ট্যালিনগ্রাডে লালফৌজের সঙ্গে নাৎসি সেনাদের হাতাহাতি যুদ্ধ পর্যন্ত হয়। কিন্তু অস্ত্রশস্ত্রে বলীয়ান নাৎসি ঝটিকা বাহিনী লালফৌজের ধৈর্য ও প্রতিরোধ শক্তির কাছে হার মানে। স্ট্যালিনগ্রাডের যুদ্ধের পরই শুরু হয় হিটলারের জার্মানির পশ্চাদপসারণ ও পরাজয়ের পালা।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকালেও আমার মনে হয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে রাজনৈতিক রণনীতি অনুসরণের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন রাশিয়া ও জার্মানির অনুসৃত সামরিক নীতির একটা মিল আছে। বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকুক আর ক্ষমতার বাইরে থাকুক, তাদের নীতি সব সময় আক্রমণাত্মক। ঝটিকা আক্রমণ দ্বারা তারা সব সময় আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে তাড়াতে অথবা স্থায়ীভাবে ক্ষমতার বাইরে রাখতে চায়। আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে নির্মূল করতে চায়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নীতি সকল সময় ডিফেনসিভ ও আত্মরক্ষার। এই নীতি অনুসরণ করে তারা ঝটিকা আক্রমণের মুখেও নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে এবং ক্ষমতাতেও রয়েছে।

বিএনপির জন্ম রক্তপাতের মধ্য দিয়ে। তাদের প্রত্যেকটি শাসনামলে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে আওয়ামী সমর্থক বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক হত্যার সংখ্যা অগুনতি। স্বয়ং শেখ হাসিনার জীবনের ওপর হামলা চালানো হয়েছে কমপক্ষে ছ’বার। তার মধ্যে গ্রেনেড হামলার ঘটনা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। এই গ্রেনেড হামলায় বিএনপি নেত্রীর শীর্ষ উপদেষ্টা, এমনকি বড় ছেলে তারেকও ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

পাশাপাশি আওয়ামী লীগ শাসনামলে খালেদা জিয়াকে হত্যার চেষ্টা দূরে থাক তার গায়ে একটি ফুলের টোকাও পড়েনি। তার দলের প্রধান নেতাদের গায়েও হাত পড়েনি। তথাপি বিএনপি ভিকটিম সিনড্রমে ভুগছে। চারদিকে খুন, জখম, সন্ত্রাসের অভিযোগ তুলছে। এমনকি খালেদা জিয়ারও প্রাণনাশের চেষ্টা হচ্ছে বলে মাঝে মাঝেই চিৎকার তোলা হচ্ছে। অথচ তিনি বহাল তবিয়তে আছেন। ট্রাকভর্তি খাবার যাচ্ছে তার অফিসে, যেখানে তিনি অবস্থান করছেন। ওই অফিসে বসেই আন্দোলনের নামে মানুষ পুড়িয়ে মারার অভিযান পরিচালনা করছেন। দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত হয়েও তিনি আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও সেখানে হাজিরা দিচ্ছেন না। অর্থাৎ তিনি দেশের আইন-আদালত সব কিছুর উর্ধে।

এত কিছু করার পরেও বিএনপির অফেনসিভ রণনীতি সফল হচ্ছে না। আওয়ামী লীগ তার ডিফেনসিভ বা আত্মরক্ষামূলক কৌশল নিয়ে এখনও ক্ষমতায় টিকে আছে। খালেদা জিয়া ক্ষমতা ছাড়ার জন্য আওয়ামী লীগকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম বহুবার দিয়েছেন। তা বুমেরাং হয়ে তার ঘাড়েই ফিরে গেছে। তার হরতাল-অবরোধ ডাকা এখন একটা তামাশা। কেউ সে ডাক শোনে না। হরতাল ডাকলে ঢাকা শহরে যানজট আরও বাড়ে। এখন বিএনপি-জামায়াতের পশ্চাদপসারণকালীন একমাত্র রণকৌশল হচ্ছে পোড়ামাটি নীতি। অর্থাৎ পরাজিত হওয়ার আগে জ্বালাও পোড়াও নীতি দ্বারা এবং চোরাগোপ্তা হামলা দ্বারা সাধারণ মানুষের ধনপ্রাণ ধ্বংস করা এবং তাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা। সেই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন নাৎসি সাপোর্টিয়ারদের কৌশল। কিন্তু আখেরে এই কৌশলও সফল হবে কি?

দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত খালেদা জিয়া সমন পেয়েও আদালতে হাজির না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। আমার একটি ধারণা, তিনি গ্রেফতারি পরোয়ানা উপেক্ষা করে মামলার পরবর্তী তারিখেও আদালতে হাজিরা দেবেন না। তিনি সম্ভবত গ্রেফতার হতে চান। ভাবছেন তাহলে জনসমর্থন পাবেন এবং রাজনৈতিক হিরো হয়ে যাবেন। এই কৌশল সফল করার লক্ষ্যেই হয়ত সন্ত্রাস ও বোমাবাজি হঠাৎ বাড়ানো হয়েছে। এমনকি রাজধানী ঢাকা শহরেও। সরকারকে ক্রমশ প্রোভোকেশন দেয়া হচ্ছে কঠোর হওয়ার। কিন্তু সরকার রেসপন্স করছে না। মামুলি ধড়পাকড় ছাড়া বিএনপি নেত্রীকে গ্রেফতার করা হয়নি। সন্ত্রাস দমনেও পুলিশ শক্তি প্রয়োগের মাত্রা বাড়ায়নি। এখন তাহলে বিএনপি নেত্রীর উপায়? ক’দ্দিন তিনি নাৎসি ঝটিকা বাহিনীর মতো উদ্যম ও মনোবল অক্ষুণœœ রাখতে পারবেন? যদি না পারেন, তাহলে তাকে আওয়ামী লীগ সরকারের ধৈর্য ও আত্মরক্ষার কৌশলের কাছে অচিরেই চূড়ান্ত পরাজয় বরণ করে নিতে হবে।

বিএনপি-জামায়াতের পেট্রোলবোমার ঝটিকা হামলার সংখ্যা বাড়ানোর সঙ্গে অভিজিৎ হত্যাকে আমি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখি না। যেমন দেখি না ’৭১ সালে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর বাংলাদেশে গণহত্যা চালানোর সময়ে তাদের দোসর জামায়াতীদের বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনাকে। গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যা একই লক্ষ্যে চালানো হয়েছিল। বছর দুই আগে ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের দ-াদেশ কার্যকর করার দাবিতে ঢাকার শাহবাগ চত্বরে গণজাগরণ মঞ্চের বিশাল অভ্যুত্থান ঘটার সময়েও এই মঞ্চের সমর্থক তরুণ বুদ্ধিজীবী ও ব্লগারদের জামায়াত এবং বিএনপি নেত্রী একযোগে মুরতাদ, নাস্তিক, ইসলামের শত্রু আখ্যা দিয়েছেন এবং ব্লগারদের ধারালো অস্ত্র দ্বারা কুপিয়ে হত্যা করা শুরু হয়েছিল। এবারেও বিএনপি-জামায়াত যখন রাজপথে আগুনে মানুষ মারার (গণহত্যা) অভিযানে রত, তখন মুক্তমনা অভিজিৎ হত্যা কি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা?

যদি বাংলাদেশের পুলিশ তাদের তদন্তে আন্তরিক ও সাহসী হয়, তাহলে তারা বিএনপি-জামায়াতের বর্তমান সন্ত্রাসের সঙ্গে তথাকথিত ইসলামী জঙ্গীদের তৎপরতা বৃদ্ধি এবং অভিজিৎ হত্যার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আবিষ্কার করতে পারবেন। লক্ষ্য করার বিষয়, যেসব বুদ্ধিজীবী ও ব্লগার বিএনপির পক্ষে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ অবস্থান নিয়েছেন, তাদের কারও গায়ে একটি ফুলের টোকাও পড়ছে না। কিন্তু কুপিয়ে নৃশংসভাবে মারা হচ্ছে হুমায়ুন আজাদ থেকে অভিজিৎ রায় পর্যন্ত অসংখ্য মুক্তমনা ও সেক্যুলারিস্ট বুদ্ধিজীবী এবং ব্লগারকে।

আজ হাসিনা সরকারের ভাল-মন্দ, ভুল-ত্রুটি, ধীরে চলার নীতি নিয়ে আমরা যতই সমালোচনা করি, আগামী দিনের ইতিহাস স্বীকার করবে, বাংলাদেশের এক চরম সঙ্কট সন্ধিক্ষণে এই একটি সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা একা রণাঙ্গনে দাঁড়িয়ে (চার্চিলের ভাষায় ধষড়হব রহ ঃযব নবধপয) দেশটির স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্র রক্ষার জন্য যুদ্ধ করেছেন। তিনি না থাকলে বাংলাদেশ বহুদিন আগে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো একটি তালেবান রাজ্য বা কিলিং ফিল্ডে পরিণত হতো। ড. কামাল হোসেনেরা তো এখন বিপদ দেখলে পাসপোর্ট দেখিয়ে প্রকাশ্যেই দেশ ছেড়ে মাঝে মাঝে চলে যান। শেখ হাসিনা প্রাণবাজি রেখে যুদ্ধ না করলে বহু আগে ড. কামাল হোসেনকে ইরানের সুশীল সমাজের নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট বনি সাদরের মতো নারীবেশে গোপনে দেশ ছেড়ে পালাতে হতো।

এই সত্যটি বুঝে অথবা না বুঝে দেশের একটি সুশীল সমাজ যে ভূমিকা গ্রহণ করেছেন তা দেশটিতে বহুত্ববাদী সমাজ ব্যবস্থা ও গণতন্ত্র রক্ষায় সহায়ক নয়। বরং তা পরোক্ষভাবে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস এবং তথাকথিত জঙ্গীদের হাতে মুক্তমনা তরুণ বুদ্ধিজীবী ও ব্লগার হত্যায় সহায়তা যুগিয়েছে। দেশে একদিকে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস তথাকথিত ইসলামী জঙ্গীদের বুদ্ধিজীবী ব্লগার হত্যা, অন্যদিকে ড. কামাল হোসেনের নব্য সখা ও সচিব মাহমুদুর রহমান মান্নার সাম্প্রতিক কার্যকলাপ যোগ করলে কী অর্থ দাঁড়ায়? একটি মাত্র অর্থই কি দাঁড়ায় না যে, বিএনপি-জামায়াত ও জিহাদিস্টরা যখন রাজনৈতিক সন্ত্রাস সৃষ্টিতে রত তখন গণতন্ত্রের নামে ড. কামাল হোসেনদের নেতৃত্বে গঠিত একটি সুশীল অথবা নিরপেক্ষ নাগরিক সমাজ সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চক্রান্তে লিপ্ত? তাদের উদ্দেশ্য কি ক্ষমতা দখলে সামরিক বাহিনীকে উস্কানো এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু ছাত্রের লাশ ফেলে দেয়া? এবং সবই গণতন্ত্রের নামে নিজেদের ক্ষমতা দখলের স্বার্থে?

এক কথায় শেখ হাসিনাকে এখন তিনটি ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। ক্ষমতায় থাকার জন্য নয়, দেশের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যতকে সুরক্ষাদানের জন্য। তাঁকে হারলে চলবে না। কারণ তাঁর জেতার ওপর বাংলাদেশে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যত নির্ভর করছে। তাঁর সরকারের ভুল-ত্রুটির যতই সমালোচনা করি, এ কথা স্বীকার করতে আমার কিছুমাত্র দ্বিধা নেই যে, আজ যদি বর্তমানের ত্রিমুখী হামলায় হাসিনা হারেন তাহলে তা শুধু তাঁর একার বা তাঁর দলের হার হবে না, এই হার হবে স্বাধীনতা সংগ্রামে জয়ী গোটা বাঙালী জাতির।

লন্ডন ৩ মার্চ, মঙ্গলবার ২০১৫

প্রকাশিত : ৪ মার্চ ২০১৫

০৪/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: