মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

তারুণ্যের নির্ভরশীলতা ও উইকিপিডিয়ার দায় সিরাজুল এহসান

প্রকাশিত : ৩ মার্চ ২০১৫

অফিস শেষে সাবের আর মোহিত আড্ডা দিচ্ছিল টিএসসি এলাকায়। এমন সময় এলো সাবেরের মেয়ে দিবার ফোন। কেজি টুতে পড়ে। মেয়ে জানতে চাচ্ছে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশ্ববিখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন কোন্ দেশের অধিবাসী ছিলেন? কিছু একটা উত্তর দিতে গিয়ে থেমে গেল সাবের। বলল, মা-মণি একটু পরে আমি ফোনে তোমাকে জানাচ্ছি। মোহিত বন্ধু বলে ব্যাপারটা ফলো করছিল। সাবের একটু যেন বেকায়দায় পড়ে গেল। প্রশ্নটা আপাত দৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও ওর কাছে এখন কঠিনই লাগছে। একে তো বিজ্ঞান নিয়ে পড়েনি তার ওপর নিজের মেয়ে বলে কথা। সঠিক উত্তর জানাতে না পারলে যেমন প্রেস্টিজের ব্যাপার তেমনি মেয়ের জন্যও ক্ষতিকর। সে যদি ভুল শেখে বা ভুল উত্তর লিখে দেয় স্কুলের খাতায়? বন্ধু মোহিতকে ব্যাপারটা বলার আগে মনে এলো আইনস্টাইনের বাড়ি ইংল্যান্ডে নয় তো? মোহিতকে বলল, আচ্ছা দোস্ত আইনস্টাইন কোন্ দেশের অধিবাসী? মোহিতও পড়ে গেল সমস্যায়। মনে করতে পারছে না। অনেকটা কনফিউজিং কাজ করছে তার মধ্যে। দুর্বল ও প্রত্যয়হীন অস্ফুট স্বরে বলল, পোল্যান্ডে না? সাবের ঝেড়ে ফেলে বলল, ধ্যাৎ, কীযে বলিস না! পোল্যান্ড হতে যাবে কেন, আমার তো মনে হয় ইংল্যান্ডে। মোহিত বলল, আচ্ছা হাতের কাছে জানার উপায় থাকতে এত সময় নষ্ট করা কেন? বলে ল্যাপটপটায় মডেম লাগিয়ে দ্রুত ঢুকে গেল উইকিপিডিয়ায়। সার্চ দিতেই যা পেল দু’জনেই কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে হেসে উঠল। কারোটাই ঠিক নয়। মোহিত বলল, তাড়াতাড়ি মা-মণিকে জানিয়ে দে আলবার্ট আইনস্টাইন জন্মেছিলেন জার্মানিতে।

পর্যবেক্ষণ-২

শাহানা সুলতানা নাটক নিয়ে লেখালেখি করেন। বিষয়টি তার খুব প্রিয়। তরুণ এ লেখকের নাটক, নাট্যতত্ত্ব, নাট্যকার, নাটকের গতি-প্রকৃতি নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধোত্তর নাটকের বাস্তবতা নিয়ে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে একটা তথ্যের জন্য প্রয়োজন হলো উইকিপিডিয়ার সহযোগিতা। আবদুল্লাহ আল-মামুনকে ছাড়া তার গবেষণাপত্র যেন থেকে যাবে অসম্পূর্ণ। বরেণ্য এই নাট্যকার, অভিনেতা, নির্দেশক-চলচ্চিত্রকার সম্পর্কে তথ্য জানতে বাংলাপিডিয়ায় গিয়ে অনেকটা অবাকই হলেন শাহানা। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিনের শেষ বিকেলে বাংলাপিডিয়ায় গিয়ে তিনি যা পেলেন তা উদ্ধৃত করা হলো- ‘উইকিপিডিয়ায় স্বাগতম! এটি একটি উন্মুক্ত বিশ্বকোষ, যা সবাই সম্পাদনা করতে পারে।’ আবদুল্লাহ আল-মামুনের পেজে গিয়ে তিনি যা পেলেন তা হুবহু এরকম- ‘এই নিবন্ধটিতে কোনো উৎস বা তথ্যসূত্র উদ্ধৃত করা হয়নি। দয়া করে উপযুক্ত তথ্যসূত্র থেকে উৎস প্রদান করে এই নিবন্ধটির মানোন্নয়নে সাহায্য করুন। (সাহায্যের জন্য দেখুন : যাচাইযোগ্যতা) নিবন্ধের যেসব অংশে সঠিক তথ্যসূত্রের উল্লেখ নেই সেগুলি যেকোনো মুহ্নর্তে সরিয়ে ফেলা হতে পারে। (মার্চ ২০১০)’

আবদুল্লাহ আল-মামুন সম্পর্কে নিবন্ধটি শুরু হয় এভাবেÑ ‘আব্দুল্লাহ আল মামুন ১৯৪২ সালের ১৩ই জুলাই জামালপুরে জন্ম আমড়া পাড়ায় গ্রহণ করেন। তার পিতার অধ্যক্ষ আব্দুল কুদ্দুস এবং মাতা ফাতেমা খাতুন।... শহীদুল্লাহ কায়সারের আকর উপন্যাস সংশপ্তক নিয়ে ধারাবাহিক নাটকের পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবে তিনি পান প্রবাদপ্রতিম খ্যাতি।’ এ পর্যন্ত দেখে শাহানা একটু আশ্চর্য হলেন। নাট্যকারের মাত্র ১০টি নাটকের নামোল্লেখ আছে অথচ আবদুল্লাহ আল-মামুন তিরিশের অধিক নাটক রচনা করেছেন।

উপরোক্ত শব্দগুলো দেখলে বোঝা যায় তাতে তথ্য ও যতেœর যথেষ্ট অভাব রয়েছে। ‘সেগুলি’ শব্দ ব্যবহৃত হয় সাধু রীতিতে। হওয়া উচিত ছিল ‘সেগুলো’। মুহূর্তে বানান লেখা হয়েছে ‘মুহ্নর্তে’। ব্রাকেটবন্দী ইটালিক ফন্টে লেখা মার্চ ২০১০-এর পরে আর নিবন্ধটিকে উন্নীত করা হয়নি। নাট্যকারের নামের প্রথম অংশটির বানান হবে ‘আবদুল্লাহ’। ‘ব’-এর সঙ্গে ‘দ’ সংযুক্ত হবে না। ১৩ সংখ্যার পর ‘ই’ বর্ণটি প্রযোজ্য নয়। জন্ম শব্দটির পর গ্রহণ শব্দটি নেই; আছে বাক্যের শেষদিকে। এতে বাক্য গঠনে হয়েছে হ-য-ব-র-ল। সবচেয়ে বড় তথ্যগত ভুল নাট্যকারের জন্মস্থানের নামে। হবে ‘আমলাপাড়া’ হয়েছে আমড়া পাড়া, তাও মাঝে রয়েছে স্পেস। ‘পিতার’ শব্দটির সঙ্গে ‘র’ বর্ণটির প্রয়োজন নেই। পিতার নামের বানানের প্রথম অংশটি ‘আব্দুল’ শব্দটিতে ‘ব’-এর সঙ্গে ‘দ’ সংযুক্ত হবে না। পরের লাইনে ‘আকর’ শব্দ দিয়ে কী বোঝানো হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। এমন বাস্তবতা দেখে শাহানা অনেকটা হতাশই হলেন। একজন দেশবরেণ্য একুশে পদকপ্রাপ্ত নাট্যকারের তথ্য ও নিবন্ধ নিয়ে বাংলাপিডিয়ার এমন অযতœ আর অবহেলা তাঁকে পীড়া দেয়।

উইকিপিডিয়ার বাংলাপিডিয়ায় ‘উন্মুক্ত’ বা ‘সবাই সম্পাদনা করতে পারে’ এবং ‘তথ্যসূত্র উল্লেখ করা হয়নি’ এমন বাস্তবতায় নির্ভরশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বৈকি। এখানে পর্যাপ্ত স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে অদক্ষ, অযোগ্য বা হীন উদ্দেশ্যপূর্ণ ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অসদুদ্দেশ্য চরিতার্থ করার সুযোগ নিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে- এ দেশে একটি মহল ১৯৭৫ সালের পর রক্তের বিনিময়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। তারা স্বাধীনতার ঘোষক ও ঘোষণা নিয়ে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করে তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত ও ভুল ইতিহাস শেখানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান ও ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করার হীনচেষ্টায় আদাজল খেয়ে নেমেছে। তারা যদি এই ‘স্বাধীনতা’র সুযোগ নিয়ে বাংলাপিডিয়ায় হামলে পড়ে তখন এ সেবার মাধ্যমটি হয়ে পড়তে পারে বিতর্কিত। তাদের মহৎ উদ্দেশ্যটি হতে পারে বাধাগ্রস্ত। এই সেবার মাধ্যমটি যেহেতু ব্যবহার করেন বেশিরভাগই তরুণ প্রজন্ম সেহেতু একটি প্রজন্ম নয়, পর পর কয়েকটি প্রজন্ম বিভ্রান্ত হতে পারে।

এ তো গেল সমস্যার কথা। উইকিপিডিয়ায় বাংলার সংযোজন নিয়ে আনন্দের সংবাদও আছে; আছে গর্ব করার মতো বিষয়াদি। তার আগে একটু জেনে নেয়া যাক উইকিপিডিয়া সম্পর্কে কিছু তথ্য। এনসাইক্লোপিডিয়া অর্থ বিশ্বকোষ। উইকি দিয়ে বোঝানো হয় কয়েকজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। ২০০১ সালে সম্পূর্ণ অবাণিজ্যিকভাবে সেবার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় উইকিপিডিয়া। এবারই ১৪ বছরে পদার্পণ করল। উইকিপিডিয়ায় রয়েছে ২৮৭টি ভাষা। এর সঙ্গে জড়িত আছেন এক শ’ জন পূর্ণ সম্পাদক ও চার হাজারেরও বেশি প্রদায়ক। ১১০ নোবেলজয়ী ও পাঁচজন মার্কিন রাষ্ট্রপতির রচনায় সমৃদ্ধ এই সেবা মাধ্যম। এটি প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পর সংযুক্ত হয় বাংলা সংস্করণ। সে হিসাবে বাংলাপিডিয়াও পার করল এক দশক চলতি বছরে। এটি বিশ্বব্যাপী উন্মুক্ত। এতে সংযুক্ত আছে ৩৪ হাজারেরও বেশি বাংলা কনটেন্ট। ভাবতেই আনন্দ লাগে- ব্যবহৃত ভাষার মধ্যে বাংলার অবস্থান এখন তৃতীয়।

উইকিপিডিয়ার অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও উইকিমিডিয়ার চেয়ারম্যান জিমি ওয়েলস গত সপ্তাহে ঢাকা সফর করে গেলেন। এ সফর ছিল তার বাংলাপিডিয়ার ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে। এক বেলার সফরে তিনি বাংলাপিডিয়ার জন্য একটি দক্ষ, যোগ্য ও সৎ টিম তৈরির যে আশ্বাস দিয়ে গেছেন তার বাস্তবায়ন দেখতে চায় তরুণ প্রজন্ম। তাদের আশা নির্ভুল, সঠিক বানান, অধিকতর গ্রহণযোগ্য তথ্য, ইতিহাস উইকিপিডিয়াসহ বাংলাপিডিয়ায় বিধৃত হোক। সবার নির্ভরশীলতার সর্বোচ্চ জায়গা হোক এ সেবা মাধ্যমটি।

প্রকাশিত : ৩ মার্চ ২০১৫

০৩/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: