কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

একটি প্রয়োজনীয় কথোপকথন

প্রকাশিত : ৩ মার্চ ২০১৫
  • স্বাস্থ্য সংবাদ

ড.লিসা একারলি, প্রফেসরিয়াল ফেলো, আরএসপিএইচ, ভিজিটিং প্রফেসর, ইউনিভার্সিটি অব সালফোর্ড, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, হাইজিন অডিট সিস্টেমস লি.

১। আমাদের আরএসপিএইচ এবং বিশ্বব্যাপী এর কাজ সম্পর্কে একটু বলুন?

রয়্যাল সোসাইটি ফর পাবলিক হেলথ একটি স্বাধীন, মাল্টি ডিসিপ্লিনারী চ্যারিটি সংস্থা যা সম্মিলিতভাবে জনকল্যাণ ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ও সুরক্ষার জন্য উৎসর্গীকৃত। স্বাস্থ্যকর্মী, চ্যারিটিস, কমিউনিটি গ্রুপ, সরকারী স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং স্থানীয় ও জাতীয় সরকারী সংস্থা এসব স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে আমাদের ব্যাপ্তি বিশ্বব্যাপী এবং আমাদের অনেক আন্তর্জাতিক সদস্যও রয়েছে।

২। ঢাকায় অনুষ্ঠিত ডঙঘঈঅ কনফারেন্সে জঝচঐ কি নিয়ে এসেছে?

লাইফবয়ের ‘হেল্প এ চাইল্ড রিচ ফাইভ’ হচ্ছে প্রথম ক্যাম্পেইন যা আরএসপিএইচের মাধ্যমে প্রচলন করা হয়েছে এবং যেহেতু বাংলাদেশে লাইফবয়ের অনেক সফল প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, সেহেতু এই ক্যাম্পেইনের মান এবং অবশ্যই হাত-ধোয়ার মান সম্পর্কে কথা বলার জন্য এই কনফারেন্স ভালো একটি ক্ষেত্র।

৩। জীবাণু প্রতিরোধ এবং সাবান দিয়ে হাত ধোয়া সম্পর্কে কি একটু ভেঙ্গে বলবেন?

বিশ্বের মোট মৃত্যুর ৪ শতাংশ মৃত্যুর কারণ হচ্ছে ডায়রিয়া এবং পৃথিবীব্যাপী ডায়রিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৪বিলিয়ন। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে ৩ থেকে ৫ মিলিয়ন ব্যক্তি শ্বাসনালীতে জীবাণুর সংক্রমণে আক্রান্ত, যা কিনা ২৫০০০০-৫০০০০০ ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ। আমরা এও জানি, পুরো পৃথিবীজুড়ে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার মতো প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ১.৭মিলিয়ন শিশু ৫ বছরে পৌঁছার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ‘নিয়মিত সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়া অস্বাস্থ্য প্রতিরোধে এবং জীবন বাঁচানোর একটি অন্যতম সহজ, সাশ্রয়ী এবং কার্যকরী উপায় (২০১৩)।’

আমি খুবই আশাবাদী যে প্রত্যেকেই তাদের হাত নিয়মিত এবং অবশ্যই সঠিক সময়ে ধৌত করবে- ইউনিলিভার স্কুল অব ৫ যেখানে বাচ্চাদের সকালের খাবারের আগে, দুপুরের খাবারের আগে, রাতের খাবারের আগে, টয়লেটের পরে এবং ঘুমোতে যাবার আগে হাত ধোয়ার ব্যাপারে শেখানো হয়। এটা খুবই ভালো সূচনা এবং মনে রাখা খুবই সহজ। বাচ্চাদের অল্প অল্প করে হাইজিন সম্পর্কিত বার্তা দেয়া যেটার সুফল আমরা পরবর্তীতে ভোগ করব যখন এই বাচ্চারা বড় হবে এবং তাদের বাচ্চাদের এ সম্পর্কে শিক্ষা দিবে। তাছাড়া এই প্রকল্পটি শিশুদেরকে তাদের বাবা মা এবং পরিবারের সকল সদস্যদেরও শিখানোর ব্যাপারে উৎসাহিত করে তদুপরি এভাবে পুরো কমিউনিটিতে বিষয়টি ছড়িয়ে যায়।

৪। আরএসপিএইচ লাইফবয়-এর হেল্প এ চাইল্ড রিচ ৫ ক্যাম্পেইনকে সমর্থন জানিয়েছে। আপনি কি আমাদের এ সমর্থনের ব্যাপারে সংক্ষেপে বলবেন?

জনস্বাস্থ্য এবং জনকল্যাণে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে আরএসপিএইচ সে সব ধরনের ক্যাম্পেইন সমর্থন করে যেগুলো যথাযথ অভ্যাস পরিবর্তনের ওপর প্রভাব বিস্তার করার লক্ষ্যে হাইজিন বিষয়ক শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যবিধির উন্নতিতে কঠোর প্রচারণা চালায়।

আরএসপিএইচ লাইফবয়-এর বিভিন্ন ধরনের সাবান, বডি ওয়াশ ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ফর্মুলা পর্যালোচনা করছিল, তারা বিজ্ঞাপনে যেসব জিনিস দাবি করে এবং এডুকেশনাল হ্যান্ড হাইজিন ক্যাম্পেইনের সফলতার মাপকাঠির যথার্থতা পরীক্ষা করে দেখেছিল। তারা অভ্যাস পরিবর্তন প্রোগ্রামকে ঘিরে চালানো গবেষণার ফলাফল ও পর্যালোচনা করেছিল এবং সে সমস্ত প্রমাণাদির ওপরও লক্ষ্য রেখেছিল যেগুলোর ওপর ভিত্তি করে লাইফবয় তাদের আউটরিচ এডুকেশনাল ওয়ার্কের ফরম্যাট ডিজাইন করেছিল। এ সমস্ত বিষয় যাচাই বাছাই করার পর লাইফবয় ‘হেল্প এ চাইল্ড রিচ ৫ ক্যাম্পেইন’কে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

লাইফবয়কে এ ধরনের স্বীকৃতির অনুমোদন শুধু একটি পণ্য হিসেবে দেয়া হয়নি, এটা লাইফবয়ের হাইজিন বিষয়ক শিক্ষা প্রদানের চেষ্টা এবং রোগজীবাণু প্রতিরোধের মাধ্যম হিসেবে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাসের প্রচেষ্টারও স্বীকৃতি।

৫। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের বাচ্চাদের মধ্যে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস সৃষ্টির ব্যাপারে আপনার অভিজ্ঞতা কি?

গত বছর আমি একটি ছোট প্রোগ্রাম সম্পন্ন করেছিলাম যখন আমি জাম্বিয়াতে একটি এতিমখানা/স্কুলে পরিদর্শনে গিয়েছিলাম যেটাকে আমি সহায়তা করি। আমার টিনেজ কন্যা রোজকে নিয়ে আমরা ৪৪৬ জন শিশু, তাদের শিক্ষক, রন্ধনকর্মী (খুবই গুরুত্বপূর্ণ) এমনকি প্রশাসকদের হাত ধোয়ার প্রশিক্ষণ দিয়েছিলাম।

ইউনিলিভার খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে প্রতিটি শিশুকে একটি করে এবং শিক্ষক ও ক্যাটারারদের যথেষ্ট পরিমাণ লাইফবয় সাবানের বার সরবরাহ করেছিল। তারা তাদের উপকরণ এবং প্রশিক্ষণ প্যাকও ভাগ করে নিয়েছিল,

সুতরাং আমরা ইউনিলিভার স্কুল অব ৫ এর বাস্তব অভিজ্ঞতার স্বাদ পেয়েছিলাম। যদিও আমরা তাদের প্রাথমিক উদ্যোগকে অনুসরণ করার জন্য খুব বেশিদিন সেখানে অবস্থান করিনি, আমরা উপকরণগুলোকে শিক্ষকদের হাতে দিয়ে দিয়েছিলাম যাতে তারা এই বার্তা প্রবাহটাকে চালু রাখে। আমরা সব ওয়াশ বেসিনে লিক্যুইড সোপ ডিস্পেন্সার স্থাপনও করেছিলাম (ইতোপূর্বে তাদের ওখানে কোনো সাবান ছিল না ) এবং আমরা সব জায়গায় ‘এখন আপনার হাত ধুয়ে ফেলুন’ নোটিশ টাঙ্গিয়ে দিয়েছিলাম। মেটালওয়ার্কে দক্ষ শিক্ষার্থীরা ডিস্পেন্সারদের জন্য খাঁচা বানিয়েছিল যেন তারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আমরা সাবান এবং রান্নাঘর পরিষ্কারক পণ্যের জন্য তহবিল গড়ে তুলেছিলাম, যা ছিল সম্পূর্ণ সরকারী বিধিনিষেধ মুক্ত, যাতে ডিস্পেন্সারগুলো পরিপূর্ণ থাকে এবং বাচ্চারা যেন সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যাপারে কোন গড়িমসি না করে।

বাচ্চারা ‘স্কুল অফ ৫’ এই ধারণাটি খুবই পছন্দ করেছিল এবং হাত ধোয়ার ৫টি মুখ্য সময়ের সম্পর্কে তারা খুব দ্রুত শিখে গিয়েছিল। উপকরণ এবং ধারণার ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটা আমার জন্য এক চরম পাওয়া। আর একটি বিষয়, এক ধরনের স্পেশাল পাউডার এবং আল্ট্রা ভায়োলেট টর্চ ব্যবহার করে আমি প্রদর্শন করে দেখিয়েছি কিভাবে অদৃশ্য জীবাণুরা এক জনের থেকে আরেক জনের মধ্যে এবং ক্ষেত্রে স্থানান্তর হতে পারে।

৬। যেহেতু আপনি এখানে ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান কনফারেন্সের জন্য এসেছেন, তো বাংলাদেশে একটি স্বাস্থ্যকর পরিবার/সমাজ গড়ে তোলার ব্যাপারে আপনার কোন পরামর্শ?

যেহেতু মানুষ খালি চোখে মাইক্রো অর্গানিজমস অথবা জীবাণুদের দেখতে পায় না, সেহেতু এ ব্যাপারে আলোচনা করা মাঝে মাঝে খুব কঠিন যে কিভাবে জীবাণুরা ইনফেকশনের কারণ হতে পারে এবং আমাদের হাত থেকে জীবাণুদের মুছে ফেলা কিভাবে গুরুত্ব বহন করে, সুতরাং মিডিয়া ক্যাম্পেইনে গ্লো ইন দ্য ডার্ক পাউডার ব্যবহার করে ‘জীবাণুদের জীবনযাত্রা’ চাক্ষুস প্রদর্শনের ক্ষেত্রে খুবই কার্যকর হতে পারে। আমি বিভিন্ন টিভি অনুষ্ঠানে দেখেছি যে, একটি সুন্দর পরিষ্কার হাতে কি পরিমাণ জীবাণু থাকতে পারে তা আল্ট্রা-ভায়োলটে-রশ্মি ব্যবহার করার মাধ্যমে তুলে ধরে। এ ধরনের অনুষ্ঠান মানুষকে আকৃষ্ট করে এবং মনোযোগী হতে সাহায্য করে।

ডক্টররা তাদের ওয়েটিং রুমে সহজপাঠ্য পোস্টার প্রদর্শন করতে চাইতে পারে। যদি সার্জারি রুমে কোন টয়লেট থাকে অথবা এমন কোন জায়গা যেখানে জনসাধারণ স্বাস্থ্যসেবার জন্য যায়, সেখানে পিছনের দরজা হাত ধোয়ার বার্তা দেবার জন্য চমৎকার জায়গা। আমি পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় এরকম বেশ ভালো কিছু উদাহরণ দেখতে পেয়েছি।

সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার বার্তা ছড়িয়ে দেয়াটা এমন কিছু যেখানে কমিউনিটির সবাই যারাই স্বাস্থ্য সেবার সঙ্গে জড়িত তারাই যেকোন সুযোগেই যেন সহজে কথোপকথন করতে পারে- আমি অবশ্যই হাত ধুই।

উদাহরণস্বরূপ, যদি আমি খাদ্য তৈরির কথা বলি আমি উল্লেখ করব তোমাকে যে শুধু খাবার তৈরির পূর্বেই হাত ধুতে হবে তা নয় বরং কাচা মাংস, হাঁস মুরগির কিংবা সবজি সবকিছু প্রস্তুত করার পর সবসময়ই হাত ধুতে হবে। এসব খাবার ধুয়ে পরিষ্কার করার পর এটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ যে খাবারের পাত্রগুলো যাতে খুবই গরম পানি অথবা জীবাণুনাশক ব্যবহার করে জীবাণুমুক্ত করা হয় এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া। এ বার্তা ছড়িয়ে দেয়ার ব্যাপারে টিভি শেফদের সাহায্য নেয়া যেতে পারে।

৭। স্কুলগুলো কি করতে পারে?

স্কুলের বাচ্চাদের হাত ধোয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করা উচিত যখনই তারা স্কুলে যাওয়া শুরু করবে তখন থেকেই- আমার দাদি/নানি আমাকে বলেছিলেন উনার শৈশবে উনারা দিন শুরু করার পূর্বেই শিক্ষকদের দ্বারা হাত চেক করিয়ে নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে যেতেন।

জাম্বিয়ার স্কুলটিতেও বাচ্চাদের খাবারের রুমে প্রবেশের পূর্বে শিক্ষকের সামনে হাত ধোয়ার জন্য লাইনে দাঁড়াতে হতো। এটি সত্যিই দারুণ আইডিয়া। বাচ্চারা যখন খেলার মাঠ থেকে ফেরত আসত তখন আমিও সাবান দিয়ে ধোয়া হাত দেখতে চাইতাম- তাদের হাত খুবই নোংরা থাকত। যখন তারা খেলত যেটা স্বাভাবিক কিন্তু পড়তে বসার আগে জীবাণুমুক্ত হয়ে বসাই উত্তম।

আপনার জীবন আপনারই হাতেÑ স্মরণ রাখার মতো দারুণ এক নীতিবাক্য এটি।

প্রকাশিত : ৩ মার্চ ২০১৫

০৩/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: