আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ঢাকায় ১৬ গরিবের হাসপাতালে দামী ওষুধও মেলে

প্রকাশিত : ৩ মার্চ ২০১৫
  • দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্রে তিন বছরে রোগী বেড়েছে দ্বিগুণ

আনোয়ার রোজেন ॥ সেবার মান ও ওষুধের সরবরাহ বাড়ায় রাজধানীর সরকারী বহির্বিভাগ চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে (আউটডোর ডিসপেনসারি) বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। গত ৩ বছরে এসব ডিসপেনসারিতে সেবা নেয়া রোগীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এ সময়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার ১৬ ডিসপেনসারি থেকে ৬ লাখ ৫৭ হাজার রোগীর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা মূল্যের ওষুধ বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে । একই সময়ে ওষুধের জন্য প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করেছে সরকার। সর্বনিম্ন ২ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা মূল্যের ওষুধও এসব ডিসপেনসারি থেকে রোগীদের বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়। সাধারণ রোগের চিকিৎসা ও ওষুধ, গর্ভবতী মায়েদের সেবা, পরিবার পরিকল্পনা সেবা, পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বাস্থ্য ও পুষ্টি শিক্ষাও ডিসপেনসারিগুলোতে নিয়মিত দেয়া হয়। রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ডিসপেনসারিগুলো ঘুরে এসব তথ্যচিত্র পাওয়া গেছে।

২০১২ সালে এসব ডিসপেনসারি থেকে মোট সেবা নিয়েছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭০০ রোগী। ২০১৩ সালে রোগীর এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৫২ হাজার ৯৫২ জনে। সর্বশেষ ২০১৪ সালে সেবা নিয়েছেন ২ লাখ ৬৬ হাজার ৩২ রোগী। যথাযথভাবে ব্যবহার হওয়ায় এসময়ে সরকার ডিসপেনসারির ওষুধের জন্য বরাদ্দের পরিমাণও বাড়িয়েছে। ২০১১-’১২ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৭৭ লাখ টাকা। এর পরের অর্থবছর থেকে বরাদ্দ বাড়িয়ে দেড় কোটি টাকা করা হয়। ওষুধের সরবরাহ বাড়ায় মূলত তখন থেকেই ডিসপেনসারিতে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

মূলত গরিব ও দুস্থ মানুষের মাঝে বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধ বিতরণের জন্য এসব ডিসপেনসারি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখানে রোগী ভর্তির সুযোগ নেই। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওষুধের গুণগত মান এবং কার্যকারিতা ও চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতির কারণে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে অসচ্ছলদের পাশাপাশি সচ্ছল রোগীরাও এসব ডিসপেনসারিতে ভিড়ছেন।

সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর ১৬ ডিসপেনসারির মধ্যে তুলনামূলক ঘনবসতিপূর্ণ ও অনগ্রসর এলাকা হাজারীবাগ, রায়েরবাজার, ঝিগাতলা, মিরপুর পুরাতন কলোনি, মিরপুর গোলচক্কর, মিরপুর বাউনিয়া বাঁধ, খিলগাঁও, গে-ারিয়া ও পুরান ঢাকার ডিসপেনসারিতে রোগীর ভিড় বেশি। প্রতিদিন গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ রোগী এসব ডিসপেনসারিতে সেবা নিতে আসেন। শুক্রবার বাদে প্রতিদিন সকাল সাড়ে আটটা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ দেয়া হয়। মতিঝিলে সরকারী কলোনির ভেতর অবস্থিত ডিসপেনসারিতে সাধারণ রোগীর সংখ্যা কম হলেও গর্ভবতী মায়েদের ভিড় বেশি। প্রসূতির জন্য এখানে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। গ্রীনরোড ডিসপেনসারিতে প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ৮০ রোগী সেবা নিতে আসেন। এখানে রোগীদের জন্য রয়েছে নেবুলাইজার সুবিধা। তবে সেগুনবাগিচার এজিবি আউটডোর ডিসপেনসারি, মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদফতর ডিসপেনসারি, পরিকল্পনা কমিশন এলাকার ডিসপেনসারি, তেজগাঁওয়ের বিজি প্রেস ডিসপেনসারি ও শেরে বাংলা নগর আউটডোর ডিসপেনসারিতে রোগীর সংখ্যা কম। প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ রোগী এসব ডিসপেনসারিতে সেবা নিতে আসেন। ২০১৪ সালে এসব ডিসপেনসারি থেকে সেবা নিয়েছেন যথাক্রমে ৭ হাজার ৮২৫, ৭ হাজার ৬৫৫, ১২ হাজার ৫৫৩, ১৩ হাজার ৫৭ এবং ১৪ হাজার ৫৯৩ রোগী। তবে এসব ডিসপেনসারিতে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আশপাশে আরও কয়েকটি সরকারী সেবা প্রতিষ্ঠান থাকায় এসব ডিসপেনসারিতে রোগীর ভিড় তুলনামূলক কম।

প্রায় প্রতিটি ডিসপেনসারিতে ৩ চিকিৎসক, একজন ফার্মাসিস্ট, একজন মিডওয়াইফসহ কমপক্ষে ১০ জনের লোকবল রয়েছে। তবে চিকিৎসকের সব পদ পূর্ণ থাকার পরেও ভিআইপি ডিউটি, এসএসসি পরীক্ষার ডিউটি এবং প্রেষণে অন্যত্র থাকাসহ নানা কারণে প্রতিটি কেন্দ্রে ১ জনের বেশি চিকিৎসকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

এসব ডিসপেনসারিতে আসা রোগীদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। গরিব ও দুস্থ মানুষের জন্য হলেও অনেক নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত রোগীরাও এখানে সেবা ও ওষুধ নিতে আসেন। মিরপুরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ফৌজিয়া খাতুন। জ্বরে আক্রান্ত আড়াই বছরের শিশুসন্তান অর্ণবের জন্য মঙ্গলবার সিরাপ নিতে এসেছেন মিরপুর মাজার রোডের ডিসপেনসারিতে। ফৌজিয়া বলেন, বাইরের ফার্মেসি থেকে সিরাপ কিনে খাওয়ালে তেমন কাজ হয় না। কিন্তু ডিসপেনসারির সিরাপ খাওয়ালে বাচ্চা দ্রুতই সুস্থ হয়ে যায়। তাই বাচ্চার অসুখ হলে বা টিকা দেয়ার প্রয়োজন হলে এখানেই নিতে আসি। ডিসপেনসারির চিকিৎসক ও ফার্মাসিস্টরা জানিয়েছেন, সরকারী ওষুধের সর্বোচ্চ গুণগত মান কঠোরভাবে নিশ্চিত করা হয়। তাছাড়া সিভিল সার্জন অফিস থেকে চাহিদা অনুযায়ী প্রতি তিনমাস অন্তর ওষুধ সরবরাহ করা হয় বলে ওষুধের কার্যকারিতা বজায় থাকে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ আবদুল মালেক মৃধা জনকণ্ঠকে বলেন, এসব ডিসপেনসারিতে সরবরাহের জন্য মোট ওষুধের ৭০ ভাগ সরকারী ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন ড্রাগ কোম্পানি (ইডিসিএল) থেকে কেনা হয়। ফলে ওষুধের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ থাকে না। তাছাড়া বিতরণ প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে তত্ত্বাবধান করা হয় বলে ওষুধ সংক্রান্ত কোন দুর্নীতির সুযোগ নেই।

এসব ডিসপেনসারি ঘুরে দেখা গেছে, এন্টাসিড, প্যারাসিটামল, হিস্টাসিন ও গ্যাস্ট্রিকের বিভিন্ন ক্যাটাগরির ওষুধের পাশাপাশি অনেক দামী ওষুধও রোগীদের মাঝে বিতরণ করা হয়। যেমন- ক্যাপসুল শ্রেণীর সেফিক্সিম (২০০মিলিগ্রাম), সেফ্রাডিন (২০০ মিলিগ্রাম), ফ্লু-ক্লত্রাসিলিন (৫০০ মিলিগ্রাম), ট্যাবলেট শ্রেণীর সিপ্রোফ্লক্সাসিন (৫০০ মিলিগ্রিাম), এ্যাজিথ্রোমাইসিন (৫০০ মিলিগ্রাম), সাসপেনসন প্যারাসিটামলের পাশাপাশি এ্যামোক্সিসিলিন (১০০ মিলিগ্রাম) সিরাপও পাওয়া যায়। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিভেদে এসব ওষুধের প্রতিটির বাজার মূল্য ১৫ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। তবে প্রতিটি ডিসপেনসারিতে আসা রোগীদের অভিযোগ, সব সময় চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ পাওয়া যায় না। বাইরে থেকে কিনতে হয়। অভিযোগ প্রসঙ্গে সিভিল সার্জন ডাঃ আবদুল মালেক মৃধা বলেন, ওষুধের মজুদ থাকলে রোগীদের মাঝে বিতরণ না করার সুযোগ নেই। তবে চাহিদা বেশি থাকায় কোন কোন ডিসপেনসারিতে অনেক সময় নির্ধারিত সময়ের আগেই ওষুধ শেষ হয়ে যায়। ফলে সাময়িক ওষুধ সরবরাহে ছেদ ঘটতে পারে। তাছাড়া সর্বরোগের ওষুধই ডিসপেনসারিতে পাওয়া যাবে- এ ধারণাও সঠিক নয়।

প্রকাশিত : ৩ মার্চ ২০১৫

০৩/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: