কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সময়টা কাটুক ভাল

প্রকাশিত : ২ মার্চ ২০১৫
  • খাদীজা আক্তার

মফস্বলের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহকর্তা মোঃ হাফিজ উদ্দিন। শিক্ষকতা ছিল তার পেশা। অদম্য নিষ্ঠা আর সততার বলে চার সন্তানই আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ভাল যাচ্ছে না তার দিনগুলো। ব্যস্ততাহীন জীবন তাকে এনে দিয়েছে শারীরিক ও মানসিক নানা জটিলতা। আবেগাপ্লুত হয়ে প্রায়ই কান্নাকাটি করা, মনে রাখতে না পারা, অল্পতে রেগে যাওয়া, ঘুমের মধ্যে ভয় পেয়ে চিৎকার করা, আর সেই সঙ্গে ডায়াবেটিস, প্রেসার তো আছেই, অক্টোপাসের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে তাঁকে। স্ট্রোক হয়েছে দু’বার। ইন্দ্রিয়গুলোও নিস্তেজ হচ্ছে দ্রুত। আর এসবই হয়েছে ৫৯-৬৯ বছরের মধ্যে। সন্তানরা সরকারী-বেসরকারী চাকরিতে বিভিন্ন জায়গায় কর্মরত। পিতামাতার প্রাপ্য ন্যায্য সময়টুকু দিতে পারে না তারা কখনই। এ অবস্থায় সত্তরে এসে হাফিজ উদ্দিন যেন আজ অনেক কিছু বুঝতে না পারা ছোট্ট শিশুর মতো হয়ে গেছেন।

এদেশে এ চিত্রটি কোন অসাধারণ ঘটনা নয়। প্রবীণ বয়সের এক বাস্তবতা। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় সোয়া এক কোটি সিনিয়র সিটিজেন বা বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক রয়েছেন। ২০২৫ সাল নাগাদ এই সংখ্যা প্রায় পৌনে দুই কোটি এবং ২০৫০ সাল নাগাদ প্রায় চার কোটিতে গিয়ে ঠেকবে। ২০৫০ সালের মধ্যে সিনিয়র সিটিজেনদের সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশে উন্নীত হবে এবং এই সংখ্যা শিশুদের মোট সংখ্যার চেয়েও বেশি হবে বলে জনসংখ্যাবিদরা অনুমান করছেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের বদৌলতে চিকিৎসা শাস্ত্রের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। ফলে যেমন হ্রাস পেয়েছে শিশুমৃত্যু হার, তেমনি গড় আয়ুও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বয়োজ্যেষ্ঠদের রোগব্যাধি কমেছে বিশ্বব্যাপী। আমাদের দেশও তার বাইরে নয়। যার প্রমাণ, ১৯৮৬ সালে এ দেশে গড় আয়ু ছিল ৫৮ দশমিক ৮ আর ২০১১ সালে তা ৬৯ বছরে পৌঁছেছে। বর্তমানে গড় আয়ু ৭০ দশমিক ৬।

প্রবীণদের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাদের জন্য সেবা ও প্রাণচঞ্চল সিনিয়র সিটিজেনদের শক্তি, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, প্রজ্ঞাকে কাজে লাগানোর জন্য সামাজিক ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি। তাছাড়া জনবহুল বাংলাদেশে যেখানে সম্পদ আর চাহিদার মধ্যে অসমতা ব্যাপক সেখানে সিনিয়র সিটিজেনদের সংখ্যা বৃদ্ধি সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ। আর এ চ্যালেঞ্জকে সফলতার সঙ্গেই মোকাবেলা করতে চায় এ জাতি। ইতোমধ্যে সরকারী পর্যায়ে প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু হয়েছে। ১৭ নবেম্বর ২০১৩ মন্ত্রিসভা প্রবীণ বিষয়ক জাতীয় নীতিমালা অনুমোদন করেছে। প্রবীণদের দারিদ্র্যমুক্ত, কর্মময়, সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ সামাজিক জীবন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ প্রণীত হয়েছে নীতিমালা। এতে প্রবীণ ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে জ্যেষ্ঠ নাগরিক (ংবহরড়ৎ পরঃরুবহ)-হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া প্রবীণদের জ্ঞান ও মেধাকে প্রজন্মান্তরে বহমান করার জন্য পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, প্রবীণ ব্যক্তির দেশের চলমান সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও জীবন শিক্ষায় অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখা, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর উৎপাদনশীল ক্ষমতার নিরিখে স্বীকৃতি দেওয়া ও সরকারী-বেসরকারী কাজে ব্যবহার করা, জাতীয় ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রবীণ নারী ও পুরুষদের পূর্ণ ও সমানভাবে সম্পৃক্ত করা, গণমাধ্যম, সভা, সেমিনার, আলোচনাসভা প্রভৃতির মাধ্যমে প্রবীণ ও নতুন প্রজন্মের মধ্যকার মতভেদ ও পার্থক্য দূর করা এবং পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটানো প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নীতিমালার আলোকে প্রয়োজনীয় আইন, পরিকল্পনা ও কর্মসূচী নিতে হবে, দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এজন্য পর্যালোচনা করা যেতে পারে গড় আয়ু বেশি দেশের কর্মসূচীসমূহ। পাশের দেশ ভারতে সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য জাতীয় কাউন্সিল, ৬৫ উর্ধদের মাসিকভাতা প্রদান, প্রণোদনামূলক ব্যাংক ডিপোজিট স্কিমসহ নানা সুবিধা চালু আছে। সিঙ্গাপুর, জাপানে সিনিয়র সিটিজেনের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়। এসব দেশে এজিং সোসাইটিকে (অমরহম ঝড়পরবঃু) যথাযথ সম্মান দিতে বয়স নয় পারদর্শিতাকে (পড়সঢ়বঃবহপু) কর্মে নিয়োগের মাপকাঠি ধরা হয়। বহির্বিশ্বে রূপালি শক্তিকে কাজে লাগাতে নানামুখী পদক্ষেপের মধ্যে পৃথক মন্ত্রণালয়, প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সমৃদ্ধ ওয়েবসাইট, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তামূলক কর্মসূচী চালু রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে পায়ে হেঁটে শিল্পকারখানায় বা অন্য কাজে যাচ্ছে অসংখ্য আশিউর্ধ সিনিয়র সিটিজেন। অথচ এদেশে কর্মহীন অসংখ্য সিনিয়র সিটিজেন অলস সময় কাটিয়ে শারীরিক, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন।

প্রবীণরাই আলো, প্রবীণরাই দিকনির্দেশক। প্রবীণদের এ আলোকে প্রজ্বলিত রাখতে গত বছর ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘ঞযব ভঁঃঁৎব বি ধিহঃ : যিধঃ ড়ষফবৎ ঢ়বৎংড়হং ধৎব ংধুরহম.’

আমাদেরও এ আলোকবর্তিকা সামনে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। মলিন, শীর্ণ, ভাজপড়া দেহ বোঝা নয়, প্রবীণত্বকে রূপ দিতে হবে রুপালি শক্তিতে। এজন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন সিনিয়র সিটিজেনদের সংখ্যা, লিঙ্গ, পেশা বা বৃত্তি, সক্ষমতা, অক্ষমতা, চাহিদা প্রভৃতির ভিত্তিতে ডাটাবেস তৈরি করা। কর্মক্ষম প্রবীণদের পেশাগত দক্ষতা অনুযায়ী কর্মে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে যেমন, শিক্ষকতা, চিকিৎসা সেবা, গণমাধ্যম, পরামর্শক, শিল্প কারখানার ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। অনেক সময় প্রবীণরা ব্র্যান্ড বা মডেল হিসেবেও কাজ করতে পারেন। যেমন জাতীয় অধ্যাপক এমআর খান, যিনি শিশুস্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ে গঠনমূলক ভূমিকা রাখছেন। সম্প্রতি সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. ফরাস উদ্দিনকে প্রধান করে পে-কমিশন গঠন করেছে। অভিজ্ঞতার এ মূল্য তারা তাদের পারদর্শিতা দিয়ে প্রমাণ রাখছেন।

এমনিভাবে বিদেশ ফেরত সিনিয়র সিটিজেনরা তাদের ২০-২৫ বছরের প্রবাস জীবনের অর্জিত অভিজ্ঞতা, ভাষা, সংস্কৃতি জ্ঞান সবই নবীনদের শেখাতে পারেন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত হয়ে। যেহেতু প্রতিবছর গড়ে ছয় লাখ কর্মী বিদেশে যাচ্ছে এবং বিহির্বিশ্বে দক্ষ শ্রমিক প্রেরণ আমাদের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক দিক, তাই সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে এ উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।

প্রকাশিত : ২ মার্চ ২০১৫

০২/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: