কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

নিউইয়র্ক বইমেলা ভারতীয় লেখকের কল্পকাহিনী

প্রকাশিত : ১ মার্চ ২০১৫
  • আবদুল মালেক

‘অর্ধেক মানবী তুমি অর্ধেক কল্পনা’ কবি সাহিত্যিক যা লেখেন সেটা বাস্তব ও কল্পনার এই রকম একটা সংমিশ্রণ। কোন সাহিত্য যদি লেখকের পুরোপুরি কল্পনাপ্রসূত হয় তারপরেও তাকে দাঁড়াতে হয় বাস্তব জীবনের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে। কিন্তু কোন লেখা যদি ফ্যান্টাসি হয় যাকে আমরা বলি কল্পসাহিত্য সেখানে অবিশ্বাস্য সব ঘটনা ঘটাতে পারেন লেখক।

ভারতের আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান লেখক সমরেশ মজুমদার বাংলাদেশকে নিয়ে একসময় একটি কল্পকাহিনী লিখেছিলেন, প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতার সাহিত্য পত্রিকা ‘দেশ’ পত্রিকায় সম্ভবত একযুগ আগে। কাহিনীতে ছিল দরিদ্র ও দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলাদেশ একদিন কি করে যেন হয়ে উঠল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নত একটি আর্থিক সম্পদশালী দেশে। বিদেশ ছেড়ে দেশের মানুষরা তো বটেই, ইউরোপ-আমেরিকার মানুষরাও জীবিকা অন্বেষণে আসছে বাংলাদেশে, উপার্জিত অর্থ প্রেরণ করছে নিজ দেশে। মনে মনে বলেছিলাম ফুলচন্দন পড়ুক লেখকের কলমে। কিন্তু সেই সঙ্গে একটি চাপা দীর্ঘশ্বাসও দলিতমথিত করেছিল পাঁজরটাকে।

পাকিস্তানী শোষণের বিরুদ্ধে যৌবনের শুরু থেকে অগ্রজদের দেখানো স্বাধীনতার স্বপ্ন স্থায়ী করে নিয়েছিল শুধু চোখের পাতায় নয় অস্তিত্বের ভেতরেও। আমরা জানতাম ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার এই তো সময়!’ ৯ মাসের একটি রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে সেই স্বাধীনতা বাস্তব হয়ে এসেছিল। কিন্তু একাত্তর সালের ১৬ ডিসেম্বরে বিজয়ের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত বাংলার মাটিকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছিল হানাদার পাকিস্তানী ও তার দোসর রাজাকার-আলবদর। ফসলের পোড়া মাঠ, পুড়িয়ে দেয়া ব্যাংকের টাকা, ধ্বংস করা সেতু, উপড়ে ফেলা রেললাইন- চারদিকে বিপুল ধ্বংসযজ্ঞ। শুধু তাই নয় সংগ্রামের ৯ মাসব্যাপী জাতিকে মেধাশূন্য করার পরিকল্পনায় অত্যাচারে নির্মমভাবে নিধন করেছিল বাঙালী মেধাবী ব্যক্তিত্বদের। নিজ দেশের পোড়ামাটিতে পা রেখে বিজয়ের আনন্দ-বেদনার সঙ্গে উদ্বিগ্নতাও গ্রাস করেছিল হৃদয়কে। এখানেই শেষ হয়নি, এর ভেতর দিয়ে বঙ্গবন্ধু যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে স্বীকৃতি আনছিলেন বাংলাদেশের, গড়ে তুলছিলেন দেশ, তখনই শুরু“হলো আন্তর্জাতিক ও দেশীয় চক্রের ষড়যন্ত্র। সাড়ে তিন বছরের মাথায় নির্মমভাবে হত্যা করা হলো জাতির জনক ও তাঁর পরিবারের সদস্য এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ঘুমন্ত জাতীয় চার নেতাকে। এরপর রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে শুরু হলো পাকিস্তানী মডেলে সেই উর্দিপরা শাসন, হত্যা ও ক্যুর পুনরাভিনয়।

একদিন ইমিগ্রেশন নিয়ে আমেরিকা প্রবাসী হয়েছি- যেখানে আমার জন্মভূমির মানুষের পরিচয় ছিল অন্নহীন, বস্ত্রহীন ও হতদরিদ্র হিসেবে। প্রবাসী হওয়ার আগে দেশ থেকে শেষ যাত্রা ছিল এক দীর্ঘ পথ। ঢাকা থেকে রংপুর, রংপুর থেকে ঢাকা সে সময় যমুনা পারাপার ছিল দুঃসহ যানজট ও ফেরি পেরিয়ে। দেশে থাকতে কয়েক বছর ধরে শুনতাম যমুনা সেতুর পরিকল্পনা নাকি কার্যকর করা শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু যে বাংলাদেশ দুনিয়াভর বিখ্যাত হয়ে উঠেছে ফি বছরের বন্যা, দুর্ভিক্ষ, ভিক্ষের ঝুলি নিয়ে বিশ্বের দেশে দেশে সাহায্যের আবেদন- সেখানে মনে হতো যমুনা সেতুর পরিকল্পনার পরীক্ষাটি উড়ছে বুঝি বা কেবল কল্পনাতেই।

কিন্তু স্বপ্নও কোনদিন ধরাছোঁয়ার আওতায় সত্য হয়ে বিরাজ করে কে জানত সে কথা। যমুনা সেতু প্রকল্পের কাজ শেষ এবং অবিলম্বেই এই সেতুর শুভ উদ্বোধন হতে যাচ্ছে-

’৯৬ হঠাৎ একদিন প্রবাসের বাংলা সংবাদপত্রে আচমকা ছাপা হয়ে গেল। ভাবতাম আমরা যারা স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম সেই প্রজন্ম মরে-টরে গেলে হয়ত একদিন এই সেতু হবে, তাতে চলবে গাড়ি-ঘোড়া-ট্রেন। আনন্দে আবেগে খবরটা পড়ে থরথর করে কেঁপেছিল অন্তরাত্মা। সঙ্গে সঙ্গে স্বদেশ ভ্রমণের টিকেট কেটে ফেললাম যদিও বাংলাদেশে তখন গ্রীষ্মের খরতাপ। আরিচার ফেরিঘাট নয়, ফুলছড়ির স্টিমার ঘাটও নয়, যমুনার বিশাল বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর দিয়ে শো-শো করে বাস চলছে রংপুরের দিকে। আর কি আশ্চর্য সেতুটা দেখে মনে হলো- সেটা যেন আমেরিকা বা ইউরোপের কোন একটা ব্রিজ!

প্রবাসে সাংবাদিকতার সুবাদে সবসময় দেশের খবর যা পেতাম সবই ছিল প্রায় হতাশাজনক। অথচ সেতু পারাপারের পর হাতের ইত্তেফাক পত্রিকাটিতে চোখ রাখতেই একটি রিপোর্টে বিস্মিত হলাম। দেশে নাকি এ বছর বাম্পার ফলন হয়েছে- ধানের ধনে নাকি ভরে গেছে কৃষকের গোলা, এমনকি নিজের গোলাতে কৃষকের ধান রাখার স্থান সঙ্কুলান হচ্ছে না। এক সময় যে কথা কবিতায় গানে অতীত কথা হিসেবে পড়েছি ও শুনেছি- ‘ধন ধান্যে পুষ্পভরা আমাদেরই বসুন্ধরা।’ জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই উত্তরবঙ্গের চিরচেনা বৈশাখী প্রকৃতি ধাঁধায় ফেলল। রাস্তার দু’পাশের শস্যক্ষেতগুলো এমন রুদ্র দহন দিনেও সবুজে সবুজ। আর ধানের চারাগুলো চিকমিক করে খেলছে যেন রুপালি জলে। এটা স্বপ্ন না মরীচিকা? কিন্তু বাসের সহযাত্রী জানালেন দেশে এখন গভীর নলকূপের সেচ দিয়ে জমির ফসল চাষাবাদ করা হয়। আজন্ম দেখিনি এমন দৃশ্য- ক্ষেতে ও নলকূপে কাজ করছে কৃষকের সঙ্গে কৃষাণীরাও। ধারণাতেও ছিল না কোন নতুন গল্পের সূচনা করছে আমার জন্মভূমি!

এরপর যখন আবার ’৯৮ সালে দেশে যাওয়া হলো তার কিছু আগে দুঃখজনকভাবে ভয়াবহ একটি বন্যা ছোবল দিয়েছে বাংলাদেশে। কিন্তু অবাক কথা এই যে, কোন আন্তর্জাতিক ভিক্ষে গ্রহণ করেনি দেশ। চাল-ডাল আমদানি করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সামলে নিয়েছে সেই ভয়াবহ বিপর্যয়। এমনকি একদিন রংপুরের প্রবাদ-প্রতিম মঙ্গা অঞ্চল গঙ্গাচড়াও ভরে গেল ফসলে ফসলে। অবশ্য সেটি আরও পরের কথা। এর পরে স্বদেশ ভ্রমণকালে সময়টিতে কৌতুকের উৎস হয়ে উঠেছিল আমজনতার হাতে মোবাইল ফোন। মোবাইল হাতে কিভাবে লুঙ্গি পরে রিকশায় চলছে ডিমওয়ালা, মুদি দোকানদার মোবাইল কানে কিভাবে মাপছে চাল ইত্যাদি ইত্যাদি।

অথচ এর আগে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট এরশাদ আমেরিকা ভ্রমণে এলে কোন এক ভক্ত একটি দামী মোবাইল সেট উপহার দিয়েছিলেন। সেটা নিয়ে নিউইয়র্কের বাংলা পত্রিকাগুলোতে উচ্চবাচ্যের কমতি ছিল না। এর পরপরই সে সময়কার বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে তৎকালীন মন্ত্রী মোর্শেদ খানের কোম্পানির মোবাইল সেটগুলো দেশে বিক্রি হতে লাগল এক লাখ তিরিশ হাজার টাকায়। চলতি মোবাইলের এই হালচাল দেখে এক বন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘রাজছত্র’ ও ‘ছেঁড়া ছাতা’ কি করে একইপথে মিলে গেল ভাই? লাখপতি মানুষের নির্ধারিত মোবাইল কি করে হাতে পেল সাধারণ মানুষ। ঐ সময় আমেরিকার বহু মানুষের হাতে হাতে মোবাইল ফোন ছিল না। বন্ধুর উত্তর পেলাম, বিগত সরকারের আমলের লক্ষাধিক টাকার মোবাইল সেট এখন নাকি ১০-১৫ হাজারের মধ্যে মেলে। এরপর যখন দেশে যাওয়া হলো তখন দেখলাম বাড়ির স্মার্ট কাজের মেয়েটিরও গলায় ঝুলছে মোবাইল। সর্বশেষ ভ্রমণেও অবশ্য ভিখারিদের হাতেও ওটা দেখতে পেলাম। শুধু তাই নয়, শুনলাম ঢাকা শহরে ফকির খাওয়াতে গেলে তাদের নেতার মোবাইলে এসএমএস করতে হয়। তবে এখন মায়ের মুখে যা শুনি আজকাল বাড়িতে ভিক্ষে করতে আসা ফকির প্রায় নেই। বাসা বাড়িতে কাজ করতে আসা ছোট মেয়েগুলোও আর নেই, ওরা নাকি এখন স্কুলে পড়তে যায়। মাছ চাষীরাও এখন কোটিপতি হয়ে গেছে।

গত ২০১৩ সালে যখন যাওয়া তখন কম্পিউটার ও মোবাইল ইন্টারনেট ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামে-গঞ্জেও এবং রমরমা হয়েছে ফেসবুক। মজা পাওয়ার অন্যতম একটা ঘটনা হলো- যখন কুড়িগ্রাম জেলার সুদূর ভুরুঙ্গামারীর অভ্যন্তরে একটি অজপাড়াগাঁয়ের ছেলে ফরিদুল বলল- মামা আপনার ফেসবুকে আমাকে একটু এ্যাড করবেন? বললাম, ‘তোর কম্পিউটার আছে নাকি?’ ওর উত্তর, ‘আমার নেই তবে আমাদের ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্রে আছে, সেখানে গেলে কম্পিউটার ব্যবহার করা যায়।’ দেশ থেকে ফিরে ঢাকার বিভিন্ন দৈনিকের খবরেই দেখলাম তিস্তার চরাঞ্চলের মানুষ, বান্দরবানের সুদূর পাহাড়ের অধিবাসীরাও সৌর বিদ্যুত উৎপাদন করে আলো জ্বালাচ্ছে, ল্যাপটপও চালাচ্ছে। যখন এসব খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে সমরেশ মজুমদারের কল্পগল্পটিকে মনে পড়ে।

কিন্তু ভেতরে ভেতরে দেশ কতটা অগ্রসর হচ্ছে- সেটা জানলাম ক’বছর আগে নিউইয়র্ক বাংলাদেশ মিশনে বিজয় দিবসের এক জমকালো অনুষ্ঠানে। আমেরিকার স্বনামধন্য জেপি মর্গান গ্রুপের প্রধান, যিনি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন আইসিডিডিআরবিতে কর্মরত ছিলেন। তিনি বক্তৃতায় যখন বললেন, ‘আমি জেপি মর্গানের ব্যবসা সংক্রান্ত কাজে ঢাকায় গিয়েছিলাম সুদীর্ঘ বছর পর। কিন্তু ঢাকার পরিবর্তন দেখে আমার বিস্ময়ের অন্ত ছিল না। অযুত সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ তাতে কারও সন্দেহ নেই।’

আজকাল দেশ থেকে প্রায়শই ধনী মানুষজন বেড়াতে আসেন নিউইয়র্কে। সেদিন ঢাকায় কথা বলতে বলতে আমাদের ভাগ্নে মাজেদুল আমেরিকান একটি দামী ল্যাপটপ প্রসঙ্গে বলেছিল ‘ওটা আমাদের অনেক বন্ধুরই আছে, আজকাল বাংলাদেশে ধনী মানুষের অভাব তো নেই।’

নিউইয়র্কে আগামী মে মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলা বইমেলা। সেদিন রাতে এ বিষয়ে কলকাতায় বাংলাদেশ নিয়ে কল্পগল্পের লেখক সমরেশ মজুমদারের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হচ্ছিল- দাদা এবার বইমেলা উপলক্ষে আপনার সঙ্গে দেখা হচ্ছে তো?

হ্যাঁ মালেক ভাই আপনার সঙ্গে নিশ্চয়ই এবার দেখা হচ্ছে।

প্রতিবছর এই বইমেলায় সমরেশ দাদা আসেন, আসতেন সুনীল এবং হুমায়ূনও। কিন্তু গত বছর থেকে হুমায়ূন, সুনীল আর নেই, আসেননি সমরেশও। বলেছিলেন- পায়ে খুব ব্যথা হচ্ছে। এয়ারপোর্টের লম্বা পথ হাঁটতে পারব না। কিন্তু সুনীল, হুমায়ূনবিহীন মেলায় আশায় ছিলাম অন্তত সমরেশ মজুমদার আসবেন।

এটা কি কোন সমস্যা হলো দাদা? এয়ারলাইন্সে একটি হুইল চেয়ারের কথা বলে দিলেই তো সমাধান হয়। কিন্তু সমরেশ শুনে আকাশ থেকে পড়েছিলেন- হুইল চেয়ার!

তারপর কৌতুক করে বললেন- নিজেকে অত বুড়ো ভাবতে পারছি না।

একসময় ফোবানা সম্মেলন উপলক্ষে বাংলাদেশী মানুষের মিলনমেলায় প্রতিবছর সমবেত হতেন দুই বাংলার প্রথিতযশা কবি সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, গায়ক-গায়িকা, অভিনেতা-অভিনেত্রী। এর মধ্যে দিয়ে বড় আকারে শুরু হয়েছিল উত্তর আমেরিকা বাংলা সাহিত্য সম্মেলন। কিন্তু এর সবই যেন মরুপথে হারিয়ে ফেলল তার ধারাবাহিকতা।

এমনই মেরুকরণের প্রাক্কালে নিউইয়র্ক ‘মুক্তধারা’ প্রবাসের সাহিত্য সংস্কৃতি অঙ্গনে যেন বয়ে আনল এক উষার স্রোতস্বিনী। মুক্তধারার কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহার একক প্রচেষ্টায় বলতে গেলে শুরু হয়েছিল তাঁর জ্যাকসন হাইটসের বুক স্টোরটিতে। মেলা উদ্বোধনের একটি দিনে স্টলে আগমন করেছিলেন কলকাতা ও ঢাকার তিনজন দিকপাল সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদার, হুমায়ূন আহমেদ ও ইমদাদুল হক মিলন। সেখানে উপস্থিত ছিলাম নিউ ইয়র্কের তিনজন সাংবাদিক। ক্রেতারা লেখকের সঙ্গে ছবি তুলে স্বাক্ষরযুক্ত বই কিনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। বলাবাহুল্য যাদের অধিকাংশই ছিলেন মহিলা।

প্রবাসে ভাগ্য গড়তে এসে বাংলাদেশের বিশ্বজিৎ সাহা সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা বই, ক্যাসেট ও সিডির বিকিকিনি শুরু করেছিলেন তাঁর বাড়ি থেকে। নিউইয়র্ক থেকে আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্য ও কানাডায় অনুষ্ঠিত বাংলা মেলাগুলোতে বিক্রি করতেন এসব। তাছাড়া বিভিন্ন রাজ্যে যখন বাংলাদেশী গ্রোসারি চালু হতে লাগল সেখানেও তিনি বই, ক্যাসেট ও সিডি সরবরাহ করতে লাগলেন। বিনয়ী হাসিমুখ এই যুবকটি একদিন হয়ে উঠলেন ভাগ্যের বরপুত্র।

মুক্তধারার বইমেলা পরের বছরই বুকস্টোরের ক্ষুদ্র পরিসর থেকে বেরিয়ে অনুষ্ঠিত হলো নিউইয়র্কের সরকারী বিদ্যালয়ের বিরাট অডিটোরিয়াম ও লবি ও খেলার মাঠজুড়ে। এরপর থেকে নিউইয়র্ক সিটির কোন না কোন স্কুলে প্রতিবছরই ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে লাগল বইমেলা। বাংলাদেশ ও ভারত ছাড়াও এই মেলায় কানাডা, ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশ থেকে আসতে শুরু করলেন গুণীজন ও প্রকাশনা সংস্থা। নিউইয়র্কের এই বইমেলার অনুষ্ঠানেই আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আলাপচারিতা হয়েছিল সুনীল ও হুমায়ূনের সঙ্গে।

প্রথম দিকের মেলাগুলো অনুষ্ঠিত হতো যথাযথ নিয়মে ফেব্রুয়ারি মাসে। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কে যেমন তীব্র শীত, তেমনি ঘটে যখন তখন তুষারপাত। বিশ্বজিৎ সিদ্ধান্ত নিলেন মেলাটি গ্রীষ্মের উষ্ণতায় সরিয়ে আনতে এবং অনুষ্ঠিত হতে লাগল তিন দিনব্যাপী। বিশ্বজিৎ জানালেন এবারে দুই যুগের পূর্তি হচ্ছে- আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলার। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত দুই বাংলার বহু শিল্পী, কলাকুশলী ও দল বইমেলা আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

এ বছর বইমেলায় আহ্বায়ক একসময় বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারের খ্যাতনামা সংবাদ পাঠিকা, বর্তমানে ভয়েস অব আমেরিকার (ভোয়া) বাংলা বিভাগীয় প্রধান রোকেয়া হায়দার। তিনি আমাকে জানালেন ঢাকা-কলকাতা ও বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী স্বনামখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও প্রকাশনা সংস্থাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

বর্তমানে দেশে চলছে পদ্মা সেতু নির্মাণের এক সুবিশাল কর্মযজ্ঞ। বিশ্বব্যাংকের ঋণের অর্থে মাথা বিক্রি করে নয়, অবিশ্বাস্যভাবে নির্মিত হচ্ছে দেশের নিজ টাকায়। যে যজ্ঞ কাজে দেশের জনগণের সঙ্গে অবিশ্রান্তভাবে অংশগ্রহণ করে চলছেন বিদেশীরাও। খুব পুরনো দিনের কথা নয়- আমাদের বাল্যকালেও মানুষের চন্দ্রাভিযান নিয়ে কত কল্পকাহিনী পড়েছি। সেটা বর্তমান সময়ে আর কল্পকাহিনী হয়ে রইল না, হয়ে গেল সত্য। উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার আগের ধাপ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উন্নীত হওয়া। তা এখন বাংলাদেশের জন্য প্রায় বুড়ি ছোঁয়া দূরত্ব। এবার বইমেলায় সমরেশ দাদাকে তাঁর কল্পকাহিনীটির বাস্তবরূপ লাভের সূচনালগ্নের গল্পটি শোনাবার আশা রাখি।

লেখক : আমেরিকা প্রবাসী সাংবাদিক

প্রকাশিত : ১ মার্চ ২০১৫

০১/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: