কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

প্রভাতফেরি

প্রকাশিত : ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • রাশেদ রউফ

কৃষ্ণকুমারী স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে জয়িতা। নগরীর নামকরা স্কুল না হলেও নামের মধ্যে কেমন জানি আকর্ষণ আছে। কৃষ্ণচূড়ার রঙে রঞ্জিত হতে তার ভাল লাগে। এই ফুলের রং যেমন মানুষের চোখকে মোহিত করে, তার শোভায় তেমন প্রফুল্ল হয়ে ওঠে মন। কৃষ্ণচূড়ার এই নাম নিয়ে অনেক প্রশ্নও ঘুরপাক খায় মনে। কৃষ্ণ মানে তো কালো, কিন্তু তার রং তো লাল। এজন্য কবিরও প্রশ্ন জয়িতার মতো : ‘কৃষ্ণচূড়া তোমার এ নাম কে দিয়েছে, কে?/ মিশকালো না হয়ে যদি লাল হয়ে ফুটবে?/ আলতা রঙে এমন যদি সাজবেই বারবার/তোমার কেন কৃষ্ণচূড়া নাম হয়েছে আর?’ বাহ্! কী সুন্দর মনের কথা বলে দিলেন কবি। এই প্রিয় ফুল কৃষ্ণচূড়ার নামের মতো কৃষ্ণকুমারী নামটাও তার কাছে প্রিয়। এই স্কুলে যাওয়া-আসার পথে যখন দেখে কৃষ্ণচূড়া লাল হয়ে ফুটে আছে ডালে ডালে, তখন মন খুশিতে নেচে ওঠে। স্কুলে ভর্তির পর তেমন ক্লাস হয়নি। হরতালে হরতালে স্কুলের পড়ালেখা প্রায় বন্ধ। জয়িতা ছোটো মানুষ, কেন এই হরতালÑ সে বুঝে উঠতে পারে না। বড়রা যখন কথা বলেন, সে শোনে তাঁদের কথা। তাঁরা বলেন, অযথা মানুষকে কষ্ট দেয়ার জন্য নাকি এ হরতাল। হরতালে কী লাভ বা কী ক্ষতিÑ জয়িতা এসব বিষয়ে মাথা ঘামাতে চায় না। কিন্তু তার মন খারাপ, কারণ সে স্কুলে যেতে পারছে না। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে পারছে না।

শিক্ষায় বড় হতে না পারলে জাতি বিকশিত হবে না, এ কথাটা ছোট্ট জয়িতাও বোঝে। কেন যে হরতালকারীরা বোঝে না?

নতুন স্কুল, নতুন উন্মাদনা, নতুন আনন্দ। কিন্তু সেই আনন্দ মাটি করে দিল হরতাল। এবার স্কুল কর্তৃপক্ষ শুক্র ও শনিবার ছুটির দিন স্কুল খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন। সেই আরও আগে ছোটোবেলা থেকে শুনে আসছে : ‘পড়ার সময় লেখাপড়া, খেলার সময় খেলা করা’। ছুটির দিনে মন খুলে খেলাধুলা আর অন্যসময় পড়াশোনার কথা থাকলেও উল্টোটা করতে বাধ্য হচ্ছে সবাই। যা হোক। শুক্রবার ছুটির দিনে স্কুল চালু থাকাতে, জয়িতা গেল তার আনন্দ পাঠ নিতে। ক্লাস টিচার তামান্না হক প্রধান শিক্ষক মর্জিনা আখতারের নির্দেশে সেদিন অন্যরকম ক্লাস নিলেন। অভিভূত হয়ে গেল জয়িতা, অভিভূত হয়ে গেল সবাই। তামান্না আপা সে দিন গল্প করলেন আমাদের দেশের স্বাধীনতার, গল্প শোনালেন মহান ভাষা আন্দোলনের। বললেন, ‘অল্প কিছু দিন পর বছর ঘুরে আমাদের সামনে এসে হাজির হবে মহান শহীদ দিবস। একুশে ফেব্রুয়ারি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এ দিনে আমরা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করব, ফুল দেব শহীদ মিনারে। তোমাদের নিয়ে যাব কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।’

বাহ্! আপার কথায় উৎফুল্ল হয়ে উঠল ক্লাসের সবাই। শহীদ মিনারের ছবি দেখেছে বইতে। টেলিভিশনে। কিন্তু কখনও সেখানে যাওয়া হয়নি। কৃষ্ণকুমারী স্কুল চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের একেবারে পাশে। সেই জন্য তাদের অনেক সুবিধা। আপার সঙ্গে হেঁটে হেঁটে গিয়ে শহীদ মিনার দেখে আসতে পারবে।

সেদিন ক্লাসে উপস্থিতির সংখ্যা বেশি ছিল না। ৩০/৩২ জনের বেশি নয়। এদের নিয়ে সারিবদ্ধভাবে ক্লাস টিচার রওনা হলেন শহীদ মিনারে। সামান্য পথ হাঁটলেই শহীদ মিনার। শহীদ দিবস অতি নিকটে বলে ধুয়ে মুছে একেবারে ঝকঝকে করে রেখেছে কর্তৃপক্ষ। ছাত্রীদের নিয়ে আপা তামান্না হক শহীদ মিনারের সবদিক দেখিয়ে শুরু করলেন তাঁর কথা। বললেন, শহীদ মিনারের দিকে যদি তাকাই, তখন মনে হবে টলমল করছে অশ্রুবিন্দু। অশ্রুবিন্দু খুব স্বচ্ছ। সুন্দর। দেখতে একেবারে মুক্তোর মতো। কিন্তু তা কষ্টের মুক্তো। শহীদ মিনারও কষ্টের, দুঃখের, বেদনার।

তামান্না আপা বলে যান তাঁর কথা : ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। বৃহস্পতিবার। সেদিন ঢাকা শহরে মিছিল বের করেছিল ছাত্ররা। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় সাধারণ মানুষ। সবার মুখে সেøাগান : রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। সেদিন মিছিল বের করা নিষেধ ছিল। কিন্তু তারা তা মানেনি। পাকিস্তানের দুষ্টু শাসকেরা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছিল। ছাত্ররা মেনে নেয়নি তা। তাই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি নিয়ে মিছিলে নামে তারা। মিছিল এগোতে থাকে। সেøাগানে সেøাগানে প্রকম্পিত পুরো শহর। এসময় বাধা দিতে এগিয়ে আসে পাকিস্তানি শাসক। তারা গুলি চালায় ছাত্রদের মিছিলে। লাল হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। সেখানেই বাঙালীর অশ্রুবিন্দুর মত দেখা দেয় শহীদ মিনার। সেটি ছিল ছোটো। ঘাতকেরা ভেঙে ফেলে সেটি। কিন্তু দুঃখের যে ঢেউ, তা টলাতে পারেনি কেউ। তাই পরে গড়ে ওঠে আরও বড় শহীদ মিনার। এরপরে সারা দেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলে গড়ে তোলা হয় শহীদ মিনার। এই চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার তাদের একটি।

আপার কথাগুলো সবাই শুনেছে অত্যন্ত আগ্রহ ভরে। তারা জানল একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের অশ্রুবিন্দুর জন্মদিন। চোখের জল খুবই কোমল। কিন্তু তা আগুনের থেকেও লেলিহান হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের অশ্রুই পরবর্তী সময়ে লেলিহান আগুন হয়ে ওঠে, যাতে পুড়ে ছাই হয়ে যায় পাকিস্তান। সেদিন সেখানেই শেষ করলেন আপা। ওখান থেকেই সবাই যে যার বাড়ি ফেরে।

জয়িতা তার বাবাকে বলে রেখেছিল, এবার সে শহীদ মিনারে যাবে। তাই সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে বাবার সঙ্গে বের হতে প্রস্তুতি নেয়। বাবাও খুশি, মেয়েটি শহীদ মিনারে যেতে আগ্রহী। ঘর থেকে বের হয়ে মেহেদিবাগ থেকে ওরা যাবে শহীদ মিনারে। ডিসি হিল, নন্দনকানন পার হতেই দেখা মিলল প্রচুর মানুষের। সবাই সারিবদ্ধভাবে হাঁটছে। খালি পায়ে। মুখে প্রভাতফেরীর গান। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’ না, আমরা ভুলতে পারি না। ওরা সবাই যাচ্ছে শহীদ মিনারে, অশ্রুবিন্দুর কাছে। জয়িতারও। মনে পড়ল কবিতার সেই বিখ্যাত লাইন : ‘প্রভাতফেরী, প্রভাতফেরী, আমায় নেবে সঙ্গে?’ হ্যাঁ, সঙ্গে নেয়ার জন্যই তো সে হাত বাড়িয়ে আছে। তারাও লাইনে দাঁড়ায়। মিশে যায় প্রভাতফেরীতে। যেতে যেতে প্রভাতফেরী পরিণত হয় জনসমুদ্রে। শহীদ মিনার চত্বর যেন মহাসাগর, যেখানে ভাসতে থাকে হাজার হাজার মানুষ। জয়িতার মনও সমুদ্রের মতো বড় হতে থাকে।

অলঙ্করণ : সোহেল আশরাফ

প্রকাশিত : ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২৮/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: