মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অবহেলা আর বঞ্চনার মধ্যে বড় হয় ওরা

প্রকাশিত : ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
অবহেলা আর বঞ্চনার মধ্যে বড় হয় ওরা
  • শিশু হয়েও বইমেলার শিশুতোষ কি তা জানে না পথশিশুরা

শর্মী চক্রবর্তী ॥ সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ময়লা কুড়ায় পথশিশু রজিব (১১)। সবার কাছে তার পরিচয় টোকাই। পড়ালেখা করার ইচ্ছা থাকলেও করতে পারেনি। সামর্থ্য নেই। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছে। যখন থেকে বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই সংসারে দুমুঠো খাবারের জন্য রাস্তায় ঘুরে ঘুরে অব্যবহৃত জিনিস কুড়াতে থাকে। এখনও খাবারের সন্ধানে সারাদিন ঘুরে একই কাজ করে। তার পরিচয় পথশিশু হিসেবে। বই কেনার মতো সামর্থ্য নেই। ময়লার স্তূপে অব্যবহৃত জিনিস কুড়াতে গিয়ে একটি ব্যাগের ভেতর বই পেয়ে যায় সে। সেই শিশুটি ব্যাগে বইগুলো পেয়ে যেন অমূল্য সম্পদ হাতে পেয়েছে এমনটাই প্রকাশ পায় তার মুখে। তাই ময়লার ভাগাড়ে বসেই বইগুলো ব্যাগের ভেতর থেকে খুলে দেখতে থাকে। একেকটি পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে অবাক দৃষ্টিতে দেখে। তার কাছে মনে হচ্ছিল সাদা কাজছে কালো কালি দিয়ে কিছু আঁকানো। সে কিছুই বুঝতে পারছে না তাতে কি লেখা আছে। বর্ণগুলোর সঙ্গে তার কোন পরিচিতি নেই। কখনও এই অক্ষরগুলো কি, তা সে শেখেনি। তার বাবা মারা যাওয়ার পর মা টাকার অভাবে স্কুলে পাঠাতে পারেনি।

অন্যদিকে এই ভাষার মাসে একই বয়সী শিশু অর্নি বাবা-মায়ের হাত ধরে বইমেলায় ঘুরে ঘুরে মনেরমতো বই বাছাই করছে। বিভিন্ন ধরনের গল্পের বই কিনছে আর মন দিয়ে পড়ছে। ছোটবেলা থেকেই শিশুটি বইয়ের সঙ্গে বেড়ে উঠেছে।

দুই জায়গায় দুই দৃশ্য। দুজনের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য। তারা দুজনই এই জাতির সন্তান। কিন্তু একেকজনের জন্য একেক পরিবেশ। এক শিশু বাবা-মায়ের সঙ্গে থেকে নিজের পছন্দমতো বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। আরেকজন টাকার অভাবে ময়লার স্তূপ থেকে বই কুড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করছে।

পড়ালেখার স্বপ্ন সবার থাকে। ছোটবেলা থেকেই এই ইচ্ছা গড়ে ওঠে শিশুদের মনে। অনেক শিশুর মনে পড়ালেখা করার ইচ্ছা থাকলেও সে পড়তে পারে না। টাকার অভাবে। দু’বেলা দুমুঠো খাবারের সন্ধানে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। আবার অনেক শিশু বাবা-মায়ের সংস্পর্শে থেকে পড়ালেখার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে। অনেক কিছুতে পরিপূর্ণ থেকেও বাবা-মাকে সারাক্ষণ সেই শিশুটিকে সময় দিতে হয়।

রজিব তার মা ও ভাই-বোনদের নিয়ে আলিনগরচরে ভাড়া থাকে। মা আলো বেগম বাসাবাড়িতে কাজ করে। সেই টাকা দিয়ে ঘর ভাড়া দিতে হয়। অন্যান্য ভাইবোন ছোট। রজিবের ওপর পরিবারের বিশাল দায়িত্ব। ময়লা কুড়ানোর পর সেগুলো বিক্রি করে যে টাকা সে পায় তা দিয়ে তাদের পরিবারের সবার খাবারের জোগাড় করে সে। বই হচ্ছে পড়ার জন্য, তা জানে রজিব। কিন্তু পড়ালেখা গরিবের জন্য নয়, সে বিষয়টিও তার মাথায় স্থান পেয়েছে। যাদের অনেক টাকা আছে তারাই শুধু পড়ালেখা করতে পারে বলে রজিবের মধ্যে ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। সে বলে আমরা তো তিনবেলা ভালভাবে খেতেই পারি না, পড়ালেখা কি করে করব।

অবহেলিত শব্দটি পথশিশুদের জীবনের সঙ্গে যেন কোন না কোনভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে তারা বিভিন্ন ধরনের অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার। রাস্তাঘাটে এক টাকা-দুই টাকার জন্য তারা পথচারীকে অনুরোধ করে নানাভাবে। কেউ কেউ আবার কাগজ কুড়ায়। তীব্র শীতের মধ্যেও তাদের প্রায়ই গরম কাপড় ছাড়া থাকতে হয়, যা অমানবিক ও দুঃখজনক।

স্বাধীন দেশে এ পথশিশুদেরও সমান সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বড় হওয়ার অধিকার আছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এ মৌলিক চাহিদাগুলো যথোপযুক্তভাবে পাওয়ার অধিকার তাদেরও আছে।

উন্নত দেশগুলোতে দেখা যায়, প্রত্যেকটি শিশুর দায়িত্ব রাষ্ট্র কোন না কোনভাবে পালন করে। বেশি খেয়াল রাখা হয় প্রত্যেক শিশুর সুস্থ জীবনযাপনের প্রতি। গড়ে দেয়া হয় প্রত্যেক শিশুর ভবিষ্যত বিভিন্ন সুন্দর পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে; কোন শিশু যেন অবহেলার শিকার না হয়। কিন্তু এদেশে এখনও অনেক শিশু বঞ্চিত। অনেকেই শিক্ষা, খাদ্য, চিকিৎসা পায় না। রজিবও ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। বই কি সে চোখে দেখেনি। আর বাবা-মায়ের আদরে যারা বেড়ে উঠেছে তারা পাচ্ছে সব সুযোগ। তারা সবাই তো শিশু; কবে কেন তাদের মধ্যে এই পার্থক্য।

প্রকাশিত : ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২৮/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

অন্য খবর



ব্রেকিং নিউজ: