কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

এল নিনোর ভয়াবহ প্রভাব ॥ দীর্ঘস্থায়ী অস্বাভাবিক খরা, অসহনীয় দাবদাহ

প্রকাশিত : ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
এল নিনোর ভয়াবহ প্রভাব ॥ দীর্ঘস্থায়ী অস্বাভাবিক খরা, অসহনীয়  দাবদাহ
  • উত্তরাঞ্চলে ইতোমধ্যেই ৬ নদী বিলীন হওয়ার পথে
  • পদ্মা-যমুনার বুকে শুধুই চর- ধু ধু বালিয়াড়ি

সমুদ্র হক ॥ বায়ুমণ্ডল আগের চেয়ে অনেক বেশি ভেজা ও ময়লার আস্তরণে ঢাকা পড়ায় অসময়ে প্রলয়ঙ্করি ঝড়-তুফান, অস্বাভাবিক খরা, দাবদাহ, বিরামহীন বৃষ্টির কবলে পড়ছে গোটা বিশ্ব। বাংলাদেশও এই অবস্থার বাইরে নয় বরং দুর্যোগের মাত্রা অন্য দেশের চেয়ে বেশি। ইতোমধ্যে তা শুরুও হয়ে গেছে। জলবায়ুবিষয়ক বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ বছর ‘এল নিনো’র দাপট এতটাই বেশি যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অঞ্চল বাংলাদেশে জানুয়ারি থেকেই তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার হার উপরের দিকে উঠে ফেব্রুয়ারির শেষভাগ থেকেই চরম মাত্রার দিকে ধাবিত হবে। মার্চ মাসে দাবদাহ অনেকটা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মতো হয়ে মে মাসে কিছুটা কমে জুন, জুলাই, আগস্টে অসহনীয় পর্যায়ে যাবে। এই সময়ের মধ্যে যে ঝড়, শিলাপাত হবে তা মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো ঠেকবে। ঝড়ের আলামত একটু একটু করে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত এক সপ্তাহে দেশের উত্তরাঞ্চলে দুই দফায় (বৃহস্পতিবার রাতে দ্বিতীয় শিলাপাতে ফসলের বিস্তর ক্ষতি হয়েছে। বগুড়ার গাবতলী এলাকায় টিনের চালায় এত বড় শিলাপাত হয়েছে যে বেশিরভাগ বাড়ির টিন হয় পাল্টাতে হয়েছে, না হয় বিশেষ ধরনের পুডিং দিয়ে চাল সাময়িক ঠিক করা হয়েছে। প্রবীণরা বলছেন, এত বড় শিলাবৃষ্টি আগে কখনও দেখেননি। এক আবহাওয়াবিদ জানিয়েছেন, ফাল্গুনের এই সময়টায় ও চৈত্রে কখনও ঝড়-বৃষ্টিপাত হতে পারে। মাত্রা বেশি হলে তাকে স্বাভাবিক অবস্থা বলা যাবে না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকা জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের লেখা জলবায়ুবিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশ করে বিশ্লেষণ করেছে, এ বছর এল নিনোর প্রভাব এতটাই বেড়ে যাবে যে, গোটা বিশ্বই খরখরে ভূমির অঞ্চলে পরিণত হবে। বাতাস অস্বাভাবিক উত্তপ্ত হয়ে বাড়তি জলীয়বাষ্প ধারণ করে বায়ুম-লে আর্দ্রতা বাড়াবে। এর সরাসরি প্রভাবে ভূমি উত্তপ্ত হয়ে ফাটল ধরবে। সেচ দিয়েও কিনারা করা যাবে না। ছোট নদী মরাগাঙে পরিণত হবে। বড় নদীগুলো পড়বে হুমকির মুখে। উত্তরাঞ্চলে এই অবস্থা এখনই শুরু হয়েছে। বগুড়ার সারিয়াকান্দি অঞ্চলে যমুনা নদীর দিকে তাকালে যতদূর চোখ যায় ধু-ধু বালুচর। কোথাও গরু ব্যবসায়ীরা ঘর তুলে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছে। কেউ গরুর বাথান করেছে। কুড়িগ্রাম থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের অনেক জায়গায়ই আর চেনা যায় না। মনে হয় ছোট নদীও নয়। রাজশাহী মহানগরীতে যে পদ্মাপাড়ে নৌকা ভাড়া করে অনেকটা নদী পথ ভ্রমণ করা যেত সেই পদ্মাকে আর চেনা যায় না। নদীর বুক চিরে হাঁটাপথে অনেকদূর যাওয়া যায়। চোখে পড়ে পদ্মার ঢেউ ঝিলের তরঙ্গের মতো শান্ত হয়ে খালের মতো বইছে। এক পানি প্রকৌশলী জানান, জলবায়ুর পরিবর্তনের থাবা তো আছেই, এর সঙ্গে উপনদী ও শাখানদীগুলো ভরাট হয়ে অবরুদ্ধ হচ্ছে। সংস্কারের অভাব তো আছেই। একটি সূত্র জানায়, দেশের উত্তরাঞ্চলে অন্তত ৬০ নদীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক ও গ্রামীণ পাকাসড়কে চলার সময় অনেক নদী তার নামটি সেতুর গায়ে লেখা থাকায় জানান দেয়; এই সেতুর নিচে একদিন পানি ছিল। আজ শুকনো ঠা ঠা বালিয়াড়ি। কখনও এসব সেতুর নিচে সরকারী ভূমিতে কৃষক ফসল ফলায়।

বড় কোন নদীতে কি পরিমাণ চর পড়েছে তার একটা হিসাব জানা যায়, যমুনায় ১ হাজার ৭শ’ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি চর পড়েছে। দিনে দিনে তা বাড়ছে। যদিও যমুনায় সময়ে-অসময়ে ভাঙ্গনের থাবা বেড়েছে, তারপরও চর জেগে ওঠার পরিমাণ কমেনি। বাঙালীর আবহমান সংস্কৃতিতে বলা হয়, নদীর এ কূল ভাঙ্গে ও কূল গড়ে.... এখন আর গড়ে না। চর পড়ে একেবারে বালিয়াড়ি হয়ে গেছে। পদ্মায় চরের পরিমাণ প্রায় একহাজার বর্গকিলোমিটার। বছরপাঁচেক আগেও পদ্মায় এত চর ছিল না। মেঘনার উত্তর ও দক্ষিণ অববাহিকায় চর পড়েছে প্রায় ৫শ’ বর্গকিলোমিটার। বড় নদীগুলোরই এই অবস্থা। সহজেই অনুমান করা যায় আত্রাই, বড়াল, ইছামতি, তেঁতুলিয়া, নারদ, করতোয়া, হুরাসাগর, খলসডোঙ্গা, গুমানি, কাঁকন কাঁকেশ্বরী, চিকনী, রূপনাই, নাগর, নদীশুকা, মাথাভাঙ্গাসহ ছোট নদীর অস্তিত্ব। কুড়িগ্রামে ধরলা, লালমনিরহাটে তিস্তা, চাঁপ্ইানবাবগঞ্জে মহানন্দা, বগুড়ায় বাঙালী নদী খালের মতো শীর্ণকায়া কঙ্কালে রূপ পেয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, মৃতপ্রায় নদীকে জাগিয়ে তোলার অন্যতম প্রধান কাজ হলো পানিপ্রবাহ বাড়ানোর ব্যবস্থা করা। এর পর ড্রেজিং ও সংস্কারসহ নানা কাজ পর্যায়ক্রমে চলে আসে। অন্যতম প্রধান কাজটি (পানিপ্রবাহ) করতে গিয়ে আন্তঃদেশীয় আলোচনা এবং তার সফলতা খুবই দরকার। নদীর জীবন নির্ভর করে প্রবাহের ওপর। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের যে থাবা দেশে পড়েছে তাতে নদীকে বাঁচানো জরুরী। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন জলীয় গ্যাস এতটাই জমা হয়ে সূর্যতাপকে ধরে রেখেছে যে উত্তপ্ত বায়ুম-ল তছনছ করে দিচ্ছে প্রকৃতি। এর সঙ্গে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের থাবা যোগ হচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার ফেরে পড়ে দেশের দুর্যোগ বেড়েই চলেছে।

প্রকাশিত : ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২৮/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: