মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

টিএসসিতে ব্লগার অভিজিতকে কুপিয়ে খুন

প্রকাশিত : ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • স্ত্রী বন্যা গুরুতর আহত ॥ হুমায়ুন আজাদের মতো একই কায়দায় জঙ্গী হামলা

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বইমেলার অদূরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় জঙ্গী সন্ত্রাসীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে খুন হয়েছেন সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী প্রবাসী লেখক অভিজিৎ রায় (৩৮)। ‘মুক্তমনা’ ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও ঢাবির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক অজয় রায়ের ছেলে অভিজিৎ রায়ের সঙ্গে এ সময় তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকেও (৩০) কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। তাঁর অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। ঠিক একই কায়দায় এক দশক আগে ওই এলাকায়ই লেখক ড. হুমায়ুন আজাদকেও হামলা করা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার রাত নয়টার দিকে ঢাবির টিএসসি মোড়ে রাজু ভাস্কর্যের পাশে এই দম্পতিকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে সন্ত্রাসীরা। ঘটনাস্থলের ১৫-২০ হাত দূরেই ২০/২৫ জন পুলিশ বসে থাকলেও তারা অভিজিৎ দম্পতিকে রক্ষায় এগিয়ে আসেনি। সন্ত্রাসীরা পেছন থেকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এ হামলা চালায়।

ঘটনার পর পরই গুরুতর আহত অভিজিৎ দম্পতিকে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত দশটা ২০ মিনিটে অভিজিৎ মারা যান। বন্যা চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসা চলাকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ-২ নং ভবনের পাশে টহলরত র‌্যাবের গাড়ি লক্ষ্য করে গাড়ির সামনে ও পেছনে দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। তবে কে বা কারা এই ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে তা জানা যায়নি।

জরুরী বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক একেএম রিয়াজ মোর্শেদ জানান, নিহত অভিজিতের মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। তার স্ত্রী বন্যার একটি আঙুল শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। অভিজিতের ওপর কারা হামলা চালিয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ঘটনাস্থলে দুটি চাপাতি পাওয়া গেছে। উল্লেখ্য, লেখক ড. হুমায়ুন আজাদকেও চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়েছিল। ঢাকা মেডিক্যালের পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মোজাম্মেল হক বলেন, মাথায় গুরুতর জখম নিয়ে সঙ্কটাপন্ন অভিজিতকে সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রোপচার কক্ষে নেয়া হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এম আমজাদ আলী বলেন, অভিজিৎ রায় বিদেশ থাকা অবস্থায় মুক্তমনা নামে একটি ব্লগে লেখালেখি করতেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতেন। সরেজমিন দেখা যায়, টিএসসি এলাকায় রাজু ভাস্কর্যের কয়েক হাত দূরে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ, চশমা, হাতের বিচ্ছিন্ন কয়েকটি আঙ্গুল ও মাথার মগজের মতো বস্তু পড়ে রয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল কর্ডন করে রেখেছে। ঢাবি প্রক্টর আমজাদ আলী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিহত অভিজিৎ ও আহত বন্যাকে দেখতে যান। এ সময় ঢাকা মেডিক্যালের সামনে জামায়াত শিবির নিষিদ্ধ ও হত্যাকারীদের অতি দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও শাস্তি দাবিতে ব্লগার এক্টিভিস্ট ফোরামের সদস্য ও বাম সংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিল করছিল।

হত্যাকা- নিয়ে অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, এ হত্যাকা- বিএনপি ও জামায়াত শিবিরের জঙ্গীদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। মৌলবাদীরা এদেশে আমাদের বাঁচতে দেবে না। এর অংশ হিসেবেই ড. হুমায়ুন আজাদ স্যারের মতো এ হত্যাকা- ঘটানো হয়েছে। এর জন্য সরাসরি বিএনপি নেত্রী বেগম জিয়া দায়ী। তাকেই এ হত্যার দায়িত্ব নিতে হবে।

এর আগে, ঢামেক হাসপাতালে ভর্তির পর বন্যা সাংবাদিকদের বলেন, বই প্রকাশ উপলক্ষে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা থেকে ঢাকায় বেড়াতে এসে তারা এক আত্মীয়ের বাসায় ওঠেন। বৃহস্পতিবার বইমেলায় ঘুরে রাত নয়টার দিকে টিএসসিতে পৌঁছলে কয়েক ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়। এতে তারা মাথায় জখমসহ গুরুতর আহত হন। শাহবাগ থানার এসআই অহিদুজ্জমানান জানান, হামলার কোন কারণ জানা যায়নি। জড়িতদেরও চিহ্নিত করা যায়নি। তবে হামলাকারীদের খুঁজে বের করতে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে।

একটি সূত্র জানায়, দেশী ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে অভিজিৎ দম্পতিকে আহত করে। এছাড়া বইমেলায় অভিজিৎ রায়ের দুটি বই প্রকাশিত হয়। এজন্যই তিনি স্ত্রী বন্যাকে নিয়ে বইমেলায় আসেন। তবে কে বা কারা কী কারণে এ হামলা চালিয়েছে তা কিছুই জানাতে পারেননি কেউ। ড. অভিজিৎ রায়ের প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে অবিশ্বাসের দর্শন, ‘আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’, ‘মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে’, ‘ভালবাসা কারে কয়’, স্বতন্ত্র ভাবনা : মুক্তচিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি, সমকামিতা : বৈজ্ঞানিক এবং সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান।

সূত্র জানায়, লেখালেখি নিয়ে অভিজিৎ জঙ্গীবাদীদের হত্যার হুমকি পেয়ে আসছিল। প্রবাসী প্রকৌশলী অভিজিৎ অনলাইন নিউজপোর্টাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে নিয়মিত লিখতেন। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বের হওয়ার পথে একইভাবে চাপাতি দিয়ে লেখক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা হয়েছিল। ওই হামলায় জঙ্গীরা জড়িত ছিল বলে পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে। এছাড়া ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকেও মিরপুরে তার বাড়ির সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। ওই হত্যাকা-েও পরবর্তীতে জঙ্গীবাদীদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলে।

রাত পৌনে বারোটায় ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মারুফ হাসান ঢাকা মেডিক্যালে লাশ দেখতে যান। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, হত্যাকারী কারা ও কেন ঘটেছে তা অতি দ্রুত বের করে আনা হবে। দুর্বৃত্তদের অতি দ্রুত ধরতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাব। এ ঘটনায় সম্পৃক্ত কাউকেই ছাড়া হবে না।

প্রকাশিত : ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২৭/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: