মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

এ সময়ে বাংলার খাদি

প্রকাশিত : ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • তৌফিক অপু

আবহমান বাংলার ঐতিহ্য খাদি। খাদি আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বদেশী আন্দোলনের কথা। ইতিহাসের বার্তা বাহক এই খাদি যেন বহুকাল ধরে আমাদের মাঝে স্বাধিকারের চেতনাকে জাগ্রত রেখেছে। সরাসরি হাতে তৈরি হয় এই খাদি বা খদ্দর কাপড়। কার্পাসতুলা থেকে সুতা বোনা হয় এবং সেই সুতা থেকে হাতে চালানো চরকা বা তাঁতে বোনা হয় কাপড়। বিগত পনেরো বছরে এই ঐতিহ্যকে খুব চমৎকারভাবে ফ্যাশনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে এদেশের ফ্যাশন হাউসগুলো। আড়ং, কেক্রাফট, প্রবর্তনা, নিপুণ, অন্যমেলাসহ আরও অনেক ফ্যাশন হাউস খাদি কাপড়ের তৈরি পোশাক উপস্থাপন করছে, পোশাকে নিয়ে আসছে নানা বৈচিত্র্য। খাদি এখন বাঙালীর ফ্যাশন প্রতীক হিসেবে স্থান পেয়েছে।

বাংলাদেশের মধ্যে কুমিল্লা খাদি কাপড়ের বিখ্যাত একটি জায়গা। মোঘল সময় থেকে এর ব্যবহার চলে আসছে। সতেরো শ’ শতাব্দীর দিকে ত্রিপুরা রাজ্যে খাদি কাপড় বুননের কাজ বেশ প্রচলিত ছিল। পরবর্তীতে ময়নামতি, চান্দিনা, নবীনগর, গৌরীপুরসহ বেশ কিছু জায়গায় খাদি বুননের কাজ চলত। রঙিন খাদি কাপড়ের লুঙ্গি, শাড়ি, গামছা সে সময় ময়নামতিতে তৈরি করা হতো এবং দুই থেকে পাঁচ টাকার মধ্যে এগুলো পাওয়া যেত । তবে ধুতি, বিছানার চাদরের জন্য বিখ্যাত ছিল সরাইল, নবীনগর, ময়নামতি, গৌড়িপুর, চান্দিনা এবং মুরাদনগর খাদি কাপড় বুননের উল্লেখযোগ্য চারটি অঞ্চল। ১৯২১-এর দিকে মহাত্মা গান্ধী কুমিল্লার চান্দিনা অঞ্চলে আসেন এবং বিদেশী কাপড় ছেড়ে দেশী কাপড় ব্যবহারে এবং তা সংরক্ষণে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করেন। সেই সঙ্গে চরকার ব্যবহার সম্পর্কেও প্রশিক্ষণ দেন তিনি। ১৯৪৭ বঙ্গভঙ্গের কারণে কিছুটা বাধা আসলেও পরবর্তীতে এই বাধা অতিক্রম করে স্বদেশী ঐতিহ্যকে পুনরায় উজ্জীবিত করে একদল মানুষ।

এ দেশে খাদি কাপড়ের ঐতিহ্যের সঙ্গে একটি নাম যেন সারাজীবন বেঁচে থাকবে, তিনি হলেন শৈলেন্দ্রনাথ গুহ, যিনি ‘খাদিবাবু’ হিসেবেও পরিচিত সবার কাছে। কুমিল্লার চান্দিনার খাদির ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে দীর্ঘদিন তিনি এর উন্নয়নের পেছনে কাজ করে যান। আর এভাবেই আস্তে আস্তে প্রসার ঘটে এই আদি ঐতিহ্যের ১৯৯৫ সালে তার মৃত্যুর পর ছেলে বিজন গুহ ও অরুণ গুহ বাবার বাঁচিয়ে রাখা ঐতিহ্যকে পরিপূর্ণভাবে ধরে রাখে। আর এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে আমাদের ফ্যাশন হাউসগুলোও ব্যাপকভাবে এই ঐতিহ্যের প্রসার ঘটিয়েছে, এনেছে বৈচিত্র্য।

আগে খাদি কাপড় মানেই ছিল সাদা বা মেটে রঙের কাপড়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈচিত্র্য এসেছে রঙে, সেই সঙ্গে পোশাকেরও। এক সময় পাঞ্জাবির ফ্যাশনেই সীমাবদ্ধ ছিল খাদি। তবে বর্তমানে শাড়ি। সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়াসহ আরও অনেক পোশাকেই খাদি ব্যবহারের বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ডিজাইনার এবং মডেল বিবি রাসেলের খাদি ফ্যাশনের পেছনে অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৯৪-এ বাংলাদেশে ফিরে এসে তিনি দেশীয় ঐতিহ্য জামদানী, মসলিন, চেক এবং খাদি কাপড়ের ব্যবহারের উপর জোর দেন এবং দেশে ও বিদেশে অনেক ফ্যাশন শো’র আয়োজন করেন, যেখানে শুধুই স্থান পায় এই সব দেশীয় কাপড়ের তৈরি পোশাক। এভাবেই খাদি হয়ে ওঠে ফ্যাশনজগতের এক অন্যতম প্রতীক।

হালকা শীত খাদি পোশাকের অন্যতম সময়। তাই এই সময়কে মাথায় রেখেই ফ্যাশন হাউসগুলো পোশাকের নকশা ও উপাদান, ফ্যাশন নির্ধারণ করেছে। গত এক দশকে যে খাদির নববিকাশ ঘটেছে তা ফ্যাশন হাউসগুলোর নিত্যনতুন ডিজাইনের পোশাক দেখলেই বোঝা যায়। এখন খাদি মানেই হাল্কা রঙের কোন কাপড় নয়, বরং উজ্জ্বল লাল, কমলা, নীল, ম্যাজেন্টা নানা রঙে রঙিন হয়েছে কাপড়গুলো। ব্লক, এমব্রয়ডারি, স্ক্রিনপ্রিন্ট, কারচুপি, হাতের কাজ সব ধরনের ডিজাইন দেখা যায় খাদি কাপড়ের পোশাকগুলোতে। তরুণ প্রজন্মের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতাও যেন বেড়েই চলেছে। এ সম্পর্কে অন্যমেলার প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম বলেন, খাদির সঙ্গে মিশে আছে আমাদের ঐতিহ্যের দ্যুতি, ইতিহাসের অহঙ্কার, আবহমান বাংলার গন্ধ। ‘মায়ের দেয়া মোটা কাপড়’ খাদি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় স্বাধিকার আর স্বাধীনতার কথা। উজ্জীবিত করে স্বনির্ভর হওয়ার চেতনায়। আর এই গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করতে এবং নতুনভাবে এর উপস্থাপন করতেই এই আয়োজন। ডিজাইনের ভেরিয়েশনও আনা হয়েছে এবারের পোশাকগুলোতে। তিনি বলেন, ডিজাইন রাখা হয়েছে খাদি কাপড়ে তৈরি সেলোয়ার-কামিজ, ছেলে ও মেয়েদের ফতুয়া, শর্ট ও লং পাঞ্জাবি। হাতের কাজ, ব্লক, মেশিন এমব্রয়ডারি স্ক্রিন প্রিন্ট, কারচুপিসহ নানা ডিজাইনে তৈরি করা হয়েছে পোশাকগুলো। এছাড়াও থাকছে মসলিন, হাফসিল্ক ও সুতি শাড়িতে খাদি ব্যবহারের নানা বৈচিত্র্যময় শাড়ি। এই প্রথম মসলিন বা সিল্ক কাপড়ে খাদি বুননের কাজে বেশ চমকপ্রদ।’

বিভিন্ন ডিজাইনের ও রঙের এসব খাদি কাপড়ের তৈরি সালোয়ার-কামিজ পাওয়া যাবে ১১৪৫-১৩৮৬ টাকায়, মেয়েদের ফতুয়া ৪৪৬-৫৫৫ টাকায়, ছেলেদের ফতুয়া ৪৬৬-৫৮৬ টাকার এবং শর্ট পাঞ্জাবী ৬৪৫ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।

প্রকাশিত : ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২৭/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: