রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ধর্মান্ধতা নারী প্রগতির অন্তরায়

প্রকাশিত : ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • রুখসানা কাজল

এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল ভারতের হায়দরাবাদের সেই মেয়েটির কথা। সেও ইসলামের শত্রুদের নিশ্চিহ্ন করতে জিহাদীদের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করবে বলে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। জিহাদীদের থালাবাসন মাজা আর কাপড়-চোপড় ধুতে ধুতে নিজেকে বিলিয়ে দেয়া ছাড়া, কোন শত্রুর অস্তিত্ব খুঁজে না পেয়ে স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা নিয়ে ঘরে ফিরে এসেছে সেই মেয়ে। তারপর? এরপর আর কি কোন পর থাকতে পারে? চেতনা যেখানে অন্ধ, সেখানে একজন, দু’জন জেহাদের ভয়াবহতায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে ফিরে এলে কি হবে, এই ফাঁদ যে ছড়িয়ে আছে জালের মতো পৃথিবীজুড়ে। মারণনেশার মতো আজকের মুসলিম তরুণরা ছুটে যাচ্ছে।

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। বাংলাদেশের এক ধনীর ছেলেকে ড্রাগের নেশা আর আসক্ত সঙ্গীদের কাছ ছাড়া করতে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। কয়েক বছর পর ছেলে সত্যি নেশামুক্ত হয়ে ফিরে এসে বাবার সঙ্গে পারিবারিক ব্যবসায় হাত লাগিয়ে আজ একজন সফল ব্যবসায়ী। এখন কিন্তু ভয় পাচ্ছে, বাংলাদেশী বাবা-মায়েরা। ড্রাগের চাইতেও বেশি ভয়ঙ্কর এই ধর্মান্ধ দলগুলো। ড্রাগ এক সামাজিকব্যাধি। মরলে ব্যক্তি নিজে মরছে বা তার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু এই ধর্মান্ধরা একটি শান্তির ধর্মকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। স্বদেশ, বিদেশ গোটা পৃথিবীর মানুষের মনে ইসলাম আর বিশ্বশ্রেষ্ঠ মহাজ্ঞানী হযরত মুহম্মদ (সা.)-কে কলুষিত করে তুলছে। যে ধর্মে নারীকে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্র পরিচালনার মতো ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার দেয়া হয়েছে, সেই ধর্মের মূল সুনীতি শিক্ষাকে জলাঞ্জলী দিয়ে নারীকে কেবল ভোগ্যবস্তু হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ সত্যটা কি মহিমাময়। কথিত আছে, হযরত মুহম্মদ (সা.) তাঁর পালিত মাতাকে দেখে সসম্মানে উঠে দাঁড়াতেন এবং মাতাকে বসতে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। এই সেই মহান মাতা, যিনি নিজের বুকের দুধ খাইয়ে ইসলামের মহানবীকে লালন করেছেন। কত বড় গর্ব মুসলিমদের, যে সময় আরবের লোকেরা মেয়ে সন্তানকে জ্যান্ত কবর দিত, সেই বর্বর আরব ভূমির ওপর দাঁড়িয়ে শত সহস্র বাঁধাকে অতিক্রম করে সকলের জন্য অধিকার আর সম্মান নিয়ে আসা পবিত্র ইসলামকে তিনি প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছিলেন। সমগ্র নারী জাতির কাছে সেই সন্তান সম্মানের, আদরের, ভালবাসা ও শ্রদ্ধার, যে কিনা মহানবীর মতো তাঁর মাকে যথাযথ সম্মান করে আজন্মভর। আর আজ মুসলিম জিহাদীদের হাতে নারীরা খুন হচ্ছে, ধর্ষিত হচ্ছে, বিক্রি হচ্ছে, জ্যান্ত কবরস্থ হচ্ছে। এই কি ইসলামের শিক্ষা? আফগানিস্তানে একজন তালেবানের ২২ বছরের স্ত্রীকে কামনা করে ভোগ করে একজন তালেবান নেতা। অথচ ব্যাভিচার করার দোষে তালেবান স্বামীর হাতে মৃত্যুদ- পাওয়ার শাস্তি পেল কেবল স্ত্রীটি! কেন? শুধু নারী বলে? জেনা বা ব্যাভিচার কি একা করা যায়? ধিক এই বাহাদুর মুসলিম তালেবান আফগান স্বামীকে! স্ত্রীকে তার চেয়ে শক্তিশালী পুরুষের ভোগের লোভ থেকে যে রক্ষা করতে পারে না, সেই মুসলিম পুরুষকে দুয়ো দিই। এই কি ইসলামের শিক্ষা? এদের হাতে নারীর কি সম্মান আছে কুকুর-বেড়াল-ইঁদুরের মতো মরা ছাড়া?

একজন নারী সে তো মা হয়। আমাদের পাড়ার পারভীনের মা সাত বাড়ি কাজ করে তিন ছেলেমেয়েকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। মা তো মা ই। অনন্যোপায় হয়ে কত মা শরীর বিক্রি করে সংসারের চাকা চালিয়ে নিচ্ছেন। কত মেয়ে বাবা-মা, ভাই-বোনকে বাঁচাতে শরীরে মেখে নিচ্ছে কলঙ্ক। জিহাদীরা কি এর চেয়ে বেশি সম্মান দিচ্ছে নারীদের? সত্যিকারের জিহাদ হলে, ন্যায়ের জিহাদে নামলে, পৃথিবীর মানুষের জন্য শান্তি প্রতিষ্ঠার জিহাদ হলে তারা তো কেবলমাত্র সাহচর্যের জন্য নারীদের চাইত না। কেন তাদের নারীর প্রয়োজন? বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্র থেকে নারীদের প্রলোভন দিয়ে কি করছে সেই নারীদের নিয়ে এই জিহাদীরা? পত্র-পত্রিকা, ভিডিও দেখে শিউরে ওঠে মন, আতঙ্কিত লাগে তরুণ পুত্র-কন্যাদের জন্য। জিহাদীরা কি জানে না, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত। মায়ের এক ধার দুধের দাম কি মানুষ হত্যা করে কখনও পূর্ণ করা যায়? আইএসের ইশতেহারে নারীর স্বাধীনতাসহ প্রগতিশীলতার তীব্র সমালোচনা করে বলা হয়েছে, নয় বছর বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দেয়া দরকার।

যেখানে পৃথিবীর মানুষ অগ্রগামী চিন্তায় মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর, সেখানে ইশতেহারে যা লেখা আছে, তাতে একমাত্র জিহাদে বিশ্বাসী চরমপন্থী নারীরা ছাড়া অন্যরা সকলেই কোন না কোনভাবে আহত এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গীরা সামাজিক মাধ্যমগুলো সুচতুর কৌশলে ব্যবহার করছে। নারীদের জঙ্গীবাদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে গঠন করেছে জোরা ফাউন্ডেশন, ব্লগ এবং টুইটার বার্তায় নারী জঙ্গীরা শিরñেদ দেখে কখনও উল্লাস দেখাচ্ছে, কখনও বার্তা দিচ্ছে ইরাক সিরিয়ার জঙ্গীদের পানীয় হচ্ছে রক্ত আর তাদের প্রিয় খেলা হচ্ছে হত্যাযজ্ঞ। যে কোন বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত করা ইসলাম পছন্দ করে না। শান্তির ধর্ম ইসলামের নামে এই যে মানব হত্যা, তা মেনে নেয়া যায় না।

বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের ক্ষেত্রে হুঁশিয়ারি থাকবে, তারা যেন দেশে বা বিদেশে যে কোন পরিস্থিতিতে সহিংসতাকে ঘৃণা করে। ইসলামের নামে এই যে বিশ্বব্যাপী সহিংসতা চলছে, তার থেকে নিজেকে দূরে রেখে পড়াশোনা করে নিজের পরিবার এবং দেশকে উন্নত করার কাজে অংশগ্রহণ করা উচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বেশ সবল এবং কোন কোন ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী শক্তিশালী দেশ ভারতের চাইতেও উন্নত। বিশেষ করে নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ব্যাপক অগ্রসর হয়েছে। পড়াশোনা থেকে যে কোন কর্মক্ষেত্রে বাংলাদেশী নারীরা তাদের মেধা, বুদ্ধি, পরিশ্রম, অধ্যবসায়, বিবেচনাবোধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা দেখাতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমান বিশ্বের অন্যান্য উন্নত রাষ্ট্রের নারীদের মতোই পারিবারিক এবং সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে শিক্ষিত, কম শিক্ষিত এমনকি অশিক্ষিত নারীরাও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে স্ববুদ্ধিতে সচেতনভাবে। তাই বাংলাদেশের নারীদের একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, তারাও মানুষ। আজ যদি তারা কর্মক্ষেত্র থেকে সরে যায় বা সরে যেতে বাধ্য হয়, তাহলে কী হবে তাদের? তাদের পরিবার কি বেঁচে থাকতে পারবে? দেশটা যেন কোনভাবেই পাকিস্তান আফগানিস্তানের মতো হয়ে না যায়। আমরা আজ যে অন্ধকার আফগানিস্তানকে দেখতে পাচ্ছি, কয়েক দশক আগেও আফগানিস্তান এরকম অবস্থানে ছিল না। বাংলাদেশের নারীদের মতোই মুক্ত প্রগতিশীল শিক্ষিত নারী সমাজ ছিল আফগানিস্তানে। অথচ ধর্মের ফতোয়ায় আজকের পাকিস্তান-আফগানিস্তানে নারীরা বন্দী। ইসলাম নারীকে অন্ধকার থেকে আলোতে মুক্তি দিয়েছিল। দিয়েছে অধিকার। যে সমস্ত নারী জঙ্গীদের এজেন্ট হিসেবে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সরল প্রাণ অন্য নারীদের ইসলামের নামে প্রতারিত এবং বিভ্রান্ত করছে, মনে রাখবেন তারা কোন না কোন জঙ্গী সংগঠনের অনুসারী। যেমন ঘটেছে ওই তিনজন তরুণী আর ভারতের তরুণীর ক্ষেত্রে। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কুইলিয়াম ফাউন্ডেশনের চার্লি উইন্টার বলেছেন, আইএসের প্রচারণায় অনেক সময় নারীদের সক্রিয়, এমনকি সশস্ত্র ভূমিকার কথা বলা হলেও, বাস্তবতা হলো- নারীরা আইএসে যোগ দেয়ার পর কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। তাই সময় থাকতে সাবধান।

প্রকাশিত : ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২৭/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: