আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ঘুরে এলাম গ্রেটওয়াল মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক

প্রকাশিত : ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

চীন দেশে কেউ বেড়াতে গেলে যে বিশ্বখ্যাত স্থাপনাটি সবার আগে দেখতে চায়, তা হলো গ্রেটওয়াল বা চীনের মহাপ্রাচীর। চৈনিকদের ইতিহাস ঐতিহ্যের অনেক কিছুকে ছাপিয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এই গ্রেট ওয়াল। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এই সমৃদ্ধশালী মহাপ্রাচীর না দেখাটা এক ধরনের বোকামির নামান্তর। এ কারণে চীনের মাটিতে পা দিয়েই এ প্রাচীর দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠি। বেইজিংএ আমরা যে হোটেলে উঠেছি, সে হেটেলের নাম ‘টাইমস হলিডে হোটেল’। শহরের অনেকটা দক্ষিণে এর অবস্থান। পরিকল্পনা মতো একদিন দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে দলেবলে বেরিয়ে পড়ি গ্রেট ওয়াল দেখতে। পর্যটকদের সুবিধার জন্য মহাপ্রচীরে আরোহণের জন্য কতগুলো স্থান নির্ধারণ করা আছে। বেইজিং শহর থেকে কাছাকাছি যেখান থেকে গ্রেট ওয়ালে আরোহণ করা যায় সে স্থানের নাম মুতিয়ানু, শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার। যেতে সময় লাগে প্রায় দু ঘণ্টা।

আমাদের বহনকারী বাস বড় বড় সড়ক পেরিয়ে উত্তরের দিকে ছুটতে থাকে। সঙ্গে গাইড হিসেবে আছে এন্ডু এবং এ্যানি, ওরা দু’জনেই চাইনিজ। শিক্ষাজীবন শেষ করে সাময়িক সময়ের জন্য গাইডের কাজ করছে। এ কাজের জন্য যে যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকা প্রয়োজন, দু’জনের মধ্যেই তা প্রতিভাত। এই দুই তরুণ-তরুণীর নেতৃত্বেই আমরা বেইজিং মহানগরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোতে ঘুরেছি। প্রাণ ভরে দেখেছি বিখ্যাত ‘ফরবিডেন সিটি’, চৈনিক সম্রাটদের ‘সামার প্যালেস’, বিখ্যাত ‘তিয়ানয়ানমেন স্কয়ার’সহ আরও নানান ধরনের নান্দনিক স্থাপনা।

বেইজিং মহানগরের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে ঘণ্টাখানেক পরেই আমরা নগরের ব্যস্ততা পেছনে রেখে গ্রামের শান্ত পথ ধরে ছুটতে থাকি গন্তব্যের দিকে। বাস চলতে থাকে নির্দিষ্ট গতিতে, আশপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে সময় কেটে যায়। বিস্তীর্ণ ফসলের ভূমি, বনাঞ্চল, ছোট ছোট শহর পাড়ি দিয়ে প্রায় দু’ঘণ্টা পর বাসটি একটি পাহাড়ের পাদদেশে এসে ব্রেক কষে। বাস থেকে নেমে অবাক বিম্ময়ে তাকিয়ে থাকি বহুল কাক্সিক্ষত গ্রেট ওয়ালের দিকে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় একটি আঁকা বাঁকা নদী পাহাড়ের কোল বেয়ে বয়ে চলছে।

প্রতিদিন দেশ বিদেশের হাজার হাজার পর্যটক এই মহাপ্রাচীরের পাদদেশে ভিড় জমিয়ে থাকে। কেউ কেউ সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে উপরে উঠে যায়, কেউ উট বা গাধার পিঠে বসে আঁকাবাঁকা পাহাড়ী সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে, কেউ আবার ক্যাবলকারে করে প্রাচীরে উঠে হাঁটাহাঁটি, ঘোরাঘুরি করে এর সৌন্দর্য সুধা পান করে থাকে। আমাদের হাতে সময় ছিল কম তাই ক্যাবলকারে করেই ওপরে ওঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এতে জনপ্রতি খরচ পড়ে প্রায় ৬০ ইউনান (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৭৮০ টাকা)। এক একটা ক্যাবল কার ছয়জন করে যাত্রী নিয়ে উপরের দিকে ছুটতে থাকে। নিচের পাথরের বন্ধুর পথকে পেছনে ফেলে কেবল কার ক্রমশ উপরের দিকে উঠতে থাকে। যত উপরের দিকে উঠতে থাকি, তত যেন উৎসাহ-উদ্দীপনাও বাড়তে থাকে। এক সময় ল্যান্ডিং স্টেশনে এসে ক্যাবলকার স্থিত হয়। তিন মিনিটেই পৌঁছে যায় প্রাচীরের দোরগোড়ায়। ক্যাবল কার থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে এগুতে থাকি কাক্সিক্ষত গ্রেট ওয়ালের অঙ্গনে।

হাঁটি হাঁটি পায়ে প্রাচীরের পাদদেশে দাঁড়িয়ে সকলেই আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে পড়ি। চারদিকে ছবি তোলার হিড়িক পড়ে যায়। এ এলাকার যতদূরে চোখ যায় দেখা যায় শুধু পাথর ও চুনামাটির পাহাড়। পাহাড়গুলো কোথাও কোথাও এতটা উঁচু যে বাহ্যিক দেখাতে মনে হয় ওরা যেন মেঘের কাছাকাছি চলে গেছে। পাথরের পাহাড় হলেও কোথাও সবুজের সামান্যতম কমতি নেই। পাহাড়ের কোলে দাঁড়িয়ে আছে নানা জাতের গাছ, লতা, গুল্ম। কোথাওবা ফুটে আছে নানা বর্ণের বনাজী ফুল। বিভিন্ন প্রজাতি, বর্ণ ও আকারের পাখির ওড়াওড়িও দেখতে বেশ ভালো লাগে। চারদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেখতে, প্রাচীরের উঁচু নিচু সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করতে করতে সময় বয়ে যায়। অবাক হয়ে ভাবি, এত উঁচু পাহাড়ে তখনকার দিনের মানুষরা কেমন করে এই বিশাল নির্মাণযজ্ঞ সম্পন্ন করেছিল? আসলে মানুষের অসাধ্য বলে যে কিছু নেই, এটি তারই জ্বলন্ত প্রমাণ।

চীন দেশের এই গ্রেট ওয়ালটি ছিল একটি আত্মরক্ষামূলক প্রতিরক্ষা প্রাচীর। এটি মূলত নির্মাণ করা হয়েছিল পূর্ব সীমান্ত থেকে পশ্চিম সীমান্ত বরাবর। এই গ্রেট ওয়াল পূর্বের শানহাইগুয়ান থেকে পশ্চিমের লপ লেক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ক্ষেত্র বিশেষে এটির বিস্তার ছিল মঙ্গোলিয়ার অভ্যন্তরভাগ পর্যন্ত। বিভিন্ন যাযাবর জাতি, শত্রু সেনা এবং লুটেরা অনুপ্রবেশকারীদের আগ্রাসন প্রতিরোধকল্পে এই বিশাল প্রতিরক্ষাব্যুহটি বিনির্মিত হয়েছিল। এর প্রকৃত দৈর্ঘ্য কতটুকু, সে ব্যাপারে ইতিপূর্বে অনেক মতবিরোধ ছিল। বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি এবং পরিমাপক কলাকৌশল ব্যবহার করে বিভিন্ন শাখা প্রশাখা জোড়া দিয়ে এর দৈর্ঘ্য ২১ ১৯৬ কিলোমিটার বলে নিরূপণ করা হয়েছে।

এই সুদীর্ঘ স্থাপনাটি বিভিন্ন শাসকরা খ-খ-ভাবে নির্মাণ করেছিল। প্রাচীনকাল থেকেই চীনের ছোট বড় রাজ্যগুলো নিজেদের সুরক্ষার জন্য নিজ নিজ সীমান্ত এলাকা প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রাখত। এতে বাইরের আক্রমণকারীরা সহজে কোন রাজ্যে প্রবেশ করতে পারত না। খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম থেকে পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত পর্যন্ত চিউইন, ওয়েই, ঝাও, চিউআই, ইয়ান এবং ঝংশান রাজ্যগুলো এ কারণেই নিজেদের রাজ্যে প্রাচীর নির্মাণের মাধ্যমে সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। খ্রিস্টপূর্ব ২২১ সালে চিউইন শি হুয়াঙ নামের একজন বিখ্যাত বিজেতা এ সমস্ত ক্ষুদ্র রাজ্য দখল করে বিশাল এক চীন সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন। মঙ্গোলীয়দের আক্রমণ ঠেকানোর জন্য স¤্রাট শি দখলকৃত ছোট ছোট রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা প্রাচীর ভেঙ্গে দিয়ে উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল সীমান্ত জুড়ে মজবুত প্রাচীর গড়ে তোলায় মনোনিবেশ করেন। পাহাড়ের পাথর দিয়েই পাহাড়ে প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছিল। যে সমস্ত এলাকায় পাথর ছিল না, সে সমস্ত এলাকায় মাটির দেয়াল নির্মাণ করা হতো। কোথাও বা প্রাচীর নির্মাণের জন্য ব্যবহার করা হতো বন থেকে আহরিত মজবুত কাঠ। প্রাচীর নির্মাণের কাজে লাখ লাখ শ্রমিক নিয়োগ করা হয়েছিল। এই কঠিন এবং অমানুষিক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিল লক্ষাধিক অসহায় শ্রমিক। আজকের যে প্রাচীর নিয়ে চীনের এত গর্ব, সে গর্বের পেছনে কত লাখ লাখ অসহায় শ্রমিকের চোখের জল মিশে আছে, সে হিসাব কেউ কি কখনও করেছে? চৌদ্দ শতকে এসে মিঙ সম্রাটরা প্রাচীর নির্মাণ ও উন্নয়নে মনোনিবেশ করেন। আজকের দিনে আমরা যে গ্রেট ওয়ালের দেখা পাই তার প্রায় পুরোটাই এই মিঙ সম্রাটদের শাসনামলে নির্মিত।

প্রাচীরের ওপর সব সময় সৈনিকরা পাহারায় নিযুক্ত থাকত। এখানে সৈনিকদের অনেক শিবির ছিল। কিছুদূর পর পর সুদীর্ঘ দেয়ালের অভ্যন্তরে ছিল পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। এ সমস্ত টাওয়ারে দাঁড়িয়ে দায়িত্বরত সৈনিকরা শত্রুদের গতিবিধির ওপর নজর রাখত। শত্রু সংখ্যা কম হলে এ সমস্ত শিবিরের সৈনিকরাই শত্রুদের মোকাবেলা করত, শত্রুদের সংখ্যা অনেক বেশি হলে প্রয়োজনীয় সাহায্য গ্রহণ করা হতো। সাহায্য এবং শত্রুদের আগমন সম্পর্কে স¤্রাটকে অবহিতকরণের জন্য এখান থেকে সঙ্কেত পাঠাবারও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা ছিল। এ ধরনের সঙ্কেত পাঠানোর ব্যবস্থাটি ছিল বেশ চমকপ্রদ। দিনের বেলা হলে প্রাচীরের টাওয়ার থেকে ধোঁয়ার মাধ্যমে এবং রাতের বেলা হলে আগুন জ্বালিয়ে সংকেত পাঠানো হতো। এই ধোঁয়া এবং আগুন জ্বালানোরও সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম ও প্রকারভেদ ছিল। টাওয়ারগুলো থেকে একবার ধোঁয়া ওড়ালে বা আগুন জ্বালালে বোঝা যেত, প্রাচীরের কাছে ১০০ শত্রু সৈন্য সমবেত হয়েছে। দুইবার ধোঁয়া বা আগুন জ্বালালে বোঝা যেত ৫০০ শত্রু সৈন্য সমবেত হয়েছে, এভাবে তিনবার আগুন বা ধোঁয়া ওড়ানো হলে বোঝা যেত ১০০০ শত্রু সৈন্য হাজির হয়েছে। এভাবে পাহারাদাররা সীমান্ত এলাকায় আক্রমণকারী বা শত্রু সেনাদের উপস্থিতি সম্পর্কে স¤্রাট ও উর্ধতন সেনাপতিদের অবহিত করত এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সৈন্য সমাবেশের আয়োজন করত। প্রাচীর পথের মাধ্যমে মানুষ জনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হতো, অযাচিত অনুপ্রবেশকারীদের চলাচল প্রতিরোধ করা হতো, ব্যবসাবাণিজ্যের শুল্ক আদায় করা হতো এবং ঐতিহাসিক সিল্ক রোডের চলাচল পথ হিসেবেও এটি বণিক দল কর্তৃক ব্যবহার করা হতো।

আমরা যেখানে এ প্রাচীর দেখতে গিয়েছিলাম, সেখানে এটি ছিল প্রায় ২৬ ফিট উঁচু এবং ১৬ ফিট চওড়া। এ সমস্ত প্রাচীরে সেনাবাহিনীর সৈনিকরা ঘোড়ার পিঠে বসে অবাধে যাতায়াত করতে পারত। প্রাচীর পথেই পরিবাহিত হতো নানা ধরনের পণ্য সম্ভার। এখন আর এ পথ কোন কাজে ব্যবহৃত হয় না। সৈনিকরাও ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে পাহারায় নিযুক্ত থাকে না। তারপরেও এখানে মানুষের উপস্থিতির কোন অভাব নেই। প্রতিদিন দেশ-বিদেশের নানা ধরনের পর্যটকের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা থাকে মুখরিত। আমরা যে মুতিয়ানু এলাকায় প্রাচীর দেখতে গিয়েছিলাম, তা ছিল একটি বিখ্যাত এলাকা। এটি অনেক দিন আগে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। রাজধানী থেকে কাছে বলে অনেকে এ এলাকায় এসে গ্রেট ওয়ালের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। পরিসংখ্যান নিয়ে জানা যায়, এ পর্যন্ত ওখানে এক কোটি দেশী বিদেশী পর্যটক পা রেখেছেন। বিদায় নেয়ার আগে দেয়ালের চত্বরে দাঁড়িয়ে অবাক বিস্ময়ে দেখতে থাকি চারদিকের সবুজের শোভা। নজরে পড়ে দেশ বিদেশের নানা অবয়বের পর্যটক।

হাঁটতে হাঁটতে নজরে পড়ে গ্রেট ওয়ালের কিছু ভগ্নাংশ। বয়সের ভারে ন্যুব্জ ভঙুর দশা এখন এ স্থাপনার অনেক স্থানেই চোখে পড়ে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পর্যটকদের অবাধ বিচরণ, ধূলিঝড় এবং বর্ষণজনিত ভূমিধসের কারণে এই ঐতিহাসিক স্থাপনার কিছু কিছু এলাকা এখন হুমকির সম্মুখীন। ধূলিঝড়ের কারণে গঙজু প্রদেশের প্রায় ৬০ কিলোমিটার প্রাচীর আগামী ২০ বছরের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নির্জন পাহাড়ের কোলে দাঁড়িয়ে থাকা দেয়াল দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। পশ্চিমের সূর্য আস্তে আস্তে দূরের সবুজের বুকে হারিয়ে যেতে থাকে। আমরাও শেষবারের মতো গ্রেট ওয়ালের দিকে তাকাতে তাকাতে ক্যাবল কারের দিকে এগিয়ে যেতে থাকি। ফিরে আসার পথে পাহাড়ের পাদদেশে সংরক্ষিত একটি শিলালিপির দিকে দৃষ্টি পড়ে, ওতে লিখা ছিল, ‘এক সময় শত্রুদের থেকে রক্ষার নিমিত্ত এই প্রাচীর চীনকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। আর আজকে এই প্রাচীর সারা বিশ্বের মানুষকে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ করেছে।’

প্রকাশিত : ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২৭/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: