কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শীতল যুদ্ধ কি তপ্ত হচ্ছে!

প্রকাশিত : ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • আতাউর রহমান রাইহান

পৃথিবীটা কতটা বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে, তার প্রতীক স্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন বিজ্ঞানী একটি ঘড়ি বানিয়ে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। তাও প্রায় সত্তর বছর আগে। ঘড়ির মিনিটের কাঁটা রাখা হয়েছিল রাত ১২টার ৫ মিনিট আগে। অবিরত কার্বন নির্গমনে জলবায়ু পরিবর্তিত হয়ে এবং বিশ্বব্যাপী পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতায় পৃথিবী যে ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছে, তা বোঝাতেই নির্মিত হয়েছিল এই ঘড়ি। গেল জানুয়ারিতে সেই কাঁটা দুই মিনিট এগিয়ে ১২টা বাজার ৩ মিনিট আগে রাখা হয়েছে। পরাশক্তিগুলোর ধ্বংস উন্মাদনাই পৃথিবীকে ধ্বংসযজ্ঞের কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন ইস্যুতে রুশ-মার্কিন শীতল যুদ্ধও নতুন করে শুরু হয়েছে।

আসন্ন বৈশ্বিক বিপর্যয়ের হুমকি সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করার চিন্তা করেই ঘড়িটির নকশা তৈরি করা হয়েছিল। ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাতের ঠিক ৫ মিনিট আগে থেমে আছে। অর্থাৎ পৃথিবী তার বিপর্যয়ের সর্বশেষ পর্যায়ে রয়েছে। যে কোন সময় ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। প্রযুক্তির অভিশাপে পৃথিবী যে ধ্বংসে দুয়ারের পৃকভাবে তাই বোঝানো হয়েছে ডুমস ডে ঘড়িতে।

যুক্তরাষ্ট্রের বুলেটিন অফ এটমিক সায়েন্সের বিজ্ঞান ও নিরাপত্তা বোর্ড প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী এই হুমকির বিষয়টি পর্যালোচনা করে নির্ধারণ করে ডুমস ডে ঘড়ির মিনিটের কাঁটা কোথায় রাখা হবে। গেল জানুয়ারিতে কাঁটার অবস্থান পরিবর্তন করে মধ্যরাতের তিন মিনিট আগে রেখেছে। ত্রিশ বছরের মধ্যে পৃথিবী ধ্বংসের খুব কাছাকাছি চলে যাবে।

জলবায়ু সংক্রান্ত বিষয়ে ঔদাসীন্যই কেবল এজন্য দায়ী, তা নয়; বরং পৃথিবী এক নয়া শীতল যুদ্ধের দিকে ধাবিত হতে উস্কানিমূলক কুচকাওয়াজ চলছে। মূলত, পূর্ব ইউক্রেনে এখন মানবিক বিপর্যয় চলছে। পুরো অঞ্চল গ্রাস করেছে মানবতাবিরোধী যুদ্ধ। রাশিয়ার বিরুদ্ধে উত্তেজনায় যুক্তরাষ্ট্র ক্রমাগত ইন্ধন জুটিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি কিয়েভ সরকারকে মারণাত্মক অস্ত্র দেয়ার কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র।

জন ম্যাককেইনসহ বেশকিছু সিনেটর ইউক্রেনে সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে। তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক ও পণ্ডিতরাও এই উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছে। ওবামার প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নজরেও এতদিন এ খবর চলে আসার কথা। তারও সম্মতি অস্ত্র হস্তান্তরের পক্ষেই। ফেব্রুয়ারিতে সিনেটে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে মনোনয়নের শুনানিতে এশটন কার্টারও তা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ইউক্রেনীয়রা যাতে নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে, সে জন্য আমাদের সাহায্য করা উচিত।

এ্যাশটনের কৃতিত্ব হলো, ওবামা নিজেও যেখানে মারণাত্মক অস্ত্র দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করছেন, সেখানে এ্যাশটন এক কাঠি সরেস। যদিও ওবামা বলেছেন, সব ধরনের সুযোগের পথ খোলা আছে। ইউক্রেনের সেনাবাহিনীকে অস্ত্র দিলে যুক্তরাষ্ট্রের খুব লাভের কিছু নেই। বিপরীতে ইউক্রেনের জন্যে এটা বিপজ্জনক একটা সঙ্কট। দেশটিতে সংঘাতে এ পর্যন্ত পাঁচ হাজারেরও বেশি লোক নিহত হয়েছে। প্রায় ১৫ লাখ লোক বাস্তুহারা ও উদ্বাস্তু হয়েছে।

কাজেই সংঘাতের সমাধান সামরিকভাবে করা যাবে না। অবশ্যই রাজনৈতিকভাবে করতে হবে। কিয়েভকে যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র দিলে কেবল রাশিয়ার সন্দেহই সত্যি হবে। রুশ সীমান্তের কাছে পশ্চিমা সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ইউক্রেনকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ব্রুকিং ইন্সটিটিউটের জার্মি শ্যাপিরো লিখেছেন, যদি ইউক্রেনকে যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র দেয়ার পরেও রাশিয়াকে পিছু হটাতে বাধ্য করতে না পারে, তবে যুদ্ধ তীব্র হবে বৈকি। শান্তি ও সমঝোতার কোন সুযোগ থাকবে না। কিয়েভকে অস্ত্র দেয়ার মানে এই নয় যে, রাশিয়া পিছু হটে গেল। ঐতিহাসিক কিংবা ভৌগোলিক, যে কোন দিক থেকেই রাশিয়ার জন্যে ইউক্রেন অপরিহার্য কৌশলগত জায়গা। সে তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খুব একটা সম্পর্কিত নয়। ওয়াশিংটনের দিক থেকে বিপজ্জনক সামরিক নীতি গ্রহণ করলে, তা ব্যর্থ হতে পারে। রাশিয়া সবসময়ই এই বিষয়টি অত্যন্ত শক্তিশালী সামরিক হাতে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবে।

ইউক্রেনের সেনাবাহিনীকে অস্ত্র দেয়ার সম্ভাব্য ফলাফল বিপর্যয় বয়ে আনবে। এতে সমাধানের কিছুই হবে না। বরং দেশটিতে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটবে, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হবে। ফলে ব্যাপক পরমাণু অস্ত্রে সমৃদ্ধ দেশ দুটির মধ্যে সর্বশেষ সহযোগিতাটুকুও বন্ধ হয়ে যাবে। এজন্যই পরমাণু অস্ত্রের শক্তি ও ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে পরিচিত ম্যানহাটান প্রকল্পের বিজ্ঞানীরা সতর্ক সঙ্কেত দিচ্ছেন।

প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ও এইচডব্লিউ বুশের সময়ের সোভিয়েত ইউনিয়নে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জ্যাক ম্যাটলক বলেন, পরস্পরের প্রতি কঠোর অভিযোগের তীর ছুড়ে দেশদুটি নতুন করে শীতল যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করেছে। অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের পাশাপাশি ভয়াবহভাবে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে। অথচ সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্ভাচেভের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গড়ে রিগান ও বুশ শীতল যুদ্ধের ইতি ঘটিয়েছিলেন। রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সমস্যাও সেই সময় থেকে ব্যতিক্রমী নয়। তার মতে, একটা সময় এটাকে হয়তো আর শীতল যুদ্ধ বলতে পারবে না, তার বদলে বলতে হবে তপ্ত যুদ্ধ। আমার ভয় যে, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র সেই ঝুঁকির পথই বেছে নিয়েছে।

ইরানের সঙ্গে পরমাণু আলোচনা, সিরীয় গৃহযুদ্ধ থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেখানে মস্কোর কাজ করতে হবে, সেখানে ইউক্রেন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে শীতল যুদ্ধ শুরু হলে সেই সুযোগ আর থাকছে না। যুক্তরাষ্ট্রের ইউক্রেন নীতির নিট ফল নিয়ে ভাবা উচিত ওবামা প্রশাসনের। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সবাই এই সংঘাতের যবনিকা টানতে জটিল কূটনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছে।

অতীতের প্রতিটি সংকট মুহূর্তে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলো ক্রমাগত সমর শক্তি বাড়িয়েছে। কিন্তু এসবের ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে ইউক্রেনের জনগণের ওপর, দেশটির সরকারেরও টিকে থাকার বিষয়টি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইউক্রেন বর্তমানে সামরিক ও অর্থনৈতিক পতনের একেবারে প্রান্তে এসে পৌঁছেছে। গেল এক সপ্তাহে মুদ্রার মূল্যহ্রাস ঘটেছে।

বিদেশী মুদ্রার মজুতও শেষের পথে। দেশটিকে টিকে থাকতে হলে এখন পাঁচ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি দরকার। অথচ মন্দাক্রান্ত ইউরোপের পক্ষে এই অর্থ সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। কিয়েভ জানে, এই যুদ্ধে ন্যাটোকে অন্তর্ভুক্ত করতে না পারলে জয়ী হবে না তারা। পরাজয় এড়ানোর এটাই একমাত্র উপায়। কিন্তু সেই যুদ্ধও হবে অনেকটা দীর্ঘ ও রক্তাক্ত।

ইউক্রেনের জাতীয় স্থিতিশীলতার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা নীতি সংশোধন করা উচিত। পাশাপাশি দু’পক্ষের তরফ থেকে উত্তেজনা কমিয়ে শান্তির শেষ উদ্যোগটি অন্তত নেয়া দরকার। তাহলে পৃথিবী হয়ত নতুন কোন ধ্বংস ও বিপর্যয় থেকে রেহাই পাবে। আর ইউক্রেনের জনগণও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে শান্তিতে ঘুমাতে পারবে।

প্রকাশিত : ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২৫/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: