হালকা কুয়াশা, তাপমাত্রা ১৮.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

চার সেঞ্চুরিতে আরও উপরে মাহেলা

প্রকাশিত : ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
চার সেঞ্চুরিতে আরও উপরে মাহেলা
  • মোঃ নুরুজ্জামান

‘মাহেলা আসলে ক্রিকেট দেখতে পায়। ক্রিকেটের সঙ্গে কথা বলে, বসবাস করে। ক্রিকেটে এমন ধ্যানমগ্ন সাধক আমি কমই দেখেছি’, টেস্ট-অবসরের সময় বলেছিলেন কুমার সাঙ্গাকারা। সতীর্থ বলে এতটুকো কি বাড়িয়ে বলেছেন তিনি? মোটেই না। মাহেলা জয়াবর্ধনে লঙ্কান ইতিহাস তো বটেই, আধুনিক ক্রিকেটেরই এক চলমান বিস্ময়, জীবন্ত কিংবদন্তি। ব্যাট হাতে এখনও দ্বীপ-দেশের সেবা করে চলেছেন। এবারের বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের কাছে হারের পর আফগানিস্তান ম্যাচে ঘুড়ে দাঁড়ানোর বিকল্প ছিল না। হাঁকালেন সেঞ্চুরি, দলকে জেতালেন সামনে থেকে।

আফগাস্তিানের ২৩২ রান টপকে শিরোপাপ্রত্যাশী লঙ্কানদের সহজেই জিতে যাওয়ার কথা। কিন্তু বল হাতে শুরুতেই তাদের বিপদে ফেলেন প্রতিপক্ষ পেসাররা। যেখানে নেতৃত্ব দেন দীর্ঘদেহী তারকা শাপুর জাদরান। স্কোরবোর্ডে রান জমা হওয়ার আগেই দুই ওপেনার লাহিরু থিরিমান্নে ও তিলকারতেœ দিলশানকে সাজঘরে ফেরান তিনিÑ শূন্য রানে দুই ওপেনারের আউট হওয়ার ঘটনা বিশ্বকাপ ইতিহাসে এই প্রথম (সর্বোপরি ওয়ানডেতে দ্বিতীয়)! দলীয় ১৮ রানে অভিজ্ঞ কুমার সাঙ্গাকারা (৭) ও ১২তম ওভারে ৪র্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে দিমুথ করুনারতেœ (২৩) যখন সাজঘরে ফেরেন শ্রীলঙ্কার রান তখন মোটে ৫১। ২৩৩ তখন দূরের পথ! বহু যুদ্ধের পোড় খাওয়া সৈনিক মাহেলা জ্বলে উঠলেন দলের কঠিন সময়ে। বিপর্যয়ের মুখে খেললেন দারুণ এক ইনিংস।

অধিনায়ক ম্যাথুসকে সঙ্গে নিয়ে পঞ্চম উইকেটে ১২৬ রানের দুর্দান্ত জুটি গড়ে শ্রীলঙ্কাকে বিপদ থেকে রক্ষা করেন। ১২০ বলে ১০০ রানের ইনিংসটি খেলেন ঠা-া মাথায়, ৮ চার ও ১ ছক্কায়। সেঞ্চুরির মধ্য দিয়ে একইসঙ্গে রেকর্ড বইয়ে একাধিক অদল-বদলের নজির গড়েন ক্যারিয়ারেরর শেষ বিশ্বকাপ খেলা ৩৭ বছর বয়সী কলম্বো হিরো। বিশ্বকাপে এটি তার চতুর্থ সেঞ্চুরি। সৌরভ গাঙ্গুলীর সঙ্গে যৌথভাবে চতুর্থ সর্বাধিক। ৬ ও ৫টি করে সেঞ্চুরি নিয়ে এ তালিকায় ওপরে শচীন টেন্ডুলকর ও রিকি পন্টিং। শ্রীলঙ্কার হয়ে বিশ্বকাপে সর্বাধিক সেঞ্চুরি মাহেলারই। ৩ সেঞ্চুরিতে সাবেক গ্রেট সনাথ জয়সুরিয়া আছেন তার পেছনে। জয়সুরিয়ার (১১৬৫) পর বিশ্বাকাপে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানও (১০৭৫) তারই। কেবলই তাই নয়, বিশ্বকাপে এটি মাহেলার ৯ম পঞ্চাশোর্ধ রানের ইনিংস! ক্যারিয়ারের ১৯তম সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে একাধিক কীর্তিতে নাম লেখান ৪৪৩ ওয়ানডেতে ১২৬২৫ রানের মালিক।

এবারের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী ক্রিকেটারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার কৃতিত্ব জয়াবর্ধনের (৩৫টি)। দ্বিতীয় স্থানে থাকা সাঙ্গাকারা খেলেছেন ৩২টি ম্যাচ। শ্রীলঙ্কার সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের একজন মাহেলা জয়াবর্ধনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে ১৯৯৭ সালে। ভারতের বিরুদ্ধে টেস্ট অভিষেকের পরের বছরই অভিষেক ঘটে ওয়ানডে ক্রিকেটে। এবার নিয়ে তিনি পঞ্চম বিশ^কাপে অংশ নিচ্ছেন। বিশ^কাপ ক্যারিয়ারে জয়াবর্ধনের সেরা সাফল্য ২০০৭ আসরে। লঙ্কান দলের অধিনায়ক হিসেবে এ আসরের সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয়ী ম্যাচে সেঞ্চুরি করেছিলেন। গতবার ২০১১ বিশ^কাপ ফাইনালে ভারতের বিরুদ্ধে ছয় উইকেটে পরাজিত ম্যাচে ৮৮ বলে অপরাজিত ১০৩ রান করেন জয়াবর্ধনে। ২০০৭ বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক ছিলেন ৩৭ বছর বয়সী মাহেলা। ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার পর স্বেচ্ছায় অধিনায়কত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন।

৯৭-এ টেস্ট ক্রিকেটে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে জয়াবর্ধনের। এর পরের মৌসুমে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষিক্ত হন। স্মরণীয় সাফল্য হিসেবে তিনি ২০০৬ সালে নিজ দেশে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট ইতিহাসে সর্বাধিক ব্যক্তিগত ৩৭৪ রান করে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নেন। ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) জয়াবর্ধনেকে বছরের সেরা আন্তর্জাতিক অধিনায়ক হিসেবে ঘোষণা করে। পরের বছর বছরের সেরা টেস্ট ক্রিকেটারের সম্মানেও ভূষিত হন। এবার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে আলো ছড়িয়ে স্মরণীয় করতে চান। এ প্রসঙ্গে জয়বর্ধনে বলেন, ‘বিশ্বকাপে অনেক সুখকর স্মৃতি আছে। তবে এবারের বিশ্বকাপই শেষ আমার। শেষটা ভাল করতে চাই।’

ক্রিকেটার মাহেলা সম্পর্কে কিংবদন্তিতল্য সতীর্থ সাঙ্গাকারার মূল্যায়ন, ‘মাহেলা আসলে ক্রিকেট দেখতে পায়। ক্রিকেটের সঙ্গে কথা বলে। ক্রিকেটের সঙ্গে বসবাস করে। ক্রিকেটে এমন ধ্যানমগ্ন সাধক আমি কমই দেখেছি। অনেকেই আমাদের বন্ধুত্বের কথা জানেন। কিন্তু এক অর্থে ও আমার গুরুতুল্য বন্ধু। ২০০০ সালে আমি যখন ক্রিকেটে আসি, সে তখন প্রতিষ্ঠিত। সহ-অধিনায়ক। নতুন হিসেবে আমাকে সাদরে গ্রহণ করে নিয়েছিল। এরপর ক্যরিয়ারে এত এত অর্জন সবকিছুতে বন্ধনটা দৃঢ় হয়েছে। ওর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাহায্য ছাড়া আমি আজকের সাঙ্গাকারা হতে পারতাম না।’ লঙ্কান ক্রিকেটে মাহেলার অবদান সম্পর্কে বন্ধু সাঙ্গা আরও যোগ করেন, ‘ঠিক করে রেখেছি অবসরে বই লিখলে তাতে তিনজন স্থান পাবেন- এ্যালেক্স কুন্টরিস, মুত্তিয়া মুরলিধরন ও মাহেলা জয়াবর্ধনে। প্রত্যেকে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটে ভিন্ন ভিন্ন ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে। তিনটি প্রজন্মকে ধারণ করেছেন তাঁরা। ভেবে কষ্ট হয় তাঁদেরই শেষজনের সঙ্গে এখন আর বাইশ গজে দেখা হবে না।’

গত বছর আগস্টে মাহেলার টেস্ট অবসরের সময় কথাগুলো বলেন সাঙ্গাকারা। চলতি বিশ্বকাপ খেলে দু’জনেই তুলে রাখবেন ওয়ানডের রঙিন জার্সি। তবে বোর্ডের বিশেষ অনুরোধে আরও কিছুদিন টেস্ট খেলবেন সাঙ্গাকারা, যখন সকল ধরনের ক্রিকেটে অতীত হয়ে যাবেন মাহেলা!

প্রকাশিত : ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২৫/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: