মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিশ্বকাপের সব ম্যাচই ‘ফিফটি ফিফটি’

প্রকাশিত : ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

অনন্ত দ্বিতীয় পর্বে খেলার স্বপ্ন নিয়েই বাংলাদেশ বিশ্বকাপের ময়দানে পা রেখেছে বা নিজেদের খেলা শুরু করেছে। টাইগারদের সেই স্বপ্নটা মোটেও অবান্তর কিছু নয়। কিন্তু বিশ্বকাপ অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মাটিতে হওয়ায় ব্যাটে-বলে লড়াই শুরুর আগে অনেকের মনে নানা ভয় বাসা বেঁধে ছিল। তার ওপর বিশ্বকাপের আগের বছরটি একেবারেই ভাল কাটেনি বাংলাদেশের। শুধু বছরের শেষ দিকে জিম্বাবুইয়েকে ঘরের মাঠে হোয়াইটওয়াশ করেছিল টাইগাররা। বছরের বাকিটা সময় ঘোর অমানিশার মধ্যে কেটেছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের। এ অবস্থায় বিশ্বকাপে পারফর্মেন্স কেমন হয় তা নিয়ে নানা শঙ্কা কাজ করছিল ভক্ত-সমর্থকদের মনে। যদিও দলের প্রত্যেক সদস্যই বিশ্বকাপে দেশবাসীকে ভাল কিছু উপহার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে আফগানিস্তানের বিপক্ষে জয় টাইগারদের সেই প্রতিশ্রুতি পূরণেরই ইঙ্গিত বহন করে। প্রখ্যাত ক্রীড়া সংগঠক খন্দকার জামিল উদ্দিন মনে করেন প্রথম ম্যাচে শতভাগ সাফল্যের মধ্য দিয়েই বিশ্বকাপ শুরু করতে পেরেছে বাংলাদেশ। জনকণ্ঠের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় টাইগারদের পারফর্মেন্স প্রসঙ্গে খন্দকার জামিল বলেন, ‘বিশ্বকাপ শুরুর পূর্বে চারটি প্রস্তুতি ম্যাচ আমরা খেলেছি। চারটি ম্যাচেই পারফর্মেন্স আশানুরূপ ছিল না। তারপরও প্রথম ম্যাচটা বাংলাদেশ খুব ভালভাবেই শুরু করেছে। সবচেয়ে যেটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, প্র্যাকটিস ম্যাচে আমাদের সেরা ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহীম রান পাচ্ছিল না। সাকিবেরও একই অবস্থা। কিন্তু আসল লড়াইয়ে এসে প্রথম ম্যাচেই তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সাকিব-মুশফিকের অনবদ্য জুটি, মাশরাফি-তাসকিনের চমৎকার বোলিং, সব মিলিয়ে আমি মনে করি বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচের নৈপুণ্য শতভাগ সফল। ‘নন টেস্ট প্লেইং’ দলগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের যে পার্থক্য সেটিও এই ম্যাচের মধ্য দিয়েই পরিষ্কার হয়ে গেছে। ‘আফগানিস্তান নামক যে ভূতটা আমাদের মাথায় চেপে বসছিল তা দূর হয়ে গেছে। সেই এশিয়া কাপে আফগানিস্তানের কাছে হারার পর থেকেই যেন কিছুটা ভীতি আমাদের মধ্যে পেয়ে বসেছিল। বাংলাদেশ খুব ভালভাবেই সেই ভয়টা কাটাতে পেরেছে। টাইগাররা পরিষ্কার করে দিয়েছে সবার কাছে, আফগানিস্তানের মতো দলগুলো দু-একবারই অঘটন ঘটাতে পারে। বার বার নয়। বাংলাদেশ অন্যদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছে আইসিসি সহযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমরা অনেক এগিয়ে। সেই বিষয়টা বাংলাদেশের পারফর্মেন্সে পরিষ্কার হয়ে গেছে।

আফগানদের বিপক্ষে জয়ের পর নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে ব্রিসবেনে অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল মাশরাফি-সাকিবদের। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় মার্সিয়া ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সেই ম্যাচ। এক পয়েন্ট করে ভাগ করে নিতে হয়েছে দু’দলকেই। অনেকের মতে যা বাংলাদেশের জন্য লাভই হয়েছে। ম্যাচ হলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় বা কোন পয়েন্ট অর্জন প্রায় অসম্ভব ছিল বলে বিশ্বাস অনেকের। কিন্তু খন্দকার জামিল তা মানতে নারাজ। তার মতে ম্যাচ হলে জিততে পারত বাংলাদেশও। বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা এবং আমরা সবাই কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটা দেখার প্রত্যাশায় ছিলাম। কারণ বিশ্বকাপে ম্যাচ জয়ের চান্স কিন্তু সবার জন্যই ফিফটি-ফিফটি। ফলে মনে করার কোন কারণ নেই যে খেলা হলে বাংলাদেশ হেরে যেত। বর্তমান অস্ট্রেলিয়া থেকেও ভয়ঙ্কর অস্ট্রেলিয়া দলকে আমরা কার্ডিফে পরাজিত করেছিলাম। ক’দিন আগে আমরা দেখেছি আয়ারল্যান্ডের কাছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হার। এই রেজাল্ট প্রমাণ করে বাংলাদেশের সঙ্গে খেলা হলেই যে অস্ট্রেলিয়া জিতে যেত তা পুরোপরি সঠিক নয়। কেবল সময় তা ভাল বলতে পারত। আমি মনে করি খেলা হলে সম্ভাবনা বাংলাদেশেরও ছিল। কিন্তু বৃষ্টির ওপরে তো কারও হাত নেই। এটা প্রকৃতির বিষয়। আমরা এক পয়েন্ট পেয়েছি। এখন এই এক পয়েন্টের গুরুত্ব বাংলাদেশের কাছে অনেক।’ অস্ট্রেলিয়ার কাছ থেকে পাওয়া এই পয়েন্ট অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে দলকে মানসিকভাবে আরও চাঙ্গা করতে। গ্রুপে থাকা আরেক সহযোগী দেশ স্কটল্যান্ডকেও পরাজিত করব আমরা। এই আত্মবিশ্বাস আমার রয়েছে। পূর্ণ আস্থা রয়েছে মাশরাফিদের ওপর। সেই সঙ্গে শ্রীলঙ্কা, ইংল্যান্ড এবং নিউজিল্যান্ডের মধ্যে যদি আমরা কোন দলকে হারাতে পারি তাহলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়া ম্যাচে পাওয়া এক পয়েন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এটা বাংলাদেশের জন্য একটা প্লাস পয়েন্ট হয়ে আছে।

আগামীকাল নিজেদের তৃতীয় ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মাঠে নামবে বাংলাদেশ। পরের তিনটি ম্যাচের প্রতিপক্ষ যথাক্রমে স্কটল্যান্ড, ইংল্যান্ড এবং নিউজিল্যান্ড। মাশরাফিদের দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলতে হলে এই চার ম্যাচের অন্তত দুইটিতে জয় পেতে হবে। সেক্ষেত্রে শক্তির বিচারে স্কটল্যান্ড পিছিয়ে থাকায় এই দলটিকে হারানো অবধারিত । পাশাপাশি হারাতে হবে শক্তিশলী দলগুলোর একটিকে। সেই বিবেচনায় শ্রীলঙ্কা বা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচেই ইতিবাচক কিছু ঘটার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছি। এই দুটি ম্যাচই টাইগারদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। ‘যেহেতু নিউজিল্যান্ড ঘরের মাটিতে খেলছে এবং নিজেদের মাটিতে তারা সব সময়ই ভয়ঙ্কর। তারপরও ক্রিকেটে শেষ কথা বলে কিছু নেই। সব দলই জয়ের লক্ষ্যে মাঠে নামে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। তবে যদি বলা হয় কোন দলের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাবনা বেশি তাহলে আমি ইংল্যান্ডের নামটাই আগে বলব। ইংল্যান্ডের যে পারফর্মেন্স তাতে বাংলাদেশ জয়ের আশা করতেই পারে। দ্বিতীয়ত শ্রীলঙ্কা। কারণ এই বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কা এখনও পর্যন্ত আহামরি পারফর্মেন্স দেখাতে পারেনি। আফগানিস্তানের বিপক্ষে তারা প্রায় হেরেই যেতে বসেছিল। সেই ক্ষেত্রে আমি মনে করি শ্রীলঙ্কা ও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অন্তত এটি জয় বাংলাদেশ পাবেই। যদিও আশাবাদী মানুষ হিসেবে আমি দু’দলকেই হারাতে চাই। আমাদের ক্রিকেটারদের সেই ক্ষমতা আছে।

তবে লক্ষ্য পূরণে পরের ম্যাচগুলোতে ওপেনারদের আরও ভাল কিছু উপহার দিতে হবে। পেসারদের পারফর্মেন্সে আমি সন্তুষ্ট। প্রথম ম্যাচে ওপেনাররা ভালই করেছে। তারপরও আরেকটু ভাল আশা করি তামিম-এনামুলের কাছে। তারা যদি প্রথম পনেরো ওভারে ৭০-৮০ রান স্কোর বোর্ডে যোগ করে দিয়ে যেতে পারে সেটা পরের ব্যাটসম্যানদের জন্য অনেক সহজ হবে। ওপেনিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের আরেকটু উন্নতি জরুরী। তবে আমাদের স্পিনাররাও সে রকমভাবে কার্যকর হয়ে ওঠেনি। আমাদের স্পিনাররা স্বরূপে ফিরবে পরবর্তী ম্যাচগুলোতে। তবে একটা বিষয় খুবই ভাল লেগেছে। সেটা বাংলাদেশের পেস আক্রমণ। মাশরাফি, রুবেল এবং তাসকিন চমৎকার বোলিং করেছে আফগানিস্তানের বিপক্ষে। সেটা আমাকে খুবই আশাবাদী করে তুলেছে।’

প্রথম ম্যাচে টপঅর্ডার ব্যাটসম্যান মুমিনুল হককে নিচের দিকে খেলানোয় কিছুটা হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। টিম কম্বিনেশন প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে মুমিনুলকে তিন নম্বরে খেলনোর পক্ষে নিজের যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় যেহেতু মুমিনুল আমাদের স্বীকৃত ব্যাটসম্যান এবং সে তিন নম্বর পজিশনে সবসময় ভাল খেলেছে। তাই যদি মুমিনুলকে এগারো জনের দলে রাখা হয় তাহলে আমি মনে করি তাকে তিন নম্বরেই ব্যাট করতে দেয়া উচিত। কারণ সে তিন নম্বর পজিশনে কমফোর্ট ফিল করে। সুতরাং মুমিনুলকে যেহেতু আমি একাদশে রাখছি তাহলে কেন তাকে তার পজিশনে খেলাব না? অপরদিকে মুমিনুলের পজিশনে যাকে খেলাচ্ছি সে কিন্তু একজন সিমিং অলরাউন্ডার। লীগেও আমরা তাকে উপরে নিচে ব্যাট করতে দেখেছি। সুতরাং আমি মনে করি যদি মুমিনুলকে একাদশে রাখা হয় তাহলে তাকেই তিন নম্বর পজিশনটা দেয়া উচিত। মুমিনুল যে জায়গাটায় খেলেছে আমার মনে হয় সৌম্য সরকারকে সেই পজিশনে খেলালে আমাদের কম্বিনেশনটা আরও ভাল হবে। মুমিনুলকে দলে রেখে তিন নম্বর পজিশনে না খেলালে তাকে দলে রাখার যে প্লাস পয়েন্ট সেটা বাংলাদেশ পাচ্ছে না। এর আগেও আমরা কয়েকবার দেখেছি সে নিচের দিকে ব্যাট করে ভাল করতে পারেনি। তার থেকে আমাদের সেরাটা আদায় করতে হলে তাকে আমাদের তিন নম্বরেই ব্যাট করতে দেয়া উচিত।’

এখন পর্যন্ত জ্বলে ওঠা তারকাদের নিয়ে কথা বলতে গিয়ে খন্দকার জামিল বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের মাটিতে বিশ্বকাপ হচ্ছে। সেই বিবেচনায় ভারতের শিখর ধাওয়ান আমার নজর কেড়েছে। নিউজিল্যান্ডের ম্যাককুলাম, কেন উইলিয়ামসন, অস্ট্রেলিয়ার এ্যারন ফিঞ্চ, স্মিথ, ওয়ার্নার, আয়ারল্যান্ডের স্টার্লিং, শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে জয়াবর্ধনে চমৎকার একটা ইনিংস খেলে দলকে রক্ষা করেছে। সাঙ্গাকারাকে আমরা এখনও পর্যন্ত স্বরূপে দেখতে পাইনি। তবে বিশ্বকাপে আমাকে সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছে পাকিস্তানের পারফর্মেন্স। পাকিস্তান যেভাবে খেলছে বিশ্বকাপ বা যে কোন টুর্নামেন্টে পাকিস্তানকে এত অসহায় আমরা কখনও দেখিনি। পারফর্মেন্সের বিচারে পাকিস্তানের পারফর্মেন্স সবচেয়ে বেশি খারাপ মনে হয়েছে আমার কাছে। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার কথা বলব, তাদের যে সুনাম বা যে দাপট নিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে তারা বিচরণ করে কিন্তু বড় বড় আসরে সব সময় আমরা দেখি তারা যেন কেমন হয়ে যায়। ঠিক সেই একই জিনিসটা তারা ভারতের সঙ্গে ম্যাচে দেখিয়েছে। যদিও জিম্বাবুইয়ের সঙ্গে জিতেছে কিন্তু পারফর্মেন্সের মানদ-ে জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে পারফর্মেন্সকে সেভাবে মূল্যায়ন করা যারে না। ওয়েস্ট ইন্ডিজ এখনও পর্যন্ত মিশ্র। খুব ভালভাবে দাপটের সঙ্গে তারা পাকিস্তানকে হারিয়েছে। ঠিক তেমনি আয়ারল্যান্ডের কাছে পর্যুদস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে যদি আমাকে বলা হয় তাহলে আমি বলব, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ভারত, বাংলাদেশ তো বটেই, সঙ্গে সহযোগী দেশগুলোর মধ্যে আয়ারল্যান্ডের পারফর্মেন্স আমার নজর কেড়েছে।’

সবশেষে বাংলাদেশ দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলবে এমনটাই আশা ব্যক্ত করেন তিনি, ‘এখনও পর্যন্ত প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশের যে পারফর্মেন্স এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে যে একটা পয়েন্ট আমাদের ঝুলিতে যোগ হলো সব মিলিয়ে ইংল্যান্ড, শ্রীলঙ্কার যে পারফর্মেন্স তাতে আমি মনে করি এদের মধ্যে যে কোন একজনকে হারাতে পারলেই বাংলাদেশের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত হবে এবং আমার বিশ্বাস বাংলাদেশ অবশ্যই কোয়ার্টার ফাইনালে খেলবে।’

প্রকাশিত : ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২৫/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: