মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

রিপোর্টারের ডায়েরি

প্রকাশিত : ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৭ ফেব্রুয়ারি। সিডনির বাঙালীপাড়া লাকেম্বার রাস্তায় আমাদের কা- দেখতে লোকজন ভিড় করেছে! বাংলাদেশের লালসবুজ জাতীয় পতাকায় গাড়ি সাজাচ্ছিলাম আমরা চারজন। সবাই পরে নিয়েছি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জার্সি। কপালে পতাকা খচিত ব্যান্ড। এরসবই খেলা উপলক্ষে দেশ থেকে এসেছে। আকাশী রঙের একটা টয়োটা করলা সিকা এখন চালাই আমি। লালসবুজ পতাকায় সেটিকে আরও আকর্ষণীয় পঙ্খিরাজ মনে হয়। গন্তব্য ক্যানবেরা। অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী শহর। ১৮ ফেব্রুয়ারি সেখানে আফগানিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশ্বকাপের প্রথম খেলা। এ খেলা নিয়ে অনেক আয়োজন প্রস্তুতি অনেকদিনের। সে জন্য একদিন আগে যাওয়া। লাকেম্বা থেকে ক্যানবেরা ২৯০ কিমি দূর। এদেশে যারা লং ড্রাইভে বেরোন, সাধারণত ভাগাভাগি করে গাড়ি চালান। একজন টায়ার্ড ফিল করলে তাকে বিশ্রামে দিয়ে স্টিয়ারিং ধরেন আরেকজন। কিন্তু সঙ্গী তিনজন এদেশে আসা নতুন ছাত্র। নিশান, রুবাই, রিজু। আমি তাদের বন্ধু, বড়ভাই। তাদের এখনও এদেশে ড্রাইভিং লাইসেন্স হয়নি। আমার সঙ্গে ক্যানবেরা যাওয়ার প্ল্যান করে তারা কাজ থেকে ছুটি নিয়েছে। গাড়ি ভর্তি আমাদের নানান বাজার-সদাই! চলতে শুরু করেছে গাড়ি। লাকেম্বা, ওয়ালি পার্ক, রোজল্যান্ড পেরিয়ে গাড়ি নেমেছে ক্যানবেরাগামী মহাসড়কে। পঞ্চাশ-ষাট কিমি গতির পথ বেরিয়ে মহাসড়কে প্রথমে নব্বই-এক শ’ এরপর এক শ’ দশ কিমি. গতিসীমার পথ! এ দেশের মহাসড়কে অবশ্য এক শ’ দশ কিমিই সর্বোচ্চ গতিসীমা। পথে থেমেছি শুধু একবার একটা ম্যাকডোনাল্ডে নাস্তার বিরতিতে। এদেশের সব মহাসড়কই চার-ছয় লেনের। বাম পাশের লেনে থেকে ১১০ কিমি গতির রাস্তায় ১০০ কিমি গতিতে গাড়ি চালাচ্ছি দেখে পেছনের চালকরা বিরক্ত হয়ে ওভারটেক করে চলে যাচ্ছে দেখে মজা পাই! জীবন এখানে অনেক গতিময়! কেউ কারও জন্যে আস্তে চলতে চায় না। আমাদের তাড়া নেই বলে ধীরে সুস্থে যাচ্ছিলাম। ক্যানবেরা পৌঁছতে পৌঁছতে রাত বাজে দশটা। এদেশের বাঙালীদের জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রিয় অস্ট্রেলিয়া ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা শাহাদাত মানিকের বাসায় গেস্ট হয়ে যাই। চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে বাড়ি। পেশায় প্রকৌশলী ভদ্রলোক সাংবাদিকতা করেন। গান-কবিতা লিখেন। রাতে আমাদের বাবু নামের আরেকজনের বাসায় খাবারের দাওয়াত ছিল। ঢাকা থেকে আসা কয়েক টিভির সাংবাদিককে সিডনি থাকতে শাহাদাত মানিকের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেই। তিনি তাদেরও সে দাওয়াতে নিয়ে আসেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি। বেলা আড়াইটায় খেলা ক্যানবেরার মানুকা ওভালে। সুবিধামতো গাড়ি পার্কিং পাওয়ার আশায় দুপুর ১২টার মধ্যে আমরা স্টেডিয়ামের উদ্দেশে রওনা দিয়ে দেই। শাহাদাত মানিকের পরিবারের সদস্যদের জন্য আমরা জার্সি-ব্যান্ড এসব নিয়ে এসেছিলাম। সেগুলো তারা পরে নেয়ায় দুই গাড়িতে জার্সি পরা ৯ জন টিম বাংলাদেশ ভক্ত। অস্ট্রেলিয়ার সব শহরই ছবির মতো সাজানো-গোছানো। ক্যানবেরাও তেমন। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যারা গেছেন তারা এ শহরের সঙ্গে মিল পাবেন। দুই শহরই একই স্থপতির স্থাপত্য নক্সায় গড়া। দুটিই পুরোদস্তুর অফিস সিটি। অফিস উপলক্ষে লোকজন আসেন। অফিস শেষে চলে যান। যারা থাকেন ক্যানবেরায় তারা জানেন বোঝেন কত ব্যয়বহুল এ শহর! মানুকা ওভাল থেকে একটু দূরে গাড়ি পার্ক করে হেঁটে যেতে যেতে দেখা দৃশ্যটি যে কোন বাংলাদেশীর মনে নাড়া দেবেই। বানের মতো ছুটছে মানুষ! নানান বয়সী নারী পুরুষ শিশু। সবার পরনে টিম বাংলাদেশের জার্সি! সবার হাতে জাতীয় পতাকা! মানুকা ওভালের গেটে চলছিল কনসার্ট। উদ্যোক্তাদের আয়োজনে একদল তরুণ-তরুণী সেখানে নাচছে-গাইছে। কেউবা বাজাচ্ছে ব্যান্ড। নিশান সে ভিড়ে মিশে গিয়ে নাচল কিছুক্ষণ। এরপর তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে স্টেডিয়ামে প্রবেশের লাইনে দাঁড়িয়েছি। সে এক লম্বা লাইন! বেশিরভাগ প্রবাসী বাংলাদেশী। ক্যানবেরায় এত বাংলাদেশী নেই। সিডনিসহ নানা শহর থেকে এত লোকজন ছুটে এসেছেন যে মানুকা ওভাল জুড়ে সৃষ্টি হয়ে গেছে একখ- বাংলাদেশ! এখানে লাইনে টিকেট, ব্যাগ-শরীর সবকিছুরিই তল্লাশী চলছিল। ব্যাগের ভেতর বিয়ার-বোতল এসব আছে কি না তা খুঁজে দেখা হচ্ছিল। অস্ট্রেলিয়ায় এসব স্পোর্টস ভেন্যুর ভেতরে মদ-বিয়ারের দোকান আছে। কিন্তু এসব বাইরে থেকে নিয়ে যেতে দেয় না। ভেতরের দোকানিদের সুবিধার স্বার্থে হয়তোবা। আমাদের সঙ্গে একটি পতাকার বাঁশের কঞ্চিটি ছিল অনেক লম্বা। বার্নিং হাউস নামের একটি দোকান থেকে দশ ডলারে কেনা। কিন্তু পতাকার সঙ্গে ওই কঞ্চিটি গেটে অনুমোদন করা হয় না। ওটা নাকি অস্ত্র হয়ে যেতে পারে! অতঃপর কঞ্চি বাদ দিয়েই পতাকা নিয়ে যেতে হয় ভেতরে। কঞ্চিটা আমরা ফেলতে পারি। আমাদের পতাকা তো ফেলতে পারি না। এ আমাদের প্রাণের পতাকা।

স্টেডিয়ামের ভেতরে ঢুকে দেখি শুধু লাল আর সবুজ রঙের ছড়াছড়ি! শুধু বাঙালী আর বাঙালী! মাঝে মধ্যে কিছু আফগান। বাংলাদেশ গ্যালারিতে এক বয়স্কা বিদেশিনীকে দেখে চমকে উঠি। কথা জমাতেই বললেন তিনি বাংলাদেশকে সমর্থন জানাতে এসেছেন। কেন কেন, জানতে চাইলেই চলে আসে এক মানবিক গল্প। ভদ্র মহিলার জন্ম আমেরিকায়। নাম মালিয়া। ক্যানবেরায় পঞ্চাশ বছর ধরে আছেন। এক সময় বাঁশি বাজাতেন। এখন কাটাচ্ছেন অবসর জীবন। এক সময় এক এনজিওর মাধ্যমে বাংলাদেশের এক গ্রামের মেয়েকে পড়াশুনার টাকা পাঠিয়েছেন অনেক বছর। বছরে ছয় শ’ ডলার পাঠাতেন। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কটা গড়ে উঠেছে সেভাবেই। সেই বাংলাদেশ এখন ক্রিকেট খেলে! বিশ্বকাপ খেলতে এসেছে ক্যানবেরায়। আর আমি কী না এসে পারি? মালিয়ার সঙ্গে কথা বলতে বলতে ওই এলাকায় বিসিবির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য সাজ্জাদুল আলম ববী ভাইকে দেখি। তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেই মালিয়াকে। ছবি তুলি একসঙ্গে। ববী ভাই তার একটি বিজনেস কার্ড মালিয়াকে দিয়ে তাকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। বাংলাদেশকে ভালবাসা মালিয়ার মুখ তখন আরও উজ্জ্বল দেখায়। ততক্ষণে টস জিতে ব্যাট নিয়েছে বাংলাদেশ। টস জয়ের পর থেকেই গ্যালারি শুধু কাঁপছে উচ্চৈঃস্বর চিৎকার আর হর্ষধ্বনিতে। আফগানিস্তানের কিছু ছেলে মাঝেমাঝে আফগানিস্তান আফগানিস্তান বলে পতাকা দোলানোর চেষ্টা করলে বাংলাদেশের ছেলেরা জবাব দেয়, আফগানিস্তান ভুয়া! এক আফগান ছেলে এটি শুনতে শুনতে যখন জবাব দেয়, বাংলাদেশ ভুয়া তখন মজা পায় সবাই! এক পর্যায়ে ছেলেটি পাশে এসে জানতে চায়, ভুয়া বলতে তারা আসলে কী বোঝাচ্ছ? ভুয়ার অর্থ বোঝালে মজা পায় সে। ব্যাটিং ইনিংসে বাংলাদেশের শুরুটা হয়েছে সতর্ক ধীরগতির। সৌম্যই প্রথম ছক্কা মারে। সাকিব-মুশফিক জুটি আসার পর বদলে যায় ইনিংসের চেহারা। তাদের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি মুশফিকের ছক্কায় উচ্ছ্বাসে কাঁপতে থাকে বাংলাদেশ। ইনিংসের মাঝে মাঝে গ্যালারিতে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি স্টেডিয়াম সীমার মধ্যে খ-খ- অন্য চেহারা। কেউ নামাজ পড়তে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। কেউ খাবার কিনতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন খাবার দোকানগুলোর সামনে। অস্ট্রেলিয়ার এসব ভেন্যু সীমার মধ্যে সিগারেট টানার অনুমতি নেই। সিগারেটের জন্য স্টেডিয়ামের বাইরে যেতে হয়। গেটে টিকেট দেখালে দেয়া হয় পাসিং আউটের কার্ড। আবার ভেতরে ঢোকার সময় শরীর-ব্যাগের নিরাপত্তা তল্লাশী হয়। বাংলাদেশের বোলিং ইনিংসের শুরুতেই উইকেট পান মাশরাফি আর রুবেল। ৩-৩-৩! ৩ ওভারে ৩ রানে ৩ উইকেট! বাঁহাতি স্পিনারের জন্যে বিখ্যাত বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার বাউন্সি উইকেটে কী ফলাফল করবে তা নিয়ে অনেকের উদ্বেগ ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের পেসাররা যে অস্ট্রেলিয়ার উইকেটে মানিয়ে নিয়ে বিধ্বংসী হওয়ার যোগ্যতা রাখেন তার প্রমাণ পাওয়া গেছে মানুকা ওভালে। রুবেল শুরুতে উইকেট নিয়েছে। আবার তাকে অভিন্দিত করতে গ্যালারি থেকে হ্যাপি হ্যাপি চিৎকারও হয়েছে! তাসকিনের একটা উইকেট মিস হয়েছে সাকিব ক্যাচ মিস করাতে। নতুবা প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই জ্বলে উঠতেন তরুণ তাসকিন! কিন্তু শেষ পর্যন্ত দল জিতেছে বলে এসব কোন ইস্যু হয়নি। সাকিব দুর্ভাগ্যক্রমে একটা উইকেট পাওয়াতে তার আর ম্যান অব দ্য ম্যাচ হওয়া হয়নি। ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছেন সর্বোচ্চ ৭১ রান করা মুশফিক। পুরো মানুকা ওভাল তখন শুধু বাংলাদেশ বাংলাদেশ বলে নাচছে। আর সারা স্টেডিয়াম জুড়ে দুলছে লাল সবুজ জাতীয় পতাকা! খেলার মাঝে গ্যালারিতে একটা কানাঘুঁষা চললেও তা বিশেষ আমল পায়নি!

ফজলুল বারী, সিডনি থেকে

প্রকাশিত : ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২৫/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: