আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সবশেষে মানুষই জয়ী হয়

প্রকাশিত : ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • মমতাজ লতিফ

যারা বিচার ব্যবস্থার কুশীলব, তাঁরা আমাদের মতোই রক্ত-মাংসের মানুষ, আমাদের মতোই দোষে-গুণে, ভাল-মন্দ মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত মানুষ! মানুষ তো আর দেবতা-ফেরেশতা নয়। সুতরাং নিশ্চয় তাঁদের কিছু প্রশ্ন করলে আদালত অবমাননা হবে না কেননা তাঁরা যখন কোন বেঞ্চে বা ট্রাইব্যুনালে বসেন, বিচার কাজ পরিচালনা করেন, রায় ও দণ্ড প্রদান করেন, সে সময়ের জন্য তাঁরা ‘আদালত’ হিসেবে গণ্য হন অথবা ‘আদালতের সদস্য’ হিসেবে গণ্য হন। ঐ আদালত কর্তৃক পরিচালিত মামলার বিচার কাজ, রায় ও দণ্ড সম্পর্কে সমালোচনা করা হলে তা আদালত অবমাননা গণ্য করেন বিচারকÑ আমার ভুল না হলে বিষয়টি এমনই। অর্থাৎ আদালতের কার্যক্রম, রায় নিয়ে প্রশংসা গ্রহণযোগ্য হবে, বাস্তবিক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত ট্রাইব্যুনালের কয়েকটি রায় ও পর্যবেক্ষণ চিরকাল স্মরণযোগ্য এবং অন্য কনিষ্ঠ আইনজীবীদের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে। এবং একই সঙ্গে আরও কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন সাধারণ আমজনতার মনে ঘটনা পরম্পরায় উঠে আসে যেমন- বিচারক কি জনগণের উর্ধে? না। কেননা, সংবিধানেই তো বলা আছে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার উৎস জনগণ, জনগণই রাষ্ট্রের ভাগ্য নিয়ন্তা। প্রশ্ন উঠেছে, বিচারকের বিচার কাজ, অবশ্যই বিচারক যেহেতু মানুষ, শপথ গ্রহণের সময় সত্য এবং নিজের আবেগকে মুক্ত রেখে বিবেকের দ্বারা চালিত হয়ে সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা বজায় রেখে বিচার কাজ পরিচালনার কথা উচ্চারণ করলেও বিচারকদের সবাই বিবেক-নির্দেশিত হয়ে চলেন, তা কি বলা যায়? তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, বার এ্যাসোসিয়েশন সভাপতি তরুণ আইনজীবী হিসেবে ’৯২ সালে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত যুদ্ধাপরাধীপ্রধান গোলাম আযমের বিচারের লক্ষ্যে আয়োজিত ‘গণআদালতে’র বিচারক সে কনিষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে কাজ করার পর যুদ্ধাপরাধী পক্ষ, যুদ্ধাপরাধী-মিত্র দলের পক্ষ হয়ে যান কিভাবে? অবশ্য মনে মনে বিবেকের দংশন নিশ্চয় তাঁকে ভোগ করতে হয়। কেননা, শেষ পর্যন্ত বিচারকও মানুষ এবং মানুষ হলে তাঁর বিবেক থাকবে এবং বিবেক থাকলে নিজের মানবতাবিরোধী অবস্থানের কারণে বিবেক তাঁকে দংশন করবেই!

উল্লেখ্য, সম্প্রতি এবং আগেও কিছু আইনজীবীÑবিচারকের কাজ বিচারক-আইনজীবীদের মাথা নত করে দিয়েছে এবং এখনও দিচ্ছে। বেচারা, সব সময় সমালোচিত পুলিশ-র‌্যাব অপরাধী খুনী-জঙ্গী-বোমাবাজ, এদের অর্থদাতা-হুকুমদাতাদের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে গ্রেফতার করে আর ক’দিনের মধ্যেই মহামান্য বিচারক-আইনজীবীরা বিবেকের নির্দেশ উপেক্ষা করে দ্রুততার সঙ্গে তাদের জামিনে মুক্তি দেন! প্রায়শই যে মুক্তির অর্থ হয় চিরমুক্তি! কারণ ক’দিন পরেই তারা মহাউৎসাহে আবার খুন-অপহরণ, ধর্ষণ, রাহাজানি-বোমাবাজি-গ্রেনেডবাজি-কুপিয়ে হত্যা-আগুনে হত্যা, পেট্রোলবোমা ছুড়ে হত্যাÑ সবই শুরু করে! অথবা পলাতক হয়ে যায়। এসব কাণ্ডে অর্থের ভূমিকা, পেশাজীবী, আইনজীবীসহ উচ্চবিত্ত মানুষের সীমাহীন অর্থলোভ দেখে বিচারক, আইনজীবীরাই আবার এদের সমালোচনা না করে পারেন না! সুতরাং, পুলিশকে এসব দুর্ধর্ষ অপরাধীকে দেখেও অনেক সময় নিজেকে, পরিবারকে রক্ষা করতে পলাতক গণ্য করতে হয়।

সম্প্রতি, সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানের দণ্ড কার্যকরে স্থবিরতা দেখা দেয়ায় একটি সেমিনারে আইনমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এ বিষয়ে শ্রোতাদের মধ্য থেকে প্রশ্ন ওঠে। আইনমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে এর উত্তরে শপথ অনুযায়ী সত্য তথ্য দিয়েছেন, যে তথ্য জনগণের শিক্ষিত অংশের অজানা নয়। এটি ‘রায়’ প্রকাশিত হওয়ার সময় আদালতই জানিয়ে দিয়েছে যে, মেজরিটি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন, একজন বিচারক এ রায়ে ‘ডিসেন্ট’ দিয়েছেন। কোন বিচারক ‘ডিসেন্ট’ দিয়েছেন তা আদালত উল্লেখ না করলেও শিক্ষিত জনগণ সেটি জানেন।অবশ্যই আমাদের মতো শ্রোতারা এ উত্তরে চরম অসন্তুষ্ট হয়েছি এবং প্রশ্ন করেছিÑ একজন বিচারক একটি রায় লিখতে সর্বমোট কতদিন সময় পান এবং প্রশাসনে যেমন একটি ফাইল কতদিন একজন প্রশাসকের টেবিলে থাকতে পারবে তার সময়সীমা নির্দিষ্ট করা আছে, তেমন সময়সীমা কি বিচারকদের রায় লেখার জন্য নির্দিষ্ট করা নেই? এ প্রশ্নটি পরে আমি নিজে মন্ত্রীকে করেছি এবং এ জন্য কোন নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই জেনে বিমূঢ় হয়েছি! সেমিনারে মুনতাসীর মামুন চরম ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্ন করেছেনÑ যদি আমরা প্রধানমন্ত্রী, এমনকি প্রেসিডেন্টকেও সমালোচনা করতে পারি, তাহলে যে সব বিচারক একটি রায়ের তাঁর অংশটি লিখতে মাসের পর মাস ফেলে রাখবেন, তাঁর সমালোচনা হবে না কেন? এটি কি গ্রহণযোগ্য? তাঁদের কোন জবাবদিহিতা জনগণের কাছে নেই কেন? তাঁদের বিষয়ে কিছু বললে আদালত অবমাননা হয় কেন? তাই যদি হয় তাহলে তাদের যুদ্ধাপরাধী সমর্থক মনে করা হলে এবং যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ড কার্যকরকে ঝুলিয়ে রাখার, যুদ্ধাপরাধীদের সুবিধা দেয়ার জন্য রায় লেখায় অহেতুক দীর্ঘসূত্রতা করেন বলে জনগণ যদি ধারণা করে, তাহলে এর উত্তরে তিনি এবং আইনজীবী-বিচারকরা কি বলবেন? সচেতন নাগরিকের প্রশ্ন, লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধার প্রাণের বিনিময়ে, চার লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে যে আজ আমরা, আইনজীবী-বিচারকসহ সব পেশাজীবী স্বাধীন দেশে স্ব-স্ব অবস্থান অর্জন করেছি, তা কি আমাদের, সব পেশাজীবী ব্যক্তির স্মরণে থাকে না? যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে কোন পেশাজীবী, তিনি বিচারক-আইনজীবী যাই হোন না কেন, তাঁদের আচরণে, কাজে যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি, সন্ত্রাসীদের প্রতি কোনরকম নমনীয়তা, তাদের স্বার্থরক্ষা করে এমন কাজ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, তা কি বলার অপেক্ষা রাখে? অবশেষে ১৩ ফ্রেব্রুয়ারি জানা গেল ঐ রায়টি প্রদান করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বলব, এই ডিজিটাল বিশ্বে এসব প্রকাশিত অথবা অপ্রকাশিত তথ্য জানানো তো একজন জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব, তেমনি এসব তথ্য জানা জনগণের অধিকারও। বরং বিচার ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত আইনজীবী-বিচারকদের মামলা পরিচালনার দিবস সংখ্যা, রায় লিখে জমা দানের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

নিবন্ধের দ্বিতীয় বিষয়Ñ খালেদা জিয়ার আইএস জঙ্গীনেতা হয়ে ওঠার প্রেক্ষিতে বিএনপির গণতন্ত্র সমর্থক নেতাকর্মীদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত, সে বিষয়ে।

জনগণকে আগেই একটি লেখায় লিখেছিলাম। বৃহস্পতিবার স্বদেশ রায় তাঁর লেখায় পরিষ্কারভাবে যা বলেছেন তার মূল কথাÑ খালেদা-তারেক প্রকৃতপক্ষে কোন নির্বাচন চান না, তাঁরা জাওয়াহিরি কথিত আইএসের উপমহাদেশ নেটওয়ার্কের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আইএসের সঙ্গে অবশ্যই জড়িত আছে আইএস মূলত এদেরই নির্দেশে খালেদা-তারেক বাংলাদেশ ধ্বংস, এ দেশের উন্নয়নের পথ রুদ্ধ করে এ দেশের ধ্বংসস্তূপের ওপর ইসলামী জঙ্গী-আইএসের কট্টর ইসলামী হুকুমত কায়েম করা, বাঙালীর হাজার বছরের ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্য-সংস্কৃতি ঠিক ইরাক-সিরিয়ার প্রাচীন ঐতিহ্য ধ্বংসের মতোই ধ্বংস করে দেয়া এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত লক্ষ্য ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক উন্নত আধুনিক বাংলাদেশ ধ্বংস করা। খালেদা-তারেকের জন্য নির্ধারিত এ্যাসাইনমেন্ট হচ্ছে বাংলাদেশ ধ্বংস করা। জনগণকে ভাবতে হবে নির্বাচনে বিশ্বাসী কোন নেতা-নেত্রী কি কখনও দুই মাসব্যাপী নিজ দেশের নিরীহ জনগণকে পেট্রোলবোমা, সঙ্গে অতি দাহ্য কেমিক্যাল দিয়ে পুড়িয়ে মারতে পারে?

বিএনপির প্রকৃত গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী নেতা-কর্মীদের উপলব্ধি করতে হবে বর্তমান মুহূর্তটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত এবং যে মুহূর্তটি জাতি ও তাদের জীবনে সম্ভবত দ্বিতীয়বার আর আসবে না। এই মুহূর্তে সময়ের দাবি ও প্রয়োজনকে বুঝতে পেরে প্রয়োজন একটি সঠিক সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ জাতি বিনাশে পেট্রোলবোমা হাতে দণ্ডায়মান নারীবেশী রাক্ষুসী ও মানুষবেশী দানবকে বর্জন করে সুস্থ, দেশপ্রেমে জারিত গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রকাশ ঘটানো এবং একইসঙ্গে প্রকাশ্যে মানুষ পোড়ানো, দেশ ধ্বংসকারী কর্মকা-কে প্রত্যাখ্যান করা। প্রয়োজনে নতুন নামে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল গঠন করতে পারেন, এমনকি বিএনপি নামটি বর্জন করে নতুন নামও গ্রহণ করা যায়। আগে বলেছি, আবারও বলছিÑ ভদ্রলোক, উচ্চশিক্ষিতদের নিষ্ক্রিয়তা ও নীরবতা ইউরোপে হিটলারের উত্থান ঘটিয়েছিল। তেমনি আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ এখন আর এক নারী-হিটলারের উত্থান প্রত্যক্ষ করছে। সুতরাং এখন যার কাছে যা আছে তাই নিয়ে তাকে নিধন-নিষ্ক্রিয় করতে হবে এবং সেটি দ্রুতই করতে হবে। এর আর কোন বিকল্প নেই। বাংলাদেশে এই নারী-হিটলারেরও পতন হতে চলেছে, এক্ষুণি সময়, সে পতনকে ত্বরান্বিত করতে সক্ষম বিএনপি নেতা-কর্মীদের একযোগে খালেদা-তারেকের বিএনপি থেকে বেরিয়ে আসা এবং রাজপথে প্রকাশ্যে বোমা মেরে মানুষ হত্যার সন্ত্রাসকে প্রত্যাখ্যান করা।

সুশীল সমাজকে বলবÑ যুক্তরাজ্য সরকারকে পত্র দিন, প্রশ্ন করুন, তাদের দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করা ব্যক্তি কোন্ আইনে, কিভাবে বাংলাদেশ ধ্বংসের আদেশ-নির্দেশ দিয়ে অব্যাহতভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে? কোন ব্রিটিশ নাগরিক কি এদেশে বাস করে ব্রিটেনে ব্রিটিশ জাতি ও অর্থনীতি ধ্বংসের কার্যক্রম চালাতে পারবে? সেটি অসম্ভব। সুতরাং ঐ বাঙালী রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তিকে তাদের আইনে বিচার করার দাবি জানান। তাঁরা কিভাবে ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে আপত্তি জানান? অথচ এই তাঁরাই খালেদা-তারেকের পেট্রোলবোমায় মানুষ পুড়িয়ে মারা তথা গণহত্যার বিরুদ্ধে কেন নীরব? এখন কি খালেদা-তারেকের দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়নি?

সবশেষে বলব, খালেদাকে পত্র দিয়ে কোনদিন কোন ইতিবাচক, শুভ পথে ফেরানো আগেও যায়নি, এখন তো আইএস, আইএসের হুকুম পালনকারীর পক্ষে তা আশা করাও বোকামী হবে। বরং এই সন্ত্রাস বন্ধ করতে সরকারের পাশে দাঁড়ান ’৭১-এর মতো। নতুবা হয়ত সেই সময়টুকুও বাকি থাকবে না। জনগণকে বলব, যুগে যুগে কখনও কখনও হিটলারদের উত্থান ঘটে, লাদেনদের জন্ম হয়, তারা অনেক ধ্বংসযজ্ঞ করে, কিন্তু সবশেষে জনমানুষই জয়ী হয়, হিটলাররা ধ্বংস হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রাপ্ত বাংলাদেশকে রক্ষা করতে মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী শেখ হাসিনা সরকারকে দৃঢ় সমর্থন দিয়ে রক্ষা করুন- এ সরকারের জয় ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ আর কিছু চাইতে পারে না। নিজে জয়ী হতে, বাংলাদেশকে, বাঙালীকে বিজয়ী করতে শেখ হাসিনার সরকারকে জয়ী করুন।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

প্রকাশিত : ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২৩/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: