কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাঁচাতে হবে জমি

প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • ড. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন খান

অর্থনীতি শাস্ত্রে ভূমিকে অভিহিত করা হয়েছে উৎপাদনের আদি ও অবিনশ্বর উপাদান হিসেবে। বদ্বীপ তথা প্লাবন সমভূমির দেশ বাংলাদেশ। অত্যন্ত উর্বর এর ভূ-পৃষ্ঠ। অথচ উন্নয়নের নামে এর যথেচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে। বসতি নির্মাণ, নগরায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ ইত্যাদি প্রায় প্রত্যেকটি কাজেই জমির অপব্যবহার তথা অপচয় করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দেখা যায় অস্স্থু প্রতিযোগিতা। ফলে আমাদের দেশের আবাদী জমি আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। ১৯৭২ সালে দেশে আবাদী জমির পরিমাণ ছিল প্রায় সাড়ে আট মিলিয়ন হেক্টর। বিগত ৪৩ বছরে তা কম-বেশি দুই মিলিয়ন হেক্টর হ্রাস পেয়ে বর্তমানে সাড়ে ছয় মিলিয়ন হেক্টরে এসে দাঁড়িয়েছে।

এক হিসেবে দেখা গেছে, আমাদের দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩২০ হেক্টর কৃষি জমি চলে যাচ্ছে অকৃষি কর্মকা-ে। তার মানে বছরে ০.১১৭ মিলিয়ন হেক্টর জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যা বছরে প্রায় ১.৫ মিলিয়ন মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ধ্বংস করে দিচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় ১.০% আবাদী জমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে যা আমরা চাইলেও আর কখনই কৃষি কাজে ফিরিয়ে আনতে পারব না। এভাবে চলতে থাকলে ২০৭১ সালের পর কৃষি কাজের জন্য আমাদের দেশে আর কোন জমি অবশিষ্ট থাকবে না। এ মহাধ্বংসাত্মক প্রবণতা থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে একমাত্র একটি পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার নীতিমালা। এতে যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে সেগুলো হলো:

১. ভূমির আনুভূমিক ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে এবং উল্লম্ব ব্যবহার উৎসাহিত করতে হবে।

২. শিল্পায়নের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত নিকৃষ্ট বা অনুর্বর জমিকে প্রাধান্য দিতে হবে। কোন অবস্থাতেই উর্বর বা উৎকৃষ্ট ভূমি এ কাজে বরাদ্দ দেয়া চলবে না। এ ক্ষেত্রে আধুনিক পরিবহন অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে শিল্পায়নের কাজে প্রত্যন্ত এলাকার অপেক্ষাকৃত অনুর্বর তথা নিকৃষ্ট জমি ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে হবে।

৩. জমির উর্বরতা বৃদ্ধির স্বার্থে জৈব জ্বালানির ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। আর এ জন্যে দেশব্যাপী সিলিন্ডারজাত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। জরুরী ভিত্তিতে সমুদ্র উপকূলে গ্যাস টার্মিনাল স্থাপন করে বিদেশ থেকে ট্যাঙ্কারের সাহায্যে গ্যাস আমদানি করে তা সিলিন্ডারজাত করা যেতে পারে।

৪. নদ-নদী ও সাগর থেকে জমি উদ্ধার করতে হবে। দেশের দক্ষিণ সীমান্ত সাগরের দিকে উন্মুক্ত। ২৪ হাজার কিলোমিটার নদী রয়েছে আমাদের। অনেক স্থানেই এগুলো প্রয়োজনাতিরিক্ত প্রশস্ত। খনন-পুনর্খননের মাধ্যমে এগুলোর গভীরতা বাড়িয়ে ও প্রশস্ততা হ্রাস করে প্রচুর পরিমাণ জমি উদ্ধার করা সম্ভব। চীনসহ মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার অনেক দেশ মরুভূমি থেকে যদি জমি উদ্ধার করতে পারে তা হলে আমরা কেন নদী ও সাগর থেকে তা পারব না। টেকসই উন্নয়ন ও ভবিষ্যত প্রজন্মের কথা মনে রেখে অবশ্যই আমাদের এ বিষয়ে ভাবতে হবে।

৫. বাসস্থানসহ শিল্প-কারখানা, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি যে কোন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বহুতল বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। এতে করে বিপুল পরিমাণ জমি বাঁচানো সম্ভব হবে। পল্লী এলাকায়ও চীনাদের মতো আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ বহুতল (কমপক্ষে ১০ তলা) ভবন নির্মাণ করে জমি উদ্ধার প্রক্রিয়া শুরু করা জরুরী হয়ে পড়েছে।

৬. সড়ক নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। আমাদের দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কিলোমিটার বিভিন্ন ধরনের সড়কপথ রয়েছে যার বেশিরভাগই প্রায় ব্যবহার অনুপোযোগী। পঁচাত্তর পরবর্তী সামরিক শাসনামলে বিশেষ করে আশির দশকে রেলকে অবহেলা করে সড়ক নির্মাণে বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ১৯৯০ সাল নাগাদ দেশে প্রায় তিন লাখ কিলোমিটার সড়কপথ নির্মাণ করা হয়। এতে কম করে হলেও প্রায় এক মিলিয়ন হেক্টর উর্বর তথা উৎকৃষ্ট ফসলী জমি ধ্বংস করা হয়েছে। অথচ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো যদি রেলপথ নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হতো তা হলে এ অপূরণীয় ক্ষতি থেকে আমাদের দেশ রক্ষা পেত। এ জমি আর কোন দিন আমরা ফেরত পাব না। এত রাস্তা নির্মাণ না করে আমরা যদি মাত্র ১০ হাজার কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করতাম তা হলে সড়ক পথের চেয়ে লাখ গুণ বেশি উপকৃত হতো দেশ ও দেশের জনগণ আর এত বিপুল পরিমাণ জমিও হারাতে হতো না।

বর্তমান মহাজোট সরকার রেলপথের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। এটা শুভ লক্ষণ। তবে অত্যন্ত শম্ভুকগতিতে চলছে কাজ। রাজধানী ঢাকা দেশের একেবারে মাঝখানে অবস্থিত। টেকনাফ থেকে ঢাকার যে দূরত্ব, ঠিক একই দূরত্ব তেঁতুলিয়া থেকে । অন্য দিকে সাতক্ষীরা ও তামাবিল থেকেও ঠিক একই দূরত্ব। রাঙ্গামাটি-সাপাহার এবং কলাপাড়া-হালুয়াঘাটের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। দীর্ঘমেয়াদে আমাদের দেশের সীমান্তবর্তী উপরোক্ত গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোসহ স্থল ও নৌ বন্দরগুলোকে আধুনিক রেলপথ নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসা উচিত। মাল্টি ট্রাকবিশিষ্ট রেলপথ নির্মাণ করতে হবে যাতে পথে ক্রসিংয়ের সময় নষ্ট না হয়। সকল ধরনের ক্রসিংয়ে ওভারপাস নির্মাণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। রেলপথকে বিদ্যুতায়িত করা দরকার। প্রয়োজনে নিজস্ব বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে যাতে বিদ্যুত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত না হয়। রেলের সঙ্গে নৌ পরিবহনকে তথা পথকে সমন্বিত করে গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক ও দক্ষ অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে এর কোন বিকল্প নেই। ভারতীয়রা নিজেরাই প্রতিবছর গড়ে ৬০০ কিলোমিটার করে রেলপথ বানাচ্ছে। তারপরও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চীনকে আরও রেলপথ নির্মাণে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। চীন এতে সম্মত হয়েছে। আমাদের সরকারও চীনকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করতে বিশেষভাবে অনুরোধ জানাতে পারে। চীন এতে রাজি হবে। কারণ ব্যবসা-বাণিজ্যসহ যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য দক্ষিণ এশীয় করিডর নির্মাণে চীন বেশ তৎপর। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদের সেøাগান হবে : জমি বাঁচান, দক্ষ ও সুবিস্তৃত রেল ও নৌপথ গড়ে তুলুন, দক্ষ অর্থনীতি গড়ে তুলুন!

অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২২/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: