মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পাল্টে যাচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা

প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • শংকর লাল দাশ

পাল্টে যাচ্ছে দক্ষিণ উপকূলের কৃষি অর্থনীতির চালচিত্র। বৈচিত্র্যপূর্ণ কৃষিপণ্য উৎপাদনের মধ্য দিয়ে ঘটছে এ পরিবর্তন। কৃষকরা যেমন প্রয়োজনের তাগিদে নানাবিধ পণ্য উৎপাদনে এগিয়ে এসেছে, তেমনি সরকারী-বেসরকারী সংস্থা-প্রতিষ্ঠানের সহায়তা-সহযোগিতা সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। ফলে ধানের মতো এক ফসলের ওপর নির্ভরশীলতা ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে। সারাবছর কৃষকদের হাতে আসছে নগদ অর্থ। বাড়ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। কমছে দারিদ্র্য। মোট কথা কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ছোঁয়ায় মানুষের জীবন-জীবিকাতেও লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া।

বরিশাল-পটুয়াখালীসহ দক্ষিণ উপকূলীয় এলাকা বরাবরই ধাননির্ভর। এ অঞ্চলের অধিকাংশ জমিতে বছরে মাত্র একবার আমন ধানের চাষ হতো। বছরের বাকি সময়টা জমি পরিত্যক্ত থাকত। স্বাধীনতার পর থেকে কৃষি ক্ষেত্রে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগতে শুরু করে এ অঞ্চলে। গত এক দশকে রীতিমতো বিপ্লবের সৃষ্টি হয়েছে। মান্ধাতা আমলের চাষাবাদ পদ্ধতি পাল্টে গেছে। এসেছে আধুনিকতা। পরিবেশ-পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে প্রয়োজনের তাগিদেই কৃষক বৈচিত্র্যপূর্ণ কৃষিপণ্য উৎপাদনে এগিয়ে এসেছে। যে জমিতে বছরে একবার ধানের ফলন হতো, সে জমিতেই এখন সারাবছর নানাবিধ ফসলের সমারোহ।

কয়েক বছর আগেও বরিশাল-পটুয়াখালীর কোথাও গোল আলুর চাষ প্রায় হতোই না। এ অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন আলুর চাহিদা মেটানো হতো মুন্সীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে। অথচ এখন কেবলমাত্র পটুয়াখালী জেলাতেই বছরে শত কোটি টাকার গোল আলুর চাষ হচ্ছে। পটুয়াখালী জেলায় গোল আলু চাষের ক্ষেত্রে পথ প্রদর্শন করেছেন গলাচিপা উপজেলার মুরাদনগর গ্রামের উৎসাহী কয়েক কৃষক। বছর দশেক আগে তারা মুন্সীগঞ্জ গিয়ে হাতে কলমে গোল আলু চাষের পদ্ধতি শিখে আসেন। প্রথমে তাঁরা সীমিত পরিমাণ জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে আলুর চাষ করেন। সাফল্যের দেখা পান প্রথম বছরেই। পরের বছর বাড়ে জমির পরিমাণ। বাড়ে উৎপাদন। এরপর ধীরে ধীরে তা গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

গত বছরের মওসুমে গলাচিপা উপজেলায় চার শ’ হেক্টর জমিতে ৪০ কোটি টাকা মূল্যের ৬০ হাজার টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। এবারের মওসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৬৫ হাজার টন নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়েছে সম্পৃক্ত কৃষকের সংখ্যা। অন্তত ১০ হাজার কৃষক এ মুহূর্তে গোল আলু চাষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছে। এ সংখ্যা সামনে ক্রমে বাড়বে, এমনটা আশাবাদ সংশ্লিষ্টদের। একইভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে তরমুজ চাষের বিষয়টি। এ অঞ্চলে বহু আগে থেকে তরমুজের চাষ হলেও এলাকার গ-ির বাইরে তার তেমন চাহিদা ছিল না। কিন্তু গত এক দশকে তরমুজ চাষেও এসেছে যথেষ্ট পরিবর্তন। এক্ষেত্রেও গলাচিপা ও রাঙ্গাবালী উপজেলার কৃষকরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁরা নিয়ে এসেছেন উন্নত জাতের তরমুজ। গত বছরের মওসুমে কেবলমাত্র গলাচিপা উপজেলায় সাড়ে ৭ হাজার হেক্টর জমিতে ৭২ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ৩ লাখ ৩৮ হাজার টন তরমুজের ফলন হয়েছিল। গত বছর ৮-১০ হাজার কৃষক তরমুজ চাষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। এখন এ অঞ্চলের উৎপাদিত গোল আলু কিংবা তরমুজ নিজ এলাকার চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অনেক অঞ্চলেরই প্রধান আমাদানি কৃষিপণ্যে রূপ নিয়েছে।

তরমুজ, গোল আলুর পাশপাশি দক্ষিণ উপকূলে এখন হরেক ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। বিশেষ করে মিষ্টি আলু, ক্ষিরাই, বাঙ্গির মতো বহুল প্রচলিত শষ্যের যেমন ব্যাপক উৎপাদন হচ্ছে, তেমনি তিল, তিসি, সরিষা, মাষকলাইয়ের মতো অপ্রচলিত পণ্যেরও যথেষ্ট উৎপাদন হচ্ছে। অনেক কৃষক এগিয়ে এসেছে সূর্যমুখী ফুলের আবাদে। আদা-মানকচুর মতো ফসলেরও কমবেশি উৎপাদন হচ্ছে। সোয়াবিনের চাষও করছেন বহু কৃষক। মুগ, মসুরের মতো ডালের উৎপাদন বেড়েছে অনেক। বেড়েছে বাদাম ও মরিচের আবাদ। এক সময়ের অবহেলিত দক্ষিণ উপকূল এখন বৈচিত্র্যপূর্ণ কৃষিপণ্য উৎপাদনের কারণে ক্রমে সমৃদ্ধ অঞ্চলে রূপ নিচ্ছে। বাড়ছে স্বাবলম্বী কৃষকের সংখ্যা। বাড়ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। আশ্বিন-কার্তিকের ‘মরা মঙ্গা’ ধীরে ধীরে হলেও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

কৃষি ক্ষেত্রে এ পরিবর্তনে উদ্যোমী কৃষকদের পাশাপাশি সরকারী বিভিন্ন সংস্থা-প্রতিষ্ঠান যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, তেমনি রয়েছে বেসরকারী খাতেরও তৎপরতা। সরকার সার-কীটনাশকসহ নানাভাবে দিচ্ছে ভর্তুকি। দিচ্ছে কৃষি সহায়তা। এ সহায়তা অব্যাহত রাখা গেলে কৃষি ক্ষেত্রে আরও ব্যাপক পরিবর্তন হবে বলে আশা করা যায়।

প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২২/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: