কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শিক্ষক আচরণ বিধি প্রয়োজন

প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • জাফর ওয়াজেদ

রক্ষক যখন ভক্ষক হয়ে ওঠেন, তখন আতঙ্ক, সংশয়, সঙ্কোচ এবং অসহনীয় ক্ষোভ জেগে ওঠাই স্বাভাবিক। আর সেই রক্ষক যদি হন অভিভাবক এবং পথপ্রদর্শক শিক্ষক, তখন ধরণী বিধা হও-এর মতোই অবস্থা হয়। শিক্ষকতা পেশা পবিত্রতার আবরণে সমৃদ্ধ হয়ে আছে মানুষের মনে। সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি প্রতিভাত হয়ে আছেন। ঘর-বাড়ির বাইরে শিক্ষকের ভূমিকাটা সর্বার্থে বাবা-মায়ের মতোই গুরুত্ববহ। কেবল ‘পড়িয়ে গেলাম আর মাসশেষে মাহিনা পেলাম’ জাতীয় বিষয় নয়। শিক্ষকদের স্বীকার করতে হয় অনেক ত্যাগ এবং তিতিক্ষা। অনেক প্রলোভন রাখতে হয় দূরে সরিয়ে। এমন কি কথা বার্তায় আচার আচরণে অনেক সংযম রক্ষা করতে হয়। শিক্ষকের আদর্শ কোন অবাস্তব আকাশ কুসুমের মতো জিনিস নয়। একে ধরা ছোঁয়া যায় না। তার প্রতিফলন ঘটে প্রতিটি শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতায়। এবং শ্রেণীকক্ষের বাইরে সামাজিক সম্বন্ধের বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে। তাই শিক্ষকের ন্যূনতম আচরণবিধিগুলোকে কোনভাবেই অবজ্ঞা করা যায় না। বঙ্কিমচন্দ্র এক সময় শিক্ষকদের ‘অবতার’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।

শিক্ষার ভেতর দিয়েই বিকশিত হয় মনুষ্যত্ব। মানুষের উত্থান, জাগরণ, দর্শন সবকিছুতেই শিক্ষা হচ্ছে মূল। শিক্ষা না থাকার অর্থ হচ্ছে স্থবিরতায় নিমগ্ন থাকা। বাংলাদেশে শিক্ষার অধিকারের জন্য এক সময় আন্দোলন হয়েছে। আর আজ শিক্ষা হয়ে পড়ছে ক্রমাগত অধিকার নয়, বিনিয়োগ। এই ব্যবস্থা শিক্ষিত হয়ে ওঠার পথে অন্তরায় বৈকি।

গৃহিণী যেমন গৃহের প্রাণ, তেমনই বিদ্যালয়ের প্রাণ শিক্ষকরা। কিন্তু সেই প্রাণ যদি হয় প্রাণঘাতী ভ্রমর, তবে তো কঠিন হয়ে পড়ে শিক্ষার্থীর মানসম্ভ্রম রক্ষা। শিক্ষার মান তলানিতে ঠেকবে এটা কেউই যেমন চায় না, তেমনি শিক্ষকের মান লাম্পট্যবাদের ধারক, বাহক ও পূজারি হয়ে উঠবেÑ এটা ভাবাও দুষ্কর। তথাপি সমাজের প্রাণপ্রবাহ শিক্ষাঙ্গনে এসব ঘটছে। শিক্ষকের হাতে পাস-ফেল, ভবিষ্যত কেরিয়ার ইত্যাকার বিষয় যদি অপব্যবহারের হাতিয়ারে পরিণত হয় তবে তো সমাজে ধস নামার, পতনের স্তর তৈরি হতে থাকে। আর এটা স্পষ্ট করে যে, জীবনানন্দীয় ভাষ্য ধরেÑ ‘সকলেই শিক্ষক নয়, কেই কেউ।’ কিন্তু তা তো হবার কথা নয়। শিক্ষকতা তো পেশা হিসেবে যেমন মহান, তেমনি সমাজ বিকাশের বিশাল স্তরও বৈকি। শিক্ষাদীক্ষা মানুষকে সম্পন্ন মানবে পরিণত হবার পথ উন্মোচিত করে।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সংস্কৃতিবান শিক্ষক যে নিদর্শন রাখলেন, তা নতুন নয়। অতীতেও এমন ঘটেছে। কিছু তার প্রকাশ হয়েছে। আবার অনেক ঘটনা অপ্রকাশিত থেকে যায়। পিতার ভূমিকা যার, তিনি যখন জৈবিক আদিম রিপুর তাড়নায় আবিষ্ট হয়ে কন্যাসমর প্রতি কদর্য, অশালীন, অভব্য এবং নিপীড়নমূলক আচরণ করেন, তখন পেশা ও প্রতিষ্ঠানের গায়েও কলুষতার ছাপ পড়ে।

বিজ্ঞান প্রযুক্তি উৎপাদন এই তিনটির অভুতপূর্ব সাফল্যকে ঘিরে যুগের যে পরিবর্তন ঘটে চলেছে, তার প্রভাব ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে অপরিসীম। প্রতিটি বৃত্তিতে নিযুক্ত ব্যক্তি স্ব স্ব ক্ষেত্রে এর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছেন। শিক্ষা ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রমা নেই। বর্তমানে ‘শিক্ষক’ শব্দটাই অপ্রসাঙ্গিক হয়ে পড়েছে। এখন শিক্ষক না বলে শিক্ষকসহায়ক/সহায়িকা বলা হচ্ছে। শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় তথ্য প্রযুক্তি তথা কম্পিউটারের অনন্য ভূমিকাকে খাটো করে দেখার আর সুযোগ নেই। এই অবস্থায় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে ছাত্র-ছাত্রীদের সম্পর্কও আর আগের মতো নেই। প্রতিষ্ঠান-শিক্ষক-অভিভাবক-ছাত্রছাত্রীদের ঘিরে একটা খোলামেলা পরিবেশই এখন সবচেয়ে কাম্য। কিন্তু এই খোলামেলা কথাটিকে হাল্কা করে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে একটা নিগূঢ় শৃঙ্খলাবোধ সর্বক্ষেত্রে জাগ্রত রাখতে হবে এবং এর জন্যই লিখিত বা অলিখিত আচরণবিধি থাকার প্রয়োজন আছে বা থাকা উচিত। এ ক্ষেত্রে অন্য বৃত্তিতে নিযুক্ত ব্যক্তিদের আচরণবিধির ফারাকও মানতেই হবে। কারণ তারা ছাত্রছাত্রীদের নজরে থেকে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার সম্মুখীন হচ্ছেন।

যে শিক্ষকের কাজ শিক্ষার্থীকে আদর্শ মানব হিসেবে গড়ে তোলা, তিনি যদি হয়ে ওঠেন শিক্ষক থেকে রাক্ষস, আর বলে ওঠেন, ‘হাউ মাউ হাউ, নারীর গন্ধ পাউ’, তবে তা ভয়ালচিত্র বৈকি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ছাত্রছাত্রীরা ‘রোল মডেল’ হিসেবে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের গ্রহণ করে থাকেন। সুতরাং শিক্ষক-শিক্ষিকারা ব্যক্তিস্বাধীনতার ক্ষেত্রগুলোকে কতদূর প্রসারিত করবেন, তা তাদেরই ঠিক করে নেয়া উচিত, যাতে ছাত্রছাত্রীদের কাছে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতায় ভাটা না পড়ে। শিক্ষকদের সনাতন আচরণের সঙ্গে আধুনিকতার লড়াই কোনভাবে কাম্য নয় যদিও, তথাপি তা হয়ে আসছে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যালয়-শিক্ষক-অভিভাবক-বিদ্যার্থী কেউই আর পিছিয়ে নেই। অবশ্য আধুনিক বা মডার্ন হবার দায় ও দায়িত্ব অনেক। এটা ঠিকমতো পালন করতে না পারলে, শিক্ষকের গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। আধুনিকতার মূল লক্ষ্য তো যুক্তিগ্রাহ্য বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আয়ত্ত করা। এই বিশেষ মনোভঙ্গি, বোধ বা সচেতনতার জন্য অবশ্যই প্রয়োজন নিজেকে সবদিক দিয়েই সমৃদ্ধ করে তোলা। যাকে ‘আপডেটেড’, ‘আপগ্রেডেড’ বলা হয়। সময়োপযোগী শিক্ষা, শীলন, মূল্যবোধ, মনন, সর্বোপরি আচরণিক সংশ্লেষ ও সমন্বয় ছাড়া এই দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভঙ্গি আয়ত্ত করা অসম্ভব।

শিক্ষা যেমন দেয় জ্ঞান, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, চরিত্র ও কর্মÑ তেমনই আদর্শ শিক্ষকের কাছে পাওয়া যায় সুঅধিত জীবন, বাকশৈলী ও ব্যক্তিত্ব। শিক্ষক তার শ্রেষ্ঠ যা কিছু যদি ছাত্রÑছাত্রীদের দিতে পারেন, তবে তা শতগুণ বর্ধিত হয়ে তাঁর কাছে চরম তৃপ্তি হয়ে ফিরে আসে নবতম জীবন বিন্যাসের আনন্দ নিয়ে। তিনি নিজেই স্ব- ঘোষিত ‘কোড অব প্রফেশনাল এথিক্স’ তৈরি করে নেন। প্রতিদিন না হলেও সপ্তাহে অন্তত একবার, নিদেন পক্ষে প্রতিমাসে একবার ‘সেল্ফ রেটিং’ করে নিজের অবস্থানকে গোপনে গোপনে জেনে নেন কোথায় তার শক্তি, কোথায় দুর্বলতা, কোথায়ই বা তাঁর সুযোগ-সুবিধা এবং সর্বোপরি কোথায় এগিয়ে যাবার পথে বাধা বা সঙ্কট। আচরণবিধি না থাকলে এই ‘হায়ার এ্যান্ড ফায়ার’Ñ এর যুগে তাকে কিন্তু পস্তাতেই হবে আখেরে। হয় তিনি নিজেই আচরণ বিধি ঠিক করে নিবেন অথবা গ্রহণযোগ্য আরোপিত আচরণবিধি মেনে চলবেন। মানুষের মনে ধারণাটা বদ্ধমূলÑ এ দেশের শিক্ষক তথা মাস্টারমশাইরা মোটামুটি বিদ্যাসাগরের অবতার। এই জাগতিক কোন কলুষতা তাদের শ্বেতশুভ্র রাজহংসের মতো তৈলসিক্ত গাত্রে স্পর্শ করতে পারে না বলে, কোনও ধরনের আচরণবিধি দ্বারা তাদের নৈতিক আদর্শের অপমান করা গর্হিত কাজ। কিন্তু বাস্তব সত্য সে কথা বলে না।

শিক্ষকের মান নিচু হলে শিক্ষার মানও যে তলানিতে ঠেকে, সেটা সবার বোধগম্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকটির যে আচরণ প্রকাশিত হয়েছে তাতে নষ্ট ভ্রষ্টরাও যে এ পেশায় ঢুকে পড়েছে এবং দলতন্ত্রের বাহন হয়েÑ তা স্পষ্ট। কারণ শিক্ষক হিসেবে তিনি একটি রাজনৈতিক মতাদর্শগত সংগঠনে জড়িত। সে সুবাদে দলবাজ হয়ে শিক্ষকতায় প্রবেশ করেছেন বটে। তবে শিক্ষকতার আদর্শকে ধারণ করতে না পেরে হয়েছেন শিক্ষাকর্মী। আর তাই নিজ ছাত্রীর প্রতি তার লোলুপতার নিদর্শন ক্ষমার অযোগ্য। এমন পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন যাতে, তা আর কোনদিন কোন শিক্ষকতুল্যর মধ্যে সংক্রমিত না হয়। সর্বাগ্রে জরুরী তাই আজ শিক্ষক আচরণবিধি। কারণ সরকারী তহবিল থেকে তাঁদের জন্যও অর্থ ব্যয় করা হয়ে আসছে। তাই বিধি থাকা দরকার।

প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২২/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: