কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বোমা তৈরির কারখানার সন্ধানে ঢাকায় চিরুনি অভিযান

প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • জামায়াত-জেএমবি-বিএনপি একছাতার নিচে এসে বড় ধরনের নাশকতার ছক ॥ ৪শ’ অর্থদাতার তালিকা উদ্ধার

গাফফার খান চৌধুরী ॥ বোমা তৈরির কারখানার সন্ধানে ঢাকার বিভিন্ন থানা এলাকায় চিরুনি অভিযান চালাচ্ছে যৌথবাহিনী। অপেক্ষাকৃত ঘনবসতিপূর্ণ থানা এলাকাগুলোতে চলছে বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি। ঢাকায় বড় ধরনের নাশকতা চালাতে বোমা তৈরি কারখানা স্থাপনে জামায়াত-শিবির ও জামায়াতের মহিলা শাখা বেনামে টাকা ঢালছে। অর্থদাতা হিসেবে ৪শ’ জনের নামের তালিকা উদ্ধার হয়েছে। আর সাঙ্কেতিকভাবে লেখা রয়েছে অর্থদাতাদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যবসায়িক পরিচয়। তালিকাভুক্তদের কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কয়েকটি বোমা তৈরির কারখানায় বিস্ফোরণের পর আটক ১৫ দফায় রিমান্ডেও তেমন কোন তথ্য মেলেনি। এতে গ্রেফতারকৃতরা জামায়াত-শিবির নাকি অন্য কোন জঙ্গী সংগঠনের প্রশিক্ষিত সদস্য তা নিয়ে রীতিমতো দ্বিধায় পড়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় বড় ধরনের নাশকতা চালাতে বোমা তৈরির কারখানা স্থাপনের বিষয়ে ২০১০ সালের ২৩ মে রাজধানীর কদমতলী থেকে গ্রেফতারকৃত জামায়াতের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ও নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন জেএমবির আমির মুফতি মাওলানা সাইদুর রহমান জাফর আগাম তথ্য দিয়ে গেছেন। সাইদুর রহমান আরও জানিয়েছেন, জেএমবির ৯৫ ভাগ সদস্যই জামায়াত-শিবিরের। জেএমবি জামায়াতের একটি অঙ্গ সংগঠন। জামায়াতের দলীয় নির্দেশেই সাইদুর রহমান জেএমবির আমির নিযুক্ত হন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা লাভ করলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর প্রেক্ষিতে জামায়াত জেএমবিকে পূর্ণ শক্তি নিয়ে ঢাকার চারদিকে অবস্থান নিতে বলে। গড়ে তুলতে থাকে বোমা তৈরির কারখানা আর অস্ত্র গোলাবারুদের মজুদ। বোমা তৈরির কারখানা স্থাপন ও বিস্ফোরক মজুদ প্রক্রিয়াটি ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকবে। সেই পরিকল্পনা মোতাবেকই ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে গোপনে বোমা তৈরির কারখানা স্থাপন শুরু হয়।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এসব বোমা তৈরির কারখানার মধ্যে গত বছরের ২০ জানুয়ারি রাজধানীর বনানীর ছাত্র শিবিরের কারখানাটির সন্ধান পায় পুলিশ। কারখানা থেকে ১৩০ শক্তিশালী তাজা বোমা ও গান পাউডারসহ বোমা তৈরির নানা সরঞ্জাম উদ্ধার হয়। গ্রেফতার হয় ছাত্র শিবিরের বনানী থানা শাখার সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমানসহ ৫ জন।

বনানী মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শেখ শাহিনুর রহমান জনকণ্ঠকে জানান, গ্রেফতারকৃতরা শিবিরের প্রশিক্ষিত বোমা তৈরি, মজুদ, সরবরাহকারী ও বোমাবাজ। তাদের কাছ থেকে চারটি বড় রেজিস্টার উদ্ধার হয়। রেজিস্টারে বোমা তৈরির কারখানা স্থাপনে অর্থায়নকারী অন্তত ৪শ’ জনের নামের তালিকা রয়েছে। তালিকায় অর্থদাতাদের নামের পাশাপাশি তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যবসায়িক পরিচয় সাঙ্কেতিকভাবে লেখা রয়েছে। গোয়েন্দারা ওসব সঙ্কেত উদ্ধারে চেষ্টা চালাচ্ছে। গ্রেফতারকৃতদের দু’দফায় ৫ দিন করে দশ দিনের রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে বোমা তৈরির নেপথ্য কারিগর ও অর্থদাতাদের সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। বোমা তৈরির কারখানা স্থাপনের জন্য জামায়াত-শিবিরের মহিলা শাখাও নিয়মিত চাঁদা দেয়ার প্রমাণ মিলেছে। চাঁদা প্রদানকারীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চললেও অদ্যাবধি কাউকেই গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।

গত ২১ জানুয়ারি লালবাগ থানাধীন ঢাকেশ্বরী এলাকার ৩১ নম্বর বাড়িতে বোমা তৈরির সময় ভয়াবহ বিস্ফোরণে নিউ মার্কেট থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক বাপ্পীর হাতের কব্জি উড়ে যায়। পরবর্তীতে বাপ্পীর মৃত্যু হয়। আহত হয় হ্যাপি (১৪), রিপন (৬) ও রিপনের মা ঝুমুর বেগম (২২)।

সর্বশেষ গত ১৯ ফেব্রুয়ারি হাজারীবাগের ভাগলপুর লেনের ১৩৬ নম্বর বাড়ির দোতলায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে নিহত হয় জসিম উদ্দিন। আহত হয় হাজারীবাগ থানা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক রাজু হোসেন (২৫) ও তার ভাই জিসান (২০)। পুলিশ বাড়ি থেকে তাজা বোমা, বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করে। রাজুর মা ফাহমিদা হককে শুক্রবার ২ দিনের রিমান্ডে পেয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।

হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাঈনুল হাসান জনকণ্ঠকে জানান, তার ছেলের সঙ্গে বাইরের বন্ধুবান্ধব তাদের বাসায় যাতায়াত করত। তবে তারা রুমের ভেতরে কি করত তা তার জানা ছিল না। মাঈনুল হাসান আরও জানান, বিএনপির ডাকা টানা অবরোধে রাজধানীতে নাশকতা চালাতেই ওই বাড়িতে বোমা তৈরির কারখানা স্থাপন করা হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। তবে বোমা তৈরির কারখানার নেপথ্যে আরও কেউ আছে কিনা সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। চিকিৎসাধীন রাজু খানিকটা সুস্থ হলেই কি কারণে এবং কাদের টাকায় বোমা তৈরির কারখানা স্থাপনসহ পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হবে।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ঢাকায় বড় ধরনের নাশকতা চালাতে বিএনপি-জামায়াত-শিবির ও জেএমবিসহ জঙ্গী সংগঠনগুলো এক ছাতার নিচে আসার চেষ্টা করছে। তারা বোমা তৈরির কারখানা স্থাপন করছে। কারখানা স্থাপনের সম্ভাব্য থানা এলাকা হিসেবে হাজারীবাগ, লালবাগ, কামরাঙ্গীচর, বংশাল, চকবাজার, ডেমরা, শ্যামপুর, যাত্রাবাড়ি, কদমতলী, গেন্ডারিয়া, সবুজবাগ, খিলগাঁও, রামপুরা, শাহজাহানপুর, মুগদা, মোহাম্মদপুর, আদাবর, মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল, দারুসসালাম, ভাসানটেক, রূপনগর, বাড্ডা, খিলক্ষেত, ভাটারা, তুরাগ, উত্তরখান ও দক্ষিণখান সন্দেহের তালিকায়। এসব এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ।

লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে এবং সম্ভাব্য ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে তল্লাশি চালানোসহ গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে প্রতিটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার তরফ থেকে বার বার তাগাদা দেয়া হচ্ছে। রাজধানীর প্রতিটি থানায় বোমা তৈরির কারখানার সন্ধানে ধারাবাহিক অভিযান অব্যাহত আছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বড় মাপের নাশকতাকারীরা ইদানীং থাকার জায়গা পরিবর্তন করছে। বিশেষ করে জামায়াত-শিবিরের নাশকতাকারীরা গুলশান, বনানী, উত্তরা, বারিধারা, ধানম-ির মতো অভিজাত এলাকায় বাড়ি, ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বসবাস করছে। তারা বসবাসের আড়ালে নানা ধরনের নাশকতামূলক কর্মকা- চালাচ্ছে। এক্ষেত্রে বাড়িভাড়া আইন মানা হচ্ছে না। অভিজাত এলাকার বাড়ি মালিকদের অধিকাংশই প্রভাবশালী ব্যক্তি। এজন্য তাদের বাসা বাড়িতে তল্লাশি চালাতে নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। আর অপরাধীদের গ্রেফতারের ক্ষেত্রে পড়তে হচ্ছে নানা জটিলতায়। কারণ নাশকতাকারীরা বাড়ি ভাড়া নেয়ার সময় সঠিক নাম ঠিকানা ব্যবহার করছে না।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের উপকমিশনার শেখ নাজমুল আলম জানান, সন্ত্রাসী, নাশকতাকারী, বোমাবাজদের গ্রেফতার এবং বোমা তৈরির কারখানা সন্ধান করতে তারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

প্রসঙ্গত, জেএমবি আমির সাইদুর রহমানের তথ্যের ভিত্তিতেই ইতোপূর্বে ২০১০ সালের ৩০ জুলাই রাজধানীর শাহআলী থানাধীন উত্তর বিশিলের ৭০/ক নম্বর বাড়ি থেকে তিন ধরনের ৪০ কেজি বিস্ফোরক, ১টি এসএমজি (স্মল মেশিনগান), একটি বিদেশী স্বয়ংক্রিয় পিস্তল, একটি তাজা হ্যান্ডগ্রেনেড, বোমার ২৫ ডেটোনেটর, তিন ব্যাগ বোমার স্পিøন্টার, ১৮ রাউন্ড এসএমজি ও নাইন এমএম পিস্তলের গুলি, গ্রেনেডের ৩৬ খোলস, শতাধিক ইলেক্ট্রিক ও কাঁটাযুক্ত ঘড়ি ও বোমা তৈরির ফর্মুলাসহ প্রচুর জিহাদী বই উদ্ধার হয়।

একই বছর ২৭ অক্টোবর মিরপুর-১ নম্বর কালওয়ালপুরের ১/জি,২/১০ নম্বর বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জাম ও জিহাদী বইসহ রাজশাহী-১ আসনের জামায়াতের সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মজিবুর রহমান, খুলনা মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুল আলম ও বেসরকারী নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কন্ট্রোলার জামায়াতে মিরপুর পশ্চিম শাখার আমির মাহফুজুর রহমানসহ ২০ জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়।

২০১১ সালের ১৪ অক্টোবর যাত্রাবাড়ী থানাধীন মিরহাজীরবাগের ৩৬৪ নম্বর পাঁচতলা বিএনপি নেতা কাজী আতাউর রহমানের বাড়ি থেকে দুই দফায় ৯৭ শক্তিশালী বোমা উদ্ধার হয়। ২০১৩ সালের ৫ জানুয়ারি সবুজবাগ থানাধীন রাজারবাগে বরিশাল জেলার হিজলা থানা বিএনপি শাখার একটি ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক খালেক মাঝির (৪৫) বাড়িতে বোমা তৈরির সময় ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে আহত বোমা প্রস্তুতকারী খালেক মাঝি ও ছাত্রদল নেতা রাসেল (২৫) এবং আরাফাতকে (২৪) গ্রেফতার করে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হয় এক কেজি গানপাউডার, প্রায় দুই কেজি বিস্ফোরক, বোমা তৈরির কৌটাসহ নানা সরঞ্জাম।

প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২২/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: