আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিচারপতি হাবিবুর রহমান- আমাদের ইতিহাসের এক ধ্যান গম্ভীর ঐশ্বর্য

প্রকাশিত : ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • স্বদেশ রায়

১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে যে নয় ছাত্রনেতা ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত নেন, আমার সৌভাগ্য এঁদের তিনজনের অপত্য স্নেহে এই ঢাকা শহরে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছি। এঁরা তিনজন, ভাষাসৈনিক গাজী উল হক, চরমপত্রখ্যাত এমআর আখতার মুকুল ও বিচারপতি হাবিবুর রহমান শেলী। তাঁদের এত কাছে থেকে এত বেশি দেখেছি যে, তাঁদের নিয়ে লিখতে গেলে আঙ্গুল কেঁপে ওঠে। সব সময়ই মনে হয়, এ কাজ আমার নয়। আমি কোনমতেই এর যুগ্যি নই। এঁরা একেক জন শুধু ইতিহাসের নায়ক নন, কত বড় মানুষ, কী অগাধ তাঁদের পাণ্ডিত্য ও বাস্তব বোধ ছিল তা প্রকাশের কোন যোগ্যতাই আমার নেই। তাছাড়া ব্যক্তিজীবনে তাঁদের এত স্নেহের চাদরে আবৃত ছিলাম, তাই তাঁদের নিয়ে লিখতে বসলেই চোখ জলে ভরে আসে। লিখতে পারি না। বিচারপতি হাবিবুর রহমানের মৃত্যুর পরে অনেকবার চেষ্টা করেছি। লিখতে পারিনি। কারণ কোথা থেকে শুরু করব? কী লিখব? যেমন ব্যক্তি জীবনে আমি কোন ধর্মীয় আচরণ পালন করি না। নিজের ভাল-মন্দ বোধের ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করি। ছোট বেলায় স্বামী বিবেকানন্দ পড়ে আমার স্থির বিশ্বাস জন্মে, যে অন্ধ তার পথ চলার জন্যে একটা যষ্টি দরকার, কিন্তু যে চোখে দেখতে পায় সে যষ্টি ছাড়া পথ চললে কারও কোন ক্ষতি নেই। সেভাবেই কিশোর বেলা থেকে পথচলা। মায়ের ছোট ছেলে আমি। মায়ের ইচ্ছে ছিল, আমি যেভাবে আমার জীবনচর্যা চালিত করি না কেন, তাঁর শেষকৃত্যটি যেন হিন্দুধর্মীয় মতে (অর্থাৎ হাজার বছরের ভারতীয় লোকাচার অনুযায়ী) করি। বিষয়টিতে আমারও কোন আপত্তি ছিল না। কারণ মায়ের ইচ্ছে অনুযায়ী একটি কাজ করব না এতো হতে পারে না। তারপরেও একদিন বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে বিচারপতি হাবিবুর রহমানকে বলি, স্যার, আমার মায়ের এমন ইচ্ছে অন্যদিকে আপনি তো আমাকে জানেন; জীবনে একদিন না একদিন আমাকে এ বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে সেদিন আমি কী করব? তিনি বললেন, অন্য কোনদিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই। মায়ের ইচ্ছেই বড়। ২০০৫ সালে মা মারা যান। মায়ের অসুস্থতার খবর, মৃত্যুর খবর সবই তিনি জানতেন। তারপরে আমার গোত্র, ঠিকুজি হিসেব করে তিনি যে শ্রাদ্ধের দিনক্ষণটি হিসাব করে রেখেছিলেন তা আমি জানতাম না। নাপিত বাসায় এসে আমার মস্তক মু-নের কাজ শুরু করেছেন মাত্র এমন সময় ফোন। জীবনের বন্ধু চিত্রার কাছে উনি শুনলেন আমি মাথার চুল ফেলতে বসেছি তারপরেও উনি বললেন, চিত্রা তুমি ফোনটা তাকে দাও। ওই অবস্থায় ফোন ধরতেই তিনি বললেন, সব কিছু ঠিকঠাক মতো হোক এটাই প্রার্থনা করি। তোমার মঙ্গল হোক। এত বড় এই মানুষটিকে নিয়ে কি আমার পক্ষে লেখা সম্ভব?

তবু তাঁর এই দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে এসে বার বার মনে হচ্ছে, কিছু না হোক গঙ্গা জলে গঙ্গা পুজোর কিছুটা চেষ্টা করি না! তাঁর কাছে শোনা কিছু কথা, কিছু স্মৃতি এগুলো নিয়ে না হয় কিছু লিখি। যেমন আমার মনে হয় বিচারপতি হাবিবুর রহমানের সব থেকে বড় কাজ তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হিসেবে ১৯৯৬ সালে সামরিক অভ্যুত্থান ঠেকিয়ে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। ওই সামরিক অভ্যুত্থান ঠেকিয়ে সেদিন যদি তিনি নির্বাচন অনুষ্ঠান করাতে না পারতেন তাহলে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর থেকে যে পাকিস্তানী রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা এদেশে চলছিল সেটাই চলত। আদৌ আজকের এই অবস্থানে আসা সম্ভব হতো কিনা, যুদ্ধাপরাধী বিচারসহ আজ যে জঙ্গীবিরোধী যুদ্ধে বাংলাদেশ, এই বাংলাদেশ ফিরত কিনা, এটা বলা সত্যিই কঠিন। বরং এদেশের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে ভিন্ন হতো। হয়ত এতদিনে এদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশনে চলে যেত, যে চেষ্টা এখন জামায়াত ও বিএনপি করছে। বিচারপতি হাবিবুর রহমানের ১৯৯৬-এর ওই ভূমিকা নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক গবেষকরা বিশদ কোন আলোচনা এখনও করেননি। বাস্তবে দেশে ওই মাপের রাজনৈতিক গবেষক নেইও। বরং রাজনীতি বিশ্লেষণের নামে টিভি পর্দায় অনেক কিছু দেখে মনে হয়, সারমেয় চিৎকারের সময় পার করছে দেশ। যাহোক, আমাদের নতুন প্রজন্ম ঠিকই একদিন তার অবদানকে বিশ্লেষণ করে ইতিহাসের পাতায় নিয়ে আসবে।

১৯৯৬ সালে গণআন্দোলনের মুখে খালেদার পনেরো দিনের সরকার শেষ হয়ে যায়। সংবিধানে সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান রাখা হয়। সংবিধান অনুযায়ী বিচারপতি হাবিবুর রহমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হন। দেশের রাষ্ট্রপতি তখন বিএনপি নেতা রাজাকার আব্দুর রহমান বিশ্বাস। অন্যদিকে নির্বাচনের মাঠে নেমেই বিএনপি বুঝতে পারে ওই নির্বাচনে তাদের জয়ের কোন সুযোগ নেই। সামরিক বাহিনীতে তখনও পাকিস্তানী মানসিকতার জোয়ারটি প্রবল। বিএনপি তাই রাজাকার আব্দুর রহমান বিশ্বাস ও সামরিক বাহিনীর পাকিস্তানী মানসিকতার অংশটিকে কাজে লাগিয়ে সামরিক শাসন আনার জন্য সামরিক অভ্যুত্থানের পথ নেয়। যার মূল উদ্দেশ্য মুক্তিযুদ্ধের শক্তি যাতে রাষ্ট্র ক্ষমতায় না আসে। বিএনপি ও সামরিক বাহিনীর পাকিস্তানীমনা অংশের সিদ্ধান্তে সেদিন রাজপথে ট্যাঙ্ক নামে। রাষ্ট্রপতি রাজাকার আব্দুর রহমান বিশ্বাস যে বক্তব্য রাখেন তা সেনাশাসন জারির মতোই। এসব ঘটনা দুপুরের দিকে ঘটে। কিন্তু সেদিন রাজপথের ট্যাঙ্ক আর সেনাবাহিনীর রক্তচক্ষু সর্বোপরি মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে সাংবিধানিক দায়িত্ব বলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হিসেবে বিচারপতি হাবিবুর রহমান জাতির উদ্দেশে ছোট্ট একটি ভাষণ দেন। সামরিক বাহিনীর ওই ট্যাঙ্কের মুখে দাঁড়িয়ে, দৃঢ়তা ও যে বীরত্ব নিয়ে সেদিন তিনি ওই ভাষণ দেন তা বাংলাদেশের ইতিহাসের যুগ পরিবর্তনের একটি ভাষণ। ওই ভাষণের পর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বদলে যায়, মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যায়। আর ১৯৭৩ সালের পর বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়। ১৯৭৫-এর পনেরো আগস্টের পর ওই নির্বাচনের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় আসে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে দীর্ঘ একুশ বছর পরে ক্ষমতায় আসতে অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। অনেক তরুণ বুকের রক্ত দিয়েছে। নূর হোসেন গণতন্ত্রের প্রতীক হয়েছে। তবে তারপরেও এ সত্য স্বীকার করতে হবে ১৯৯৬তে বিচারপতি হাবিবুর রহমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান না হলে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ক্ষমতায় আসতে আরও দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হতো।

বিচারপতি হাবিবুর রহমানের সেদিনের ওই চ্যালেঞ্জ নেয়াকে যে কত কঠিন ছিল তা রাজপথে দাঁড়িয়ে একজন সাংবাদিক হিসেবে দেখেছি। তবে ওই দিন তাঁর সঙ্গে এ নিয়ে কোন কথা হয়নি। কথা বলার সুযোগও ছিল না। এ নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হিসেবে তিনি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে তাঁর সরকারী বাসায় চলে যায়। যদিও শেখ হাসিনা সরকারপ্রধান হিসেবে তাঁকে আরও কয়েক মাস সেখানে থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি থাকেননি। অন্যদিকে গুলশানে তিনি যে ফ্ল্যাটটি নিয়েছিলেন তার কাজও তখন শেষ হয়নি। এ সময়ে সদরে ইস্পাহানি তাকে ইস্পাহানি কলোনির ১০ নম্বর বাড়িটিতে থাকার জন্য অনুরোধ করেন। তিনি সেখানে ওঠেন। তখন অনেকটা তাঁর প্রতিবেশী হই। সকাল-বিকেল দেখা হতো। বিশেষ করে বিকেল হলেই চলে যেতাম। আর তাঁর জন্য অপেক্ষা করতে হতো না কখন তিনি বেইলি রোডে আসবেন বা অন্য কোথাও। ওই সময়ে একদিন তাঁকে প্রশ্ন করি, স্যার ওই সামরিক অভ্যুত্থানের দিন আপনি কিভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? কোন আতঙ্ক বা কোন কিছু আপনার মধ্যে কী কাজ করেছিল? উনি রুপার কাপে রাখা হাল্কা গ্রীন-টিতে একটি চুমুক দিয়ে অতি স্বাভাবিক গলায় বলেন, দেখ স্বদেশ, ওইদিন আমি কিন্তু একদম স্বাভাবিকভাবেই সব কাজ করি। আমার দৈনন্দিন জীবনের কোন রুটিনও আমি পরিবর্তন করেনি। দুপুরের খাওয়ার পরে আমার যা অভ্যাস তাই আমি করি। আমি জানতাম উনি সব সময় দুপুরের খাওয়ার পর ঘণ্টাখানেক ঘুমান। আমি চমকে উঠে বলি, স্যার ওইদিনও আপনি ঘুমিয়েছিলেন? তিনি হেসে বললেন, শোন মজা। আমি তো যথারীতি ঘুমিয়েছি। এদিকে আমার মেয়ে আমেরিকা থেকে বার বার তার মাকে ফোন করছে। সে ভীষণ ওরিড, এই অবস্থায় বাবা ঘুমাচ্ছে। একপর্যায়ে সে তার মাকে বলে, বাবাকে তুমি ঘুম থেকে ডেকে আমার লাইনটা দাও। আমি কথা বলব। ওর মা বলেন, আর একটু পরেই তো তোর বাবা উঠবেন। যাহোক, ঘুম থেকে উঠতেই আবার মেয়ের ফোন। দেখি সে ভীষণ উদ্বিগ্ন। আমি তাকে কোন চিন্তা করতে নিষেধ করি। এদিকে আমি ঘুমের আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যে অবস্থা হোক না আমি আমার ওপর অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করে যাব। কারণ আমি সংবিধান অনুযায়ী শপথ নিয়েছি। তাই আমি ঘুম থেকে উঠেই নির্দেশ দিলাম বেতার ও টিভিকে জানিয়ে রাখতে আমি এই কয়টার সময় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেব। তারপরে আমি কারও সঙ্গে কোন আলোচনা না করে নিজের মনের ওপর নির্ভর করে ভাষণটি লিখতে বসি। আমার স্থির বিশ্বাস ছিল, আমার ওপর যে অর্পিত দায়িত্ব, এটা পালনে আমার সব থেকে বড় সহযোগী আমার মন, আমার বিবেক। দশ মিনিটও লাগেনি। কোন কাটা-ছেঁড়া ছাড়াই আমি ভাষণটি তৈরি করি।

আমি তাঁকে প্রশ্ন করি, আপনার আগে রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাসের বক্তব্য তো প্রচার হয়েছে। এরপরে আপনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন তা কি আপনি রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকারের ধারাবাহিকতা। নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী আমার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন। সেই অনুযায়ী আমি শপথ নিয়েছি সংবিধান অনুযায়ী। অতএব আমার এ দায়িত্ব পালনের জন্য রাষ্ট্রপতির অনুমতি নেয়া বা তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করার কোন প্রয়োজন নেই। আমি তা নেয়নি। আবার তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম, কিন্তু সেনাবাহিনীর ট্যাঙ্ক তখন বাইরে যে কোন কিছু তো ওরা ঘটাতে পারত। আপনার... আমি এ পর্যন্ত বলতেই তিনি বলেন, দেখ আমি সংবিধান অনুযায়ী শপথ নিয়েছি সকল ভয়-ভীতির উর্ধে উঠে আমি আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করব। তাই সেখানে আমার জীবনের কী হবে তা ভাবার কোন সুযোগ আমার থাকে না। আমাকে সংবিধানের অর্পিত দায়িত্বই তো পালন করতে হবে।

তাঁর এ কথা শোনার পরে সেদিন বিচারপতি হাবিবুর রহমানের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হয়েছিল, পৃথিবীতে দুই ধরনের বীর থাকে এক ধরনের বীর পাহাড়ের মতো ধীর-স্থির অবিচল বীরত্ব নিয়ে চলে আরেক ধরনের যারা তারা সমুদ্রের গর্জনের মতো, কূল ভেঙ্গে তছনছ করে আবার নতুন কূল গড়ার বীর। বিচারপতি হাবিবুর রহমান ওই পাহাড়ের মতো বীর। যার বীরত্ব দেখা যায় না, কেবল উচ্চতা আর মৌনতা দেখেই পরিমাপ করতে হয় কত বড় বীর।

বিচারপতি হাবিবুর রহমানের বীরত্বের নানা উপাদান নানাভাবেই যোগ হয়েছিল তাঁর জীবনে। তাঁর সঙ্গে কথা বলে বোঝা যেত জেফারসনের প্রভাব আছে তাঁর জীবনে। তবে জীবনের শেষ অধ্যায়ে তাঁর বীরত্বে ও জীবনচর্যায় পাহাড়ের মৌনতা দিতে যিনি বেশি প্রভাব ফেলেন, তিনি রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ পড়েও যেমন মাঝে মাঝে মনে হয়, তেমনি বিচারপতি হাবিবুর রহমানের সঙ্গে কথা বলতে বলতে মনে হতো, আসলে বালক রবীন্দ্রনাথকে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ পাহাড় দেখাতে নিয়ে গিয়ে কী সম্পদ মানব সভ্যতায় যোগ করেছেন তা পরিমাপ করা কঠিন। তাই কখনও কখনও মনে হয় মহর্ষি মনে হয় পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ পিতার উদাহরণ। বিচারপতি হাবিবুর রহমান সমগ্র রবীন্দ্রনাথ পড়েছিলেন অনেকটা জীবনের শেষ অধ্যায়ের কিছু আগে। একটি বিশেষ লেখার তাগিদ আসে তাঁর কাছে তখন তিনি তাঁদের বলেছিলেন, তাহলে আমাকে সমগ্র রবীন্দ্রনাথ দাও, আমি পড়ে নেই। এই পড়া ও জানার আগ্রহ তাঁর যে কী মাপের ছিল সেটা ভাষায় প্রকাশ করা সাধ্য নয়। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি যেভাবে স্কুলছাত্রের মতো ম্যান্ডারিন ভাষা শিখেছিলেন তা পৃথিবীতে ক’জনের পক্ষে সম্ভব সেটা বলা কঠিন। ম্যান্ডারিন শিখে তিনি অনেক চাইনিজ কবিতা অনুবাদ করেন। সে আরেক অধ্যায়। তা লিখতে গেলে বই হয়ে যাবে। পত্রিকার পাতার নির্দিষ্ট স্পেসে সেটা সম্ভব নয়। তাই আর মাত্র দু’একটা ঘটনা উল্লেখ করে এ লেখা শেষ করব।

২০০৬-এ বিএনপি ক্ষমতা ছাড়ার আগেই রাজপথে গণঅভ্যুত্থান হয়। এবারও বিএনপি বুঝতে পারে নির্বাচনে তাদের ক্ষমতায় যাবার পথ নেই। তারা সেজন্য অনেক কিছু করে। সে ইতিহাস সকলের জানা। যাহোক, একপর্যায়ে ১/১১ হয়। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের দিনক্ষণ আসে। রাতের বেলা ঘটনা ঘটে। বিকেলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হিসেবে ফখরুদ্দিন শপথ নেবেন। বিচারপতি হাবিবুর রহমান তখন গুলশানে থাকেন। দুপুর একটার দিকে আমাকে ফোন করে বলেন, তুমি কি চারটার ভেতর আমার বাসায় আসতে পারবে? তাঁকে জানাই স্যার চারটের আগেই আমি পৌঁছে যাব। তাঁর বাসায় পৌঁছানোর পর দেখি তাঁর কোন তাড়াহুড়ো নেই। মনে মনে ভাবি আমাকে এত জরুরী ডেকে এনে এমন স্বাভাবিক সবকিছু করছেন ব্যাপার কী? বরং উনি হাসতে হাসতে বললেন, দেখ খুব ভাল একটা চাইনিজ গ্রীন-টি দিয়ে গেছে আমাকে এক চাইনিজ মেয়ে। ও কবিতা খুব ভালবাসে। চা-টাও কবিতার মতো। খেয়ে দেখ। কাপ দুয়েক খাওয়া হওয়ার পর তিনি বললেন, আচ্ছা বলত, এই যে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার শপথ নিচ্ছে এরা শপথ অনুষ্ঠানে আমাকে দাওয়াত করেছে। এখানে আমার যাওয়া উচিত কিনা? আমি ঠিক গভীরভাবে চিন্তা না করে মন যা উত্তর দেয় সেভাবেই বলি, স্যার আপনার যাওয়া উচিত। আপনি কেন যাবেন না? উনি বললেন, ঠিক আছে। তাহলে রেডি হয়ে আসি কি বল? বাসায় সাধারণত উনি খাটো করে লুঙ্গি পরতেন আর তার ওপর পোলো শার্ট বা ফতুয়া পরতেন। মাঝে মাঝে চাইনিজ কাঠের স্যান্ডাল পরতেন। সেদিন যতদূর মনে পড়ে তেমনি একটা কিছু পায়ে ছিল। একটু শব্দ তুলে ভেতরে গেলেন। এরপরে টাইয়ের নটটি ঠিক করতে করতে বের হয়ে এলেন। বললেন, চলো তোমাকে অফিসে নামিয়ে দিয়ে তারপর আমি যাব। বলি, স্যার তাতে তো আপানার দেরি হয়ে যাবে। বললেন, ক্ষতি নেই। কথা বলতে বলতে যাই। পথে তাঁর কথা শুনে বুঝতে পারি উনি আমার মতো জানতে চাচ্ছেন যে এই সরকারকে আমি কী ধরনের সরকার মনে করছি। আমার বিবেচনা মতো বলি, স্যার অনেকে যা মনে করছে এই সরকার আওয়ামী লীগের পক্ষের বা একটি ভাল নির্বাচন করার জন্য এসেছে তা আমার মনে হচ্ছে না। এরা ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করবে কিন্তু মাঠের অবস্থা আমি যা জানি তাতে শেষ পর্যন্ত হয়ত পারবে না। এর বেশি আমি বুঝতে পারছি না। উনি আমাকে বললেন, দেখ তেল-গ্যাসটা ঠেকাও। এই সরকার যদি তেল-গ্যাস দিয়ে দিতে পারে তাহলে কিন্তু ঘটনা ভিন্ন হবে। তাঁর ওই একটি কথার পরে তেল-গ্যাস নিয়ে কী হয় সে আরেক অধ্যায় বাংলাদেশের ইতিহাসের। যা হয়ত সকলের অগোচরে থেকে যাবে। তবে ওই সরকার পারেনি তেল-গ্যাস দিতে। এই কথা বলতে বলতে আমার অফিসের সামনে চলে আসি। নামার আগে আমি তাঁকে বলি, স্যার আপনি তো যাচ্ছেন। ওখানে গেলে আরও বিষয় আপনার চোখে ধরা পড়বে। সব কিছু মিলে একটা লেখা আপনি কাল আমাকে দেবেন। সকলে না বুঝুক কিছু মানুষ বুঝবে কোন্ দিকে যাচ্ছে দেশ। পরদিন খুব ভোরেই উনি আমাকে ফোন করেন, বলেন- স্বদেশ তুমি কি একটু নিজে আসবে। কারণ, লেখাটা নিয়ে তোমার সঙ্গে একটু আলোচনা করব। অফিসে যাবার আগে তাঁর বাসায় যাই। গিয়ে দেখি তিনি একটি কবিতা লিখেছেন। কবিতার শিরোনাম ‘রসুন বুনেছি’। শিরোনাম দেখেই আমি বলি, স্যার আর পড়া লাগবে না আমি নিয়ে যাই, ছেপে দেই। কবিতা পড়ে আমি নিজের ধারণা স্বচ্ছ করার সুযোগ পাই। বুঝতে পারি, আবার গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করতে হবে। তাই পরের বৃহস্পতিবার জনকণ্ঠে লিখলাম, অবিলম্বে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করতে হবে। বৃহস্পতিবারের লেখা তখন মঙ্গলবারে লিখতাম। বুধবারে লেখা পেস্টিং হবার পরে সন্ধ্যায় সুধা সদনে যাই। তখন সুধা সদনে ভিড় কমে গেছে। তাই শেখ হাসিনার পড়ার রুমে বসে অনেকক্ষণ কথা হয়। অনেক কথার ভেতর তাঁকে এটাও বলি, এই সরকার যাতে তেল-গ্যাস পানির দামে না দিয়ে দেবার সুযোগ পায় এ কাজ করা দরকার। তিনি সে ব্যবস্থা করেছিলেন। আর তিনিও কথার ফাঁকে একপর্যায়ে বলেন, এপ্রিলের ভেতর নির্বাচন দেয়ার দাবি জানিয়ে তিনি এখন বিবৃতি দেবেন। আমি তাঁকে সেদিন বলিনি, এ কথাই আমি লিখেছি। কাল ছাপা হবে। আমার সৌভাগ্য পরদিনের কাগজে শেখ হাসিনার নির্বাচনের দিন ঘোষণার দাবি ও একই বক্তব্যে আমার লেখা ছাপা হয়। দুপুরে বিচারপতি হাবিবুর রহমান ও বিচারপতি গোলাম রব্বানী দুজনেই আমাকে ফোন করে বলেন, স্বদেশ তোমার লেখাও পড়লাম আর হাসিনার বিবৃতি দেখলাম। বিচারপতি হাবিবুর রহমানকে বলি, স্যার আমি তো আপনার কবিতা পড়েই এ লেখা লিখতে পারলাম। সেদিন ওই তেল-গ্যাস সম্পর্কে তাঁর হুঁশিয়ারি ও এবং গণতন্ত্রের রসুন বুনেছি কবিতা যে ইতিহাসের মোড় নিতে কত সহায়তা করেছিল তাও ভবিষ্যত বলবে। যাহোক, ওই তীব্র রাজনৈতিক সঙ্কটের মাঝে জনকণ্ঠ পত্রিকা নিয়ে মহামুশকিলে পড়ি তখন। সম্পাদক গ্রেফতার হয়ে যান। পত্রিকার কিছু সাংবাদিক, ম্যানেজমেন্টের কিছু লোক ও সামরিক বাহিনীর কিছু সদস্য মিলে পত্রিকাটি দখল করতে চাচ্ছে। এ সময়ে অনেকটা আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে পত্রিকাটি রক্ষার কাজ করছি। আবার ওপরে নানা প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে নির্বাচনের পক্ষে ও শেখ হাসিনার পক্ষে লিখছি। শেখ হাসিনার বড় বড় নেতা তখন সংস্কারবাদী। যাহোক, সে একটা আলাদা সময়। টেলিফোনে হুমকি একের পর এক। কিন্তু এই সময়ে বিচারপতি হাবিবুর রহমান প্রতি মুহূর্তে আমাকে সাহস দিতেন। বলতেন, স্বদেশ তোমার শরীরে মোহনলালের রক্ত, তুমি পারবে। এমআর আখতার মুকুল ভাই নেই, গাজী উল হক কাকু তিনবার স্ট্রোক করে অনেকটা নির্জীব হয়ে বাসায় বসে আছেন। কথা বলতে পারেন খুবই অস্পষ্টভাবে। শুধু তাঁকে যখন বলি, কাকু চিন্তা করেন না, শেখ হাসিনা জেল থেকে মুক্তি পাবেন এবং তিনিই প্রধানমন্ত্রী হবেন। উনি কেবল জড়ানো শব্দে বলেন, তুই ছাড়া কেউ তো এই সাহসের কথা বলে না। তুই আসিস মাঝে মাঝে। নইলে বল পাইনে। এমন একটি সময়ে আমার মতো একজন ক্ষুদ্র সাংবাদিককে সকল প্রতিকূলতার মাঝে সঠিক পথে চলতে সাহস যোগাতেন বিশাল ওই মানুষটি, বিচারপতি হাবিবুর রহমান।

এরপরে তো অনেক চড়াই উৎরাই। তারপরে বিপুল বিজয় নিয়ে শেখ হাসিনা নির্বাচনে জিতলেন। এর কয়েকদিন পরেই বিচারপতি হাবিবুর রহমান স্যারের বাসায় যাই। অনেক উচ্ছ্বাস, অনেক আশা তখন তাঁর মনে। তিনি বলেন, এই বিজয়ের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ বিজয়ের ধারায় প্রবেশ করল। এরপর এক বছর না যেতেই ছোট্ট একটি ঘটনায় তিনি খুব আঘাত পান। বিচারপতি হাবিবুর রহমানের কথা বলার ভঙ্গি, শব্দ চয়ন, তাঁর লেখা সবই ছিল তাঁর নিজস্ব ঢঙের। তাছাড়া একই শব্দ লেখার স্টাইলের কারণে ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে। রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছেন, হীরের দ্যুতি। কিন্তু আমরা সাধারণত আর লেখার স্টাইলের ভেতর দিয়ে শব্দের অর্থ বোঝার যোগ্যতা রাখি না। তাই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে বিচারপতি হাবিবুর রহমান তাঁর এক লেখায় লিখেছিলেন, ২৫ মার্চের পিটুনির পরে। আর তাতেই একদল মুক্তিযুদ্ধ ব্যবসায়ী যাঁরা মুক্তিযুদ্ধকে বেচে বেশ ভালই থাকেন তাঁরা অকালে মায়ের পেট থেকে বেরিয়ে আসা বালখিল্য ঋষিদের মতো রে রে করে ধেয়ে এলেন একালের জাবালির দিকে। তিনি তখন দেশে ছিলেন না। ঘটনাক্রমে আমিও ওই সময়ে দেশে ছিলাম না। আমি দেশে ফেরার বেশ কয়েকদিন পরে তিনি দেশে ফেরেন। ফিরেই অফিসে আমাকে ফোন করেন, বলেন স্বদেশ আমার এই লেখা নিয়ে যা লেখালেখি হচ্ছে তুমি কি মনে করো এর উত্তর দেয়া উচিত। আমি হেসে বলি, স্যার আপনি কেন ওদের লেখার উত্তর দিতে যাবেন? তিনি বলেন, দেখ আমি তোমাকে ছাড়া আর দুজনের সঙ্গে কথা বলেছি এক আমার বন্ধু আনিস (অধ্যাপক আনিসুজ্জামান) আর আমার মেয়ে। তাদেরও একই মতো। ঠিক আছে আমি কোন উত্তর দেব না। ওইদিন তাঁর বিশালত্বে ও আরেকটি ভদ্রতায় শুধু মুগ্ধ নয়, বিস্মিতও হই। আমি তখন দেশে ছিলাম না ওই অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম ভাঙ্গিয়ে কবি অসীম সাহা একটি অশ্লীল লেখা লেখেন বিচারপতি হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে জনকণ্ঠে। এরা কেন এ কাজ করে তা দেশের মানুষ জানে। অমন লেখা জনকণ্ঠে ছাপা হয়েছে দেখে শুধু দুঃখ পায়নি, কষ্টও লেগেছিল এই ভেবে যে, এরা ক্ষুদ্র স্বার্থে শেখ হাসিনাকে এত নিচে নামিয়ে আনে। একবারও ভাবে না শেখ হাসিনা ইতিহাসের নায়ক। সন্তান, তিনি ইতিহাসের মহানায়কের। এই সমুদ্রকে কুয়ায় টেনে আনা কত নিচু কাজ। যাহোক, সেটা নিজস্ব রুচির বিষয়। তবে, বিচারপতি হাবিবুর রহমান তা নিয়ে একটি কথাও আমাকে বলেননি। কোনদিন ওই প্রসঙ্গও তোলেননি। তাই তাঁর এই দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে, ভাষা আন্দোলনের অন্যতম এই সৈনিকের নিয়ে তাঁকে ঘিরে কিছু স্মৃতিচারণ ছাড়া, তাঁকে নিয়ে শুধু বলতে পারি, বালক রবীন্দ্রনাথ কেমন বিস্মিত চোখে পাহাড় দেখেছিল তা উপলব্ধি যেমন করতে পারি না, তেমনি আমাদের মাঝে জন্ম নেয়া, আমাদের ইতিহাসপুরুষ বিচারপতি হাবিবুর রহমান, তুমিও আমাদের কাছে ছিলে পাহাড়। বালকের অপার বিস্ময় নিয়ে তোমাকে দেখেছি। দেখেছি তোমার দীর্ঘ শিখরে ধ্যান, গম্ভীর, ঐশ্বর্য।

প্রকাশিত : ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২১/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: