মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মাতৃভাষা ও জাতিসত্তা

প্রকাশিত : ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • মফিদুল হক

‘বিরূপ বিশ্বে মানুষ নিয়ত একাকী,’ বিশ শতকের মানুষ সম্পর্কে এমন উক্তি ছিল কবি সুধীন দত্তের। ‘মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থেকে যায়’, এমতো উক্তি তাঁরই সমসাময়িক আরেক কবি জীবনানন্দ দাশের। দুই কবির দুই উক্তির মধ্যে আপাত-ফারাক যাই থাকুক তলিয়ে বিচার করলে দেখা যাবে উভয়ের উপলব্ধির ভেতর রয়েছে সত্যের উপাদান। একক সত্তার কাছেই মানুষ শেষ পর্যন্ত দায়বদ্ধ, কিন্তু সেই মানুষই তো আবার পারিবারিক, সামাজিক, গোষ্ঠীগত, জাতিগত, রাষ্ট্রিক, বৈশ্বিক কত-না বন্ধনে যুক্ত। এই বন্ধন কখনো হয় সাময়িক, কখনো দীর্ঘস্থায়ী, আর কখনো-বা বলা যায় চিরস্থায়ী। চিরস্থায়ী বন্ধনের মধ্যে রয়ে যায় জন্মের দাগ- যেমন আছে মানুষের জন্ম-পরিচয়, কিংবা জাতিপরিচয়। মানুষ জন্মের সূত্র কখনোই মুছে ফেলতে পারে না, তা সে জন্মযোগ থেকে যত দূরেই থাকুক। বারাক ওবামা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়ে উঠতে পারেন কিন্তু জন্মসূত্রে তিনি যে মিশ্র ঐতিহ্যের ধারা বহন করছেন সেটা তো কিছুতেই মুছে যাওয়ার নয়। ঠিক তেমনই এক মানববন্ধনী রচনা করে মাতৃভাষা, যা কখনো ভুলে যাওয়ার নয়, মুছে যাওয়ার নয়, যদিও ক্ষেত্র কিংবা পাত্র বিশেষে ঘটতে পারে এর রূপ-রূপান্তর। কয়েক প্রজন্মের মিলনে-মিশ্রণে বিচ্ছিন্নতায়-বিয়োজনে হয়তো নবপ্রজন্মের মানবসন্তান মাতৃভাষা ব্যতিরেকে ভাষার অন্যতর রূপে আশ্রিত হতে পারেন, কিন্তু মানবজাতির অধিকাংশ সদস্য মাতৃভাষার সূত্রে হয় একতাবদ্ধ, এবং সেই বন্ধন প্রবাহিত হয় কাল থেকে কালান্তরে। মাতৃভাষা অবলম্বন করে গোষ্ঠীগত যে সত্তা গড়ে ওঠে সেটাও তাই কখনো মুছে যাওয়ার নয়।

মুছে যাওয়ার নয় বটে, তবে মুছে ফেলবার আয়োজনে কোনো কমতি কখনো ঘটেনি। নিজ ভাষা বর্জন করে পরভাষা অবলম্বনের প্রয়াস তো বহুকাল থেকে দৃশ্যগোচর হয়েছে। কোনো ভাষাভিত্তিক জনগোষ্ঠী যখন কর্তৃত্ববান বিভাষী গোষ্ঠীর মুখোমুখি হয়েছে তখনই জেগে উঠেছে ভাষা নিয়ে সংঘাত। চর্যাপদের ভাষার মধ্যে নিহিত ছিল বাংলাভাষার বীজ। নবম-দশম শতাব্দীতে বৌদ্ধ ধর্মানুসারী সাধারণ মানুষ যখন চর্যাগীতির মাধ্যমে জীবনের অর্থময়তা খুঁজে ফিরছিলেন তখন রাজশক্তির পালাবদলে রাজভাষা হিসেবে সংস্কৃতের অধিষ্ঠান চর্যাগান অপাঙ্ক্তেয় করে তোলে। রাজরোষ মাতৃভাষায় ধর্মচর্চাকে নির্বাসন-দ দিয়েছিল নেপাল কিংবা তিব্বতের মঠে অথবা রাজসভায়। তারপরেও নির্বাসিত বাংলাভাষা একেবারে হারিয়ে যায়নি, লোকভাষারূপে আবারও তো রাজ-স্বীকৃতি ফিরে পেয়েছিল সুলতানি বাংলায়, মধ্যযুগে হিন্দু-মুসলিম মিলিত সাধনায় ঘটছিল এর স্ফূরণ। তবে সেখানেও রাজানুগ্রহ-প্রত্যাশী মানুষ তো ছিল সমাজে যারা দরবারের ফার্সি-চর্চার অনুগত হয়ে বাংলাকে করেছিল অবহেলা। এদের লক্ষ্য করেই মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিম উচ্চারণ করেছিলেন ধিক্কার, ‘যেসবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সেসব কাহার জন্ম নির্ণয়ে না জানি।’

মাতৃভাষা অবলম্বন করে জাতিসত্তার যে বিকাশ নানা টালমাটালের মধ্যেও তার সেই অভিযাত্রা ছিল অব্যাহত। উপনিবেশিক আমলে পাশ্চাত্যের সঙ্গে বাংলার ঘটে আরেক ধরনের পরিচয়, সংযোগ ও সংঘাত। সাত সমুদ্র পারের শাসকগোষ্ঠী ইংরেজী শিক্ষার মাধ্যমে এমন এক শংকর জাতি তৈরি করতে চেয়েছিল যারা গাত্রবর্ণে হবে কৃষ্ণকায়, চিন্তা-চেতনায় শ্বেতাঙ্গ। সেজন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ভারতবাসীকে তাঁদের মাতৃভাষা থেকে বিযুক্ত করা। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে চললেও এই কাজে উপনিবেশিকবাদীরা যে অনেকটাই সফল হয়েছিলেন তা বলা যায়। উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যে জাতীয় আন্দোলন গড়ে উঠতে থাকে সেখানে রাজনীতি ও অর্থনীতি গুরুত্ব পেলেও ভাষার প্রশ্ন বিশেষভাবে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার প্রশ্ন বিশেষ তাৎপর্য অর্জন করে। বিদেশী বস্ত্র বর্জন করে দীনদুখিনী মায়ের দেয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নেয়ার কথা বলেছিলেন কবি, এর পাশাপাশি উঠে এসেছিল স্বদেশী সমাজ নির্মাণে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রশ্ন। বিদেশাগত জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা-সংস্কৃতি বর্জন নয়, বরং স্বাদেশিক বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে তা আলিঙ্গন করা, এমনই ছিল পদানত দেশের জাতীয় নেতাদের অভিপ্রায়।

কিন্তু ব্রিটিশ-বিরোধী জাতীয় মুক্তি আন্দোলন আক্রান্ত হয়েছিল নানা জটিলতা দ্বারা, হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করছিল নতুন নতুন সঙ্কট। অভ্যন্তরীণ এই দ্বন্দ্ব জাতীয় আন্দোলনের মধ্যে দিকভ্রান্তি আরও বাড়িয়ে তোলে, ফলে মাতৃভাষা কখনোই তার শক্তিময়তা নিয়ে দাঁড়াতে পারে না, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টিশীল ও নিষ্ঠাব্রতী নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও। রাজনীতির ক্ষেত্রে বিভাজন মুসলমানদের আবাসভূমি হিসেবে পাকিস্তানের দাবি ক্রমে জোরদার করে তুলতে থাকে এবং পাকিস্তানের দাবি যে-দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে চাইছিল সেখানে উপমহাদেশের মুসলমানরা ‘এক জাতি’ হিসেবে গণ্য হতে লাগলো। এমন দৃষ্টিভঙ্গি ভারতবর্ষীয় মুসলমানদের মাতৃভাষা চর্চার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করতে বিঘœ ঘটায়। বরং মুসলিম লীগের উত্তর-ভারতীয় নেতৃত্ব, আরবিতে অজ্ঞ ফার্সিতে বকলম হলেও, মনে করলেন উর্দুই হতে পারে নানা ভাষাভাষী ভারতীয় মুসলমানদের লিঙ্গুয়া ফ্রাংকা বা সর্বজনীন ভাষা। সর্বজনীন ভাষা যদি কিছু থাকেও সেটা যে মাতৃভাষার বিকল্প হতে পারে না, তেমন কথা বলবার লোক তখন বিশেষ ছিল না। ঘোর এক সাম্প্রদায়িক উন্মাদনার মধ্যে জন্ম নিল পাকিস্তান রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের কাঠামো ও ভিত্তি সম্পর্কে বিশেষ চিন্তা-ভাবনা ব্যতিরেকে মুসলমানদের পাক-ভূমি হিসেবে যার উদ্ভব। ১৯৪৭-এর মধ্য-আগস্টে ভারতভাগের পরিণতিতে ১২০০ মাইলের ভৌগোলিক দূরত্বসম্পন্ন দুই অংশ নিয়ে যে নতুন রাষ্ট্র সেখানে পশ্চিমাংশের মানুষের সঙ্গে পূর্বাংশের কোনো সাক্ষাৎ-পরিচয় ছিল না বললেই চলে। সমাজতাত্ত্বিক বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন জাতীয়তাকে বলেছিলেন কল্পিত নির্মাণ, তাঁর মতে যারা জাতিসত্তার অন্তর্ভুক্ত হিসেবে নিজেদের গণ্য করেন তারা তো কেউ কাউকে কখনো দেখেন নি, জানেন নি, আর তাই কল্পনায় এই সত্তা অনুভব ছাড়া আর কীভাবে ন্যাশনালিটি গঠিত হতে পারে? সেই বিচারে পাকিস্তান অবশ্য কল্পিত জাতিসত্তার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে। কিন্তু বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন জাতিসত্তার আরও দুই বড় বৈশিষ্ট্যের দিকে একেবারেই নজর দেন নি, এর একটি হলো ভাষা, যে-ভাষার ব্যবহার সব মানুষকে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে এবং তারা অভিন্ন ঐতিহ্য ও সমসাময়িকতার ভাষাগত রূপায়ণের মাধ্যমে একত্র হন, যে অনুভূতির রয়েছে বাস্তবরূপ। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভৌগোলিক, যে মাটিতে তাদের বসবাস ও জীবনধারণ, সেটা ভাষার ঐক্যকে বাস্তব ভূগঠনগত ঐক্যের যোগান দেয়। জাতীয়তা আসলে ঐক্যের নির্মাণ, মানুষকে তার সমরূপে একত্র করবার উপায়। এ উপায় ব্যবহার করে সমাজ সংহত হতে পারে, আবার অপব্যবহার দ্বারা অপরে আক্রান্ত হতে পারে। পক্ষান্তরে ধর্মের ঐক্যও মানুষকে একত্র করে, কিন্তু ধর্মের ঐক্য তো জাতিসত্তার ঐক্য নয়, কেননা একই ধর্মের আওতায় বসবাস করতে পারে নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ, নানা দেশের নানা জাতির নানা বর্ণের ও গোত্রের সদস্য। ফলে ধর্ম যে ঐক্যবন্ধন তৈরি করে সেটা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটা কেবল ঐ বিশেষ ধর্মানুসারীদের ঐক্য, সেখানে অন্য ধর্মের কারো ঠাঁই নেই, আর তাই ধর্ম জাতিসত্তার বিকল্প হতে পারে না। কেউ নিজ ধর্ম পাল্টে ফেলতে পারে রাতারাতি, খ্রীস্টান থেকে হয়তো হয়ে পড়লেন মুসলমান, কিন্তু মাতৃভাষা তো কেউ পাল্টাতে পারেন না, তিনি হতে পারেন দ্বিভাষিক কিংবা বহুভাষী, তবে মাতৃভাষা বহন করতে হবে আজীবন, ব্যবহারহীনতা অথবা অপব্যবহারে তা বিলীয়মান কিংবা বিকৃত হতে পারে, তারপরও মাতৃভাষার তিলক কপাল থেকে কখনো মুছবার নয়। তাই জাতিসত্তাও কখনো পাল্টে ফেলবার নয়। তেমনি স্বদেশের ভূগোলও কেউ পাল্টে দিতে পারেন না, যা প্রভাবিত করে জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকা তথা জীবনাচার। কিন্তু পাকিস্তান চেয়েছিল ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র ও ধর্মভিত্তিক জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠা করতে, আর তাই শুরু থেকেই অসঙ্গতি মাথা চাড়া দিয়ে উঠছিল এবং অসম্ভবের পায়ে মাথা কুটতে শুরু করেছিল রাষ্ট্র, যদিও প্রাথমিক উন্মাদনায় সেটা সবার কাছে বোধগম্য ছিল না।

পাকিস্তান বাস্তবে বহু ভাষাভাষী বহুজাতিক রাষ্ট্র, কিন্তু ইউরোপের জাতিরাষ্ট্রের আদলে পাকিস্তানও রাষ্ট্র ও জাতিকে এক করে ফেলতে প্রলুব্ধ হয়েছিল। তবে রাজনীতিবিদরা চাইলেই তো আর সমাজ ও ইতিহাসের বাস্তবতা বদলে দিতে পারেন না। পাকিস্তানের আন্দোলন হয়েছিল বায়বীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলিম জাতিসত্তা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে, কিন্তু পাকিস্তান যখন বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হলো তখন নাগরিকদের জাতিসত্তা কি দাঁড়াবে, তারা কি দ্বিজাতিতত্ত্ব অনুযায়ী মুসলিম জাতি হিসেবে পরিচিত হবেন, নাকি নতুন এক পাকিস্তানী জাতি জন্ম নেবে ইতিহাসের দিন-তারিখ মান্য করে, সেইসব জটিল প্রশ্ন দেখা দিল সামনে। ভারতের মুসলমানদের একাংশ যদি রাতারাতি ‘পাকিস্তানী জাতি’তে রূপান্তরিত হয়, তবে কি বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠী যারা রয়ে গেল ভারতে, পাকিস্তানের ভাষায় হিন্দুস্তানে, তারা হিন্দুস্তানী জাতিতে রূপান্তরিত হবে?

পাকিস্তান যে এক গোঁজামিলের রাষ্ট্র সেটা জানা যাচ্ছিল কতক সংকট থেকে, যার সমাধান দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সম্ভব ছিল না। প্রথম এবং বড় সংকট দেখা দিল ভাষার প্রশ্নে, ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের সংবিধান সভার প্রথম অধিবেশনে স্থির হয়েছিল ইংরেজীর পাশাপাশি উর্দুকে পরিষদের ভাষা হিসেবে গণ্য করা হবে। পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ জনসাধারণের মুখের ভাষা বাংলা, আর তাই কুমিল্লার ধীরেন দত্ত প্রস্তাব এনেছিলেন যে, উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও পরিষদের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হোক। যৌক্তিক এই প্রস্তাবে কর্ণপাত করবার মানসিকতা পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর ছিল না। এর প্রতিবাদে ঢাকায় ছাত্রসমাজ প্রতিবাদী সভা ও মিছিলের আয়োজন করে। মার্চ মাসে এমনি এক মিছিল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা গ্রেপ্তার হলেন, যাঁদের মধ্যে ছিলেন তরুণ তুর্কি শেখ মুজিবুর রহমান। ঘটনা আপাতবিচারে ছোট, কিন্তু তাৎপর্যে বড়। এদিকে ১১ মার্চ পাকিস্তানের স্থপতি হিসেবে অভিহিত মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথমবারের মতো ঢাকায় এসে রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় ঘোষণা করেন যে, উর্দু, একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। প্রতিবাদ উত্থিত হয়েছিল সভার এক প্রান্ত থেকে, কণ্ঠ ক্ষীণ হলেও ঐতিহাসিক তাৎপর্যে বিশাল। পাকিস্তানের পূর্বাংশে যেমন ছিল বাংলা ভাষাভাষী প্রদেশ পূর্ব বাংলা, যে-নামপরিচয় ১৯৫৪ সালে করে দেয়া হলো পূর্ব পাকিস্তান, অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল চার ভাষাভাষী প্রদেশ-সিন্ধু, বেলুচিস্তান, পাঞ্জাব ও পাখতুন তথা ব্রিটিশের দেয়া খটমটে নাম উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ। এহেন পাকিস্তান ভাষাভিত্তিক জাতিপরিচয় মুছে দিতে উদ্যত হয়েছিল, নির্মাণ করতে চাইছিল ধর্মভিত্তিক জাতীয়তা। গণতান্ত্রিক পথে সেটা অর্জন তাদের পথে সম্ভব হচ্ছিল না। সেজন্য শাসকগোষ্ঠী ধর্মকে ব্যবহার করলো ঢাল হিসেবে, আর সামরিক বাহিনীকে তরবারি রূপে। ধর্মের ধুয়া তুলে বাংলার ওপর নানা আঘাত হানবার প্রয়াস শুরু হলো। তথাকথিত ‘ইসলামী বাংলা’ প্রবর্তন, আরবি হরফে বাংলা লেখার চেষ্টা এসব ছিল এর এক ধরনের প্রকাশ। বাঙালী সংস্কৃতিও তাদের আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে উঠলো এবং বাংলা ভাষার অধিকার দমন হলো এক প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা, কেননা বাংলা ভাষার অধিকার অর্থ বাঙালী জাতিসত্তার স্বীকৃতি, যেটা দিতে পাকিস্তান সম্মত ছিল না।

সকল ষড়যন্ত্রজাল ছিন্ন করে বাঙালী জাতিসত্তার অমোঘ উদ্ভাসন আমরা দেখি ১৯৫২ সালে, ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তার জাগরণ ঘটায় একুশে ফেব্রুয়ারি এবং সেই চেতনার আলোকে স্নাত হয়ে বাঙালী জাতি খুঁজে পায় তার মুক্তিপথের নিশানা, জনকণ্ঠে সোচ্চারভাবে ঘোষিত হয়, ‘তোমার আমার ঠিকানাÑ পদ্মা মেঘনা যমুনা’। মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি মিলেমিশে জন্ম দেয় বাঙালীর মুক্তির সংগ্রাম। ১৯৪৮ সালে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় দীপ্ত যে তরুণ হয়েছিলেন কারাবন্দি তাঁরই কণ্ঠে ৭ মার্চ ১৯৭১ ঘোষিত হলো অমোঘ বাণী, ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। জয় বাংলা।’ মাতৃভাষার সুবাদে আমরা মিলিত হয়েছি বাঙালী জাতিসত্তায়, যে ভাষা পরিচয়ের মধ্যে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান ও মুসলিমের রয়েছে সম-অংশীদারিত্ব ও অধিকার। এক ধর্মের অনুসারী হতে পারে নানা জাতিসত্তায় বিভক্ত, ধর্ম সেই জাতি-পরিচয় মুছে দিতে পারে না, পক্ষান্তরে ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তা ধর্মপরিচয়কে অস্বীকার করে না, বরং অঙ্গীকার করে নেয়। ধর্মের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠতে পারে না, এর পরিণতিতে পাকিস্তান আজ ব্যর্থরাষ্ট্রের তিলক কপালে ধারণ করেছে। আর বাংলাদেশ খুঁজে পেয়েছে তার জাতীয় স্থিতি, একে গভীরতর ও তাৎপর্যময় করে তোলাই আজকের চ্যালেঞ্জ, যেজন্য মাতৃভাষার চর্চা ব্যাপক ও সমৃদ্ধতর করে তোলা বহন করে সবিশেষ গুরুত্ব।

প্রকাশিত : ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২১/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: