আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রবক্তৃতা

প্রকাশিত : ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • করুণাময় গোস্বামী

আমি নিউইয়র্ক কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বার্ষিক দক্ষিণ এশিয়া বক্তৃতা ২০১৪ প্রদানের জন্য আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। ২৭ নবেম্বর সোমবার ২০১৪ সন্ধেবেলা বিশ্ববিদ্যালয় ফ্যাকাল্টি হলে বক্তৃতা আয়োজিত হয়েছিল। বিষয় ছিল রবীন্দ্রনাথ- দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষ করে বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতির বিকাশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান। দক্ষিণ এশিয়া বলতে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান মিলিয়ে যে ভারতীয় উপমহাদেশ সেই অঞ্চলকে বোঝায়। ১৯৬৪ সাল থেকে এই বক্তৃতা চলে আসছে। ২০১৪ সালে ছিল বক্তৃতার ৫০তম বর্ষপূরণ। এর আগে এই বক্তৃতা সিরিজে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কখনও আলোচনা হয়নি। ঘটনাটি বিস্ময়কর। দক্ষিণ এশিয়া বক্তৃতার ৫০ বছর চলে যাবে অথচ রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কথা হবে না, সে কী করে হয়। ২০১১ সালে রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মবর্ষে তাঁর ওপর বক্তৃতা হওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু হয়নি। রবীন্দ্রনাথের ওপর এক বা একাধিক বক্তৃতা প্রত্যাশার মধ্যে ছিল। উদ্যোক্তারা আশা করছিলেন শ্রোতৃসমাগম স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হবে। একে ৫০তম বক্তৃতা, ছয়ে বিষয় রবীন্দ্রনাথ এবং তিনে প্রতিপাদ্য ধর্মনিরপেক্ষতা। ৫০তম বক্তৃতা বলে এর একটু বাড়তি গুরুত্ব থাকবেই। বিষয় রবীন্দ্রনাথ বলেও শ্রোতৃসমাগম বাড়বে। কারণ রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে পাশ্চাত্যে বিদ্বজ্জনম-লীতে আগ্রহ বাড়ছে। একটা দীর্ঘ সময় গেছে যখন রবীন্দ্রনাথ পাদপ্রদীপের তলে ছিলেন না। ছিলেন বেশ কয়েক বছর যখন তিনি নোবেল পুরস্কার পেলেন। সে ১৯১৩ সালের কথা। তখন তাঁর খ্যাতি হয়েছিল সাধু-সন্ত হিসেবে। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির খবর যখন ব্রিটিশ পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তখন তাঁকে বলা হয়েছিল প্রোফেট, মিস্টিক। কেন তাঁকে মিস্টিক বলা হচ্ছে তার একটা দীর্ঘ ভাষ্যও প্রকাশিত হয়েছিল। রোগশয্যায় রবীন্দ্রনাথ নির্মলকুমারী মহলানবিশকে বলেছিলেন যে, তাঁর গীতাঞ্জলির কবিতা-গান অনেক তাপিত হৃদয়কে প্রশান্তি এনে দেয় সে খবর জেনে তিনি গভীর তৃপ্তি পান। এর অর্থ সম্ভবত এই যে, সে সময় যে আধ্যাত্মিকতা রবীন্দ্র রচনায় বিশেষ করে তাঁর নীতিকবিতায় আরোপ করা হতো পাশ্চাত্যে, তাতে তিনি অসন্তুষ্ট ছিলেন না। যুদ্ধ দগ্ধ জীবনে শান্তি চাই। সে শান্তি যদি তাঁর কাব্য পাঠ থেকে আসে তাতেও তিনি খুশি। কিন্তু মিস্টিক কবির খ্যাতি স্থায়ী হলো না। একটা ভুলে থাকার যুগ চলে আসল। পশ্চিম কেন রবীন্দ্রনাথকে বিস্মৃত হলো সে নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে, যে কারণে রবীন্দ্রনাথ বিস্মৃত হয়েছিলেন, নব বিশ্বপ্রেক্ষাপটে, নব অনুধাবনের প্রেক্ষাপটে সে কারণটি বা কারণসমূহই রবীন্দ্রনাথকে নব ভাবে জনপ্রিয়তার বৃত্তে নিয়ে আসছে।

রবীন্দ্রনাথ এখন আর জীবন থেকে দূরে বসা কোন সাধু নন, তিনি একেবারে জীবনের মধ্যস্থলে বসা এক আশ্চর্য ভাবুক কবি, যিনি মানুষকে সেখানে এক আশ্চর্য ঈশ্বর বোধ দিয়ে, যে বোধ তাঁর নিজের গড়া, যে বোধ সত্যি সত্যি মানুষকে নানা বিচ্ছিন্নতা অতিক্রম করে একত্রে মিলিত হতে সাহায্য করে। তিনি এক নতুন ঈশ্বর। তাঁর সঙ্গে পূর্বাপর শাস্ত্রবিহিত ঈশ্বরের কোন সম্পর্ক নেই।

বক্তৃতায় শ্রোতৃসমাগম হলো অভাবিত। আমাকে জানানো হয়েছিল এই ধরনের বক্তৃতায় বিশেষজ্ঞ ধরনের শ্রোতা এসে থাকেন। পাকিস্তানে জঙ্গী সমস্যা বা গণতন্ত্রের অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে যদি বক্তৃতা হয় তাহলে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা এসে থাকেন। এসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির সংখ্যা কম। আছেন যাঁরা, তাঁরাও যে সবাই আসতে পারবেন তেমনও কথা নয়। ভারতকে যুক্ত করে বক্তৃতার বিষয় নির্বাচিত হলে লোকসমাগম একটু বেশি হয়। কেননা ভারত বিষয়ে বিশেষজ্ঞের সংখ্যা বেশি, ভারতীয় অভিবাসীও সংখ্যায় বেশি। একাডেমিক এলাকার বাইরে অভিবাসী এলাকা থেকেও কেউ কেউ সাগ্রহ নিয়ে এসে থাকেন। তবে শ্রোতার সংখ্যা ২৫ ছাড়িয়ে যায় না। ১০-১২ জনও হয়। কিন্তু ওয়েবসাইটে ঘোষণা জানানোর পর খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। বিষয় যেহেতু সার্বিকভাবে দক্ষিণ এশিয়া ও বিশেষভাবে বাংলাদেশ এবং রবীন্দ্রনাথের ওপর যেহেতু আলোচনা এবং আলোচনা হচ্ছে যেহেতু ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতির বিকাশের ওপর, শ্রোতা বেশি হবে। বক্তৃতার পর ডিনার, ডিনারের আগে-পরে এক ঘণ্টার প্রশ্নোত্তর। ডিনারে অংশগ্রহণকারীও বেশি হবে। হয়েছিল তেমনি। বক্তৃতা শুরু হবার আগে পর্যন্ত এসেছিলেন ৫২ জন শ্রোতা। আবহাওয়া খারাপ ছিল। কনকনে ঠা-া হাওয়া বইছিল, সেই সঙ্গে ছিল মৃদু তুষারপাত। বক্তৃতা শুরু হবার পরও ১০-১২ জন এসেছিলেন।

বক্তার পরিচয় ও বক্তৃতার বিষয়ের পরিচয় উপস্থাপিত করলেন দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতি বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক। তিনি বললেন যে, আমি অত্যন্ত আশ্চর্য হচ্ছি এ ভেবে যে, গেল ৫০ বছরে দক্ষিণ এশিয়া বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়নি। দক্ষিণ এশিয়ার ভাষা সম্পদ বলে যদি আমরা কোন বিষয়কে শনাক্ত করি, তাহলে যে আমরা পাই রবীন্দ্রনাথের রচনায়। ফলে দক্ষিণ এশিয়াকে জানতে হলে রবীন্দ্রনাথকে জানার বিকল্প নেই। এ জানা ইতিহাস ভূগোল জানা নয়। শত শত বছর ধরে পৃথিবীর সে অঞ্চলে নানা বৈপরীত্যের ভেতর দিয়ে সর্বজনীন সত্যের যে বিকাশ হয়েছে, তার সর্বশ্রেষ্ঠ বিকাশ হয়েছে রবীন্দ্রনাথের রচনায় ও কাজে। এ সন্ধ্যায় আমরা এমন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা শুনব যা শুধু বাংলাদেশের জন্য, ভারতের জন্য বা পাকিস্তানের জন্য প্রয়োজনীয় নয়, সমগ্র উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য প্রয়োজনীয়।

আজ এশিয়ায় বা আফ্রিকার নানা স্থানে মানুষে-মানুষে যে সংঘর্ষ হচ্ছে, তার সবটা কারণ মানুষের জীবনযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আগে বলা হতো, এখনও বলা হয়, সংঘর্ষ থামাতে হলে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে দারিদ্র্য বিমোচন চাই। দারিদ্র্য সকল দোষের হেতু। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, দেশে দেশে এই যে অশান্তি ঘটছে, মানুষ মানুষকে হত্যা করতে পর্যন্ত পিছপা হচ্ছে না, এর সবটা কারণ অর্থনীতির মধ্যে নেই। ১৯৪৭ সালে ভারত যে ভাগ হলো, সেই বিভাজনের মূল কারণ আর্থিক ছিল না। কারণ ছিল ধর্ম। ধর্ম নিয়ামক জাতীয়তাবোধ। কী দুর্বিপাক গেছে ভারত স্বাধীন হওয়ার আগে ও পরে। কত মানুষের প্রাণ গেল, কত মানুষের মান গেল, শত সহস্র ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেল। সে আগুন এখনও নিভছে না। এই আগুন জ্বলল, এই যে বহু কিছু পুড়ে ছারখার হলো, এর দায় গিয়ে পড়ল ঈশ্বরের ওপর। ধর্মবোধ যেখানে কাজ করে, ঠিক-বেঠিক যেভাবেই হোক ঈশ্বরকে সেখানে দায় নিতে হয়।

রবীন্দ্রনাথের গোরা উপন্যাসের নায়ক গোরা। তাঁর অনুধ্যানের বিষয় ছিল কীভাবে ভারতের মানুষের মধ্যে মিলনের সূত্রটি গড়ে তোলা যায়। গোরার মনে হতো যদি ভারতের মানুষকে মিলিত করা না যায় তাহলে ভয়াবহ বিপর্যয় হবে। সে বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল ১৯৪৬ সালে, ১৯৪৭ সালে। গোরার মনে হয়েছিল, ভারতের মানুষের জীবনযাপনে প্রায় সকল বিষয়ে মিল আছে, শুধু মিল নেই ঈশ্বর বিষয়ে। তারা ব্যাধিতে এক, ক্ষুধায় এক, ক্রোধে এক, শোকে এক, সুন্দরে এক। এক নয় শুধু ঈশ্বর বোধে। ঈশ্বর বোধে যে এক নয়, এই বিষয়টি সকল ঐক্য ভ-ুল করে দিয়ে প্রচ- মারমুখী আবহ রচনা করে। গোরার জীবন কাহিনী যখন আশ্চর্য এক আবিষ্কারের ভেতর দিয়ে গিয়ে সমাপ্ত হয় তখন তাঁর মনে হয় যে দীর্ঘকাল ধরে ভারতের মানুষের মধ্যকার অনৈক্যের উপাদানগুলো যে তিনি শনাক্ত করেছেন তাতে তাঁর মনে হয়েছে যে, ঈশ্বর বোধে সমতা না আসলে মানুষের মধ্যে সম্পর্ক-সাম্য আসবে না। আর সম্পর্ক-সাম্য যদি না আসে তাহলে সুশীল মিলিত জীবন সম্ভব নয়। সে জন্য গোরা বলছেন, তিনি এমন একজন দেবতার সন্ধান করছেন যিনি হিন্দুর দেবতা নন শুধু, তিনি ভারতবর্ষের দেবতা। উপন্যাসে একেবারে শেষভাগে গোরা পরেশবাবুকে বলছেন, ‘দেখুন পরেশ বাবু, কাল রাত্রে আমি বিধাতার কাছে প্রার্থনা করেছিলুম যে আজ প্রাতঃকালে আমি যেন নূতন জীবন লাভ করি। এতদিন শিশুকাল থেকে আমাকে যে কিছু মিথ্যা, যে-কিছু অশুচিতা আবৃত করেছিল আজ যেন তা নিঃশেষে ক্ষয় হয়ে গিয়ে আমি নবজন্ম লাভ করি। আমি ঠিক যে কল্পনার সামগ্রীটি প্রার্থনা করেছিলুম ঈশ্বর সে কথায় কর্ণপাত করেননি। তিনি তাঁর নিজের পত্য হঠাৎ একেবারে আমার হাতে এনে দিয়ে আমাকে চমকে দিয়েছেন। তিনি যে এমন করে আমার অশুচিন্তাকে একেবারে সমূলে ঘুচিয়ে দেবেন তা আমি স্বপ্নেও জানতুম না। আজ আমি এমন শুচি হয়ে উঠেছি যে, চ-ালের ঘরেও আমার আর অপবিত্রতার ভয় রইল না। পরেশ বাবু আজ প্রাতঃকালে সম্পূর্ণ আবৃত্ত চিত্তখানি নিয়ে একেবারে আমি ভারতবর্ষের কোলের ওপর ভূমিষ্ঠ হয়েছি, মাতৃক্রোড় যে কাকে বলে এতদিন পরে তা আমি পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি। আজ মুক্তি লাভ করে প্রথমেই আপনার কাছে কেন এসেছি জানেন? আপনার কাছে মুক্তির মন্ত্র আছে। সেই জন্য আপনি আজ কোন সমাজেই স্থান পাননি। আমাকে আপনার শিষ্য করুন। আপনি আমাকে আজ সেই দেবতার মন্ত্র দিন। যিনি হিন্দু-মুসলমান-খ্রীস্টান ব্রহ্মে সকলেরই, যাঁর মন্দিরের দ্বার কোন জাতির কাছে, কোন ব্যক্তির কাছে কোন দিন অবরুদ্ধ হয় না, যিনি কোনর হিন্দুর দেবতা নন, যিনি ভারতবর্ষের দেবতা।’ গোরা বা রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করছেন যে, ভারতবর্ষে সকল সম্প্রদায়ের সকল পেশার মানুষের মধ্যে যদি সম্প্রীতি রচনা করতে হয় তাহলে একজন ভারতবর্ষের দেবতা চাই, এক সাধারণ, কমন অর্থে, ঈশ্বর তাই যিনি সকলকে শেখাতে পারেন। শান্ত ঈশ্বরকে সম্প্রদায়গত করে রাখে, মানবগত করতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ এ জায়গাটিকে ধরলেন এবং সবার জন্য বোধগম্য ও ভালবাসা সাধ্য ঈশ্বরের ভাব প্রতিষ্ঠা করলেন। তিনি শুধু ভারতবর্ষের ঈশ্বর নন, তিনি সমগ্র পৃথিবীর ঈশ্বর, তিনি পৃথিবীর সকল মানুষের ঈশ্বর। তিনি শাস্ত্রের বাইরেকার কবির ঈশ্বর। প্রধানত ১৯০০ সাল থেকে ধরলে ১৯৪০ পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে রবীন্দ্রনাথ শত শত গানে এই সর্বজনীন ঈশ্বরের রূপটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। নদী-সমুদ্র-পর্বত মানুষকে ভাবের রাজ্যে মিলিত করে, আকাশ-বাতাস-আলো মানুষকে ভাবের রাজ্যে মিলিত করে, রোগ-দুঃখ-শোক মানুষকে মিলিত করে, রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর মানুষকে মিলিত করেন। শত বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য রচনা করেন। তিনি ধর্ম নিরপেক্ষ ঈশ্বর। রবীন্দ্রনাথের এই ধর্মনিরপেক্ষ ঈশ্বর ভাবনা সম্পর্কে শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, পাশ্চাত্যেও আগ্রহ প্রচুর।

প্রকাশিত : ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২১/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: