কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ইংরেজীর ভুবনায়ন

প্রকাশিত : ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • আন্দালিব রাশদী

ইংরেজী অভিধানে শব্দ সংখ্যা ছয় লক্ষেরও বেশি। শত শত বছর ধরে বিভিন্ন ভাষার শব্দ হরণ করে ইংরেজি সমৃদ্ধ করেছে নিজের শব্দ ভা-ার। বিজাতীয় শব্দ ইংরেজী কথনে ও লিখনে ঢুকে পড়লে হাত গেল। ভাষার পবিত্রতা নষ্ট হয়ে গেল বলে শোর উঠে না। হরণ করা শব্দের কোন্টা রাখবে আর কোন্টা উগরে দেবে ভাষার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ গতিশীলতাই তা নির্ধারণ করে দেয়। আরোপিত সব বিদেশী শব্দই আত্তীকরণ করে না। সাম্রাজ্যবাদের ভাষা বলে যত গালই দেয়া হোক না কেন, পৃথিবীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ জনশক্তির ব্যবহারিক ভাষা এখন ইংরেজী। ২০১৪ সাল নাগাদ ৫৮টি সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং ২১টি অ-সার্বভৌম অঞ্চলের দাফতরিক ভাষা ইংরেজী। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের বার্বাডোস, গ্রানাডা থেকে শুরু করে আফ্রিকার কেনিয়া, ক্যামেরুন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সিঙ্গাপুর ও ফিলিপিন্সন, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপাঞ্চল ইংরেজ উপনিবেশের মানচিত্র যে দিকেই সম্প্রসারিত হয়েছে, ইংরেজী ভাষা সেখানেই শিকড় গেড়ে বসতে পেরেছে। কিন্তু লক্ষণীয় ইংরেজী ভাষাভাষী তিনটি প্রধান দেশ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়া কোনটিতেই ইংরেজীকে দাফতরিক ভাষা ঘোষণা করা হয়নি। তবে স্কটল্যান্ড ও ওয়েলশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ২৮টি অঙ্গরাজ্যে ঘোষিত দাফতরিক ভাষা ইংরেজী। হাওয়াই অঙ্গরাজ্য নিজস্ব হাওয়াইওয়ান ভাষার সঙ্গে ইংরেজীকে দাফতরিক ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছে। আলাস্কা কিংবা লুইজিয়ানার মতো অঙ্গরাজ্যের কোন ঘোষিত দাফতরিক ভাষা নেই।

রোমানরা ব্রিটেনে লাতিন ভাষা নিয়ে আসে। ব্রিটেন তখন রোম সাম্রাজ্যের অংশ। পঞ্চম খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রোমান অধিকার বলবৎ থাকে। রোমান অধিকার প্রত্যাহারের পর বিভিন্ন জার্মান গোত্র স্যাক্সন, এ্যাঙ্গেলস প্রভৃতি দিক থেকে আক্রমণ চালায় এবং সুবিধাজনক স্থানে বসতিও স্থাপন করে। কেল্টিকরা ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে আগত প্রথম জার্মান গোত্র। এ্যাঙ্গেলো স্যাক্সনরা তাদের নতুন পাওয়া ভূখ-কে পরীর রাজ্য বা ইংলাল্যান্ড নামে ডাকত। তাদের চর্চিত ভাষাই ইংলিশ (সে ভাষার পরিচিতি এখন ওল্ড ইংলিশ) এখান থেকে বেরিয়ে আসে চারটি উপভাষা ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চল এবং স্কটল্যান্ডের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে নর্থামব্রিয়ান, ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে কেনটিশ, ইংল্যান্ডের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ওয়েস্ট স্যাক্সন ভাষা আর মধ্যাঞ্চলে মার্সিয়ান। আধুনিক ইংরেজী ভাষার উদ্ভব পার্সিয়ান থেকে। ইংরেজীর বিকাশের পথে দ্বাদশ শতকে একজন পুরোহিতের লিখা ১৯,০০০ পঙক্তির বাইবেল কাহিনীভিত্তিক পদ্য অরজুলাম মধ্য ইংরেজীর প্রধান সাক্ষর। তিনি দাবি করেন, অন্যরা ভুল ইংরেজী বলছে, লিখছে। প্রমিতকরণের লক্ষেই তাঁর এই রচনা। তিনি তাঁর গ্রন্থে উচ্চারণবিধিও ঠিক করে দেন।

ইংরেজীর উদ্ভব ও বিকাশ কালানুক্রমিক চিত্র

খ্রিস্টপূর্ব ৫৫ অব্দ : রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার ব্রিটেন আক্রমণ করেন।

৪৩ খ্রিস্টাব্দ : পুনরায় রোমানদের ব্রিটেন আক্রমণ এবং দখল প্রতিষ্ঠা। ব্রিটেনে রোমান রাজত্ব শুরু।

৪৩৬ : রোমানরা দখলি রাজত্ব ছেড়ে চলে গেল।

৪৪৯ : বিভিন্ন জার্মান জনগোষ্ঠীর ব্রিটেনের বিভিন্ন স্থানে আক্রমণ, অবরোধ এবং বসতি স্থাপন।

[শুরু থেকে জার্মান বসতি স্থাপনের সূচনা পর্যন্ত স্থানীয় অধিবাসীরা কেল্টিক ভাষায় কথা বলত।]

৪৫০-৪৮০ : প্রাচীনতম ইংরেজী লিখনের সন্ধান লাভ (পরবর্তীকালে)

১০৬৬ : নরম্যান্ডির ভিন্টক উইলিয়াম দ্য কঙ্কারার ইংল্যান্ড আক্রমণ করে দখল করে নেন।

[এই সময় পুরনো ইংরেজী ওল্ড ইংলিশের বিকাশকাল]

১১৫০ : মিডল ইংলিশ পা-ুলিপির সন্ধান পাওয়া যায়। (পরবর্তীকালে)

১৩৪৮ : অধিকাংশ স্কুলে লাতিন হটিয়ে ইংরেজীর স্থান দখল।

১৩৮৮ : চসার বিখ্যাত ‘ক্যান্টারবেরি টেলস’ লিখতে শুরু করেন।

১৪০০ : গ্রেট ভাওয়েল শিফট শুরু।

[এই সময়কালে মিডল ইংলিশের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে]

১৪৭৬ : উইলিয়াম ক্যাক্সসন প্রথম ইংরেজী ছাপাখানা স্থাপন করেন।

১৫৬৪ : শেক্সপিয়রের জন্ম।

১৬০৪ : প্রথম ইংরেজী অভিধান ট্যাবল এ্যালফাব্যাটিক্যাল প্রকাশিত হয়।

১৬০৭ : প্রথম স্থায়ী ইংরেজ বসতি জেমস টাউনের গোড়াপত্তন ঘটে।

১৬১৬ : শেক্সপিয়রের মৃত্যু।

১৬২৩ : শেক্সপিয়রের ফাস্ট ফোলিও প্রকাশিত হয়।

১৭০২ : লন্ডন থেকে প্রথম ইংরেীজ দৈনিক ঞযব উধরষু পড়ঁৎধহঃ’ প্রকাশিত হয়।

১৭৫৫ : স্যামুয়েল জনসন তাঁর ইংরেজী ভাষার অভিধান প্রকাশ করেন।

১৭৭৬ : থোমাস জেফারসন ইংরেজীতে আমেরিকার ঘোষণাপত্র রচনা করেন।

১৭৮২ : ব্রিটেন তার আমেরিকান উপনিবেশসমূহ ছেড়ে দেয়।

[এই সময়কালে প্রাথমিক আধুনিক ইংরেজীর বিকাশ ঘটে।]

১৮২৮ : ওয়েবস্টার আমেরিকান ইংলিশ ডিকশনারি প্রকাশ করেন।

১৯২২ : বিবিসি ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন স্থাপিত হয়।

১৯২৮ : অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি প্রকাশিত হয়।

[আধুনিক ইংরেজী বিকাশের উত্তরকাল এই সময়ে বিস্তৃত]

ইংরেজী এখন বিশ্বায়নের ভাষা। অথচ পঞ্চম চার্লস বলেছিলেন, আমি ঈশ্বরের সাথে স্পেনিশ ভাষায় কথা বলি। নারীর সাথে ইতালিয়ান ভাষায়, পুরুষের সাথে ফ্রেঞ্চ আর আমার ঘোড়ার সাথে জার্মান ভাষার কথা বলে থাকি।

হাইনেরিখ হাইলে বলেছেন, রোমানদের সকলকে যদি ল্যাটিন ভাষা শিখতে হতো তাহলে তারা কখনও বিশ্বজয় করার সময়ই পেত না। উইলিয়াম শেক্সপিয়র আফসোস করে বলেছিলেন, নিজেদের ভাষার প্রতি ইংরেজদের কোন শ্রদ্ধা নেই। তারা তাদের সন্তানদের ইংরেজীতে কথা বলা শেখাবে না।

আসলে সেক্সপিয়রও বুঝতে পারেননি ইংরেজী এক সময় গ্লোবাল ল্যাঙ্গুয়েজ হয়ে উঠতে পারে।

মাতৃভাষা ও ব্যবহারিক ভাষা

মূলত আর্থিক গুরুত্বের কারণে দাফতরিক ভাষার চাহিদা মাতৃভাষার চেয়ে বেশি। ইংরেজী যত সংখ্যক মানুষের মাতৃভাষা তার চেয়ে কমপক্ষে চারগুণ বেশি মানুষ দাফতরিক ও নিত্যকার ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে ইংরেজী ব্যবহার করে থাকে। চাইনিজ ও ম্যান্ডারিনকে সম্মিলিতভাবে চাইনিজ ভাষা হিসেবে বিবেচনা করে জনসংখ্যার নিম্নক্রম অনুসারে মাতৃভাষা ও দাফতরিক ভাষার অবস্থান দেখানো হলো। :

হাজার বছরের অভিজ্ঞতা ভাষা গবেষকদের অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছে মাতৃভাষা নিয়ে যত অহঙ্কার যত আবেগ উচ্ছ্বাসই থাকুক না কেন ব্যবহারিক ভাষার গুরুত্ব তার চেয়ে অনেক বেশি। পৃথিবীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষের ব্যবহারিক ভাষা ইংরেজী। ইংরেজী বহু ভাষাকে উৎখাত করেছে, শিশুদের মুখ থেকে সরিয়ে দিয়েছে মাতৃভাষার বোল।

ম্যাথু আর্নন্ড ১৮৬৭ সালেই বালেছিলেন, আমরা যাকে আধুনিক সভ্যতা বলি তার জন্য দরকার সমরূপ ইংরেজী ভাষাভাষী বিশ্ব।

কিন্তু কিসের বিনিময়ে? আর্থিকভাবে কম গুরুত্ব ভাষা ও সংস্কৃতির বিলুপ্তির বদলে।

শিশু যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়...

সে ভাষার মৃত্যু রোধ করা কঠিন।

ভাষা গবেষক ডেভিড হ্যরিসন বলেছেন, শিশুরা সামাজিক মর্যাদার ব্যারোমিটার।

আর গবেষক গ্রেগরি এন্ডারসন বলেন, শিশুরা যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে সেখানে যদি দুটি ভাষা প্রচলিত থাকে যদি তারা বুঝতে পারে একটি ভাষা অন্যটির চেয়ে কম মূল্যবান তা হলে তারা অধিক মূল্যবান ভাষার দিকে ঝুঁকে পড়বে, সে ভাষা ব্যবহার করবে।

তিনি আরও মনে করেন, একটি ভাষা তখনই বিপদাপন্ন হয়ে পড়ে যখন সেই ভাষা ব্যবহারকারী সম্প্রদায় মনে করে তাদের ভাষা সামাজিক ও আর্থিক অবস্থা উন্নয়নের অন্তরায়। যে সব এলাকায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে সে এলাকার ভাষা বিপদাপন্নতার চূড়ান্ত স্তরে। হ্যারিসন মনে করেন, নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাসম্পন্ন বাবা-মা কি করলেন তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং শিশুরা কি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল সম্প্রদায়ের উপর প্রভাব বিস্তার করে এবং ভাষার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।

ভাষার অস্তিত্ব বিভিন্ন ধরনের পরিপার্শ্বিক অবস্থার উপর নির্ভর করলেও শিশুদের নিজস্ব সিদ্ধান্তই প্রধান নিয়ামক শক্তি। ইংরেজী যে শিশুদের মাতৃভাষা নয়, সারা পৃথিবীতে সে শিশুদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মাতৃভাষা ডিঙ্গিয়ে ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে ইংরেজীকেই বরণ করে নিচ্ছে। তাদের একটি বড় অংশ মায়ের ভাষাটি আদৌ রপ্ত করছে না।

রিচার্ড মরিসন মনে করেন, ইংরেজীর ভুবনায়ন সৃষ্টি করছে মানবিকতার সঙ্কট। ভাষা বৈচিত্র্য সংরক্ষণই এই সঙ্কট প্রশমন করতে পারে। তারপরও নির্মম সত্য হচ্ছে অর্থনৈতিকভাবে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভাষার কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ ভাষা মার খেয়েই যাবে।

প্রকাশিত : ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২১/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: