মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ভাষা আন্দোলন ॥ অর্জন ও বিসর্জন

প্রকাশিত : ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • আহমদ রফিক

ভাষা তথা মাতৃভাষা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা এবং সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। মাতৃভাষা সেই ভাষিক জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন শ্রেণীকে একসূত্রে গেঁথে রাখে। একমাত্র ভাষার অভিব্যক্তির মাধ্যমে শ্রেণীবৈষম্যের ক্ষণিক বিরতি। অশিক্ষিত শ্রেণীরও কথা ও ভাববিনিময়ের মাধ্যমে তার মাতৃভাষা। তাই তার জীবন-জীবিকা তার সামাজিক আচার ও সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটে মাতৃভাষায়।

জাতীয় চেতনার অন্যতম প্রধান ঐক্যসূত্র তার ভাষা। বাংলা সেই তাৎপর্যে ধর্ম নির্বিশেষে বাঙালী জনগোষ্ঠীর জীবনে অন্যতম প্রধান বিষয়, যা রাজনীতি-অর্থনীতির সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট, শিক্ষিত বা এলিট শ্রেণী যতই বিদেশী ভাষা রপ্ত করুক না কেন। এমনই একাধিক মাত্রায় ভাষার গুরুত্ব বুঝে নিতে হয় জনজীবনেরও ভাল-মন্দের প্রেক্ষাপটে। ভাষা তাই কখনও কখনও জাতীয় প্রয়োজনে অধিকার আদায়ের সংগ্রামী প্রেরণা ও বাস্তবিক লড়াই হয়ে উঠতে পারে। পাকিস্তানী শাসনামলে রাষ্ট্রভাষাসহ জাতীয় পর্যায়ের অধিকার আদায়ের শুরু হয় বাঙালী ছাত্র-যুবকদের তাগিদে ভাষা-আন্দোলন, পরে তাতে ঘটে জনসংশ্লিষ্টতা। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে এর পূর্ণ বিকাশ। পুলিশের অর্বাচীনতায় কয়েকটি মৃত্যু ঘিরে জন্ম নেয় শহীদ দিবস, তৈরি হয় শহীদ মিনার, যা বাঙালীর রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক জীবনে প্রতিবাদী শক্তির উৎস।

ভাষা আন্দোলনের মূল দাবি ছিল পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পাশাপাশি বাংলার প্রতিষ্ঠা। বায়ান্নে এ আন্দোলনের চরিত্রগত নানামাত্রিক বিকাশ। যেমন রাজবন্দীদের মুক্তির দাবির প্রতীকে জাতীয় প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক দাবিদাওয়া আদায় এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা মাধ্যম ও বাংলা ভাষায় প্রচলন। শেষোক্ত বিষয়টির সঙ্গে জড়িত জনগণের আর্থ- সামাজিক স্বার্থ। তবে পাকিস্তানী শাসকদের বিভ্রান্তিকর প্রচারের ফলে আন্দোলনের সূচনা ও বিকাশ গরিষ্ঠসংখ্যক ছাত্র-যুবার তৎপরতায়। শাসকদের নানামাত্রিক অর্বাচীন তৎপরতায় ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র ভাষা আন্দোলনের চরিত্র বদল ঘটে। ছাত্র-যুব আন্দোলন গণআন্দোলনে পরিণত হয়। এর প্রভাব দেখা দেয় রাজনীতিসহ সাহিত্য সংস্কৃতি ক্ষেত্রে। সাহিত্য সম্মেলনগুলোতে ও সাহিত্যের সৃজনশীলতায় তেমন প্রমাণ মেলে। পাকিস্তানবাদী সাহিত্য পিছু হটতে বাধ্য হয়। কিন্তু রাজনীতি ক্ষেত্রে এ প্রভাবের ফলাফল ছিল চড়াই-উতরাই ভাঙ্গার মতন।

একদিকে শাসকশ্রেণীর ষড়ন্ত্রমূলক পদক্ষেপ অন্যদিকে রাজনীতিকদের সঙ্কীর্ণ স্বার্থে আত্মদ্বন্দ্বের কারণে রাজনীতির প্রতিবাদী যাত্রা মাঝে মধ্যে ব্যাহত হলেও একুশ দফা থেকে ছয় দফা হয়ে ছাত্র সমাজের এগারো দফায় সওয়ার হয়ে বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনার দ্রুত বিকাশ ঘটে। সেই সঙ্গে গণসংস্কৃতির প্রকাশ সর্বোচ্চ পর্যায়ে দেখা যায় ঊনসত্তরে। তবে জাতীয়তাবাদী চেতনার সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটে সত্তরের নির্বাচনে জনচেতনা প্রভাবিত করে। ছাত্র-যুবা নানাস্তরের পেশাজীবী ও ব্যবসায়ীকুলের সংঘবদ্ধ প্রকাশ তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধি-সংগঠন ঘিরে, যা শেষ পর্যন্ত সমাজবাদী চেতনাকে অতিক্রম করে একাত্তরের রণক্ষেত্রে পৌঁছে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমর্থন নিয়ে। এখানেই ছিল একাত্তরের লড়াইয়ের মূল চরিত্রগত দুর্বলতা।

তাই প্রবল আবেগে একাত্তরের লড়াই প্রতিবেশী শক্তির প্রত্যক্ষ ও সক্রিয় সমর্থন এবং বিদেশী শক্তির পরোক্ষ নৈতিক সমর্থন নিয়ে ‘অর্জিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ।’ সংশ্লিষ্ট একাধিক কারণে স্বাধীন বাংলায় শাসনব্যবস্থা ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে সাংবিধানিক সমর্থন সত্ত্বেও পিছিয়ে পড়ে।

আমার বিবেচনায় এক্ষেত্রে শ্রেণীচেতনা ও শ্রেণীস্বার্থের গভীর প্রভাব পূর্বোক্ত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতার মূল কারণ। সর্বজনীন স্বার্থ, নিম্নবর্গীয় স্বার্থ বিবেচনায় আসেনি, এমনকি স্বাধীন দেশে সম্প্রদায় বিশেষের সংখ্যালঘুত্ব ও অসহায়তা হীনম্মন্যতা ঘোচানোর কোন চেষ্টা শাসনযন্ত্রের ছিল না। জিন্নাহর মাইনোরিটি তত্ত্ব বিপরীত ধারায় বহাল থেকেছ। এটাও স্বাধীন বাংলার আরেক দুর্বলতা, যা দুর্ভাগ্যজনকও বটে।

ভাষা আন্দোলনের ছয় দশক অন্তে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি বা অর্জন ও বিসর্জনের হিসাব নিতে গেলে প্রত্যাশার তুলনায় অপ্রাপ্তি, অর্জনের তুলনায় বিসর্জনই বড় হয়ে দেখা দেয়। রাষ্ট্রিক বিকাশের পাশাপাশি একুশ বা একাত্তরের প্রত্যাশার বাস্তবায়ন সামান্য। দীর্ঘ ছয় দশক ধরে একুশকে আমরা শুধু আবেগভরে বরণ করেছি, বাস্তবতায় ও জীবিকার বাস্তবতায় নয়।

স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বস্তরে মাতৃভাষা বাংলার প্রচলন দেখা যায়নি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবির পাশাপাশি এর সুস্পষ্ট পরিপূরক দাবি ছিল জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষাসহ শিক্ষার সর্বস্তরে এবং প্রশাসনে, আদালতে ও সর্বত্র বাংলার মাধ্যমের ব্যবহার। কিন্তু সচিবালয়ের দাফতরিক কাজে এবং শিক্ষাক্ষেত্রে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা মাধ্যম হিসেবে বাংলা চালু হয়েছে। এর বাইরে সর্বত্র ইংরেজী ভাষাই চলছে।

রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই দাবির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য চরিত্রগুণে রাষ্ট্রিক ও সামাজিক এবং সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের দাবির তাৎপর্য সামাজিক-সংস্কৃতিক। দুটোর সঙ্গে জাতীয় জীবনের গূঢ় সম্পর্ক রয়েছে। সে সম্পর্ক জাতীয় পর্যায়ে সর্বজনীন উন্নতির। এখানে আর্থ-সামাজিক উন্নতির বিষয়টিই প্রধান। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এটা নিছক মর্যাদার প্রশ্ন।

পরস্পর সংশ্লিষ্ট দাবি দুটো বাস্তবায়িত হলে উচ্চশিক্ষার সর্বস্তরে শ্রেণীবিশেষের বদলে সর্বসাধারণের জন্য আর্থ-সামাজিক সুবিধা অর্জিত হওয়ার কথা, কিন্তু উচ্চশিক্ষাক্ষেত্রে ইংরেজী মাধ্যম সচল থাকার ফলে তা ব্যাহত হয়েছে। সেই সঙ্গে দেশে অসংখ্য ইংরেজী মাধ্যম শিক্ষায়তনÑ কিন্ডারগার্টেন থেকে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে দেশের শিক্ষার্থী সমাজ বাংলা ও ইংরেজী মাধ্যমের দুটো ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

দুই.

পরিস্থিতি বিচারে ভাষা আন্দোলনের দাবিগুলো আদায়ে আমাদের কী করণীয় এমন প্রশ্নও অনেকে করে থাকেন। এ সম্পর্কে প্রথম কথাÑ শাসকশ্রেণী অর্থাৎ যাদের হাতে ক্ষমতা (তা যে দলই হোক) তারা প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে এগিয়ে আসবেন বলে মনে হয় না। একমাত্র যারা রাজনৈতিক মতাদর্শের টানে অথবা সমাজ পরিবর্তনে বিশ্বাসী তাদেরই বৃহত্তর জনসাধারণকে এ লক্ষ্যে সচেতন করে তুলতে এগিয়ে আসতে হবে। ঠিক যেভাবে রাষ্ট্রভাষা বাংলার অধিকার আদায়ে একশ্রেণীর মানুষ একসময় এগিয়ে এসেছিলেন। তারা যদি যুক্তি দিয়ে, তথ্য দিয়ে সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের পক্ষে জনসাধারণকে উদ্দীপ্ত করতে পারেন তাহলে বৃহত্তর জনশ্রেণীর দাবিতে হয়ত প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটতে পারে। তাই দরকার বাংলা প্রচলনের পক্ষে ছাত্রজনতার ঐক্য। কাজটা কঠিন। তবে অসম্ভব নয় যদি বাংলাভাষা ও বাঙালীয়ানার টানে বাঙালীদের উদ্দীপ্ত করা যায়।

বিরাজমান আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে আরও একটি কথা বলা দরকার যে বাস্তবতার কারণেই আমরা ইংরেজী বর্জনের পক্ষপাতি নই। যে যার প্রয়োজনে ইংরেজী ভাষা শিখবে, তবে তা দ্বিতীয়ভাষা হিসেবে, মাতৃভাষার বিকল্প হিসেবে নয়। জীবিকা বা অন্য কোন প্রয়োজনে সমাজের এক শ্রেণীর মানুষ ইংরেজী শিখবেন দেশের শিক্ষানীতিতে সে ব্যবস্থা থাকবে।

সবশেষে একটি কথাÑ দেশের পুরো জনসংখ্যাকে শিক্ষিত করে তোলা সবচেয়ে বড় জরুরী বিষয়। পুরোদেশ শিক্ষিত হওয়ার একাধিক সুবিধা। তাতে অর্থনৈতিক উন্নতির প্রসার ঘটবে, জনসংখ্যা বিস্ফোরণের সমস্যা সমাধানের পরোক্ষ উপায় তৈরি হবে, শিক্ষিত কর্মরত নারীর সেখানে থাকবে বিশেষ ভূমিকা। এ দাবির পক্ষে জনমত তৈরিতে শিক্ষিত শ্রেণীকেই প্রধান ভূমিকা নিতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা পূরণের অন্যতম প্রধান উপায় ব্যাপক শিক্ষা নিশ্চিত করতে উপযুক্ত শিক্ষানীতি প্রণয়ন, যে শিক্ষানীতির মূল লক্ষ্য হবে সর্বজনীন সুশিক্ষা, একুশের আবেগ নয়Ñ একুশের দাবি বাস্তবায়নে সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটানো।

প্রকাশিত : ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২১/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: