রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ময়মনসিংহে ফেব্রুয়ারি এলেই যাঁদের কেবল ডাক পড়ে

প্রকাশিত : ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • তিন ভাষা সৈনিকের দিন কাটে গল্প ও আড্ডায় ॥ মেলেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

বিপ্লবী ভাষাসৈনিক অধ্যাপক শেখ রিয়াজ উদ্দিন আহমদ, মো. আবুল হাশেম ও খোন্দকার আবদুল মালেক শহীদুল্লাহ- এখনও অচেনাদের কাতারে। ফেব্রুয়ারি এলেই কেবল হাঁকডাক পড়ে। এরপর বছরজুড়ে আর কোন খোঁজ নেয় না কেউ। এদের মধ্যে অধ্যাপক শেখ রিয়াজ অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় বাসায় ধুঁকে ধুঁকে মরতে বসেছেন। সাবেক এমপি আবুল হাশেমের সংসার চলে নিজের লেখা বই বিক্রি করে। আর খোন্দকার মালেকের দিন কাটছে পরিবার ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের সঙ্গে গল্প আড্ডায়। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এই ৩ নক্ষত্র রাজপথ ও যুদ্ধের ময়দানে বীরত্বের ছাপ রেখেছেন। অথচ এদের কারও ভাগ্যে মেলেনি রাষ্ট্রীয় কোন স্বীকৃতি ও মর্যাদা।

অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় গত ৬ মাস ধরে বিছানায় পড়ে আছেন গফরগাঁওয়ের বিপ্লবী ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক শেখ রিয়াজ উদ্দিন আহমদ। একুশ ফেব্রুযারি ঢাকার রাজপথে পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছেন গফরগাঁওয়ের আবদুল জব্বারÑ এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ২২ ফেব্রুয়ারি খোদাদাদ খানের নেতৃত্বে দোগাছিয়ার আবদুল বাতেন, মাইজবাড়ির মকবুল হোসেন খান ও গফরগাঁওয়ের আবুল হোসেনসহ শেখ রিয়াজ প্রতিবাদ মিছিল, থানা ঘেরাওসহ নানা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মিছিল থেকে পুলিশ ৫ জনকে গ্রেফতার করলেও ব্রহ্মপুত্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মরক্ষা করেন শেখ রিয়াজ। পুলিশের গ্রেফতার এড়াতে টানা দুই বছর ছিলেন আত্মগোপনে। কিন্তু জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে পারেননি শেখ রিয়াজ। সলিমউল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্রলীগের জিএস ও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের নানা দায়িত্ব পালন করেছেন। স্কুলে ৫ বছর ও কলেজে ৩০ বছরের অধ্যাপনা শেষে অবসর নিয়েছেন শূন্যহাতে। বঙ্গবন্ধু ও গফরগাঁওয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্যসহ নানা বিষয়ে লিখেছেন বেশ কয়েকটি বই। এক বছর আগে বাথরুমে পড়ে ডান পা ভেঙ্গে যাওয়ায় অশীতিপর এই ভাষাসৈনিক গত ৬ মাস ধরে বিছনায়। চলতে ফিরতে ও উঠবস করতে সাহায্য নিতে হয়। এরই মধ্যে ডায়াবেটিস, কিডনি, হার্টের সমস্যা দেখা দিয়েছে। বয়েসের ভারের সঙ্গে নানা জটিল রোগে এখন শয্যাশায়ী এক সময়কার টগবগে শেখ রিয়াজ। উন্নত চিকিৎসাসেবার জন্য সরকারের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছিলেন। কিন্তু এখনও পাননি। রাজনৈতিক সহকর্মী কিংবা একাত্তরে রণাঙ্গনের কোন সহযোদ্ধাও খোঁজ নিতে আসেন না শেখ রিয়াজের। অসহায় এই ভাষাসৈনিকের আক্ষেপ বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীনের মতো নেতারা বেঁচে থাকলে চিকিৎসার অভাবে তাকে ৬ মাস বিছানায় পড়ে থাকতে হতো না। তাঁর বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এই খবর পৌঁছালেও উন্নত চিকিৎসার একটা ব্যবস্থা হবে। কারণ প্রধানমন্ত্রী অধ্যাপক শেখ রিয়াজকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন জানেন বলে দাবি এই ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধার।

গফরগাঁওয়ের আরেক বিপ্লবী ভাষাসৈনিক আবুল হাশেমের সংসার চলছে কবিতা লিখে আর নিজের আত্মজীবনী লেখা বই ফেরি করে। ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ ৬৩ বছরেও খোঁজ নেয়নি কেউ এই সংগ্রামী ভাষাসৈনিকের। মেলেনি প্রাপ্য মর্যাদাটুকুও। নানা অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার বঙ্গবন্ধুর আদর্শের এই বীর সৈনিকের শেষ জীবনের চাওয়া একটু রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও স্বীকৃতি।

ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারি এলে এখনও উজ্জীবিত হয়ে উঠেন গফরগাঁওয়ের ৮৮ বছর বয়স্ক ভাষাসৈনিক আবুল হাশেম। পাড়াপড়শী আর স্বজনদের সঙ্গে গল্প আড্ডায় হাতড়ে বেড়ান সেদিনের স্মৃতি। ঢাকায় গুলিতে শহীদ আবদুল জব্বারের রক্ত ছুঁয়ে সেদিন শপথ নিয়ে ফিরে এসে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে উঠেন গফরগাঁও কলেজের ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র ও কলেজছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি আবুল হাশেম। গ্রেফতারি পরোয়ানা আর বারবার আত্মগোপনের ফলে শিকেয় ওঠে পড়ালেখা। ১৯৪৭ সালে গফরগাঁও ইসলামিয়া হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন আবুল হাশেম। আজাদ হিন্দ ফৌজদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে শহীদ হন ময়মনসিংহে সরকারী আনন্দ মোহন কলেজ ছাত্রী হাশি বসু। এর প্রথম প্রতিবাদ হয়েছিল গফরগাঁওয়ে। সেদিনের এসব আন্দোলনের সিঁড়ি বেয়ে আসে আমাদের স্বাধীনতা। কিন্তু এ সময়ে বাংলা ভাষার চর্চা সর্বস্তরে প্রচলন না হওয়ায় হতাশ এই ভাষাসৈনিক। আর ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ ৬৩ বছরেও কোন খোঁজ নেয়া হয়নি বলে আক্ষেপ এই বীরের। আওয়ামী লীগ থেকে গফরগাঁওয়ে আবুল হাশেম ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালে দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু প্রচলিত রাজনীতির সঙ্গে কখনই মানিয়ে চলতে পারেননি তিনি। তারপরও এ নিয়ে কোন আক্ষেপ নেই হাশেমের। কারণ মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হাশেম এখনও কবিতা আর ছড়ার মাঝে স্বপ্ন দেখেন সোনার বাংলাদেশ গড়ার।

মুক্তাগাছার প্রবীণ রাজনীতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব খোন্দকার আবদুল মালেক শহীদুল্লাহ বিপ্লবী ভাষাসৈনিক। রক্তঝরা ফেব্রুয়ারিতে হাতেগোনা যে ক’জন সাহসী কিশোর ঢাকার বাইরে অজপাড়াগাঁয়ে থেকে তৃণমূলের আন্দোলন-সংগ্রামের মিছিলে সামনের কাতারে ছিলেন খোন্দকার আবদুল মালেক তাঁদেরই একজন। বয়সের ভারে অনেকটা ন্যুব্জ কিন্তু তেজোদীপ্ত বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের এই লড়াকু সৈনিক সেদিনের স্মৃতিচারণ করে এখনও আবেগাপ্লুুত হন। আক্ষেপ আর হতাশার দুঃখ বোধের মধ্যেও ভাষা শহীদদের প্রত্যাশা পূরণের স্বপ্ন দেখেন।

প্রকাশিত : ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২১/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: