মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নিমগ্ন ধারার গল্পের বই

প্রকাশিত : ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • বই পরিচিতি

চেতনাপ্রধান ও তত্ত্বাশ্রয়ী কথাশিল্প রচনার প্রয়াস তাশরিক-ই-হাবিবের ‘ভরদুপুরে ও অন্যান্য গল্প’। লিখেছেন একলব্য দাস

গল্প-উপন্যাসের নামে কল্পনানির্ভর, অবাস্তব, হৃদয়তোষ কাহিনী ফাঁদেননি তিনি। দ্রুত জনপ্রিয়তা কিংবা পাঠকসমাদরের জন্য অবাস্তব, কাল্পনিক চরিত্র আঁকার কৌশলও নেননি। এই বহুলচর্চিত রসদগুলোরই আনাগোনা সাম্প্রতিক (আধুনিক নয়!) কথাশিল্পীদের (?) গল্প- উপন্যাস- নাটক নামক লেখায়। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছেন। সংখ্যালঘু তাঁরা। সেই সংখ্যালঘুদের নাতিদীর্ঘ কাতারে আরেকজন শামিল হলেন। লেখকের প্রথম গল্পের বই ‘ভরদুপুরে ও অন্যান্য গল্প’ দিয়ে। নাম তাঁর তাশরিক-ই-হাবিব।

অবাস্তব রোমান্টিক কল্পনাবিলাস নয়, নিত্যদিনের অনাড়ম্বর আটপৌঢ়ে বাস্তবতাই তাঁর গল্পের উপজীব্য। তাঁর গল্পে কাহিনীর অনুপস্থিতি তীব্রভাবে প্রকট, কাহিনী (চষড়ঃ) থাকলেও তা সামান্যই। চরিত্রের অতল মনোজগত ও সেখানকার চূর্ণবিচূর্ণ, বিক্ষিপ্ত ভাবনারাশি তাঁর গল্পে মুখ্য। কেননা তাঁর গল্পে পাওয়া যায় না আদি-মধ্য-অন্ত সমন্বিত কোন কাহিনী। উল্লম্ফনধর্মী চৈতন্যপ্রবাহ রীতির অবলম্বনেই বর্ণিত হয় তাঁর গল্পগুলো। আশপাশের চিরচেনা সাদামাটা মুখগুলোই তাঁর গল্পের কুশীলব। ঢাকাকেন্দ্রিক শহুরে স্থানিক পটভূমিই গৃহীত তাঁর গল্পের বইয়ে।

‘ভরদুপুরে ও অন্যান্য গল্পে’র পাঁচটি গল্প পড়লে এ সত্য স্পষ্ট হয় যে, গল্পকার রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র-বিভূতিভূষণ-তারাশঙ্কর চর্চিত ধ্রুপদী ধারার গল্প রচনার পথে হাঁটেননি। কিংবা হাঁটেননি হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, আনিসুল হকদের জনপ্রিয়তার পথেও। বরং সচেতনভাবে তা পরিহার করে চেতনাপ্রধান ও তত্ত্বাশ্রয়ী কথাশিল্প রচনার দুরূহ ও দুর্গম পথ তথা নিমগ্ন ধারার গল্প রচনার পথকেই তিনি বেছে নিয়েছেন, যা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কিংবা শহীদুল জহিরদের মতো কথাশিল্পীদের লেখার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাশরিক-ই-হাবিবের এই পথে পা রাখার সুস্পষ্ট প্রয়াস তাঁর ‘ভরদুপুরে ও অন্যান্য গল্প’ বই। এই সত্য কমবেশি ধরা পড়ে- ‘ভরদুপুরে’, ‘জুলেখার দিনকাল’, ‘গোলকধাঁধা’, ‘কবিযশোপ্রার্থী’ ও ‘লেনদেন’ [এই পাঁচটি গল্প নিয়েই ‘ভরদুপুরে ও অন্যান্য গল্প’ বই]- তাঁর গল্পের কাহিনী বিন্যাস, চরিত্রচিত্রণ ও প্রকাশভঙ্গি থেকে সচেতনভাবে ‘ইজম’ তথা তত্ত্বের আশ্রয়, চরিত্রের শ্রেণী-পেশানুযায়ী ভাষাব্যবহার পর্যন্ত সব কিছুতেই।

‘ভরদুপুরে’ নাম-গল্পটির কথাই বলা যাক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক দম্পতির জামান-রিনির জীবন বিশেষত জামানের জীবন এ গল্পে বর্ণিত। মূলত জামানের ভাবনা জগত বা চেতনালোকেই ঘটে পুরো গল্পকাহিনী। পেশাগত ও সামাজিক জীবনে সফল জামান দম্পতি নিঃসন্তান। স্ত্রী মৃতবৎসা হওয়া ও তজ্জনিত শূন্যতা, এর কারণ হিসেবে জামানের নানা ভাবনারাশি, এক কালের সহপাঠী, বর্তমানে স্কুলশিক্ষক আবদুল হানিফের সঙ্গে আত্ম-তুলনা- এই সবই এ গল্পের বর্ণিত বিষয়।

এভাবে বস্তিবাসী ঝিয়ের কাজ-করা তের-চৌদ্দ বছরের কিশোরী জুলেখা (জুলেখার দিনরাত); এককালে কৈশোরে স্কুলবন্ধুদের ও তারুণ্যে কলেজ সহপাঠীর বিকৃত যৌন-লালসার শিকার, হালে স্ত্রীর প্রতি অনাসক্ত, মানসিকবিকারগ্রস্ত সলীল (গোলকধাঁধা), কলেজ শিক্ষক বন্ধু রতনের প্রতি ঈর্ষাকাতর ও মনোজটিলতায় ভোগা কবিযশোপ্রার্থী তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক (কবিযশোপ্রার্থী) এবং গ্রামাগত সরল ও নিরূপায় তরুণী মনিকার অসহায়ত্বের সুযোগে অর্থ ও নিজ মালিকানাধীন হোটেলে রিসেপশনিস্টের কাজ দেয়ার বিনিময়ে রক্ষিতার মতো রাখা ব্যাংকার কায়েস (লেনদেন)- এই সব চরিত্রের মানসিক টানাপোড়েন ও তাদের মনের বিক্ষিপ্ত ভাবনারাশি গল্পে রূপ পায় তাশরিক-ই-হাবিবের লেখনীতে।

চৈতন্যপ্রবাহ রীতির শিল্পকৌশল অনুসরণ করায় এই গল্পের নাম-কা-ওয়াস্তে যেটুকুন বা কাহিনী আমরা পাই তার সমগ্রটাই উল্লম্ফনধর্মী। কখনও গল্পকার চরিত্রের প্রেক্ষণবিন্দুতে ফ্লাশব্যাকে, কখনওবা ফ্লাস ফরওয়ার্ডে চলে যান। ফলে চরিত্র তাঁর চিন্তার মধ্য দিয়ে এই অতীতে চলে যায়, পরক্ষণেই চলে যায় অনাগত ভবিষ্যতে (যা হয়ত ঘটতেও পারে, আবার নাও ঘটতে পারে)।

‘ভরদুপুরে’ গল্পে স্ত্রী মৃতবৎসা হওয়ার পেছনে দায়ী (?) হিসেবে আগুন্তক মহিলার দেয়া জিলাপি-বাতাসা খাওয়া কিংবা সগীরের দেয়া দামী টমইয়াম স্যুপ খাওয়া ও বাথরুমের ফ্লাশের ওপর গুঁড়ো মাটি ও গাছের শিকড় পড়ে থাকা- এই সব সংস্কারের প্রতি উচ্চশিক্ষিত ও আলোকিত মানুষ জামানের সন্দেহ দেখি। মূলত এই প্রসঙ্গগুলো জাদুবাস্তবতার অনুষঙ্গ হিসেবে সুচারুরূপে ব্যবহৃত। ‘জরিনার দিনরাত’ গল্পেও খবিশ তথা শয়তান জিন প্রসঙ্গ এই শিল্পকৌশলেরই অংশ।

নিমগ্ন ধারা গল্প সংকলন এই বই, যা আগেই বলা হয়েছে। তবে নিমগ্ন ধারার গল্পে যে ধরনের মনোবিশ্লেষণ ও মনজাগতিক বিক্ষিপ্ত ভাবনারাশির উল্লম্ফনধর্মী পরিস্ফুটন আমরা দেখি, বইয়ের শেষ গল্প ‘লেনদেনে’ শিল্পের এই দাবি গল্পকার পুরোপুরি মেটাতে পারেননি। কাহিনী ও তার সরল বর্ণনা এ গল্পে যেন মুখ্য হয়ে উঠেছে। তদুপরি, দীর্ঘ তিন বছর ধরে ভোগ্যপণ্যের ন্যায় ব্যবহৃত মনিকার চিরকুট দিয়ে চিরতরে (?) প্রস্থানের পর কায়েসের মনোভাবনা নিমগ্ন ধারার গল্প নয়, বরং ধ্রুপদী ধারা গল্পোপযোগী হয়ে উঠেছে। বোঝার সুবিধার্থে উদ্ধৃতি প্রণিধানযোগ্য-

‘... কায়েসের মনে হলো, ও জীবনে এমন কিছু হারাল, যা আর কখনো ফিরে পাবে না, ওর রক্ত, ওর উত্তরাধিকার!’

হয়ত পাঠ-বৈচিত্র্য আনয়নের প্রয়াস হিসেবে সচেতনভাবেই এই ধ্রুপদী ধারা-ভুক্ত ‘লেনদেন’ গল্পটি লেখক স্বেচ্ছায় বইয়ে সংযোজন করে থাকবেন।

মননশীল ও আধুনিক সাহিত্য পাঠকদের মনের খোরাক জোগানোর মতো বই ‘ভরদুপুরে ও অন্যান্য গল্প’। গল্পগুলোতে পরাবাস্তববাদ, জাদু বাস্তবতা তত্ত্বাদির শিল্পিত প্রয়োগ ঘটছে, যা গল্পকারের পরিমিতিবোধ ও গল্পগুলোর শিল্পসার্থকতার স্মারক। তবে গল্পগুলো একেবারে কাহিনীহীনও নয়। নয় তত্ত্বভারাক্রান্তও। সাধারণ পাঠকও এই বইয়ের গল্প-রসাস্বাদনে বঞ্চিত হবেন না বলেই বোধ করি।

ভরদুপুরে ও অন্যান্য গল্প

তাশরিক-ই-হাবিব

মিজান পাবলিশার্স

১৭৫.০০

প্রকাশিত : ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২০/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: