মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

বই মেলা ॥ শেষ কটা দিনে শুধু বই নির্বাচন

প্রকাশিত : ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • মারুফ রায়হান

পর পর দুটি সপ্তাহের লেখায় বইমেলার সার্বিক পরিবেশ তুলে ধরার পাশাপাশি পাঠকদের কিছু ভাল বইয়ের খবর দিতে চেয়েছি। মেলার শেষ দিনগুলোতে পড়ুয়ারা বেছে বেছে বই কেনেন। নিজ পাঠপ্রবণতা অনুযায়ী উৎকৃষ্ট বইটি সংগ্রহের জন্য একুশ-পরবর্তী ছিমছাম ভিড়হীন মেলা বেশ উপযুক্ত। এবারের লেখায় তাদের বক্তব্যও নিয়ে আসতে চাই যারা বইমেলাকে ভালবেসে মেলার সর্বাঙ্গীণ সৌন্দর্য ও সুস্বাস্থ্য সম্বন্ধে ভাবেন এবং লেখায় বা আলাপনে তার প্রকাশ ঘটান। সেই সঙ্গে মেলায় নবাগত প্রকাশকদের কথাও তুলে ধরতে চাই। মিডিয়ায় দেখছি কেবল বড় বড় প্রকাশনা সংস্থার কর্ণধারদের ছবি আর বক্তব্য। ‘ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের’ দিকে কারও নজর নেই। সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশকে পেশা হিসেবে যাঁরা গ্রহণ করছেন কিংবা বলতে পারি মূল পেশার বাইরে গিয়ে আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকির বিষয়টি জানা সত্ত্বেও গ্রন্থ প্রকাশকে যাঁরা দায়িত্বশীল কাজ বলে মনে করছেন তাঁদের দুয়েকজনের কথা বলা দরকার। তার পাশাপাশি খেদের সঙ্গেই বলতে চাই, ইতোপূর্বে জনকণ্ঠের নিয়মিত কলাম ‘ঢাকার দিনরাত’য়েও কিছুটা বলেছি, সিনিয়র প্রকাশকদের ভেতর টাকা নিয়ে মানহীন বই বের করার মানসিকতা। প্রবাসে দীর্ঘকাল লেখালেখি করেও যেসব লেখক ন্যূনতম মানসম্পন্ন লেখক হয়ে ওঠেননি এমন অনেকেরই পকেটের টাকায় দেশের নামীদামী প্রতিষ্ঠান থেকে স্বরচিত বইটি বেরিয়ে আসছে। এটা দুঃখজনক। লেখক লিখবেন আর প্রকাশক সেই মেধাশ্রমের সৃষ্টিকে গ্রন্থাকারে মুক্ত আলোয় নিয়ে আসবেন পুঁজি খাটিয়েÑ এই প্রচলিত নিয়ম এখন বহুলাংশে অকার্যকর। চুটিয়ে বইয়ের ব্যবসা করছেন অথচ একজন মেধাবী তরুণ কবি বা গল্পকারের গ্রন্থ প্রকাশের বেলায় বেশিরভাগ ‘প্রতিষ্ঠিত’ প্রকাশকই এগিয়ে আসেন না।

এরই মধ্যে বইমেলা পহেলা ফাল্গুন ও ভালবাসা দিবসকে স্বাগত জানিয়েছে লাগাতার অবরোধ-হরতালের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেই। বলাই বাহুল্য এ দুদিন নজিরবিহীন ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। যদিও ধুলোর দৌরাত্ম্যও ছিল নজিরবিহীন। পহেলা ফাল্গুনে এই প্রথম ধুলোয় অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিকেলে ঢুকিনি মেলায়। আগামীকালই একুশে ফেব্রুয়ারি। ধুলোয় তুলোধুনো হওয়ার হাত থেকে কি মেলাপ্রেমীদের রক্ষা করবে বাংলা একাডেমি? মাঝে ফাল্গুনের শুরুতে গভীর রাতে বৃষ্টি হওয়ায় পুরো একটা সন্ধ্যা বইমেলা ধুলোমুক্ত ছিল। তবে যথারীতি তার খেসারতও দিতে হয়েছে কিছু প্রতিষ্ঠানকেÑ বৃষ্টির পানিতে তাদের বই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফিবছরই এমনটা দেখা যায়।

কথা হচ্ছিল নতুন প্রতিষ্ঠান অনুপ্রাণন প্রকাশন-এর প্রকাশক আবু এম ইউসুফের সঙ্গে। বললেন, সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নবীন, স্বল্পপরিচিত অথচ মেধাবী লেখকদের বই প্রকাশের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়া আমাদের লক্ষ্য। আমাদের একটি সম্পাদনা পরিষদ রয়েছে যেটি বই বাছাই ও প্রয়োজনীয় সম্পাদনার কাজটি করে থাকে। বই প্রকাশের সম্পূর্ণ খরচ অনুপ্রাণন প্রকাশন বহন করে এবং বই বিক্রির পর খরচের টাকা উঠে গেলে বাকি টাকাটা লেখককে দিয়ে থাকে। গ্রন্থ প্রকাশনা ও বিক্রির মাধ্যমে মুনাফা করার উদ্দেশ্য আমাদের নেই। পুস্তক প্রকাশনার পাশাপাশি সারা বছরে বিভিন্ন সময়ে লেখক ও সাহিত্যপ্রেমীদের মতবিনিময় অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে মানবিক, নান্দনিক, শৈল্পিক এবং মুক্তচিন্তার সাহিত্য চর্চার একটি ক্ষেত্র সৃষ্টি করা এবং সেই ক্ষেত্রটির প্রসার ঘটানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে আমরা আগ্রহী।

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হিসেবে এর আগে কোন নারীকে কি আমরা পেয়েছি? শাম্মী আকতার ‘চিত্রা প্রকাশনী’র তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, নারী হিসেবে কোন সুবিধা কিংবা প্রতিবন্ধকতা অনুভব করছেন কিনা? বললেন, আসলে নারী হিসেবে আলাদা কোন ব্যাপার তৈরি করতে না চাইলেও কিভাবে যেন তৈরি হয়েই যায়। প্রতিবন্ধকতা বলতে গেলে একজন পুরুষ যেমন ২৪ ঘণ্টার যে কোন সময় কাজ করতে পারে, নারী তা পারছে না। আমাদের সময় সীমিত পারিবারিক এবং সামাজিক দুই প্রেক্ষাপট থেকেই। অবশ্য সুবিধাও আছে। যেমন আমাদের বই পাড়ায় (কাঁটাবন কনকর্ড টাওয়ার) আমি একা একজন মহিলা কাজ করি; সেক্ষেত্রে যেখানেই যাই মোটামুটি সবাই একটু আমাকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। তবে ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ এটা আবার নারীদের পিছু ছাড়ে না।

সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে মেলার সার্বিক পরিকল্পনা নিয়ে লেখক ও স্থপতি শাকুর মজিদের বক্তব্য খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছেন, ‘মেলায় এসে বিভ্রান্ত। কোন্ দিকে যাব, বুঝতে পারি না। মেলা দুই ভাগ। কোথাও কী আছে আগে জানি না, ধুলোবালির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে কাহিল। পছন্দের স্টলও খুঁজে পাই না। স্টলগুলোর বিন্যাস অগোছালো। স্টল নাম্বারগুলোর সঙ্গে কোন দিক-নির্দেশনা নেই। কোন স্টল বর্ধমানে আর কোনটা সোহ্রাওয়ার্দীতে তা জানার কোন সুযোগ নেই। একটা মেলাকে ভেঙ্গে দুই টুকরা করা হয়ে গেছে। একসময় মনে হতো শুধু বাংলা একাডেমিতেই মেলা হলে ভাল, এখন মনে হয়, বাংলা একাডেমির কোন প্রয়োজনই নেই। বইমেলার মতো বড় আয়োজন করার মতো লোকবল এবং কারিগরি কৌশল জানা লোক বাংলা একাডেমিতে নেই। সে কারণে বছর বছর ধরে মেলা নিয়ে নানা রকমের বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে।’

লেখায় বা আলোচনায় বই প্রকাশের আগে পাণ্ডুলিপি সম্পাদনার গুরুত্বের কথা বার বার বলে আসছি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই নিয়ম কড়াকড়িভাবে অনুসরণ করা হয়। বাংলাদেশে হাতেগোনা দুয়েকটি প্রতিষ্ঠান পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা ও ভালভাবে বানান সংশোধনের ব্যবস্থা বজায় রেখেছে। শতকরা ৯৯ ভাগ প্রকাশকই কোন লেখকের পাণ্ডুলিপি নিজে পাঠ কিংবা নিজস্ব লোকের মাধ্যমে পাঠের ব্যবস্থা নেন না। আর লেখকদের কথা বলে লাভ নেই, খুব কম লেখকই পাওয়া যাবে যিনি নিজের লেখাটি পত্রিকায় প্রকাশের পর বই করতে দেয়ার আগে আরেকবার পর্যালোচনা/ পরিমার্জনা করেন। অন্য কোন লেখক কিংবা বোদ্ধা পাঠক-সমালোচক অথবা কোন সম্পাদকের মাধ্যমে গোটা গ্রন্থ একবার চোখ বুলিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়ায়ও যান না। সত্যি বলতে কী আমাদের দেশে এখন বিপুল পরিমাণে বই বেরুচ্ছে, আর শোচনীয় হারে নেমে যাচ্ছে তার গুণ ও মান। গ্রন্থের সামগ্রিক মান নিয়ে যাঁরা হাতেকলমে কাজ করছেন তাঁদের ভেতর আছেন লেখক রাখাল রাহা। তিনি ফিবছর বেশকিছু বইয়ের পা-ুলিপি সম্পাদনার কাজ করে থাকেন। তবে সম্পাদনা নয়, শিশুতোষ বইসংক্রান্ত তাঁর বক্তব্য এখানে তুলে ধরব। তিনি বলছেন, ‘বাংলা একাডেমির মধ্যকার স্টলগুলোতে শিশুদের বইয়ের বিক্রি একদম খারাপ নয়। কিন্তু উদ্যানের মধ্যকার স্টলগুলোতে অর্থাৎ মূলধারার সৃজনশীল প্রকাশকদের স্টলে শিশুদের বইয়ের বিক্রি প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু এখানকার অনেক প্রকাশকেরই অনেকগুলো করে শিশুতোষ বই আছে এবং সেগুলোর মান তুলনামূলকভাবে বাংলা একাডেমি চত্বরের স্টলগুলো থেকে ভাল। আগামীতে মেলার আয়োজন এভাবেই রাখা হলে এর দুটো প্রভাব পড়তে পারে। এক, মূলধারার সৃজনশীল প্রকাশকরা মেলাকে কেন্দ্র করে শিশুদের বই করা আরও কমিয়ে দিতে পারে; এবং দুই, কেউ কেউ উদ্যান ছেড়ে শিশুদের বই নিয়ে বাংলা একাডেমির মধ্যে স্টল বরাদ্দের জন্য আবেদন করতে পারে।’

তরুণ কথাসাহিত্যিক মাহবুব মোর্শেদ ফেসবুকে মেলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে লিখেছেন, ‘কালকে বইমেলায় গেলাম। টানা ৮ ঘণ্টা থাকলাম। আট ঘণ্টায় কেজিখানেক ধুলো খেলাম। আগে এ রকম ধুলো হলে মানুষ বাংলা একাডেমিকে গালাগালি করত। টিভিগুলো ফুঁসতো। মিডিয়া ফুঁসতো। এখন আর সে যুগ নাই। এখন লোকে আরামছে ধুলো খায় আর বাংলা একাডেমির প্রশংসা করে। সোহ্রাওয়ার্দীর মেলাকে যদি বলি কুরুক্ষেত্র তবে বাংলা একাডেমি অংশ রীতিমতো কুঞ্জবন। অবশ্য পাবলিক জানে না, মেলা কই হইতেছে। ফলে, দুপুরের পর থেকে লাইন পড়ল বাংলা একাডেমির দিকেই। সোহরাওয়ার্দীর দিকে মেলা হইতেছে এটা বলার কেউ নাই, দেখায়ে দেয়ারও কিছু নাই। শেষ পর্যন্ত, লোকে বাংলা একাডেমি ঘুরে ফিরে সোহরাওয়ার্দীতে ঢুকছে। মূল মেলায় বাংলা একাডেমির মাইকের আওয়াজ ছাড়া আর কিছু পৌঁছায় না। মেলায় বাহারি দোকান আছে কিন্তু স্টলগুলো পরিকল্পিতভাবে বসানো হয় নাই। ফলে, খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সেই অর্থে কোন রো বা নাম্বারও নাই। মানে রো ধরে নাম্বার ধরে স্টল খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা বৃথা। কালকে বেচাবিক্রি খারাপ হইল না বইলাই মনে হইল।’

আগামীকালই মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। সকাল থেকেই লোক সমাগম হবে বইমেলায়। শহীদদের প্রতি সম্মান জানানোর অন্যতম উৎকৃষ্ট উপায় হোক অন্তত একজন তরুণ লেখকের বই কেনা। আসুন বই কিনি, বই পড়ি। বইয়ের আলো সবার মাঝে ছড়িয়ে দেই।

marufraihan71@gmail.com

প্রকাশিত : ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২০/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: