মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পথীকৃৎ

প্রকাশিত : ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • হামিম কামাল

শহরের সামাজিক মানুষ সকল সপরিবারে চলে এসেছে। দেখতে পাচ্ছে, সুবিশাল এক থালা পাতা হয়েছে ঘাসে ঢাকা মাঠের ওপর। চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে বয়-বেয়ারা, তাদের পরনে সাদা পোশাক। মাথার সাদা টুপি বাতাসে ফেঁপে আছে। আকাশ মেঘলা, ঠাণ্ডা বাতাস বইছে সবার ঘাড় আর বাহুর পেশির ওপর। যাদের শরীরে শীতের কাপড় কম, তারা বাহু ঘষে তাপিত করছে, হাতে হাত ঘষছে। কিছুক্ষণ পর বিকেল কেটে যাবে সন্ধ্যা আসবে। প্রকৃতিতে তার আয়োজন শুরু হয়ে গেছে। খোলা মাঠে ক্রমশ নেমে আসা অন্ধকার ঠেকাতে, সপ্তভূজ তৈরি করে তার প্রতিটি কোণে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে উজ্জ্বল বন্যাবাতি।

মখমলের একটা গালিচা থালার গোলাকার পরিধি জুড়ে বসানো হলো। বেয়ারাদের প্রধান হাসিমুখে ঘোষণা করলো, ‘আয়োজন তৈরি!’

করিডোর থেকে ঘাসে নেমে এলো রিক্তলাল পাশা। আগতদের দিকে হাসিমুখে এগিয়ে দু’হাত বাড়িয়ে দিলো, বিকশিত হলো তার সব ক’টা দাঁত।

‘কষ্ট স্বীকার করে এসেছেন বলে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার প্রাণপ্রিয় শুভাকাক্সক্ষী অতিথিসকল। আপনাদের জন্যে, শুধু আপনাদের জন্যেই আমি এ অভিনব আয়োজন করেছি।’

‘এতো বড় থালা কিসের জন্যে?’ প্রশ্ন করলেন আগতদের কেউ।

রিক্তলাল বললো, ‘এখানে সবাই প্রীতিভোজে অংশ নেবে একসঙ্গে।’

‘এই এক থালাতেই বসবে সবাই!’ কেউ একজন আশ্চর্য হলো।

‘বিনয়ের সঙ্গে জানাচ্ছি, ঠিক তাই। এক থালাতেই খেতে হবে সবাইকে, সে জন্যেই তো রীতিমতো নকশা করিয়ে নামী কারিগর দিয়ে এটা বানানো হলো।’

আগত অতিথিদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো। কৌতূহলী অতিথিদের একজন প্রশ্ন করলেন, কণ্ঠে কৌতুক, ‘এমনটা করার কারণ?’

‘কারণটা রহস্যময়, তবে গোপন নয়। আমি চাইছি আমার ছেলের সন্তান একজন বড় নেতা হোক। গোটা জাতিকে যে সংগঠিত করতে পারবে। তার জন্মপ্রক্রিয়ার এই অতিসূচনাকালে অর্থাৎ ছেলের বিয়েতে, আমি তার বীজ বপন করতে চাইছি। সবাই এক পাতে খেতে বসবে, বাতাসে তার তথ্য থেকে যাবে। সে তথ্য ভবিষ্যত পথীকৃৎকে দৈব থেকে প্রণোদনা যোগাবে যেন সে মানুষের সামষ্টিক স্বার্থ রক্ষা করে। তাড়না যোগাবে সবাইকে একীভূত দেখার, একাকার দেখার। একার্ণব দেখার। আপনারা আমার শুভানুধ্যায়ী সুহৃদ। বিপদে-আপদে, সুসময়ে-দুঃসময়ে আমার পাশে থেকেছেন। আমি তাই এটুকু সাহস করতেই পারি, আমার কাজকে নিছক পাগলামো জ্ঞান না করে আজও আমাকে সহযোগিতা করবেন।’

অতিথিদের একাংশ নীরব রইলো, একাংশ কানাকানি করতে শুরু করলো, ‘পাশা ক্ষেপেছে।’ অতিথিদের মধ্যে উচ্চবিত্তদের অঘোষিত প্রতিনিধি ফজল প্রমিথিয়াস এগিয়ে এসে বললেন, ‘বেশ। আমরা সবাই একপাতে খেলে যদি তোমার নাতি বা নাতনি পথীকৃৎ হয়ে ওঠে তো হোক না! তোমার ছেলেকে দেখছি না যে!’

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিশাল তোরণে আবির্ভূত হলো ছেলে রক্তলাল পাশা, রিক্তলাল পাশার একমাত্র ছেলে। তার সঙ্গে মানবীরূপী এক গোলাপী ফড়ফড়ে প্রজাপতি, তার নববধূ তিতলি পার্বতী। পেছনে কালো লম্বাটে পোশাক পরিহিত জনবিশেক সখা-সখীদের দল। তাদের এগোনোর পথে রক্তলাল সকলের সঙ্গে করমর্দন করলো।

মাঠের একপ্রান্তে ঘাসের ওপর নতুন বর কনের জন্যে আলাদা আসন পাতা হয়েছে। দু’জনে এগিয়ে সেখানে বসলো। সখা-সখীরা তাদের আশপাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো ঘাসে বিছানো গালিচায়। কেউ বসল ঠা-া ঘাসের ওপর।

আরেক কোণে একই রকম গালিচা পেতে বসেছে যন্ত্রীদল। যন্ত্রে উঠছে-নামছে, বাড়ছে-কমছে উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সুর। ঐ ঘরানাটাই পিতাপুত্রের বেশি পছন্দের।

রক্তলাল পাশা ঘোষণা করলো, ‘আমার ছেলে আর ছেলের বধূ আসন গ্রহণ করেছে। এবার তাহলে প্রীতিভোজ শুরু করা যাক।’

ফজল প্রমিথিয়াস বসে পড়লো সবার আগে। তাকে অকপটে বসে পড়তে দেখে বিশাল কাঁসার থালার হলদেটে কিনারার কাছে কাছে, একে একে বসে পড়লো আগত অন্যান্য অতিথিরা। বেয়ারারা তাদের সামনে খাবার সাজাতে লেগে গেল। সুবিশাল থালার মধ্যখানে সাজিয়ে রাখা হয়েছে নব্বই হাজার ফুল। তাতে আলো ছড়াচ্ছে বারো রঙের গোলাপ, এগার রঙের জারবেরা, নয় রঙের অর্কিড, সাত রঙের চন্দ্রমল্লিকা।

বিয়ের চার বছর পর গর্ভধারণ করলো সেই ফড়ফড়ে প্রজাপতি তিতলি পার্বতী। ষষ্ঠমাসে যখন শিশুর মস্তিষ্ক, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রায় পরিণতি পেতে শুরু করলো, রিক্তলাল ও রক্তলাল তখন তিতলিকে নিয়ে চলে গেল খাগড়াছড়ির প্রত্যন্ত পাহাড়ী এলাকায়। তেরপলবিহীন এক কঙ্কালসদৃশ জীপগাড়ির অরক্ষিত যাত্রা। একশত সাতানব্বই বার ডানে ও বামে পাহাড়ের হাজার ফুট মুখব্যাদানে পড়ে যেতে যেতে কোনক্রমে যাত্রাপথে অবস্থান বজায় রাখলো গাড়িটা। এর মধ্যে স্কুলগামী দুই ত্রিপুরা শিশুকে দেখা গেল চাকার বাম্পারে পা রেখে জীপের তেরপলবিহীন খাঁচা আঁকড়ে ধরে ঝুলছে। কী মায়াবী তাদের মুখ। ভেতরে আসতে রাজি হলো না।

রক্তলাল পাশা তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করল, ‘তিতলি কেমন বোধ করছ?’

ভীতসন্ত্রস্ত মুখে বধূ জবাব দিলো, ‘মনে হচ্ছে কোন অদৃশ্য হাত শেষ মুহূর্তে আমাদের খাদের কিনার থেকে সরিয়ে সরিয়ে আনছে বারবার। আমি এমনকি নিচটা পর্যন্ত কয়েকবার দেখতে পেয়েছি। পাথর, বড় বড় ফার্ন আর অন্ধকার। হৃদস্পন্দন প্রচ-ভাবে বেড়ে যাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে, মনে হচ্ছে ঘাড়ের রগ ছিড়ে যাবে। দীঘিনালায় কোথায় উঠবো আমরা?’

‘কবিরাজ বদিমাঝির বাড়িতে।’

‘তুমি চেনো তাকে?’

‘আমি নই বাবা চেনেন। তিনি তরুণ বয়সে এখানে এসেছিলেন বহুবার। তখন বদিমাঝির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হয়েছে।’

প্রবল বাতাসে তিতলি পার্বতীর চুল উড়তে থাকলো। ভয়বিস্ফোরিত চোখে সে খাদগুলোর দিকে তাকাচ্ছিল। কিন্তু যাত্রা শেষে জীপ যখন দীঘিনালা বাজারের সামনে এসে থামলো, স্বামীকে ডেকে বললো তিতলি পার্বতী, ‘পথটা শেষ হয়ে গেল? এতো অল্প সময়ে? আমার মন বলছিল এ পথ আর কোনদিন শেষ না হোক। এতো সুন্দর ফেলে এতোদিন কোথায় পড়ে ছিলাম?’

কবিরাজ বদিমাঝি বাজারে অপেক্ষা করে ছিল তাদের জন্যে। রিক্তলাল গাড়ি থেকে নেমে তাকে জড়িয়ে ধরলো।

পাহাড়ে এক মাস কেটে গেল।

ফেরার পথে মনোদয় অরণ্যবিহার এলাকায় অচিন পাহাড়ের চূড়া অতিক্রম করার সময় তাদের জীপে একদল কালো মেঘ ঢুকে গেল। তিতলি আরও পশ্চিমে তাকিয়ে দেখলো, পাশের চূড়োয়ও একপুঞ্জ কালো মেঘ পাহাড়প্রাচীরে লেগে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। তার চোখে পানি এসে গেলো। রিক্তলাল জিজ্ঞেস করলো, ‘কাঁদছো?’

তিতলি বললো, ‘না। এতো সুন্দর সহ্য করতে পারছি না রিক্ত। তোমার হাতটাও খুঁজে পাচ্ছি না।’

সে মাসেই তারা চলে গেলো মধুপুর।

রিক্তলাল পাশা মধুপুর বনে আসছে জানতে পেরে তার গারো বন্ধু লেবিসন অরণ্যচারী, অরণ্যের ভেতর একটা কুড়েঘর তৈরি করে দিল। মেটে রাস্তায় গাড়ি রেখে এসে রিক্ত, রক্ত, পার্বতী যখন হেঁটে চলছিল তখন শ্বশুরপিতা পুত্রবধূকে ডেকে বললো, ‘এখানে এখন বিস্তীর্ণ বনভূমি দেখতে পারছো মামণি, এটা কিন্তু ছিল না। আমরা যখন কিশোর, মানুষ পুরোপুরি নষ্ট করে ফেলেছিল এ মাটি এ বন। সব গাছ কেটে ফেলেছিল, বনের শ্রাদ্ধ চলেছিল বছরের পর বছর। তারপর প্রকৃতি দেবির এলো বোধনের কাল। এখানকার মানুষ নিশ্চিহ্ন করলেন তিনি। এদের সৃজনশীল নয় বরং সৃজনবিধ্বংসী হিসেবে দেখতে পেয়ে, বহু বহুদিন পর আত্মরক্ষার ভার মানুষের প্রতিনিধিত্ব থেকে কেড়ে নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন। এরপর আবার গড়ে উঠেছে বন, একদম সময় নেয়নি। এ মাটি তো উর্বরা ভীষণ, বনপ্রসবা।’

‘কী আশ্চর্য সুন্দর বন বাবা। অন্ধকার নয়, আবার পুরোপুরি আলোকিতও নয়, যেন জোছনা। পাতাগুলো কী ভীষণ মায়াকাড়া, ছায়া দিয়ে রাখতে চাইছে আমাদের। কী ওটা পালিয়ে গেল?’

‘ঘোড়ার শাবক। আমরা কুড়ের কাছে চলে এসেছি।’

সেখানেও কাটলো একটি মাস।

মধুপুরের বন থেকে বেরোবার সময় তিনজনের দলটির গতি হলো মন্থর। তিতলি পার্বতী খুব ধীরে ধীরে চলছিল। বনের গাছপালার ফাঁকফোকর গলে ওর পাশে পাশে চলছিল শ্বশুরপিতা ও স্বামী। তিতলি রিক্তলাল পাশার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, ‘বাবা। এবার কোথায় যেতে হবে? যেতেই হবে?’

‘হ্যাঁ মা আমার, এবার সমুদ্রে। এটাই শেষ। পাহাড় থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তাকে মহাযাত্রায় পরিণত করতে সমতল বন হয়ে, অসংখ্য জনপদকে ঋদ্ধ করে সাগরের দিকে ধাবমান নদীজীবন তোকে দেখাতে চাই। এ কারণেই আমাদের এবারের যাত্রা সমুদ্র, শেষ যাত্রা। তোর মগজে একটা সঠিক ধারাবাহিক প্রাপ্তি ও পরিবেশ খেলে গেলো। এটা মগজে থেকে গেল। রক্ত এসে সে মগজ ধুয়ে দিলো, তার অণুতে পরমাণুতে এ তথ্যগুলো লিখে নিলো।’

তিতলি পার্বতী বললো, ‘আমি আমার মায়ের কাছে যাবো না বাবা? আমার জন্মদাত্রীর কাছে না গেলে আর যে ভরসা পাচ্ছি না। আমার সন্তান হওয়ার সময় কাছিয়ে আসছে যে।’

‘জানি মা। কিন্তু আরেকটু অপেক্ষা কর, আমি চাই অপেক্ষাটা তীব্রতর হোক। এটার প্রয়োজন আছে, অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে একটু বেশিই। পৃথিবীর সৎ ইতিহাসের স্বার্থে মানুষের স্বার্থে।’

‘বেশ। আমিও তো তাই চাই। কিন্তু এতো শ্রম বৃথা যাবে না তো বাবা? তুমি নিশ্চিত যে আমরা ঠিক উপায় ধরে এগোচ্ছি?’

‘এ উপায় আমার নিজের ভেবে বার করা এবং ইতিহাসে এবারই প্রথম। যদি সফল হই, তখনই ‘নিশ্চয়তা’ শব্দটা আসবে। সেটা পৃথিবীর অন্য মানুষেরা ব্যবহার করবে। ঠিক বলেছি?’

‘‘ঠিক’, ‘বেঠিক’ এইসব আপেক্ষিক শব্দে আমাদের কী প্রয়োজন বাবা?’

উপকূল।

যতদূর চোখ যায়, সমুদ্রঘেঁষা মেরিন ড্রাইভ চলে গেছে। তারই মধ্যখানে, যেখানে জনমানুষের আনাগোনা ক্ষীণ, সেখানে তারা গাড়ি থামালো। রিক্তলালের বন্ধু সিদ্ধহস্ত স্বালোকচিত্রী দেশের দক্ষিণে গেড়েছে শেষজীবনের ডেরা। সাগরের খুব কাছে আগে থেকেই বিশ্রামের জন্যে বিছানা পেতে রেখেছে তার ছেল, জীবন্ত কিংবদন্তি।

তিতলি বহুক্ষণ সমুদ্রের শব্দ গায়ে মাখলো, নোনা বাতাস পান করলো কানে, আর বিশাল জলরাশি দু’চোখে পুরে নিলো। যখন ঘুরে দাঁড়ালো সন্ধ্যা নেমে গেছে।

‘স্বালোকচিত্রীর বাড়িটা কাছেই, একদম প্রকৃতির মতো করে তৈরি। দেখলেই বুঝবে।’

‘কী আশ্চর্য!’ তিতলির উল্লসিত কণ্ঠ। ‘এ বাড়ি তো আমরা দেখেছি! গেলোবার মধুচন্দ্রিমায় ইনানীর দিকে যাচ্ছিলাম যখন, আমরা ভেবেছিলাম এটা বুঝি কোন প্রমোদ আবাস। আর ওখানে থাকার জন্যে কত বড় অঙ্কই না খরচ হতে পারে!’

স্বালোকচিত্রী হেসে বললো, ‘এরপর এলে কিন্তু তোমাদের অন্য কোথাও ওঠা কিন্তু বারণ। বিনিময়টা একটু বেশিই নেবো, তা হলো আমাদের ইচ্ছে হওয়ার আগে যেতে দেব না।’

‘সিজার করতে হবে। প্রসূতির রক্তে শর্করা বেশি।’

‘আমার মেয়ে বা ছেলে জুলিয়াস সিজার হবে না। আমি চাই তার সেভাবেই জন্ম হোক, যেভাবে প্রথম প্রজননশিশুর জন্ম হয়েছে।’ তিতলি জানালো শান্ত কণ্ঠে।

‘ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে।’

‘যখন তখন যে কোন কিছুই বুমেরাং হতে পারে ডাক্তার। প্রকৃতির স্বাভাবিকতায় সহায়তা করুন।’

‘আপনাকে বোঝানো কঠিন। শুধু আপনাকেই নয়, এই আপনাদের।’

‘একটা তাঁবু খাটানো হবে, রেললাইনের পাশেই হোক। একটা বেড়াল প্রয়োজন হবে, তীক্ষè নখ থাকবে সে বেড়ালের। শেষ মুহূর্তে ওটা আমার পেট চিরে দেবে। খুব ভালো হয় যদি একটা ট্রেন বগিচ্যুত হয়ে মাটি হেঁচড়ে ছেঁচড়ে নিহত হয় একশ’ মানুষ। ঠিক তখনই ভূমিষ্ট হবে আমার সন্তান। জন্মেই সে দেখতে পাবে মৃতত্যু। দেখবে, এতো এতো মানুষ তার সামনে মৃত পড়ে আছে। অতঃপর তাকে ঘিরে দাঁড়াবে আরও একশো মানুষ। যাদের কাছে সে হবে একমাত্র জীবিত মানবসন্তান। তাকে দেখে তারা জয়ধ্বনি করবে। সেই মৃত্যুর ছবি, জড়ো হয়ে আসা মানুষের ছবি, যন্ত্রের পতনের ছবি, জয়ধ্বনির উল্লাসবাক্য, তার মনে আঁকা হয়ে যাবে। জীবনের এমন মাতাল সূচনা থেকে পুষ্টি নিয়ে ক্রমশ পরিণত হয়ে ওঠা আমার সন্তান, খুলে খুলে পড়া পৃথিবীকে একদিন সংগঠিত করবে।’

‘আপনি পাগল হয়ে গেছেন!’

ইতোমধ্যে সাদা পর্দা সরিয়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করেছে রক্তলাল পাশা। বলে উঠলো, ‘শেষ হাসি কে হাসতে যাচ্ছে তার ওপর চিরকাল নির্ভর করেছে কে পাগল আর কে তা নয়।’

রিক্তলাল পাশার সুহৃদেরা দ্রুত আসতে শুরু করেছে মাতৃসদন প্রাঙ্গণে। রিক্তলাল বুঝিয়ে দিয়েছে, শিশুর জন্মের পর তাকে ঘিরে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে সবার, প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে হবে শিশুটির দিকে, যারা রক্তলাল পাশা আর তিতলি পার্বতীর বিয়ের দিন একপাত্রে খাবার খেয়েছে।

মাতৃসদনের ফুলের বাগান ঘিরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে শুরু করেছে সবাই। প্রমিথিয়াস আর স্বালোকচিত্রী, লেবিসন, বদিমাঝি সবাই রিক্তলালের হাত, কাঁধ ধরে রেখেছে। সবাই অপেক্ষা করে আছে, শিশু ভূমিষ্ট হলে তাকে নিয়ে আসা হবে বাগানের মাঝখানটায়।

রিক্তলাল আবেগঘন কণ্ঠে বললো, ‘সবাই চশমার কাঁচ মুছে নিন, পথীকৃৎ আসছে। আর বেশি সময় নেবে বলে মনে হচ্ছে না।’

বহুক্ষণ কেটে গেল, পথীকৃৎ এলো না। কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে সবাই বাগান ছেড়ে ধীরে ধীরে ভবনের দিকে এগিয়ে গেল। দেখলো রিক্ত শূন্য পড়ে আছে এক নোংরা হাসপাতাল। সারি সারি ওয়ার্ডের দরজায় ঝোলানো সাদা পর্দা বাতাসে উড়ছে, করিডোরের দেয়াল ঘেঁষে অসংখ্য স্ট্রেচার স্তূপ করে রাখা হয়েছে, ছাদে নিয়মিত বিরতিতে লাগানো গোলাকার বাতিগুলো জ্বলছে নিরুত্তাপ, শুধু কোথাও কেউ নেই।

প্রকাশিত : ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২০/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: