আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অন্তরঙ্গ অবলোকন

প্রকাশিত : ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • রহমান মতি

এক.

কবিতাকে তার শরীর নির্মাণের জন্য বজায় রাখতে হয় নানারকম পদ্ধতি। কাল বা সময়প্রবাহ কবিতার শরীরকে পুষ্ট করে। জীবনানন্দ দাশের কবিতা অবশ্যই কাল এবং জীবনসচেতন। অবিরাম চেতনার স্মারকও তাতে বিদ্যমান। অবিরাম বলছি কারণ এর অর্থময়তা এবং অনুভব বারবার নতুন ইঙ্গিত দিতে পারে। ‘কবিতার কথা’য় জীবনানন্দ শাশ্বত কবিতার প্রসঙ্গে যে কথাগুলো বলেছেন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবে আধুনিকতার বিভিন্ন স্বতন্ত্র প্রয়োগধর্মীতায় তার স্থান আছে। হাল সময়ে জীবনানন্দকে পাঠক-সমালোচক নতুনভাবে দেখতে উদ্বাহু হয়েছেন। জীবনানন্দের কবিতার মর্ম কিংবা অন্তঃস্বর যদি নানা ছোট-বড় পর্যায়কে কাটিয়ে, রাজনৈতিক বাধাকেও কাটিয়ে জীবদ্দশায় প্রতিষ্ঠিত কোন স্বীকৃতি পেত হয়ত এ বক্তব্য প্রদানের প্রয়োজনীয়তা অতটা থাকত না। এখনকার প্রেক্ষিতটি যে সম্পূর্ণ প্রগতিশীলতার এমনটি স্পষ্ট বলা কঠিন। বিশ্লেষণের ভঙ্গি অথবা যুগকালীন প্রাসঙ্গিকতার বাইরেও জীবনানন্দ সর্বজনীন হওয়ার মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবি। এ বক্তব্য সবার নাও পছন্দ হতে পারে। কিন্তু, স্বর পরীক্ষা করে দেখবার চেয়েও কবিতার অপরিসীম গ্রহণযোগ্যতায় রবীন্দ্রনাথের পর সবচেয়ে ভিন্ন জীবনানন্দ দাশ। কাব্যবস্তুর ভিত্তিতে বক্তব্যে, ভঙ্গিতে তাঁর মত স্বতন্ত্রর আর কেউ নেই।

দুই.

জীবনানন্দের কবিতার বৈচিত্র্যের প্রত্যেকটি কাব্যগ্রন্থেই এমন কিছু কবিতা আছে যেখানে বহুমুখী অর্থই প্রধান। ‘ধূসর পা-লিপি’র ‘স্বপ্নের হাতে’ কবিতাটি এমন। ‘বোধ’ কবিতায় স্বপ্নকে বোধ বলেছেন। এ কবিতায় স্বপ্নের শরীর, কাঠামোগত পরিবর্তনে অন্যান্য ধারা রয়েছে। চেতন ও অবচেতনে বহুমাত্রিক গঠনের মধ্যে স্বপ্নের বিকাশ ও পরিণতি আর মানুষ তার সঙ্গে কিভাবে সম্পর্কযুক্ত ইত্যাদি মিলে অসাধারণ হয়েছে এর বাণী। প্রথমে কবিসত্তার দৃঢ় আশাবাদ ‘থাকিত না হৃদয়ের জরা/সবাই স্বপ্নের হাতে দিত যদি ধরা’। বাস্তব জীবনের যত ব্যাঘাত-বাস্তব তার সঙ্গে অবচেতনের স্বপ্নজগত ভিন্ন। বাস্তবের অসম্ভব কিছু অনেকসময় স্বপ্নের সত্য হয়ে ফলে যায়। তাই পৃথিবীবাসীকে পৃথিবীর পদচারণা থেকে সরে স্বপ্নজগতে আহ্বান কবির ‘ভুলে যাও পৃথিবীর ঐ ব্যথা-ব্যাঘাত-বাস্তব’! দুই ধরনের অনুভূতিশীল মানুষকে বর্ণনা করছেন যেখানে স্বপ্নহীন এবং স্বপ্নযুক্ত বাস্তব পরিবেশবাদীরা কী করছেন, কী বিশ্বাস করছেন ইত্যাদির চিত্ররূপময়তা আছে। পৃথিবীতে অবগাহন করে জীবনের সামগ্রিক সাফল্য ব্যর্থতাকে হিসেব-নিকেসের আয়োজন বিদ্ধ করতে হয়। স্বপ্নের কাছে অবশেষে মানুষকে আশা নিতেই হয়। করুণ জীবনের ক্ষণস্থায়ী রূপ স্বপ্নের কাছে অসামান্য প্রাণশক্তি পেতেও পারে। এই বিশ্বাস কবির একান্ত। যেহেতু জীবনের সমগ্রতায় যা সুখসময় বা কবির কথায় ‘উজ্জ্বল আলোর দিন’ সেটি চিরকালীন নয়। মহাকালীন বাস্তব পথরেখা মুছে ব্যক্তিজীবনকে ‘একা’ করে দেয়। নিঃসঙ্গতার বোধ ও যন্ত্রণায় মানুষের মৃত্যু আসে। যেভাবে নক্ষত্রের মৃত্যু হয়। নক্ষত্রের মৃত্যু ও স্বপ্নহীন ধূসরতার সাথে মানুষের জীবনের সীমাবদ্ধ আয়ুর তুলনা অসাধারণ।

তিন.

‘আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা হয় যদি!’ Ñপ্রথমেই মোচড় খেয়ে উঠবে বুক। প্রেমের প্রবাহে জৈবনিক মাধুর্যের পর বেদনা ও জীবনের সর্বাঙ্গীন প্রকাশে রোমান্টিকতার আবহ অত মধুর হয় না। কেননা, কষ্টস্নাত দুমড়ে যাওয়া পাখির ডানার মতো এই হাহাকার জীবন ও প্রেমের অমলিন প্রকাশ। বিভিন্ন দৃশ্যাবলীর সঙ্গে যখন মানসসুন্দরী প্রিয়তমাকে একবার দেখার আকুতি প্রবল হয়ে ওঠে, ক্রমাগত হৃদয়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করাই তার উদ্দেশ্য হয়। একটি দৃশ্যের পর আর একটি দৃশ্য। মাঝখান থেকে শুধু ভেঙে পড়া শব্দ ও পরিবেশ। হঠাৎ দেখা পাবার আকুলতা মানুষের অনুভূতিময় সহজ উপলব্ধি। পুরো দৃশ্যটি শেষ হয়ে আসার পরেও একটি আশা কিংবা অনাগত স্বপ্ন থাকে। বাবলার গলিতে, অশথের জানালায় পেঁচার অবগাহনের সঙ্গে চিলের ডানার বিরাম অপূর্ব যোগসূত্র। কর্মময় জীবনপ্রবাহে দুটি মানব-মানবীর প্রেম ও বিচ্ছেদ অনুপম মসৃণ হয়ে ওঠে এভাবে ‘জীবন গিয়েছে চলে আমাদেও কুড়ি কুড়ি বছরের পার/তখন হঠাৎ যদি মেঠোপথে পাই আমি তোমারে আবার’। সমসাময়িক জীবনও এ ধরনের প্রেমকল্পের বাইরে নয়। কর্মময় গতিশীলতায় সবচেয়ে তাৎপর্যশীলতা আছে কুড়ি বছরের জীবন অতিবাহিত হয়ে যখন জীবনের সমূহ আক্ষেপ প্রকাশিত হলো। এতে নৈসর্গিক দৃশ্যাবলীর ছাপ থাকলেও বেদনাকে সৌন্দর্যের বিপরীতে দৃশ্যময় করার অভিনবত্ব জীবনানন্দ দাশের একার।

চার.

‘পুনর্জন্ম’ বা ‘জন্মান্তরবাদ’ সস্পর্কিত জীবনানন্দের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট কবিতা ‘আবার আসিব ফিরে’। ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থের ‘কমলালেবু’ কবিতায় পুনর্জন্মের প্রসঙ্গটি একেবারে ভিন্ন। সাবলীল কথনরীতিতে হলেও এ ছোট কবিতাটি খুব দিগন্তপ্রসারী একটি বক্তব্যকে ধারণ করেছে। ‘আবার আসিব ফিরে’তে ‘আবার আসিব ফিরে, ধানসিঁড়িটির তীরে; এই বাংলায়’-খুব সাধারণ কথাতে আপন দেশের প্রতি হৃদয়ের অনেক গোপন কথা বলার ভঙ্গিটিও ‘কমলালেবু’তে পাল্টে গেল। ‘একবার যখন দেহ থেকে বার হয়ে যাবো/আবার কি ফিরে আসব না আমি পৃথিবীতে?’ ঐ বক্তব্যের থেকে সম্পূর্ণ অন্য হলেও জীবনানন্দের পুনর্জন্ম পাবার অবিরাম ব্যাকুলতা মুগ্ধ করে। ‘আবার যেন ফিরে আসি’Ñ মূলত উপরের দুটি পঙ্ক্তিকে মাত্রা দিতে ফের বলা হল। জীবনের যাবতীয় কর্মচাঞ্চল্যের মধ্যে পুনরায় অবগাহনের জন্য মৃতকল্প হৃদয় তার বাস্তবতার পৃথিবীতে প্রাণ পাবার ব্যাকুলতায় অধীর। ভীষণ রকম আকুল কবি। আকুলতার মূলে জাগতিক মোহ নয় বরং তার কর্তব্যচেতনাকে-ই বড় মনে হয়। শীতের রাতে হিম কমলালেবুর সঙ্গে পাক্সম্পর্য পাবার প্রসঙ্গ পরিবেশীয় গুরুত্বের দিক থেকে শীতের শীতলতার সাথে হিম কমলালেবুর সম্পর্ক বেশি প্রাসঙ্গিক। উপমা বা চিত্রকল্পের বহুমাত্রিক ব্যবহারের মধ্যে কবির দক্ষতা অত্যন্ত ভালো। যদিও জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে ‘উপমাবহুল’ বলা হয়। এটি হয়ত সমালোচনার একমুখী প্রবাহ। যাতে একজন কবিকে সুনির্দিষ্ট একটি ‘বাঁক’ এ আবদ্ধ করা যায়। অথচ, বিশ্লেষণের উন্মুক্ত মানসিকতার বাইরে যদি বহুরৈখিকতা থাকে তাহলে জীবনানন্দ দাশের মতো আধুনিক কবির কবিতায় কত যে নিরীক্ষণ-নতুনত্ব, ভঙ্গি, আবিষ্কার ইত্যাদি রয়েছে অবাক বিস্ময়ে তাকে দেখতে পারি সবাই। ‘হিম কমলালেবুর করুণ মাংস’Ñ বিষয়টি খুব সাধারণমত বিবেচনা করলে বা ভাবলে খুব ভুল হয়ে যাবে। কমলালেবুর মতো একটি নরম ফলকে তার অন্তর্গত গঠনের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে মানুষের রোগ বা ‘মুমূর্ষু’ অবস্থার সাথে পৃথিবীতে কর্তব্য ও নিজস্বতার পরাবাস্তব অবস্থানের কথা চিন্তায় আনা সত্যিই দুরূহ। জীবনানন্দ মানুষের অপরিহার্যতার কথা বলতে চেয়েছেন তা নয়, জীবনের অপরিহার্যতার মূলকে বাণীবদ্ধ করেছেন আর তার মাধুর্য পুরোটাই নিল একটি কমলালেবু। অভাবনীয় এই চিন্তা বা বোধ।

পাঁচ.

অসাধারণ কবিতা ‘তোমাকে ভালোবেসে’। নারীর প্রতি ভালোবাসার ক্ষেত্রে রকমফের আছে। কবিতা বা বাস্তবে দুই জায়গাতেই। দৈহিক ও আত্মিক প্রেমের প্রসঙ্গ সচরাচর পাওয়া যায়। জীবনানন্দের এ কবিতাটি প্রেম ও জীবনকে তার স্ব স্ব রূপ নতুনভাবে চেনালো। ব্যক্তির হৃদয় বারবার প্রেমের দিকেই ছুটে যায়। ব্যর্থতা আছে তবু পরাজয়ের ভাবনা নেই। জীবন যখন পরাজিত হয়ে ফিরে আসে নিঃশব্দ প্রহরগুলো সহজ কিছু ব্যাখ্যা দেয়। প্রথম থেকে বলার স্বরটি এত রোমান্টিক, মনে হবে আখ্যান বর্ণিত হচ্ছে যেখানে দুটি মানব-মানবীর সুন্দর প্রেমছবি আছে। পরে আর ঐ অনুভূতি থাকে না। পদ্মপাতায় রাত ফুরবার পর হৃদয় ভাবতে থাকে যে জল পদ্মপাতায় স্থান দখল করেছে, তা মনোহর হয়ে থাকবে। বৃথা স্বপ্ন মরীচিকা হয়। দিনের উজ্জ্বল আলোতে এ জল শুকিয়ে যাবে নতুবা জলাশয়ের জলের অগাধ ভা-ারে এক হয়ে থাকবে ঐ একফোঁটা জল। পদ্মপাতা পরে কবির নারীমূর্তি হলো। অনেক জন্মের জমাট ব্যথার ফলে বারবার পৃথিবীতে সহ্যশীল ব্যক্তিহৃদয়ের বেদনা নৈঃসঙ্গ অবয়ব গড়েছে। তাই, রাতের শিশিরের জলও পদ্মপাতায় আটকানো দায় হলো। ক্ষণস্থায়ী জল মিশে যাবে অগাধ জলের প্রবাহে। নিঃশেষিত জীবন প্রেমের স্পন্দনে ফের স্পন্দিত হতে চায়। পূর্বের পদ্মপাতার জলের সাথে ফের মিশে নতুন ‘আলো’ ও ‘গুণ’ এর সন্ধান পেতে মরিয়া হয়। অথচ, এ কল্পনা প্রবণতা বাস্তবিক ক্ষণস্থায়ী জীবনের কাছে শেষ পর্যন্ত ‘করুণ’। প্রেম, নৈঃসঙ্গ, জীবন, ক্ষণস্থায়ী সময়প্রবাহ ইত্যাদির সম্মিলনে রোমান্টিকতা মনে হলেও কবিতার মৌল অনুভবটি এত রোমান্টিক নয়। জীবনমুখী বাস্তবতার নানাবিধ চলনে প্রেম কত ক্ষণস্থায়ী হয় তার প্রকাশ। আধুনিক কবিতাই শুধু নয় যে কোন সময় ও জীবন জিজ্ঞাসার ‘প্যারাডক্সিক্যাল’ রীতিতে বড় আপন মনে হবে ‘তোমাকে ভালোবেসে’ কবিতাটি।

ছয়.

বিশ শতকের আধুনিকতার মধ্যে নিবিড়ভাবে জড়িত ছিল পুঁজিবাদ আজও তার ব্যতিক্রম নয়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বা বিচ্ছিন্নতার অঘটনঘটনপটীয়সী স্বভাবের ভেতর থেকে মানুষ কিভাবে ক্রমশ বদলে যাচ্ছিল তার বড় দৃষ্টান্ত ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতা। মানুষ বদল হলেও জীবন ও মৃত্যু ঠিকই থাকে। যেহেতু তারা নিয়মানাধীন। জীবনানন্দ দাশের আধুনিক মন জীবনকে উপেক্ষা করেনি। একজন কবি জীবন ও বাস্তবতার প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল হলে জীবন থেকেই জীবনের পরম ও গভীর অর্থ খুঁটে বের করা সম্ভবÑ এ কবিতাটি তার দৃষ্টান্ত। কবিতার ঐ লোকটিকে আমাদের চিনতে হয় অন্যভাবে। ‘মরিবার হল তার সাধ’- এ প্রত্যয়ই মূলত তাকে মৃত্যুর প্রতি অনুপ্রাণিত করে। আসলে জীবন থেকে ছিটকে পড়া একটি মানুষের জীর্ণ জীবন এতে জড়িত। তার সংসার ছিল। স্ত্রী ছিল। প্রেমও ছিল। এই প্রেম লোকটির মধ্যে প্রদীপ জ্বালাতে পারেনি। ক্লান্তিময় জীবনের অবসাদে সে আর কোনো পথ-ই দেখেনি। আত্মহত্যার পাপকর্মকে লোকটি একান্ত আশ্রয় ভেবেছে। লোকটি কেন তার বাঁধাধরা জৈবনিক মৃত্যুর পূর্বে নিজের মৃত্যু নিজেই চায়? এটি কি তাহলে নিঃসঙ্গতা। হ্যাঁ, নিঃসঙ্গতা অবশ্যই। বাস্তবতার প্রতি ব্যক্তির যখন অনীহা কিংবা ব্যক্তির প্রচুর সহ্যশক্তি থাকার পরেও যখন সে আর বাঁচতে গিয়ে কোনো আশ্রয় খুঁজে পায় না নিঃসঙ্গতা তখনই তৈরি হয়। এই নিঃসঙ্গতা ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির আবার ব্যক্তির থেকে খুব বেশি সমাজের। অদ্ভুত আঁধারে জানালার পাশে যে নিস্তব্ধতা এসেছিল সেটি নিঃসঙ্গবোধ। তাকেই বলছি সামাজিক। কারণ লোকটি সমাজের মধ্যেই অভিযোজিত হতে চেয়েছিল। জীবন ও মৃত্যুর পরস্পরবিরোধী অবস্থানকে জীবনানন্দ ‘পেঁচা’ ও ‘ইঁদঁর’ এর মাধ্যমে দেখান। পেঁচার কাছে ফসলের ইঁদুর যেমন অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করেছিল তেমনি জীবনও আত্মহত্যার মৃত্যুর কাছে বশ্যতা স্বীকার করেছিল। ‘যে জীবন ফড়িঙের দোয়েলের/মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা’। সত্যিই হয় না। ফড়িঙের ঘন ঘন আনন্দময় ছুটে চলা জীবনের মতো মানুষের জীবন নয়। প্রকৃতি কেন এই মানুষের মৃত্যুকে বরণ করে নেয়? সে কি একটু প্রতিবাদ করতে শেখে না? জোনাকি, পেঁচা এরা কি প্রতিবাদ করতে পারল না? বস্তুত এসব খ-চিত্রকে তুলে ধরে মানবিকতার প্রতি কবি তার অসামান্য দরদকে প্রকাশ করেছেন। এরপর, মৃত্যুর গল্পটি আরও বাড়ে। জীবন ও চাহিদার অপূরণীয় ক্ষেত্র তখনও বাকি। কবি গভীরভাবে দাবি করেন এ লোকটির জীবন আসলে ব্যর্থ নয়। সে প্রণয় পেয়েছে। বিবাহিত জীবনের স্বাদ পেয়েছে। তার দেহজ ও দেহাতীত এক জায়গায় এসে মিলেছে। কোনো খাদ ছিল না। কিন্তু শরীর, প্রেম, যৌনতা এসবই কি জীবনের সবটুকু? নারীর হৃদয় কি এতেই তুষ্ট হবে? না, সে জীবন অনেক রহস্যেও, অনেক জিজ্ঞাসা আছে এতে। ‘নারীর হৃদয়-প্রেম-শিশু-গৃহ নয় সবখানি’- তাহলে কী? জীবনানন্দ পরে উত্তর দিয়েছেন আরও ‘এক বিপন্ন বিস্ময়-আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভেতরে খেলা করে’। এই সেই ‘বিপন্ন বিস্ময়’ যেখানে অর্থ, কীর্তি, স্বচ্ছলতা সব লীন হয়ে যায়। অলঙ্কার বা ঐশ্বর্য সবই নারী চায়। কিন্তু, এই ‘বিপন্ন বিস্ময়’ই একমাত্র সত্য যার অর্থ নির্ধারণ কঠিন। বিবাহিত জীবনের একজন পুরুষ তাই শারীরিক প্রেম, মানসিক প্রেম, জীবনের স্বচ্ছলতা বা ঐশ্বর্য দিয়েই নারীকে তুষ্ট করতে সক্ষম হয় না। সে আরও যেন কী চায়। এ চাওয়ার রহস্যটি জানা নেই। মৃত্যুর প্রতি কবির যে আত্মমগ্ন অবস্থা তাতে ভাবা চলবে না যে, তিনি জীবন থেকে পালাতে চাইছেন। বুড়িচাঁদের যে উৎসব তাকে নিঃশেষ করে জীবনের প্রচুর ভাঁড়ারে মানুষের ফের জীবন বাস্তবতায় আসার আহ্বান। জীবনানন্দের শেষ কথা তাহলে ‘জীবন’। মাঝখানে যা কিছু তা জীবন সংশ্লিষ্ট বাস্তবতা।

সাত.

জীবনানন্দ দাশের কবিতার যথার্থ অর্থ নির্ণয় করা অসম্ভব কাজ। স্বর ও ভাষাভঙ্গি এমনই সেটি নিশ্চিতভাবে আমি আপনি বলতে পারব না যে কী এ কবিতার মর্ম। ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র ‘মানুষের মৃত্যু হলে’ কবিতাটি একটি নিরীক্ষাকে দাঁড় করিয়েছে। ‘মানুষ’ বিপুলতার ঐশ্বর্য নিয়ে পৃথিবীতে বিরাজমান। তার মৃত্যুপূর্ববর্র্তী অপরিহার্যতা খুব গভীর বাণীভঙ্গি পেয়েছে। চেতনার মাধ্যমে মানুষ পরিচালিত হয়। যে মানুষ মরে যাচ্ছে, সে মানুষ জীবিত মানুষের কাছে পূর্ণাঙ্গ মৃত নয়। সেই মানুষ-ই জীবিতের কাছে কোন না কোনভাবে অনুপ্রেরণার উৎস। যেখানে আদর্শগত বিষয়টি মূল। যারা এ পৃথিবীতে নেই তারা সবাই স্বতন্ত্র সত্তা নিয়ে মরেছে। অপূর্ব এ বোধ। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের এই যে ‘ফর্ম’ তাকে এত আধুনিক, এত নতুনভাবে দেখানোর ভঙ্গি এর আগে দেখা যায়নি। অতীশ দীপঙ্কর বা গৌতম বুদ্ধের মতো সাধকরা রাষ্ট্রনৈতিক ও সামাজিক চিন্তায় অংশগ্রহণ করে বর্তমানের কাছে আদর্শ। যন্ত্রসভ্যতার আধুনিকতায় পুঁজিবাদী বিশ্বের লোকেরা বিলাসিতায় মত্ত হলে অতীতের মানুষের কাছে অপরাধী হয়ে থাকে। বিচার-সুবিচারের দায়িত্ব বা কর্তব্য তাঁরা ভুলে যায়। সমাজের জন্ম হলে সেখান থেকে বিপ্লবের জন্ম হয়েছে। সভ্যতা এসেছে। একটা সভ্যতা পাল্টে নতুন সভ্যতা এসেছে। এর মধ্যে নির্মমতা-ই প্রধান ছিল। মানুষের মানবিকতার মূল্য তাহলে কোথায়? ১৯১৭-এর রুশ বিপ্লব কিংবা তার পূর্বে ফরাসি বিপ্লবের কথা বললেও তাতে নির্মমতা আছে। মহৎ ব্যক্তিরা সভ্যতার বিবর্তনে নির্মমতাকে চাননি। জীবনানন্দের কবিসত্তার ভেতরের ধারালো প্রভা কত স্বতন্ত্র তা দেখা যাবে পরের কথাগুলোতে। তিনি দেখাচ্ছেন বিবর্তনের ফলে পৃথিবীর নগরী ধ্বংস হয়েছে। সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে। মানুষ বদলে গেছে। আদিম উন্মত্ততা থেকে বর্তমানের আধুনিকতায় উন্নীত হয়েছে। মানুষই পৃথিবীর পুরনো রূপকে ধুয়েমুছে নতুন রূপকে সৌন্দর্যম-িত করেছে। সৃষ্টির অবিরাম নেশাতে মানুষই ধন্যবাদ পাওয়ার উত্তরাধিকার। মানুষ নিয়মতান্ত্রিক জীবনের যাবতীয় কাজের হিসাব কষতে চায়। এটি কর্তব্যেও প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আসে। নিয়তি বা কাজ দুটির ওপরে তার আস্থা থাকে। সময় অতিবাহিত হলে তারা স্মরণীয় করে রাখে। সময়কে মানুষ গুরুত্ব দেয়। মৃত্যু আসে দৈহিক কার্যক্ষমতাকে ম্লান করার জন্য। মৃত্যু কীর্তিমান মানুষের অস্তিত্বকে ম্লান করতে পারে না। মানুষের গুরুত্ব মানুষের কাছেও অসামান্য। মানুষের প্রতি যে কবির এত টান তিনি মহত্তম অবশ্যই।

পুনশ্চ.

কবিতা কী হিসেবে শাশ্বত হয়? ‘কবিতার কথা’তে জীবনানন্দ নিজে উত্তরটি ব্যাখ্যা করেছেন। মানুষই তো শাশ্বত হয়। কবিতা মানুষের সৃষ্টি। কবিতাকে মানুষ শাশ্বত করে তার পরিবর্তনশীলতা থেকে, সময় থেকে। জীবনানন্দ দাশের যে কয়েকটি কবিতাকে নতুন চোখে দেখার প্রয়াস ঘটানো হলো তাতে কবিতার এই ‘শাশ্বত’ হবার বহুমাত্রিকতা আছে। জীবনানন্দ আমাদের ‘মন’ ও ‘মানসিকতা’র ঐ তুঙ্গ স্পর্শ করেছেন সম্পূর্ণভাবে।

প্রকাশিত : ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২০/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: