কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিড়ম্বিত নারী জীবন

প্রকাশিত : ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • রুখসানা কাজল

নারীর বিড়ম্বনার কি শেষ আছে? নাকি কোন সমাধান আছে? থাকলেই বা তা কতখানি সন্মানজনক নারীর জন্য? ঘরে, বাইরে রাস্তাঘাট অফিস বা যে কোন কর্মস্থলে নারীকে বাড়তি সতর্কতা মেনে চলতে হয় সেই সব পুরুষ নামের ব্যক্তিদের কাছ থেকে, যারা নারীকে মানুষ নয়, তেঁতুলের ঝাল মিষ্টি টক দিয়ে মাখা-মাখা করে খেতে ভালবাসে। নিত্যদিনের চলাফেরা, কাজ কর্মে, ঘোরাফেরায় এমন কোন নারী নেই যে, বলতে পারবে না সে কখনও যৌন হয়রানির শিকার হয়নি। তাকে কোন না কোনভাবে এই উৎপীড়নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতার একটি নির্মম কুৎসিত নির্যাতন হচ্ছে এই যৌন হয়রানি। পুরুষ বস বা সহকর্মীটি, অথবা স্রেফ বন্ধুটি বন্ধুত্বের খাতিরে একটু পিঠে চাপড় মেরে দিল তো ছোট চুলের মেয়ে সহকর্মীর ঘাড়ে ফু দিল, বড় চুলের একটু চুল নেড়ে দিল, গাড়ির ভেতর হাতটা টেনে নিয়ে মুঠোবন্দী করে রাখল, ইশারায় চুমু খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করল। এতে কতটা নির্মলতা থাকে, তা কেবল ওই নারী জানে আর জানে যে এই কাজটি করছে সে। ভারতের একটি আদালতে এ রকম বলা হয়েছে যে, একমাত্র নারীই বুঝতে পারে পুরুষের কোন স্পর্শটি কামহীন বা কাম বিবর্জিত। আইনে আছে কেবল স্পর্শ নয়। নারীর প্রতি অশালীন ইঙ্গিতপূর্ণ যে কোন আচরণই যৌন হয়রানিরমূলক অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। অর্থাৎ কেবল ধর্ষণ নয়, স্পর্শের বাইরে থেকেও কোন কথা, শব্দ, চোখের চাহনি, শারীরিক অঙ্গভঙ্গি, মিডিয়া বা অন্য কোনভাবে লেখা বা ছবি দিয়ে কোন বা অন্য কোন উপায়ে নারীকে বিব্রত করলে তা যৌন অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। এগুলো তো কমবেশি সবাই জানে। তারপরও ঘটছে, ঘটে চলেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংঘটিত যৌন নির্যাতনের ভিক্টিম যখন বিচার চেয়ে আবেদন করছে, তখন বিদ্যমান আইন মেনে কতটা শাস্তি পাচ্ছে এই অপরাধের নায়করা?

বাংলাদেশ সরকার নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতন প্রতিরোধ এবং বন্ধের জন্য নারী ও শিশুনির্যাতন দমন আইন, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আইন, যৌতুক নিরোধ আইন, এ্যাসিড নিক্ষেপ বন্ধের জন্য এ্যাসিড অপরাধ দমন আইন ও এ্যাসিড নিক্ষেপকারীর মৃত্যুদণ্ডের আইন প্রণয়ন করেছে। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধের জন্য বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে মহামান্য আদালতের নির্দেশনা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশনের সুপারিশে একটি ‘যৌন হয়রানি এবং নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্র’ গঠন করা হয়েছে। আরও রয়েছে আইন এবং সালিশ কেন্দ্রসহ সমস্ত দেশে ভিক্টিম সাপোর্ট সেল। কিন্তু তারপরেও এসব আইনকে থোড়াই কেয়ার করে সরকারের সকল শুভ প্রচেষ্টাকে অর্থহীন প্রমাণ করে নারী নির্যাতন দিন দিন বেড়েই চলেছে। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি নারীদের প্রত্যহ মুখ বুঁজে সহ্য করতে হচ্ছে নানান মানসিক নির্যাতন। প্রতিবাদ করলে লোক দেখানো আইন মেনে কিছু সদস্য নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। সেই তদন্ত কমিটি তদন্ত শেষে কি রিপোর্ট দিচ্ছে বা তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অনুসারে অভিযুক্ত কি শাস্তি পাচ্ছে, তা কি আমরা কখনও জানতে পারছি?

নির্মমতার কোন পরিসীমা নেই। গ্রাম, শহর, অফিস প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এ রকম অশালীনতা হলে, ধর্ষণ হলে প্রথমে ভিক্টিম নিজে এবং তার পরিবার প্রকাশ করতে চায় না। প্রতিবাদ তো দূরের কথা। নীরবে ক্ষতি মেনে নিয়ে চুপচাপ থাকে। আত্মীয়স্বজন, সমাজের লোকেরা খারাপ বলবে, এ কারণে সবাই মিলে ঘটনাটি চেপে যেতে য়ায়। তবে আজকাল এ বিষয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রতিবাদ হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান শিক্ষা, প্রচারণা, সচেতনতা এবং সরকারের আইনি সহায়তার কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সাহসি মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় প্রতিবাদ হচ্ছে। ভিক্টিমের সপক্ষেও জনমত গড়ে উঠছে। গ্রামে অথবা শহরে অনেকেই নারীর প্রতি সংঘটিত সহিংসতার বিচারের দাবিতে সোচ্চার হচ্ছে। তারা বিচারও চাইছে। সেক্ষেত্রে গঠিত হচ্ছে বিভিন্ন তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটিগুলোর দায়িত্ব ঘটনাটির সত্যতা বিচার করে রিপোর্ট দেয়ার। সেই রিপোর্ট অনুসারে অভিযুক্তের জন্য শাস্তি বিধান করে ভিক্টিমের প্রতি সুবিচার করার নির্দেশ জারি আছে। দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটিগুলো প্রয়োজনের চেয়ে শ্লথ হয়। অগুন্তি অন্য কাজের ভিড়ে ধামাচাপা পড়ে যায় তাদের তদন্ত কর্মটি। কিংবা দায়সারা লোক দেখানো একটা রিপোর্ট জমা দিয়ে দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু ধরা যাক, তদন্ত কমিটি যথেষ্ট আন্তরিকতা নিয়ে তদন্ত শেষে রিপোর্ট জমা দিয়েছে। তাতে যাবতীয় প্রমাণ অভিযুক্তের বিপক্ষে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রশাসন কি পদক্ষেপ নিচ্ছে? আদৌ কি কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে এ পর্যন্ত? হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া কোন ক্ষেত্রে প্রশাসন উদ্যত হয়েছে অভিযুক্তের বিপক্ষে পদক্ষেপ নিতে?

সাধারণত শহর এবং গ্রামে এই ধরনের অভিযোগ প্রমাণ হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সালিশির মাধ্যমে আপোষ করে অভিযুক্তকে দিয়ে ক্ষমা চাওয়ানো হয়, অর্থদণ্ড করা হয়। তেমন বেকায়দা দেখলে অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী বাদিনীর পরিবারকে সামাজিক সম্মান, আত্মীয়স্বজনদের কাছে পরিবার এবং ভিক্টিম মেয়ের ইজ্জত রক্ষার দোহাই দিয়ে অভিযুক্তের সঙ্গে ভিক্টিমের বিয়ে দিয়ে মহান দায়িত্ব পালন করা হয়। এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আবার অনেক ক্ষেত্রে উলটো ভিক্টিমের ওপর দোষ চাপিয়ে অভিযোগকে দুর্বল করে দেয়া হয়। ভিক্টিমের পোশাক-আশাক, আচরণ সংযত রাখার জন্য উপদেশও দেয়া হয়। এ রকম প্রমাণ আমরা পত্র-পত্রিকা, টিভিতে হরহামেশা দেখতে পাচ্ছি। এগুলোও কি এক ধরনের মানসিক নির্যাতন নয়? যে কোন অপরাধকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য এসব সমাধান সাময়িক টোটকা হিসেবে কাজ করে বটে। ফলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না পাওয়ায় অপরাধী তার অপরাধ নির্বিঘেœ করে যেতে পারে। হালকা শাস্তি দেখে সমাজের অন্য আরও দশজন অপরাধী উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠতে পারে। উদ্বুদ্ধ হচ্ছেও। অথচ প্রয়োজন ছিল আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে এই অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া। যা দেখে সমাজের অন্ধকারে লুকানো সুপ্ত অপরাধগুলো দমিত থাকে। অন্য কেউ এই অপরাধ করতে যেন সাহস না হয়।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী এলিনা খান বলেন- নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ার পেছনে একটি বড় কারণ হচ্ছে- নির্যাতনকারীর শাস্তি না হওয়া। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাটাই দেখুন। তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দেয়া সত্ত্বেও প্রশাসন প্রয়োজনীয় প্রাপ্য শাস্তি দিতে কোন আইনি ব্যবস্থা গ্রহন না করে দীর্ঘদিন ফেলে রাখে। এই সুযোগে অভিযুক্ত শিক্ষক দুই বছরের সবেতন ছুটি মঞ্জুর করে দেশ ত্যাগ করছে স্বসম্মানে। তদন্ত কমিটির শত আপত্তি সত্ত্বেও অভিযুক্তকে গা বাঁচানোর সুযোগ করে দিচ্ছে প্রশাসন।

সংগতভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এ ধরনের লোক দেখানো আইন করে কি লাভ? শিক্ষাক্ষেত্রের সর্বোচ্চ পীঠস্থানের সর্বোচ্চ শিক্ষিত প্রশাসনের যদি অভিযুক্তের প্রতি এ রকম বেপরোয়া প্রশ্রয় থাকে, তো সাধারণ ক্ষেত্রের অবস্থা কেমন শোচনীয় হতে পারে? শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছে যৌন অপরাধী ওই শিক্ষক যদি অমূল্য রতœ হতে পারে, সাধারণ অভিযুক্তরাও তো কারও আলালের ঘরের দুলাল! এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সাদেকা হালিম বলেন- নারীর সুরক্ষায় যেসব আইন আছে, সেসব আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। ফলে নির্যাতনকারীরা নারী নির্যাতন করতে আর ভয় পাচ্ছে না। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে- সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। নারীর প্রতি সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁদের ওপর সহিংসতার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।

কিন্তু এভাবে হাল ছেড়ে দিলে দেশে নারীর নিরাপত্তা বলে কিছু থাকবে না। নারীরা এখন কর্ম উদ্যোগী স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে। সংসার, সমাজ, পরিবার সর্বোপরি নিজস্ব অস্তিত্ব বিকাশে সর্বস্তরের নারীরা দেশ ও বিদেশে অনেক অগ্রগামী। অনেক নারী আছে, তাদের শ্রমে ঘামে বিদ্যা বুদ্ধিতে অনেক সংসার প্রতিপালিত এবং পরিচালিত হয়। কর্মবীর পুরুষের পাশে নারীও এখন একজন সহযোদ্ধা। সেক্ষেত্রে অনেক শ্রেণীর মানুষ রয়েছে যারা নারীর এই অগ্রগামীতাকে মেনে নিতে পারে না। আবার অনেকেই আছে নারীকে কেবল ভোগের সামগ্রী হিসেবেই দেখতে অভ্যস্ত। ফলে ঘরে বাইরে নারীর প্রতি সহিংসতা চলছে এক্ষেত্রে প্রচলিত আইনের ব্যাপক পরিবর্তন এনে অভিযুক্তকে সুরক্ষাকারী প্রশাসন, তদন্ত কমিটি, সালিশিসভা ও আইনরক্ষাকারীদের বিরুদ্ধেও জরুরীভাবে ব্যবস্থা নেয়ার আইন করতে হবে। নইলে দেশের অর্ধেক জনশক্তির নিরাপত্তা বলে কিছু থাকবে না।

প্রকাশিত : ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২০/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: