আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় নারীর অবদান

প্রকাশিত : ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • রহিমা আক্তার

‘১৯৪৭-৪৮ সাল থেকেই রাষ্ট্র ভাষা বাংলা হবে এমন আলোচনা হতো আমাদের পৈত্রিক বাড়িতে। বাবা ছিলেন বেশ প্রগতিশীল । বাবা তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে চিঠির মাধ্যমে নিজেদের মতামত একে অন্যদের জানাতেন। বেশির ভাগ সময়ে বাবার চিঠির খসড়া আমিই করতাম। এগুলো করতে করতে মনের অজান্তে এক সময় ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। এর পর ১৯৫০ সালে ঢাকা আসার পর সরাসরি জড়িয়ে পড়ি ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি যার অনুপ্রেরণায় তিনি হলেন বামপন্থী সাংবাদিক লায়লা সামাদ। পুরানা পল্টনে আমাদের পাড়ায় থাকতেন তিনি। পিকেটিংয়েও নেতৃত্ব দিতেন লায়লা সামাদ’- কথাগুলো বলেছেন ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকা সুফিয়া আহমেদ।

বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ছাত্র জনতার এক সারির মিছিলে ছিলেন আমাদের অনেক নারী। বাংলা ভাষার মান রাখতে তাঁদের অবদান আমাদের জাগিয়ে তোলে ও সংগ্রামী প্রতিবাদী করে তোলে। ১৯৫২ সালের এই ফেব্রুয়ারি মাসেই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার প্রয়োজনে রক্ত দিয়েছিলেন বাংলার অসম সাহসী তরুণরা। পাকিস্তানী বুলেটও সেদিন তাদের দমাতে পারেনি। সেদিনের সেই আত্মদানই পরবর্তীকালে রূপ নিয়েছিল বাঙালীর স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনে। পাকিস্তানী শাসকদের সব চক্রান্ত সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে বাঙালী জাতি এগিয়ে গেল তার অভীষ্ট লক্ষ্যে। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম হলো স্বাধীন বাংলাদেশের। তাই ফেব্রুয়ারিকে নিয়ে আমাদের এত অহঙ্কার এবং গর্ব। ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা তাকাই আমাদের শিকড়ের দিকে। সঙ্গত কারণেই ভাষার মাস নিয়ে আমাদের মধ্যে একটি অন্য রকম আবেগ কাজ করে।

ভাষা আন্দোলনের সময় দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন সুফিয়া আহমেদ। সেই সময় উইমেন্স হোস্টেল নামে একমাত্র ছাত্রী হোস্টেল ছিল। ২১ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় ছাত্র পরিষদের ডাক পড়লে ছাত্রছাত্রীরা এসে আমতলায় জড়িত হন। তাঁদের সঙ্গে সুফিয়া আহমেদও ছিলেন। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ১৪৪ ধারা জারি হয়। তারপরও ছাত্র জনতা জমায়েত হয় আমতলায়। ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা হবে কি হবে না, এই নিয়ে শুরু হয় তর্ক। জমায়েত হওয়া ছাত্রদের অনেকেই এর বিরোধিতা করেন। একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত হয় ভাঙ্গা হবে ১৪৪ ধারা। ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে সভা থেকে ১০ জন করে দল গঠন করে মিছিল নিয়ে সেøাগান দিতে দিতে কলাভবনের গেট দিয়ে বের হতে থাকে। দল বেঁধে মিছিল নিয়ে বের হলেই পুলিশ গণগ্রেফতার চালায়। তার সঙ্গে কাঁদানে গ্যাস। ছাত্রদের ২-৩টা দল বের হলে সবাইকে পুলিশ ট্রাকে তুলে নেয়। এরপর সিদ্ধান্ত হয় যে, মেয়েরা দল বেঁধে বের হবে। প্রথম দলের কয়েকজনের সঙ্গে থাকেন সুফিয়া আহমেদ। ছাত্রীদের দলেও ব্যারিকেড দেয়া হয়। শুরু হয় পুলিশের লাঠির আঘাত। ছাত্রীদের দলের অনেকে আহত হন। শুরু হলো ছাত্র-পুলিশের সংঘর্ষ। ইটপাটকেল দিয়ে ছাত্ররা পুলিশের মোকাবিলা করতে থাকেন। একসময় পুলিশ ছাত্রদের দিকে সরাসরি গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই শহীদ হন আবদুল জব্বার ও রফিক উদ্দিন আহম্মেদ। আহত হন আরও ১৭ জন। তাদের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র আবুল বরকত শহীদ হন রাত ৮টায়। ২২ ফেব্রুয়ারি গায়েবানা জানাজা পরানো হয়। জানাজা শেষে উপস্থিত জনতা অলি আহাদের নেতৃত্বে এক প্রতিবাদী মিছিল শুরু হলে পুলিশ গুলি চালায়। শহিদ হন শফিউর রহমান। ছাত্রছাত্রীরা বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার জন্য গণপরিষদে সুপারিশ জানান। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের পাশে পরের দিন ছাত্ররা শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলেন, যার উদ্বোধন করেন শহীদ শফিউরের পিতা।

১৪৪ ধারা ভাঙ্গার পর পরিস্থিতি এমন হবে, তা ভাবতে পারেনি কেউ। মেয়েদের ওপর এমন লাঠিচার্জ, তাও বুঝতে পারেনি কেউ। সে সময় মেয়েদের সামাজিক অবস্থা ছিল অন্যরকম। ছেলেমেয়েদের মধ্যে কথা বলতে হলেও প্রক্টরের অনুমতির প্রয়োজন ছিল। সেখান থেকেই স্বাধিকার আন্দোলনের শুরু। মেয়েদের ক্ষেত্রে ছিল এটা একটি বিপ্লবের মতো। জাতীয় পর্যায়ে ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে কাজ করছে, এটাই ছিল অহঙ্কারের। ছাত্রছাত্রী সবার মনে একটাই কথা- বাংলা ভাষার মান রাখতে কাজ করতে হবে। ভাষা আন্দোলনের কথা উঠে এলে আমাদের নারীদের কথা খুব একটা উঠে আসে না। অথচ এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন অনেকে।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস রচনায় ক্ষেত্রে বিকৃতি ঘটছে বলে মনে করেন ভাষা সৈনিক রওশন আরা। ভাষা আন্দোলনে মেয়েদের অংশগ্রহণের বিষয়টিও যথাযথভাবে উঠে আসেনি। ইতিহাসে এ বিকৃতি সরাতে এবং ঘাটতি পূরণ করতেই বই লেখার কাজে মন দেন রওশন আরা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে মেয়েদের যে দলটি মিছিল নিয়ে বের হয়, সেই দলে ছিলেন রওশন আরা বাচ্চু। ১৯৩২ সালের ১৭ ডিসেম্বর সিলেটে জন্মগ্রহণ করা রওশন আরা ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ছাত্রী ছিলেন। ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার ফলে পুলিশ যে বেরিকেড দেয়, সেই ব্যারিকেড ভাঙ্গার কারণে পুলিশের লাঠিসোঁটার আগাতে তিনিও আহত হন। সেদিন বিকেলে গণপরিষদের অধিবেশন পরিষদ সদস্য আনোয়ারা খাতুন বক্তব্য দিতে গিয়ে যে আহত দু’জন ছাত্রীর নাম বলেন, তাদের একজন ছিলেন রওশন আরা বাচ্চু। দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করার পর ২০০২ সালে তিনি অবসরে যান। ভাষা আন্দোলন নিয়ে লেখালেখি করছেন তিনি, বাংলা ভাষা ও ভূখণ্ড নামে একটি বই লিখেছেন।

সুফিয়া আহমেদ ও রওশন আরা বাচ্চু মনে করেন, ভাষা আন্দোলনের এত বছর পর বাংলা ভাষার যেমন উন্নতি হওয়ার কথা ছিল, তেমনটি হয়নি। বিদেশী ভাষার অনুকরণে বাংলা ভাষার বিকৃতি ঘটেছে। বাঙালী যে একটি মর্যাদাপূর্ণ জাতি, মূল্যবোধসম্পন্ন জাতি, এ জাতির রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্য-সংস্কৃতি- এই বোধ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিস্তার ঘটেনি। এই কারণে ভাষা-সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটা প্রতিরোধের জন্য বাঙালী সংস্কৃতি ও প্রমিত বাংলা ভাষার চর্চা বাড়াতে হবে। আর স্মরণ রাখতে হবে ভাষার মান রক্ষায় নারীরাও এগিয়ে এসেছিলেন।

প্রকাশিত : ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২০/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: