আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

এক বোহেমিয়ানের ছবি

প্রকাশিত : ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • সিরাজুল এহসান

শিল্প-সাহিত্যের জগতে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া প্রতিভার দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে কম নয়। উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী, সুকুমার রায় হয়ে সত্যজিৎ রায় ও সন্দীপ রায় পর্যন্ত বাংলা-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বংশ পরম্পরায় এঁদের অবদান স্বদ্যুতিতে দেদীপ্যমান। জীবনানন্দ দাশের বেলায় মা কুসুম কুমারী দাশের কথা সর্বজনবিদিত। এমনি করে যদি কবি বেলাল চৌধুরীর বেলায় বলা হয়-তাহলে কি অত্যুক্তি হবে?

সৃষ্টিশীল প্রতিভা বিকাশে অনুকূল পরিবেশ যেমন ভূমিকা রাখে তেমনি উত্তরাধিকারের ব্যাপারটিও অনেক ক্ষেত্রে হয় সহায়ক। কবি বেলাল চৌধুরীর গর্ভধারিণী মুনীর আখতার খাতুন চৌধুরাণী যে কবি ছিলেন সে কথা আমরা কজনইবা জানি! এই কবিপ্রসূর আছে ‘চির সমধুর’ নামে একটি কাব্যগ্রন্থ। গ্রামের মক্তবে পড়া সে সময়ের অনগ্রসর মুসলমান সমাজের ততোধিক পিছিয়ে থাকা কোন নারীর মাধ্যমে এমন সৃষ্টি যেমন দুর্লভপ্রাপ্তি তেমনি বোঝা ও অনুধাবন করা যায় স্রষ্টার পারিবারিক-পারিপার্শ্বিক সাংস্কৃতিক আবহাওয়া–জলবায়ু। এই কবি ও কবিজননী বেলাল চৌধুরীর কাব্যমানস গঠনে শুধু সহায়কই নন, প্রভাব বিস্তার করেছেন সুদূরপ্রসারী। সাধারণ একটা ধারা বা ধারণা প্রচলিত আছেÑ কোন কবি বা সৃষ্টিশীল মানুষের কর্মপ্রেরণার নেপথ্যে থাকেন কোন না কোন নারী। বেলাল চৌধুরীর ক্ষেত্রেও হলো সত্য। সে সত্যের নাম পরমমমতাময়ী মা। আজ যে বেলাল চৌধুরীকে পাঠক হিসেবে আমরা পড়ি তার বীজ রোপিত হয়েছিল এই মায়ের মাধ্যমেই। পিতা রফিক উদ্দিন আহমদ চৌধুরীরও অনুকূল সহযোগিতা কাব্যভাসানের যাত্রী হিসেবে উঠে পড়তে করেছিল সহায়তা। উদার মনের এ মানুষটি এক উন্নত সাংস্কৃতিক বলয় তৈরি করেছিলেন পরিবারে।

শৈশব-কৈশোরেই মনে রেখাপাত করে, দর্শন প্রতিষ্ঠিত হয়Ñ শিশু-কিশোর সংগঠন ‘খেলাঘর’-এর মাধ্যমে। প্রগতিশীল মানস গঠনের খেলাঘর নামের বাহনটি তার মনোজগত নিয়ে যায় অনেক দূর, খুলে দেয় এক অন্য দিগন্ত। যে দিগন্ত শুধু সৃষ্টিসুখ দিয়ে মোড়ানো, দেশ-জাতি মানুষের কাছে দায়বদ্ধতার সেøাগানে মুখর।

প্রথম ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাস’

শৈশব-কৈশোরের মুক্ত দিনগুলো কেটেছে তাঁর গ্রামের বাড়িতে। গাছপালায় ঘেরা, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ, গোয়ালভরা গরু, পুকুরভরা মাছ। চিরকালীন বাংলার এক অপূর্ব নৈসর্গিক আবহ। মনে হতো-‘আমাদের গ্রামখানি ছবির মতন।’ বাড়িতেও তেমন পরিবেশ। বৃক্ষশোভিত গ্রামের অবস্থাপন্ন বনেদি বাড়ি। বড় পুকুর, পুকুরঘাটে বসে বাতাসের নিস্তরঙ্গ জলে মৃদু ঢেউ দেখা আর গুনগুনিয়ে ছড়াকাটা কিশোর বেলাল চৌধুরীর তখন নিত্যাভ্যাস। এসব মিলিয়ে সৃষ্টিশীল মগ্নতার এক অনুকূল পরিবেশ।

বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে রেলপথ। দিন-রাতই চলে অবিরাম ট্রেন। কালো ধোঁয়া উড়িয়ে কু-উ-উ-ঝকঝক শব্দ তুলে হারিয়ে যায় সমান্তরাল পথ ধরে। কিশোর মনে তোলপাড় ঘটে, আকুল হয় সৃষ্টি সুখের প্রত্যাশায়। একদিন হঠাৎই বানিয়ে ফেলেন ছড়া-‘ঝকঝক গাড়ি চলে/ আগে চলে ইঞ্জিন।’ প্রথম সৃষ্টির সে কী আনন্দ! কোথায় কখন তা ছাপার অক্ষরের মুখ দেখেছিল সে আর এতদিন পরে মনে পড়ে না কবির। তবে সেই আনন্দ, পুলক অনুভব করেন আজও।

মাতৃভাষার প্রেম ও কারাবরণের অহঙ্কার

বাংলাভাষায় প্রকাশিত পত্রিকা-সাময়িকীগুলোয় সৃষ্টি প্রেমের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন কৈশোর বা কৈশোরোত্তীর্ণ বেলাল চৌধুরী। মাতৃভাষায় লেখা কবিতা-ছড়া এরই মধ্যে চিনিয়ে দিয়েছে রাজশক্তির কাউকে কাউকে। সময়টা বাঙালী ও বাঙালী জাতীয়তাবাদ বিকাশের মোটেও অনুকূল নয়। বরং প্রতি পায়ে পায়ে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান বা পূর্ব বংলার প্রতি বিদ্বেষ, বৈষম্য ও বৈরী-বিমাতাসুলভ আচরণ ফুটে উঠছে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গড়ে-ওঠা পাকিস্তান নামে রাষ্ট্রের শাসকদের কর্মকা-ে। প্রথমেই দৃশ্যমান হলো ভাষার প্রতি বিদ্বেষ। সংখ্যাগরিষ্ঠের মাতৃভাষা বাংলা হলো উপেক্ষিত ও লাঞ্ছিত। প্রতিবাদে গর্জে উঠল বাংলা ও বাঙালী সমাজ। রক্ত ঝরল রাজপথেÑ ভাষার দাবিতে। ভাষা শহীদের সাম্মানিক তালিকায় নাম উঠলÑ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিক, সালাউদ্দিনের। বিশ্বে সৃষ্টি হলো এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। বেলাল চৌধুরীর কলম থেমে নেই। ভাষার পক্ষে, জাতীয়তাবাদ বিকাশের পক্ষে বিকশিত হচ্ছে সৃষ্টিকর্ম। বাংলায় লেখা যেন হয়ে গেল তাঁর ‘অপরাধ’। শাসকের রোষানলে গেলেন পড়ে। বলা নেই কওয়া নেই একদিন ধরে নিয়ে গেল পুলিশ। সাল-তারিখ আর এখন মনে করতে পারেন না কবি। শুধু মনে আছেÑ গ্রামের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে প্রথমে ফেনী থানায় তারপর নোয়াখালী সদর থানা হয়ে সোজা কারাগারে। তিন মাসের কারাবাস জীবনের এক অনন্য অভিজ্ঞতা। জীবনে এই প্রথম কারাবাস, মাতৃভাষায় সৃষ্টিচর্চার দায়ে। এক তরুণ দ্রোহী কবির নাম উঠে গেল পাকিস্তানী শাসকের নিজের বানানো নেতিবাচক খাতায়।

যৌবনে দাও রাজটিকা

গত শতাব্দীর ৬-এর দশকজুড়ে চলছে তাঁর কবিতার সঙ্গে তুমুল ঘরবসতি। এ দশকের প্রথমার্ধেই হন মলাটবন্দী সৃষ্টির জনক। ১৯৬৪ সালে পাঠক উপহার পান ‘নিষাদ প্রদেশে’ কাব্যগ্রন্থ। চিরতরুণ এ কবির প্রথম যৌবনের কবিতার বই হয় দ্রুত আদৃত। এ সময়েই চলছে বাঙালীর জাতীয়তাবাদ বিকাশের উত্তুঙ্গ আন্দোলন। কবির নিজের কথাÑ‘কবিরা তো কবিতা লিখে চুপচাপ বসে থাকেন না।’ কবি যেহেতু এ সমাজেরই একজন। সমাজ বাস্তবতা ও সময় তাঁকে আক্রান্ত করবে এটাই স্বাভাবিক। আগেই ছিল কারাবরণের অভিজ্ঞতা। শাসকের বিরুদ্ধস্রোতে তিনি হলেন শামিল। বাঙালীর মুক্তির ম্যাগনাকার্টা ৬ দফা আন্দোলনের মিছিলে হয়ে গেলেন কর্মী। তার আগে কলকাতায় কিছুদিনের জন্য ডেরা বাঁধেন। দেশের এ অবস্থায় ফিরে আসেন আবার যান– সে এক অস্থির সময় তাঁর। কলকাতার জীবন এক অন্য ইতিহাস।

বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন রক্তস্রোত নিচ্ছে এগিয়ে। তখনকার বাস্তবতায় রাজপথে না নেমে এক কলমযোদ্ধার উপায় কী? আগেই মাথায় হুলিয়া ছিল, ছিল মামলা। অকুতোভয় কবি যাননি আত্মগোপনে। হুলিয়া নিয়েই ছিলেন কিছুদিন ঢাকায় এবং অবশ্যই রাজপথে। ’৬৯-এর গণ-আন্দোলনে মুক্তির মিছিলে ছিল সদর্পে পদচারণা, হাতে ছিল বাংলাদেশের স্বপ্নপতাকা।

বোহেমিয়ান কিংবা আনন্দবাজারের আনন্দ

কবিতার হাত ধরেই তিনি ঘর ছাড়েন অধরা শিল্প মাধুরীর অন্বেষায়। শুধু তাই নয়, দেশের সার্বিক পরিস্থিতিও ছিল না অনুকূলে। রাজনৈতিক ও কবি পরিচিতি স্বাভাবিক নাগরিক জীবনের গতি ব্যাহত হয় পুলিশী তৎপরতায়। ঘর ছেড়ে ১৯৬৩-এর কোন এক সময় ডেরা গাড়েন কলকাতায়। একই ভাষা, একই সাংস্কৃতিক আবহ। মজে যান সেখানে, অনুকূল পরিবেশ পান সাহিত্য সাধনার। তবে স্থায়ী ডেরা আর সেখানে হয় না, পড়ে থাকে সুদূরের কোন সীমানায়। শুরু হয়ে গেল এক বাউ-ুলে জীবনগাথার সূচীপত্র। এ জীবন সম্পর্কে কবি বলেনÑ ‘সত্যিকার বোহেমিয়ান কি আর হওয়া যায়?’ দিন কাটে এখানে ওখানে। কাগজের জমিন ভরে ওঠে কবিতা, গদ্যের পঙক্তিমালায়। কিন্তু কীভাবে চলবে ক্ষুণিœবৃত্তি? পেট সচল না থাকলে কলম যে অচল হয়ে পড়বে। সাধন-সাধনা হবে কীভাবে? বন্ধু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তখন আনন্দবজার পত্রিকার সাহিত্য পাতা দেখেন। লেখার সম্মানীও জোটে ভাল। সুনীলের প্ররোচনায় বর্তে গেলেন আনন্দবাজারের আনন্দযজ্ঞে। এ প্রসঙ্গে বেলাল চৌধুরী বলেন এভাবেÑ “একটা লেখা লিখলে পেতাম ২৫/৩০ টাকা। সে সময় কলকাতার বাস্তবতায় একেবারে কম নয়। লেখার শিরোনাম ছিল ‘কলকাতার কড়চা’। কড়চা লিখে খরচা চালাই আর কী...।”

শুধু আনন্দবাজারই নয়, আরও পত্রপত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিনে চলতে থাকল একের পর এক সৃষ্টির প্রসব। এ সময়ই তাঁর জীবনের উত্তাল সময়। কফি হাউসে সময় কাটানো-আড্ডা আর লেখালেখি হয়ে গেল নিত্যদিনের রুটিন। সেসব আজ ধূসর স্মৃতি অথচ মূল্যবান। মনে হলে কবি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। আহা, কী সেই অম্লামধুর দিনগুলো! ‘কোথায় হারিয়ে গেল/ সোনালি বিকেলগুলো...।’

‘কৃত্তিবাস’-এর কীর্তি

দুই বাংলার সাহিত্যে এক বাঁক পরিবর্তনের বাহন হিসেবে যুগ যুগ ধরে স্বীকৃত হয়ে আসছে যে সাহিত্য সাময়িকীটির নাম তাহলো– ‘কৃত্তিবাস’। আগামী দিনেও অনুসরণ ও অনুকরণযোগ্য হবে বলেই সাহিত্য বোদ্ধাদের স্পষ্ট ধারণা। ৬-এর দশকের গোড়ার দিক পর্যন্ত সাহিত্যের প্রচলিত প্রচল ভেঙে দেয় এই সাহাসী ম্যাগাজিনটি। এখানে সব সময় নতুনকে জানিয়েছে স্বাগত। ইতিবাচক সম্ভাবনাময় তারুণ্য, নয়া চিন্তা-দর্শন সব সময় পেয়েছে অগ্রাধিকার। এটিকে ঘিরে এক দল সৃষ্টিশীল মানুষ হাতে হাত বাঁধেÑ নাম হয় ‘কৃত্তিবাস গোষ্ঠী’। এ গোষ্ঠীর সিংহভাগ সহযাত্রীই পরবর্তীকালে হয়েছেন বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির অন্যতম শীর্ষদল। স্বদ্যুতিতে উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে আপন আসন করেছেন পোক্ত। হয়েছেন প্রাজ্ঞজন, অন্যতম প্রাতঃস্মরণীয়।

৭-এর দশকজুড়েই ছিল কৃত্তিবাসের কীর্তি। যদিও পরে অনেকটা হয়ে পড়ে অনিয়মিত। এখনও টিম টিম করে জ্বলে কৃত্তিবাসের আলো। এই ইতিহাস সৃষ্টিকারী কৃত্তিবাসের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করার গৌরব অর্জন করেন বেলাল চৌধুরী। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন এর প্রাণপুরুষ। কৃত্তিবাসসূত্রেই বাংলা কাব্য ও কথাসাহিত্যের এ উজ্জ্বল নক্ষত্রের সঙ্গে বেলাল চৌধুরীর সখ্য, বন্ধত্ব ও ঘনিষ্ঠতা।

সেতু বন্ধনের রাখি

৬-এর দশকেই যখন কলকাতায় কবিতার সঙ্গে বসবাস শুরু হয় তখনই অনুভব করেন এপার বাংলা-ওপার বাংলার ভাষা–সংস্কৃতি এক হলেও কোথায় যেন একটা অদৃশ্য দেয়াল উঠে আছে। এ দেয়াল কি জাতপাত, বর্ণ-ধর্ম? না মোটেও তা নয়। মানুষে মানুষে বৈষম্য, ভেদাভেদ নির্মূল করে মানুষ ও মানবতার জয়গানই তো গাইবে মহৎ ও মূলধারার সাহিত্য। প্রগতিশীল সাহিত্যকর্ম তো দুই বাংলাই সৃষ্টি হয়। তবে কোথায় কীসের দেয়াল? ফারাকটা কোথায়? সারা জীবন অসাম্প্রদায়িক চেতনার আদর্শ লালন-পালন করে আসা মানুষটি চেষ্টা করলেন দূরত্ব ঘোচাতে।

কলকাতার বাউলিয়ানা জীবনে যে সব অসাম্প্রদায়িক, উদারমনা ও মুক্তচিন্তার মানুষের সস্নেহ, আশ্রয়–প্রশ্রয় পেয়েছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন কমলকুমার মজুমদার, গৌরকিশোর ঘোষ, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সন্তোষ কুমার ঘোষ প্রমুখ। এ ছাড়া বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠতা পেয়েছেন শক্তি চট্টোপাধ্যয়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, তারাপদ রায়, উৎপলকুমার বসু, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মুজমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কবিতা সিংহ, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় প্রমুখের। মহৎ সাহিত্য পৃথিবীর কোন সীমানা বা প্রাচীর মানে না। কিছু কূপম-ূকদের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে এবার ওপারের সাহিত্য-সংস্কৃতির বাধা বালির বাঁধ করলেন অপসারণ এই সব গুণী মানুষের সহযোগে। খুলে গেল নতুন দুয়ার।

দুই বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতির আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে একসময় দুষ্টচক্র, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি ও ক্ষেত্রবিশেষে রাজনৈতিক কূপমন্ডূকতা বাধা হয়ে ছিল। মূলত ধর্মীয় সংকীর্ণতা ব্রাহ্মণ্যবাদ বা মোল্লাতন্ত্র, আঞ্চলিকতাই ছিল এর মূলে। এসব উচ্ছেদ করে অদৃশ্য সীমান্তের কাঁটাতার অপসারণের যুদ্ধে যারা ব্যাপৃত ছিলেন তাঁদের মধ্যে বেলাল চৌধুরী অগ্রসেনানী, এ কথা অস্বীকারের কোন সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে আগামী প্রজন্মের কাছে তিনি হবেন নমস্য, প্রাতঃস্মরণীয়।

এবারের সংগ্রাম-স্বাধীনতার সংগ্রাম

রক্তস্রোত বেয়ে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আসে বাঙালীর মুক্তির মাহেন্দ্রক্ষণ ১৯৭১ সাল। বাঙালীর মুক্তিদাতা ও স্বাধীনতার নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৭ মার্চ ঘোষণা দেনÑ ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বিশ্ব আলোড়িত এ ভাষণে কে না সেদিন উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন? এ আহ্বানে মুক্তিপাগল বাঙালী যখন অস্ত্র হাতে যুদ্ধে নেমে পড়ে তখন কি আর ভাষা আন্দোলনে কারাবরণকারী, স্বাধিকার আন্দোলনের হুলিয়া-মামলা ঘাড়ে বহনকারী কর্মী আর বসে থাকতে পারেন? কলকাতা থেকে এলেন ঢাকায়। আবার কলকাতায়। অস্ত্র হাতে নয়, তুলে নিলেন কলম। যোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করতে করলেন কিছু প্রকাশনা। পরম সহায়তাকারী পশ্চিমবঙ্গের বন্ধুদের সহযোগে সাহিত্য -সংস্কৃতির নেতাকর্মীদের যেভাবে পারা যায় সেইভাবে করলেন সহায়তা। করতে থাকলেন একটি পতাকার জন্য অপেক্ষা এভাবে–

‘একটি পতাকা হতে পারে কত আনন্দের/ স্বাধীনতা শব্দটি কত অনাবিল;/ মুক্ত হাওয়ায় পতপত স্বাধীন পতাকা, স্বাধীন দেশের/ সার্বভৌম, সুন্দর, দেশজ চেতনার রঙে রাঙা... ’(মর্মে মর্মে স্বাধীনতা)

বঙ্গবন্ধু ও গুন্টার গ্রাসের স্মৃতিধন্য

যে মানুষটি জন্ম না হলে আজ বাংলা ভাষা, বাঙালীর অস্তিত্ব আদৌ টিকত কিনা বলা মুশকিল। যে মহান নেতার নেতৃত্বে বাঙালী জাতি রক্তমূল্যে পেয়েছে স্বাধীনতা, অর্জন করে সার্বভৌম ভূখ-; সেই মহামানব জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহচর্য পেয়ে ধন্য হয়েছেন কবি বেলাল চৌধুরী।

৬-এর দশকের কোন এক সময় যখন তিনি বঙ্গবন্ধু উপাধি পাননি তখন একদিন সাক্ষাত পান। কবির নিজের ভাষায়, ‘তাঁর ছিল মানুষকে বশ ও মুগ্ধ করার এক চমৎকার গুণ। কণ্ঠস্বর ও বাচনভঙ্গিতে ছিল জাদুকরী শক্তি। আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম।’ তখন চলছিল বাঙালীর স্বাধিকার আন্দোলনের উত্তাল সময়। কবি পরিচয় শুনে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘কবিতায় দেশের কথা, মানুষের কথা লিখবে।’ বেলাল চৌধুরী এরপর নিজের কথা বললেন, ‘সেই থেকে আমার কবিতায় দেশপ্রেম ও সাধারণ মানুষের কথা বেশি করে জায়গা করে নিল।’ এমন করে জানালেন প্রথম বঙ্গবন্ধুদর্শনের অনুভূতি। কবির পিতা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ। তার খবরই বেশি জানতে চাইতেন এ নেতা। ‘এমন একজন মহান নেতার উপরে কেউ কথা বলবে, তার উপরে কেউ হাত তুলতে পারে; আজও আমি মানি না, বিশ্বাস করি না’ বঙ্গবন্ধু বিষয়ে এমন কষ্টগাথা করলেন প্রকাশ। এই নেতার মূল্যায়ন করেন কবি তাঁর কবিতায় এভাবে –‘... বাঙালির প্রতিটি নিঃশ্বাসে ফোটে/ একটি অবিনশ্বর রক্তকমল/ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।‘ ( আবহমান বাংলা ও বাঙালির)

বিশ্বখ্যাত জার্মান কবি-চিত্রকর গুন্টার গ্রাসের সান্নিধ্য পাওয়া কম কথা নয়। ভদ্রলোক রগচটা ধরনের। একটু অদ্ভুত ও খেয়ালি স্বভাবের। সেই মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠা কবি বেলাল চৌধুরীর জন্য সুখস্মৃতি বটে। সেই কথা বলেন তিনি অনেকটা এরকমÑ লেখালেখির সুবাদেই গুন্টার গ্রাস নামের সঙ্গে পরিচয়। কলকাতায় এলে দেখা হলো তাঁর সঙ্গে। একসময় সৈনিক ছিলেন। বেশ কঠিন মনের মানুষ বলে মনে হলো। অদ্ভুতও বটে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লেখেন দেরাজ বা টেবিলে কাগজ রেখে। নোবেল প্রাইজ সম্পর্কে তিনি ছিলেন উন্নাসিক। বলতেন, নোবেল প্রাইজের চেয়ে আমি বেশি মূল্যবান। ওটার এমন মূল্য কী?

ঢাকায় যখন এলেন তখনও তিনি আমার সঙ্গ চাইলেন। ঢাকা শহরের মানুষের জীবনযাপন তাকে বিস্মিত করে। আমার সঙ্গে সারা ঢাকা শহর ঘুরে বেড়ান। পুরান ঢাকার ছবি আঁকেন। এখানে বসে কবিতা লেখেন। আঁকা ছবি দেশে নিয়ে যান। একটা ছবি আমাকে উপহার দিলেন। ওই যে দেয়ালে যে ছবিটা ঝুলছে দেখছ, ওটা ওঁরই আঁকা।

সরস্বতীর কলমে লক্ষ্মীর ছোঁয়া

কলকাতায় ভবঘুরে জীবন আর সাহিত্যের সঙ্গে ঘরবসতি এক সঙ্গে চললেও খুব যে বেশি অর্থাগম হচ্ছিল তা বলা যায় না। যে মা ছিলেন কাব্য প্রেরণাদায়িণী সেই মায়ের নির্দেশে ঢাকায় ফিরে আসতে হলেন বাধ্য। একটু ছেদ পড়ল বুঝি বোহেমিয়ান জীবনের ‘ধারাবাহিকতায়’। স্বাধীনতার পরপরই দেশে এলে সচিত্র সন্ধানীর গুরুদায়িত্ব পড়ে তাঁর হাতে। গাজী শাহাবুদ্দিনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ধরেন এ পত্রিকার হাল। সচিত্র সন্ধানী অল্পদিনের মধ্যেই হয়ে ওঠে সাহিত্য–সংস্কৃতি সচেতন পাঠকের অন্যতম আরাধ্য। এখানেই সাহচর্য পেলেন, গড়ে উঠল সখ্য কাইয়ুম চৌধুরী, কলিম শরাফী, কামরুল হাসান, সৈয়দ শামসুল হক, সাইয়িদ আতীকুল্লাহর মতো গুণীদের সঙ্গে।

কবি বেলাল চৌধুরীর জীবনের আরেক স্বর্ণস্বাক্ষর ‘ভারত বিচিত্রা’। তখন বাংলাদেশসহ পশ্চিমবঙ্গে সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এক অনিবার্য নাম বেলাল চৌধুরী। দীর্ঘ বোহেমিয়ান জীবন এ সংযোগ স্থাপন করেছিল বললে অত্যুক্তি হবে না। তার প্রতিভার বিচ্ছুরণ নীতিনির্ধারক মহলেও পৌঁছেছিল। ভারত সরকারের দৃষ্টিতে বেলাল চৌধুরী এক মিত্রের নাম হয়ে ওঠে। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত ও বিনামূল্যে প্রচারিত ভারত সরকারের অন্যতম মাসিক প্রকাশনা সম্পদনার আহ্বান পান তিনি। পত্রিকাটি বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রীর বন্ধন স্মারক হিসেবে আজও স্বীকৃত এবং প্রকাশিত হচ্ছে। সম্পাদক হিসেবে বেলাল চৌধুরীর যোগদান কোন বাংলাদেশী বাঙালীর জন্য সম্মানতিলক। তাঁর যোগ্য সম্পাদনায় তুমুল পাঠকপ্রিয় হয় প্রকাশনাটি। এর প্রচার এমন এক পর্যায়ে যায় বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলেও দেখা যেত মাস শেষে সচেতন পাঠকের অধীর অপেক্ষা। স্থানীয় পোস্ট অফিসে আগাম খোঁজ নেয়া হতোÑ এল কি ভারত বিচিত্রা? উভয় দেশের ভাষা-সংস্কৃতির চমৎকার মিল ও মিলনের বাহন পড়ে পাঠক পেতেন এক নির্মল ও অনির্বচনীয় আনন্দ। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ভারত বিচিত্রার লক্ষ লক্ষ পাঠক-গ্রাহক গড়ে ওঠে। যা কোন বিদেশী দূতাবাস কর্তৃক প্রকাশিত কোন মৈত্রীর স্মারক প্রকাশনা আজ পর্যন্ত ডিঙ্গাতে পারেনি। এটা সম্ভব হয়েছে বেলাল চৌধুরীরই মেধা, মনন, ঐকান্তিকতার সমন্বয়ে। একযুগ এ প্রকাশনার হাল ধরে ছিলেন তিনি। আজও ভারত বিচিত্রার নাম উঠলে একই সঙ্গে উচ্চারিত হয় বেলাল চৌধুরীর নাম। বেলাল চৌধুরী আর ভারত বিচিত্রা যেন সমার্থক হয়ে আছে সেই সময়ের পাঠক ও বোদ্ধা মহলের হৃদয়ে। দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিকতায়ও তিনি রেখেছেন স্বাক্ষর। ৯-এর দশকে দৈনিক রূপালীর সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়ে অল্প সময়েই জনপ্রিয় করে তোলেন। বেশিদিন তাঁকে আর ছকে বাঁধা বৃত্তে রাখা যয়নি। কেননা রক্তে তার স্বাধীন সৃষ্টির উন্মাদনা আর বোহেমিয়ানের ডাক। পদাবলীর পদক্ষেপ

এ দেশে কবিদের এক উল্লেখযোগ্য সংগঠনের নাম পদাবলী। যার নেপথ্য নায়ক ও পরে কর্ণধার বেলাল চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধের পাঁচ বছর পরেই যখন অনেক কিছু উল্টো পথে চলছিল তখন সময়সচেতন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, প্রগতিশীল কবিদের প্ল্যাটফর্ম হয়ে দাঁড়ায় পদাবলী। কবিতার আসর, সময়ের বিশ্লেষণ এবং সমাজ ও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে পক্ষাবলম্বনই ছিল এর অন্যতম আদর্শ। এই পদাবলীই বাংলাদেশে দর্শনীর বিনিময়ের প্রথম কবিতা পাঠের আয়োজন করে। সে সময়ে ব্যাপারটি নতুন ধারণা হিসেবে বেশ গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং আলোড়ন সৃষ্টি করে। বেলাল চৌধুরীর মস্তিষ্কপ্রসূত পদাবলীর এ পদক্ষেপ দেশে কাব্য আন্দোলন, কবিদের সাম্মানিক পর্যায়ে উন্নীত করার ক্ষেত্রে এক মাইল ফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

রাজপথের কবি-কবির রাজপথ

যে মানুষটি কৈশোরোত্তীর্ণকালেই মায়ের ভাষায় সৃষ্টিকর্ম প্রকাশের দায়ে কারাবরণ করেন, ৬-এর দশকে মামলা হুলিয়া কাঁধে নিয়ে বেড়ান, কারাবরণ করেন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ধরেন কলম, তিনি রাজপথে থাকবেন না তা কি হয়? স্বাধীন বাংলাদেশেও তিনি রাজপথে যুদ্ধে নামলেন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে, সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির বিরুদ্ধে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে, বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচার ও রায় কার্যকরের পক্ষে।

১৯৭৫-এর বিয়োগান্তক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘদিন গণতন্ত্র ছিল নির্বাসনে। কথিত গণতন্ত্রের নামে চলেছে স্বৈরশাসন, অপশাসন, সামরিক শাসন। এ বাস্তবতায় বেলাল চৌধুরীর কলমও গর্জে উঠেছে। বাঙালীর হাতেই বাঙালীর মহান নেতা বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার কলঙ্কজনক অধ্যায় নিয়ে লিখলেন ‘... বাংলাদেশ ও বাঙালির কলঙ্কচিহ্ন দেখতেও/ যেতে হবে বত্রিশ নম্বর...।’ বত্রিশ নম্বর শাসকের রক্তচক্ষু করেছেন উপেক্ষা।

এক সময় সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে দেশময় গড়ে ওঠে গণআন্দোলন। পরিচিতি লাভ করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন হিসেবে। সে এক ইতিহাস, সবারই তা জানা। কবিদের স্পর্শকাতর, মনবিক- দ্রোহীমন এমন বাস্তবতা স্পর্শ করবে না তা কি হয়? কবির সামাজিক-রাজনৈতিক দায় ও চেতনা থেকে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন গণতন্ত্রকামী প্রগতিশীল কবিরা। দেশের অগ্রগণ্য কবিরা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেন অবস্থান। ৮৭-তে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক/গণতন্ত্র মুক্তিপাক’ এক মহাকাব্য বুকে পিঠে লিখে শহীদ হন আশ্চর্য যুবক নূর হোসেন। অন্য কবিদের সঙ্গেও বেলাল চৌধুরীর কলমও ফেটে পড়ল ক্ষোভে। তিনি লিখলেন- ‘প্রখর সূর্যের নিচে মধ্যাহ্নের অন্ধকার/শকুনীদের মাংসাশী অভিবাদন/যখন খুবলে নিচ্ছিল গণতন্ত্রের টুঁটিÑ/ নূর হোসেন তখন জীবনোষ্ণ এক ঘুমের গভীরে...।’ (জীবনোষ্ণ ঘুম)। কবিতা লিখেই ক্ষান্ত হলেন না। গড়ে তুললেন প্রতিবাদী দ্রোহী কবিদের সংগঠন ‘জাতীয় কবিতা পরিষদ’। যদিও স্বৈরাচার এরশাদের পৃষ্ঠপোষকতায় কবি নামধারী কতিপয় অর্থগৃধনু স্বৈরাচারের পক্ষাবলম্বন করে কোটি মানুষের চেতনায় করেছিল আঘাত আর বিশ্বাসঘাতকতা, তারা আজ আস্তাকুঁড়েয়।

বাঙালী জাতীয়তাবাদ, বাঙালী সংস্কৃতি, ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাসম্পন্ন অগ্রজ কবিদের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় কবিতা পরিষদে বেলাল চৌধুরীর ভূমিকা ছিল অনন্য। নেতৃত্ব পর্যায়ে থেকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে করে বেগবান। মূল আন্দোলনের এক বড় সহায়ক শক্তিরূপে। চলমান থাকে কবিতা পরিষদের কার্যক্রম। নূর হোসেন, জিহাদ, ডা. মিলনসহ অন্য শহীদদের রক্তের ধারায় ভেসে যায় স্বৈরাচার এরশাদের তখ্ত। ১৯৯০-এ জয়ী হয় সাধারণ মানুষের চাওয়া।

১৯৯১ থেকে ‘৯৬-এ জাতি পরিতাপের সঙ্গে দেখল গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত অগণতান্ত্রিক সরকার। সেখানে সবরকমের অগণতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধাচরণ ও প্রতিবাদ করে কবিতা পরিষদ; যার অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্বে থাকেন বেলাল চৌধুরী। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্বে দীর্ঘদিন পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতারোহণ করে। এর মধ্যে প্রবল দাবি ওঠে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ও স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচারের। ব্যক্তি, কবি ও কবিতা পরিষদের নেতা বেলাল চৌধুরীর ভূমিকা নানাভাবে এ সময়ে হয়ে আছে ভাস্বর।

সবাই জানেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে এক দানবীয়, নিকৃষ্ট শাসনকাল। এ সময় মুক্তিযুদ্ধের যাবতীয় চেতনা বিনাশে, ইহিতাস বিকৃতিতে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলাম সহযোগে শাসকগোষ্ঠী ব্যাপৃত হয়। তাদের সহায়তায় জঙ্গীর উত্থান ঘটে। মৌলবাদী শক্তির সহায়তায় সংখ্যালুঘু নির্যাতনসহ সাধারণ মানুষের রক্তে রঞ্জিত হয় বাংলার জমিন। ২০০৪ সালে বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার জীবননাশের চেষ্টা করে তারা গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে। প্রগতিশীল, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষের সামনে নেমে আসে ঘাতক কালো ছায়া। চারদিকে যখন নিরাপত্তাহীনতা, দুর্নীতির আখড়া রাষ্ট্রশক্তি, সব অবকাঠামো বিপর্যস্ত তখনও বেলাল চৌধুরীর অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্বে এসব অপশক্তির বিরুদ্ধে কবিতা পরিষদ আগুয়ান। তাঁর দৃঢ় নেতৃত্ব জাতির কাছে আজও স্মরণীয়। মূল আন্দোলনের সহযোদ্ধা হয়ে কবিতা পরিষদ জনজাগরণে হয় সহায়ক শক্তি।

যখনই কোন সাম্প্রদায়িক, অগণতান্ত্রিক অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তখনই বেলাল চৌধুরী প্রতিবাদ-প্রতিরোধে হয়েছেন সরব, হয়েছেন মুখর। কলম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, সৃষ্টিকর্ম ও সংগঠন নিয়ে দাঁড়িয়েছেন জনতার কাতারে রাজপথে। আজও তার মনন তেমনি সক্রিয়।

তারুণ্যের আশ্রয়-প্রশ্রয় বা সময়ের নায়ক

এ লেখার রসদ জোগাতে তাঁর পল্টনের ‘ডেরা’য় ঢুকতেই অসুস্থ শরীরে আগেই হাত উঁচিয়ে জানালেন অভিবাদন। এ পক্ষ থেকে কোন সম্ভাষণ, সম্বোধন বা সাম্মানিক কোন শব্দ-বাক্য ব্যবহারের কোন সুযোগই দিলেন না। মানুষের প্রতি সম্মান আর মমতা কী! একটু শক্তি জুগিয়ে বললেন, ‘এস, এস আমি তরুণদের সঙ্গে কথা বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। ভালোবাসি তারুণ্যকে।’

কে না জানেন বেলাল চৌধুরী সব সময় তারুণ্যের পূজারি। সারাজীবনই তরুণদের কাছে টেনেছেন, ভালবেসেছেন, দিয়েছেন প্রশ্রয়। কোন তরুণের মধ্যে সামান্য প্রতিভার উঁকি দিলেও তাকে উৎসাহের জোয়ারে ভাসিয়েছেন। হাত ধরে নিয়েছেন এগিয়ে। সে হোক না কবিতা, গল্প, চিত্রশিল্প, সঙ্গীত- নান্দনিকতার যেকোন ক্ষেত্র। তার সময়ে সমসাময়িক অনেকের চোখেই ছিলেন নায়ক, তরুণদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

তার বয়সে যারা ছোট, আজ সৃষ্টিশীলতার যেকোন মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত তারা অনেকেই পেয়েছেন তাঁর অপত্য স্নেহ, আনুকূল্য আর পৃষ্ঠপোষকতা। বয়সের ভেদাভেদ ভুলে, চির অসাম্প্রদায়িক এ চির তরুণ, চির নিরহঙ্কার কবি সবার কাঁধে বান্ধবের হাত রেখে আজও ভালবাসেন সমভাবে। এ তাঁর শুধু স্বভাবজাতই নয়, অনেকে বলেন মজ্জাগত। আর এ জন্যই তিনি অনেকের চেয়ে তরুণ কবি ও শিল্পস্রষ্টার কাছে অধিকতর প্রিয়, বেশি নির্ভরশীলতার জায়গা। তারুণ্যের কাছে তার প্রিয়তা ঈর্ষণীয়। এটা যেমন এ বাংলায় তেমনি পশ্চিমবঙ্গেও। পশ্চিমবঙ্গে অনুজসমদের কাছে ‘বেলাল দা’ আবার এদেশে ‘বেলাল ভাই’। তিনি অনেক ত্যাগ আর সাধনার বিনিময়ে হয়ে উঠেছেন, ‘আমাদের’। আমাদের বেলাল ভাই। এটা তাঁর অর্জন। এই অর্জনকে অভিবাদন। জয়তু বেলাল ভাই! সুস্থ হয়ে ফিরে আসুন দ্রুত কবিতায় ও কলমে। চারদিকে আবার জাগছে অসুস্থ কোলাহল আর অপশক্তি। আপনিই তো স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘আরেক যুদ্ধের আগে’ কবিতায় এভাবে

‘... বিধ্বস্ত বাড়িঘর দরজা জানালার সামনে

ঘন কুয়াশার চাপড়ার মতো

ওঁৎ পেতে এখনো তারা

ফিসফাস বকবক করে চলেছে সমানে...।’

প্রকাশিত : ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২০/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: